তাকওয়ার পথে কুরবানী: ইতিহাস ও শিক্ষা
উপস্থাপনায়ঃ ইসমাইল বিন ইবরাহীম
ভূমিকাঃ সম্মানিত উপস্থিত দ্বীন পিপাসু শ্রোতামণ্ডলী ভাই ও বোনেরা আপনাদের সকলকে জানাই জান্নাতী সম্ভাশন- আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ
কুরবানী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও বিশেষ ইবাদত। হযরত আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে তা চলে আসছে। তবে সব নবীর শরীয়তে এর পদ্ধতি এক ছিল না। ইসলামী শরীয়তে এর যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তার মূল সূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহীমী’তে বিদ্যমান ছিল। এজন্য কুরবানীকে ‘সুন্নতে ইবরাহীমী’ বলা হয়। এটি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও তাকওয়ার বাস্তব প্রশিক্ষণ।
আজকের সমাজে কুরবানী অনেক সময় প্রতিযোগিতা, লোক দেখানো ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অথচ কুরআন আমাদের শিখায়— কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭)
তাকওয়ার সেই অনুভুতিতে হৃদয়ে জাগ্রত করার প্রয়াসে আমাদের আজকের সেমিনার “তাকওয়ার পথে কুরবানী: ইতিহাস ও শিক্ষা” রব যেন কবুল করেন এই কামনায় শুরু করছি।
আজকের আলোচনায় আমরা জানবো—
১. কুরবানীর পরিচয়
২. কুরবানীর ইতিহাস
৩. তাকওয়ার পরিচয়
৪. কুরবানীর উদ্দেশ্য
৫. কুরবানী ও তাকওয়ার সম্পর্ক
৬. কুরআন-হাদিসে কুরবানীর ফযিলত
৭. কুরবানী থেকে অর্জিত শিক্ষা
৮. বর্তমান সমাজে কুরবানীর বাস্তবতা
৯. কুরবানীর সময় আমাদের করণীয়
১০. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে কুরবানীর প্রভাব

উক্ত পরীক্ষায় পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের জ্ঞান অর্জনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টির এই পূণ্যবান কাজে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে আপনিও অংশগ্রহন করতে পারেন। (যোগাযোগ- 01645380206 হটসঅ্যাপ)
১. কুরবানীর পরিচয়
কুরবানী قربانى শব্দটি আরবী “কুরবান” قربان যা ‘ক্বারব’ قرب শব্দ থেকে একটু পরিবর্তন হয়ে এসেছে। এর অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, আত্মোৎসর্গ, পশু যবেহ করা, রক্ত প্রবাহিত করা ইত্যাদি। যেহেতু কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন ও তার ইবাদতের জন্য পশু জবেহ করা হয়, তাই একে কুরবানী বলা হয়।
শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট কতিপয় গৃহপালিত হালাল প্রাণীকে জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের জন্য উৎসর্গ করাকে কুরবানী বলে। ইসলামি শরিয়তে এটি ইবাদত হিসেবে সিদ্ধ। উল্লেখ্য যে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে পশু জবেহ করা হয় তা তিন ধরনের। যেমন (১) হাদী (২) কুরবানী (৩) আক্বীক্বাহ্।
ঈদুল আযহা এর পরিচয়ঃ
ঈদ (عيد) একটি আরবি শব্দ। শব্দটি খুশি, উৎসব এবং আনন্দ প্রকাশক অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শব্দটি আরবি হলেও বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং হিন্দিসহ প্রায় সব ভাষাতেই শব্দ ও অর্থের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
“আযহা শব্দের অর্ধ-দ্বিপ্রহর অর্থাৎ সকাল ও দুপুরের মধ্যবর্তী সময়। গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মূল্যায়ণ বিবেচনায় কুরআন ও হাদীসে আরবীতে এ দিনটির আরোও কিছু নাম ও পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন ঈদুল আযহা বা অর্ধ-দুপুরের আনন্দ। ইয়াওমুন নাহার বা রক্ত প্রবাহের দিন। ইয়াওমুয যাবাহ বা পশু যবেহের দিন। ইয়াওমুন নুসুক বা কুরবানীর দিন।
Spritual/আধ্যাত্মিক দিক থেকে কুরবানী হল আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃ প্রকাশ
আল্লাহর নামে পশু যবেহ করা প্রকৃত পক্ষে এ কথারই ঘোষণা যে, আল্লাহ এসব নিয়ামত দান করেছেন এবং যিনি এসব আমদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন তিনি এ সবের প্রকৃত মালিক। কুরবানী সেই আসল মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং একথারও বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। যে মমিন অন্তর থেকে আল্লাহ মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি বিশ্বাস রেখে পশুর গলায় ছুরি চালায়। সে উপরোক্ত সত্যের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ঘোষণা করে এবং মুখে “বিসমিল্লাহি আল্লাহ আকবার” বলে এ সত্যের স্বীকৃতি প্রকাশ করে।
২. কুরবানীর ইতিহাস
কুরবানীর ইতিহাস ততটাই প্রাচীন যতটা প্রাচীন মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস। মানুষের জন্যে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যত শরী’য়ত নাযিল হয়েছে প্রত্যেক শরীয়তের সকল নবীর উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান বা হুকুম ছিলো। এব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা নিজেই পবিত্র কালামে কুরআন মাজীদে বলেছেন,
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ﴿الحج: ٣٤﴾
“আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’’ -সূরা হজ্জ ২২: ৩৪
অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের মধ্যে কুরবানী ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। তবে অন্যান্য শরী’য়ত যেমনি বিভিন্ন ছিল, তেমনি কুরবানীর নিয়ম-পদ্ধতি এবং খুঁটিনাটি বিষয়সমূহও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানী
মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানী হলো আদম (আঃ)-এর দু’ সন্তান হাবিল ও কাবিলের কুরবানী। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِن أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الآخَرِ ؕ قَالَ لَاَقۡتُلَنَّكَ ؕ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰهُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۲۷﴾ ﴿المائدة: ٢٧﴾
“আপনি তাদেরকে আদমের দু’ পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই (পিতার নির্দেশে) কিছু কুরবানী নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের কুরবানী গৃহীত হয়নি। সে বলল, ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব’। অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন’।’’ -সূরা মায়িদা৫:২৭
সেকালে কুরবানী গৃহিত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীকে ভস্মিভূত করে দিত। যে কুরবানী অগ্নি ভস্মিভূত করতো না, তাকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হতো।
উল্লেখ্য যে, কুরবানীদাতা ‘হাবিল’ যিনি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্যে একটি অতি সুন্দর দুম্বা কুরবানী পেশ করেন। ফলে তার কুরবানী কবুল হয়। পক্ষান্তরে ‘কাবিল’ তিনি অমনোযোগী অবস্থায় কিছু খাদ্য-শস্য কুরবানী হিসেবে পেশ করলেন। ফলে তার কুরবানী কবুল হয়নি। সুতরাং প্রমাণিত হলো কুরবানী মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবুল হয় না।
নবী মূসা (আঃ)-এর সময়ে কুরবানী : বনু ইস্রাঈলের হঠকারিতা প্রমাণের জন্য
মানুষের লোভ আর হঠকারিতা কতটা ভয়াবহ হ’তে পারে তার এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত পবিত্র কুরআনের সূরা বাক্বারায় বর্ণিত বনী ইসরাঈলের একটি ঘটনায় ফুটে উঠেছে। ইব্রাহীম (আঃ)-এর নাতি নবী ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধর বনী ইসরাঈলের এই ঘটনার সাথে কুরবানীর বিধান জড়িয়ে আছে। যেখানে আল্লাহর নির্দেশে একটি গাভী যবেহ করার মাধ্যমে এক গুপ্ত হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয় এবং একই সঙ্গে আনুগত্য ও অবাধ্যতার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বনী ইসরাঈলের এক যুবক লোভে পড়ে তার একমাত্র চাচাতো বোনকে বিয়ে করে চাচার বিপুল সম্পত্তির একক মালিক হ’তে চেয়েছিল। কিন্তু চাচা বিয়েতে রাযী হ’ল না। ফলে যুবক সম্পত্তির লালসায় অন্ধ হয়ে আপন চাচাকেই গোপনে হত্যা করে বসল। পরদিন সে নিজেই কান্নাকাটি করে কওমের নেতাদের কাছে বিচার দাবি করল, যেন কেউ তাকে সন্দেহ করতে না পারে। কিন্তু সাক্ষীর অভাবে আসামী চিহ্নিত করা যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় নেতারা বিচারের জন্য মূসা (আঃ)-এর কাছে আসলেন। মূসা (আঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে অহি-র মাধ্যমে জেনে গেলেন যে, স্বয়ং বাদীই তার চাচাকে হত্যা করেছে। কিন্তু সরাসরি অপরাধীর নাম ঘোষণা না করে আল্লাহ এক বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য উৎঘাটনের নির্দেশ দিলেন। মূসা (আঃ) নেতাদেরেকে বললেন, এই গুপ্তহত্যার রহস্য উন্মোচনের জন্য আল্লাহ তোমাদের একটি গাভী যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঠিক তখনই বনী ইসরাঈলের স্বভাবজাত কুযুক্তি আর টালবাহানা শুরু হ’ল। তারা সরল আদেশকে জটিল করতে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল যে, গাভীটির বয়স কত? রং কেমন? সেটি কাজে অভ্যস্ত কি না? প্রতিবারই আল্লাহর পক্ষ থেকে শর্তগুলো আরো নির্দিষ্ট ও কঠিন হ’তে লাগল। ফলে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সেই গাভীটি খুঁজে পাওয়া তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল। তারা দীর্ঘ সময় ধরে হন্যে হয়ে গাভীর সন্ধান করতে থাকল।
অবশেষে তারা এমন এক গাভী খুঁজে পেল যেটা না খুব বৃদ্ধ, না একেবারে অল্পবয়সী; বরং মাঝামাঝি বয়সের। তার রং ছিল উজ্জ্বল গাঢ় হলুদ, যা দর্শকদের চোখ জুড়িয়ে দেয়। সে গাভী কখনো জমিতে হাল চাষ বা পানি সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়নি। এক কথায় সুঠাম ও খুঁতহীন। সেই দুর্লভ গাভীটি খুঁজে পাওয়ার পর তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও যবেহ করল। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিস্ময়কর নির্দেশ এলো। আল্লাহ বললেন, ‘যবেহকৃত গাভীর একটি অংশ দিয়ে মৃত ব্যক্তির দেহে আঘাত করো’ (সূরা বাক্বারাহ ২/৭৩)। আঘাত করার সাথে সাথে নিথর দেহটি মুহূর্তের জন্য জীবিত হয়ে উঠল এবং সবার সামনে তার হত্যাকারী ভাতিজার নাম বলে দিয়ে পুনরায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। আল্লাহর কুদরতে সত্য প্রকাশিত হ’ল।
ইলিয়াস (আঃ)-এর কুরবানী: হক-বাতিলের পরীক্ষা
ইলিয়াস (আঃ)-এর যুগে তৎকালীন ফিলিস্তীনের বাদশাহ আখিয়াব এবং রাণী ইযবেল ছিলেন বাআল দেবতার অনুসারী। তারা বিরাট মন্দির তৈরী করে সকলকে বাআল দেবতার পূজা করতে নির্দেশ জারি করেছিলেন। রাজার আদেশে সকলেই শিরকের অতল গহবরে হারিয়ে গিয়েছিল। এই জাতিকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তা‘আলা ইলিয়াস (আঃ)-কে নবী হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দু’একজন ছাড়া কেউ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেনি। একটা পর্যায়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে তিনি দূর পাহাড়ে আত্মগোপন করেন এবং এই অবাধ্য জাতির জন্য দুর্ভিক্ষের বদ দো‘আ করলেন। এমতাবস্থায় দেশে প্রকট আকারে দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তখন ইলিয়াস (আঃ) আত্মগোপন থেকে বের হয়ে সরাসরি রাজ দরবারে গিয়ে বললেন, আল্লাহর অবাধ্যতার জন্যই তোমাদের উপর দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে। তোমরা আল্লাহর অবাধ্যতা ছেড়ে দিয়ে তাঁর ইবাদত করো, তবেই তিনি দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি দিবেন। তিনি আরো বললেন, তোমরা দাবি করো যে তোমাদের বাআল দেবতার নাকি সাড়ে চারশ’ নবী রয়েছে। তাহ’লে চলো একটা সত্য-মিথ্যার পরীক্ষা হয়ে যাক। তোমরা সবাই মিলে বাআল দেবতার নামে কুরবানী পেশ কর, আর আমি একাকী আমার আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করি। যার কুরবানী আসমান থেকে নেমে আসা আগুন গ্রহণ করবে তার ধর্মই সত্য বলে গৃহীত হবে।
এই যৌক্তিক চ্যালেঞ্জ রাজা ও মূর্তিপূজারীরা সানন্দে গ্রহণ করল। অতঃপর নির্দিষ্ট দিনে ‘কোহে কারমাল’ নামক এক পাহাড়ি উপত্যকায় সবাই সমবেত হ’ল। প্রথমে বাআল দেবতার পূজারীরা তাদের কুরবানী পেশ করল। নিমগ্ন সাধনা আর অনবরত কান্নাকাটি করতে করতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হ’ল কিন্তু আকাশ থেকে আগুন তো দূরের কথা আগুনের একটা ফুলকিও আসল না।
এরপর হযরত ইলিয়াস (আঃ) আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করলেন। কিছুক্ষণ পরই আসমান থেকে আগুন নেমে এসে সেই কুরবানী ভস্ম করে দিল। এ দৃশ্য দেখে বহু মানুষ আল্লাহর সিজদায় লুটিয়ে পড়ল কিন্তু বাআল পূজারী অন্ধ ধর্মনেতারা মুশরিকই থেকে গেল। যুগে যুগে এভাবেই আল্লাহ তা‘আলা বাতিলকে পরাজিত করে হকের আওয়াজ বুলন্দ করেছেন।
নবী ইব্রাহীম (আঃ)-কর্র্তৃক পুত্র ইসমাইলকে কুরবানীর বিবরণ
কুরবানী সম্পর্কে কুরআন মাজীদের সূরা ছ¦ফ্ফাতের ১০২-১১১ আয়াত পর্যন্ত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর মধ্যে যে ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে তা-ই হলো প্রকৃত ইতিহাস।
ইতিহাসের পাতায় এমন এক মহাপুরুষের নাম স্বর্ণাক্ষরে খচিত রয়েছে, যিনি একাধারে ছিলেন খোদাভক্ত, ত্যাগের প্রতীক, ধৈর্যের আদর্শ ও নবীজগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তিনি হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। তাকে বলা হয় মুসলিম জাতির পিতা। হজরত নুহ আলাইহিস সালামের আনুমানিক একাদশ অধস্তন বংশধর তিনি। মহান আল্লাহ তাকে যে উচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন, তা কেবল তার অতুলনীয় ত্যাগ, প্রজ্ঞা ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফল। ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মহান আল্লাহর পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। তিনি সব পরীক্ষায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন ‘খলিলুল্লাহ’ তথা মহান আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কুরবানীর কথা খোদ কুরআন মাজীদে উল্লেখিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে জুড়ে আছে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। হজ্জ্ব ও ঈদুল আজহার কুরবানী মূলত নবী ইবরাহীম (আঃ)-এর কুরবানীর অনুসরণ।
আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বৎসর পূর্বে, খৃস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে ইরাকের “উর” নামক স্থানে ইবরাহীম (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের সকলের বিরোধিতা ও প্রতিরোধের মুখে তিনি তাওহীদের প্রচারে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে তিনি ইরাক থেকে ফিলিস্তিনে হিজরত করেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান ছিলেন।
বহু দিন ধরে ইবরাহীম আ.-এর কোনো সন্তান হচ্ছে না। ধীরে ধীরে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সন্তান জন্মের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যায়। জীবনসন্ধ্যায় দাঁড়িয়েও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে নেক সন্তান প্রার্থনা করেন- رَبِّ هَبْ لِيْ مِنَ الصّٰلِحِيْنَ.
হে আমার রব! আমাকে নেক সন্তান দান করুন। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০০
যত দিন যাচ্ছিল ইবরাহীম আ.-এর হৃদয়ে সন্তানের আকাক্সক্ষা ততই তীব্র হচ্ছিল এবং আল্লাহর কাছে ততই দুআ-কাতর হচ্ছিলেন। অবশেষে ৮৬ বৎসর বয়সে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাঁর আকাংক্ষা পূরণ করে একজন সহনশীল পুত্রসন্তান দান করেন। এই সন্তানের নাম রাখেন ইসমাঈল।
একজন আশীতিপর বৃদ্ধ লোক সন্তানের মুখ দেখলে কত আনন্দিত হবে সহজেই অনুমেয়। ইবরাহীম আ. শুধু আনন্দিতই হননি; আল্লাহর শোকরে তাঁর হৃদয় ভরে যায়। তিনি শোকর আদায় করে বলেন-
الْحَمْدُ لِلهِ الَّذِيْ وَهَبَ لِيْ عَلَي الْكِبَرِ اِسْمٰعِيْلَ وَاِسْحٰقَ اِنَّ رَبِّيْ لَسَمِيْعُ الدُّعَآء.
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দুআ শ্রবণকারী। -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৩৯
ইবরাহীম আ. শামে বসবাস করতেন। একসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এল, পুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মা হা-জারকে যেন মক্কায় রেখে যান। মক্কায় তখন জনবসতি ও জীবনোপকরণ কিছুই ছিল না। তার পরও আল্লাহর নির্দেশমতো তিনি তাঁদেরকে সুদূর মক্কায় রেখে যান।
ইসমাঈল আ. ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে শুরু করেন। তিনি যত বড় হচ্ছিলেন, তাঁর প্রতি পিতার ভালবাসা তত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যখন তিনি ছোটাছুটি করার বয়সে উপনীত হন তখন ইবরাহীম আ. এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তিনি স্বপ্নে দেখেন, একমাত্র কলিজার টুকরোকে যবেহ করছেন।
এটা যদিও স্বপ্ন ছিল; কিন্তু নবীগণের স্বপ্ন ওহীর মতো হয়ে থাকে। তাই এ স্বপ্নের অর্থ এই ছিল যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবরাহীম আ.-কে একমাত্র সন্তান ইসমাঈল আ.-কে যবেহ করার আদেশ করা হয়েছে।
ইসমাঈল আ. যদিও ইবরাহীম আ.-এর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দুআর ফল; কিন্তু তাঁর কাছে আল্লাহর আদেশ ছিল সবার উপরে। তিনি খুশিমনে এ আদেশ পালন করতে রাজি হয়ে গেলেন। কেননা সন্তান আল্লাহ্ই দান করেছেন। এখন তিনিই তাকে যবেহ করার আদেশ করেছেন। তাঁর দেওয়া সম্পদ তাঁর জন্য কুরবান করতে দ্বিধা কীসের? বান্দার জন্য এটা বরং সৌভাগ্যের বিষয়।
ইবরাহীম আ. অতীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সবগুলোতে চূড়ান্ত সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। এই আদেশ পালনেও নিজের দিক থেকে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এটা যেহেতু দুইজনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় ছিল, তাই অপরজনের অভিমত জানা বা অন্তত অবহিত করা উচিত। এতে তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবেন অথবা তার কোনো দ্বিধা থাকলে বুঝানো-সমঝানো যাবে।
ইবরাহীম আ. নিজ স্বপ্নের কথা সন্তানকে জানিয়ে তাঁর অভিমত জানতে চাইলেন-
يٰبُنَيَّ اِنِّيْۤ اَرٰي فِي الْمَنَامِ اَنِّيْۤ اَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرٰي.
হে আমরা বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি, তোমাকে যবেহ করছি। তাই তুমি চিন্তা করে দেখ, তোমার অভিমত কী।
কিন্তু তিনি তো ছিলেন খলীলুল্লাহর পুত্র এবং ভাবী নবী। তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-
يٰۤاَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِيْۤ اِنْ شَآءَ اللهُ مِنَ الصّٰبِرِيْنَ.
হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০২
এটা ইসমাঈল আ.-এর গভীর জ্ঞান ও বিনয়ের পরিচায়ক। ইবরাহীম আ. তাঁর কাছে একথা বলেননি যে, আল্লাহ তোমাকে যবেহ করার আদেশ করেছেন; তিনি একটি স্বপ্নের কথা বলেছেন মাত্র। কিন্তু ইসমাঈল আ. বুঝে ফেলেছেন, এ স্বপ্ন মূলত আল্লাহর একটি আদেশ।
দ্বিতীয়ত, তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে বিষয়টি আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছেন এবং ‘আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন’ বলে এ ইঙ্গিত করেছেন যে, এই ধৈর্য একা আমারই কৃতিত্ব নয়; বরং দুনিয়াতে আরো বহু ধৈর্যশীল আছেন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে তাদের মধ্যে পাবেন। এভাবে তিনি অহংকার ও আত্মমুগ্ধতার নাম-গন্ধটুকু পর্যন্ত খতম করে চূড়ান্ত বিনয়ের প্রকাশ করলেন।
যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য রাজি হয়ে গেলেন তখন এল আসল পর্ব। ইবরাহীম আ. পুত্রকে যবেহ করার জন্য কাত করে শোয়ালেন।
যবেহের ক্ষেত্রে যদিও সাধারণ নিয়ম হল চিত করে শোয়ানো; কিন্তু ইবরাহীম আ. ইসমাঈল আ.-কে কাত করে শোয়ানোর উদ্দেশ্য সম্ভবত এই ছিল যে, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন প্রসঙ্গে তাঁরা দুইজন নিজেদের পক্ষ থেকে তো এটাই ধরে নিয়েছিলেন যে, পিতা পুত্রকে কার্যত যবেহ করবেন। তাই ইবরাহীম আ. পুত্রকে কাত করে শোয়ালেন, যাতে ছুরি চালানোর সময় চেহারা নজরে না পড়ে, পাছে পুত্রবাৎসল্য উঠলে মন টলে যায়। এ থেকে অনুমেয়, এই আদেশ পালনের জন্য তাঁরা কত আন্তরিক ছিলেন।
আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনের জন্য তাঁরা যেহেতু তাঁদের এখতিয়ারাধীন সবকিছুই করে ফেলেছিলেন, তাই তাঁদের পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল। অনন্তর আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের এক কারিশমা দেখালেন। তিনি নিজ কুদরতে সেখানে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। ইবরাহীম আ. আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের স্থলে সেটি যবেহ করলেন। ইসমাঈল আ. জীবিত ও নিরাপদ থাকলেন।
কুরআনের ভাষায়-
فَلَمَّاۤ اَسْلَمَا وَتَلَّهٗ لِلْجَبِيْنِ وَنَادَيْنٰهُ اَنْ يّٰۤاِبْرٰهِيْمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ، اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الْبَلٰٓؤُا الْمُبِيْنُ، وَفَدَيْنٰهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ.
অতঃপর যখন তারা উভয়ে আদেশ মান্য করল এবং পিতা পুত্রকে কাত করে শুইয়ে দিল। আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা। এবং আমি এক মহান কুরবানীর (পশুর) বিনিময়ে তাকে (ইসমাঈল) মুক্ত করলাম। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০৩-১০৭
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِى ٱلْأَخِرِينَ – سَلَـٰمٌ عَلَىٰٓ إِبْرَٲهِيمَ – كَذَٲلِكَ نَجْزِى ٱلْمُحْسِنِينَ – إِنَّهُۥ مِنْ عِبَادِنَا ٱلْمُؤْمِنِي
আর তার জন্য আমি পরবর্তীদের মধ্যে সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি। ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয় সে ছিল আমার মু’মিন বান্দাহদের অন্তর্ভুক্ত। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০৮-১১১
জাহেলী যুগে কুরবানী : ইব্রাহীমী সুন্নাতের বিকৃতি
আরব জাতির পিতা ছিলেন ইব্রাহীম (আঃ)। সেজন্য জাহিলী যুগে মক্কার লোকেরা দাবী করত তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর ধর্ম অনুসরণ করে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর প্রকৃত দ্বীনকে বিকৃত ও পরিবর্তিত করে ফেলেছিল। ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) সর্বপ্রথম কা‘বা ঘর নির্মাণ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমেই কা‘বাকে কেন্দ্র করে ইবাদত, তাওয়াফ এবং হজ্জের বিধান চালু করেছিলেন (হজ্জ ২২/২৬-২৭)। আর পিতা-পুত্রের কুরবানীর ইতিহাস তো যুগ যুগ ধরে জীবন্ত ছিল।
যেই কা‘বাকে ইব্রাহীম (আঃ) তাওহীদের কেন্দ্রভূমিতে রূপান্তর করলেন, সেই কা‘বার চতুর্পাশে মূর্তি স্থাপন করে মক্কার লোকেরা শিরকের আখড়ায় পরিণত করেছিল। তারা মূর্তির পূজা করত। কা‘বায় ইবাদতের সময় শিস দিত ও তালি বাজাতো (আনফাল ৮/৩৫)। তাদের এই বিকৃতি কুরবানীর বিধানকেও কলুষিত করেছিল। ইব্রাহীমী সুন্নাতের পরিবর্তে তারা মূর্তির সম্মানে কুরবানী চালু করেছিল (মায়েদাহ ৫/৩)। আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায় মূর্তির নামে কুরবানী দিয়ে গোশতের কিছু অংশ মূর্তিগুলির মাথায় রাখত ও তার উপরে কিছু রক্ত ছিটিয়ে দিত। কেউবা উক্ত রক্ত কা‘বাগৃহের দেওয়ালে লেপন করত।[5] এভাবে তারা ইব্রাহীমী সুন্নাতের মূল চেতনা পরিত্যাগ করে কুসংস্কার ও শিরকের গভীর অন্ধকারে পতিত হয়েছিল।
উম্মাতে মুহাম্মদী ﷺ-এর ওপর কুরবানীর হুকুম
আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলকে কাওসার দান করেছেন। এর শুকরিয়া আদায়ে তিনি তাকে এ দিনে কুরবানি ও সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’’ – ইবন রজব (রঃ) পৃ ঃ ৪৮২-৪৮৩
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ-فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ﴿الكوثر: ١- ٢﴾
“নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’’ -সূরা কাউসার ঃ ১-২
আমরা জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে যে কুরবানী করে থাকি তা আমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর মাধ্যমে প্রবর্তীত হয়েছে। অর্থাৎ এটি ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত।
৩. তাকওয়ার পরিচয়
তাকওয়া কী? তাকওয়া বা আল্লাহর ভয় হল অন্তরের এমন একটি বিশেষ অবস্থা যা মানুষের মনে জাগ্রত হলে আল্লাহর হক, আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সর্বোপরি আখেরাতের কাজে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণা সৃষ্টি হয়। আর তখন তার দ্বারা দুনিয়াতে কোন অপরাধ বা অন্যায়-অবিচার, ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে না। খুব সাবধানতার সাথে সে উপরোক্ত বিষয়াবলী থেকে বিরত থাকতে পারে।
খলীফা উমর (রাঃ) একবার হযরত উবাই ইবনে কা’বকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাকওয়া কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আপনি কি কখনও কন্টাকাকীর্ণ পথে চলেছেন? তিনি বললেন হ্যাঁ, উবাই বললে, তখন আপনি কী করেছেন? তিনি বললেন, খুব সতর্কতার সাথে কাঁটার আঁচড় থেকে শরীর ও কাপড় বাঁচিয়ে চলেছি। উবাই ইবনে কাব বলেন এটাই হল তাকওয়া। (সূরা বাক্কারার ৩ ও ৪ নং আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর)
আল্লাহ বলেন— يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় কর।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত- ১০২)
আল্লাহ তা’আলার নিকট সম্মান ও মর্যাদার একমাত্র মানদন্ড হল তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ.
নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলার নিকট সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান। (সূরা হুজরাত- ১৩)
মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ
তোমরা পাথেয় সঞ্চয় কর, আর উত্তম পাথেয় হল তাকওয়া। অতএব ওহে জ্ঞানী ব্যক্তিরা! তোমরা আমাকেই ভয় কর। (সূরা বাকারা- ১৯৭)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, إِنَّكَ لَستَ بِخَيرٍ مِّن أَحْمَرَ وَ لا أَسوَدَ إِلا أَن تَفَضَّلَه بَتَقْوَى
তুমি সাদা বা কালো এর ভিত্তিতে উত্তম হতে পারবে না, যদি তাকওয়ার দিক থেকে তুমি এগিয়ে না থাক। (আলফিয়্যাতুল হাদীস-হা, নং-৭৭৫, আহমদ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— التَّقْوَى هَاهُنَا
“তাকওয়া এখানে।” এরপর তিনি নিজের বক্ষের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করলেন। (সহীহ মুসলিম)
৪. কুরবানীর উদ্দেশ্য
সুতরাং মহান রবের সন্তুষ্টি লাভ, ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পশু-প্রবৃত্তিকে দমন করে তাকওয়া অর্জন কুরবানীর মূল লক্ষ্য।
১. মহান আল্লাহর নির্দেশ প্রতিপালন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ.
সুতরাং আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। -সূরা কাওসার (১০৮) : ২
২. মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আঃ) এর সুন্নাতকে বুলন্দ রাখা।
وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِى ٱلْأَخِرِينَ –
আর তার জন্য আমি পরবর্তীদের মধ্যে সুখ্যাতি রেখে দিয়েছি। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০৮
রাসূল (সাঃ) এর একটি হাদীসে এভাবে এসেছে- “একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এর সাহাবীগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কুরবানী কী? জবাবে হুজুর (সাঃ) বললেন, ইহা তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নত|” (ইবনে মাজাহ-৩২৪৭, আহমদ-১৯২৮৩)
৩. আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোসনা করা
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ﴿الحج: ٣٤﴾
“আর আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’’ -সূরা হজ্জ ২২: ৩৪২.
৪. তাকওয়া অর্জন: আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ﴿الحج: ٣٧﴾
“ওসব (কুরবানীর) পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে কিছুই পৌঁছে না; বরঞ্চ তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাক্বওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে।
৫. সামাজিক সহমর্মিতা:
কুরবানীর মাধ্যমে গরিব মানুষও আনন্দে শরিক হয়। কুরবানীর পার্থিব উদ্দেশ্য হল পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গরিব-মিসকিন, অভাবীদের আনন্দ দান, নিজে কুরবানীর গোশত খাওয়া ও স্বজনদেরকে গোশত খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা। আল্লাহ বলেন—
لِّیَشۡهَدُوۡا مَنَافِعَ لَهُمۡ وَ یَذۡكُرُوا اسۡمَ اللّٰهِ فِیۡۤ اَیَّامٍ مَّعۡلُوۡمٰتٍ عَلٰی مَا رَزَقَهُمۡ مِّنۡۢ بَهِیۡمَۃِ الۡاَنۡعَامِ ۚ فَكُلُوۡا مِنۡهَا وَ اَطۡعِمُوا الۡبَآئِسَ الۡفَقِیۡرَ
“যাতে তারা তাদের জন্য (এখানে রাখা দুনিয়া ও আখিরাতের) কল্যাণগুলো প্রত্যক্ষ করতে পারে আর তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযক দান করেছেন, নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। কাজেই তোমরা (নিজেরা) তাত্থেকে খাও আর দুঃস্থ অভাবীদের খাওয়াও। (সূরা হজ্জ, আয়াত- ২৮)
فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ ۚ ﴿الحج: ٣٦﴾
“অতঃপর যখন সেগুলো কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু প্রার্থনা করে না তাকে এবং যে প্রার্থনা করে তাকে।’’ -সূরা হজ্জ ঃ ৩৬
৬. আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তব পরীক্ষা
কুরবানী প্রমাণ করে— আমি কি আল্লাহর জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত?
আমি কি হারাম উপার্জন ছাড়তে পারি?
আমি কি প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?
৫. কুরবানী ও তাকওয়ার সম্পর্ক
কুরবানীর দর্শন ও প্রাণশক্তি হলো তাকওয়া
জাহিলীযুগের লোকেরা পশু কুরবানী করার পর তার গোশত বায়তুল্লাহর সম্মুখে এনে রেখে দিতো। তার রক্ত বায়তুল্লাহর দেয়ালে লেপে দিতো। আর তারা মনে করতো তাদের কুরবানী তাদের ‘ইলাহ’র কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কুরআন নাযিল হওয়ার পর তাদের এ দর্শনকে বলা হলো এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। সঠিক দর্শন হলো কুরবানীর সময় মানুষের মনে যে আবেগ-অনুভূতি সঞ্চারিত হয় তা যেন একমাত্র আল্লাহর জন্যে এবং তাঁর পথেই উৎসর্গ করার লক্ষ্যে হয়। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন,
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ﴿الحج: ٣٧﴾
“ওসব (কুরবানীর) পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে কিছুই পৌঁছে না; বরঞ্চ তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাক্বওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আলাহ্র মাহত্ম্য ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং হে নবী নিষ্ঠার সাথে যারা নেক কাজ করে আপনি তাদের জান্নাতের সু-সংবাদ শুনিয়ে দিন’’।’’ -সূরা হাজ্জ ঃ ৩৭
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ لَا ينظر إِلَى صوركُمْ وَلَا أموالِكم وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ (رَوَاهُ مُسْلِمٌ : ٢٥٦٤)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারার দিকে এবং তোমাদের সম্পদের দিকে দেখেন না বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল (অর্থাৎ নিয়তের বিশুদ্ধতা ও আমলের উৎকর্ষতা)।’’ -মুসলিম ঃ ২৫৬৪; মিশকাত ঃ ৫৩১৪
হাঁ, কুরবানীর পশুর কিছুই তো আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। গোশত আমরা খেয়ে নিই। রক্ত-ময়লা ফেলে দিই। তাহলে আল্লাহর কাছে কী পৌঁছে? তাঁর কাছে পৌঁছে অন্তরের নিয়ত। যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কুরবানী করা হয়, তাহলে এটাই তাঁর কাছে পৌঁছবে এবং তাঁর কাছে এর প্রতিদান পাওয়া যাবে। আর যদি নামদাম, লৌকিকতা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে করা হয় তাহলে তাঁর কাছে কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না।
মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানীর ঘটনায়ও এ বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে। যখন আদম আ.-এর দুই পুত্র কুরবানী পেশ করলেন তখন একজনের কুরবানী কবুল হল, অপরজনের কুরবানী কবুল হয়নি। এ অবস্থায় তার (যার কুরবানী কবুল হয়নি) উচিত ছিল সত্য মেনে নেওয়া, কিন্তু সে উল্টো ঈর্ষাকাতর হল এবং একপর্যায়ে অপর ভাইকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হল। তখন ওই ভাই (যার কুরবানী কবুল হল) বললেন- اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ .
আল্লাহ তো মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করেন। -সূরা মায়েদা (৫) : ২৭
তবে মনে রাখতে হবে, সকল দৈহিক ইবাদত এবং আর্থিক ত্যাগ সম্বলিত ইবাদতের উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য। তাঁর সাথে অন্য কারো সন্তুষ্টি লক্ষ্য নয়। কুরবানী ও জীবন দানের প্রেরণা ও চেতনা সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্য নবী ﷺ-কে নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ*لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ ﴿الأنعام: ١٦ “আপনি বলুন: আমার সালাত, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহই জন্যে। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি হলাম সবার আগে মুসলমান তথা আনুগত্যশীল।’’ -সূরা আন’য়াম ঃ ১৬২-১৬৩
৬. কুরআন-হাদিসে কুরবানী ও তার ফজিলত
ইবরাহীম আ.-এর এই দুম্বা কুরবানী হল, ইসলামী শরীয়তে নির্দেশিত কুরবানীর পদ্ধতির মূল সূত্র। (সামর্থ্যবান) মুসলমানদের কর্তব্য হল (নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট) পশু কুরবানী করা। এটা কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ.
সুতরাং আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। -সূরা কাওসার (১০৮) : ২
এ আয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা উম্মতকে নামায ও কুরবানীর আদেশ করা হয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-এর সূত্রে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দ্বীন সম্পর্কে জানতে এসেছিল। ফিরে যাওয়ার সময় নবীজী তাকে ডেকে বললেন-
أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى، جَعَلَهُ اللهُ عِيدًا لِهَذِهِ الْأُمَّةِ.
আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহার’ আদেশ করা হয়েছে। এ দিবসকে আল্লাহ এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৫৭৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৪
এ হাদীস থেকে জানা গেল, আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরবানীর দিন কুরবানী করার জন্য বিশেষভাবে আদেশ করা হয়েছে।
মিখনাফ ইবনে সুলাইম রা. বলেন-
كُنّا وُقُوفًا مَعَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِعَرَفَاتٍ، فَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: يَا أَيّهَا النّاسُ، عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيّةٌ.
আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আরাফায় অবস্থান করছিলাম। তখন তাঁকে বলতে শুনেছি, হে লোকসকল! প্রত্যেক ঘরওয়ালার উপর প্রতি বছর কুরবানী আবশ্যক। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫১৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ২৪৭৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৮৮৯ ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন-هذا حديث حسن غريب.
তাছাড়া নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদানী-জীবনে প্রতি বছর কুরবানী করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন-
أَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي كُلَّ سَنَةٍ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় দশ বছর ছিলেন। প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৯৫৫ ইমাম তিরমিযী রাহ. বলেন-هذا حديث حسن
উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে বোঝা গেল, কুরবানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। সামর্থ্যবানদের জন্য কুরবানী করা আবশ্যক।
কুরবানীর ফজীলত
কুরবানীই হচ্ছে কুরবানীর দিন সমূহের সর্বোত্তম আমল রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ، إِنَّهُ لَيَأْتِي يَوْمَ القِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلاَفِهَا، وَأَنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الأَرْضِ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا ( رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه ,مشكوة : ١٤٧٠)
“কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করা (যবাহ করা) অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় মানুষের কোন আমল নেই। নিশ্চয় কিয়ামতের দিন (কুরবানী দাতার পাল্লায়) কুরবানীর পশু, ইহার শিং, ইহার পশম এবং ইহার খুর সব সহ উপস্থিত হবে। এর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌছে যায় সুতরাং স্বাচ্ছন্দ্য হৃদয়ে তোমরা তা করবে।’’ -ইবন মাজাহ; তিরমিযী; মিশকাত ঃ ১৪৭০
পশুর রক্ত যমিন স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে কবূল হয়ে যায়
রাসূলে করীম ﷺ বলেছেন,
وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الأَرْضِ فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا( رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه ,مشكوة “কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলার কাছে বিশেষ সম্মানিত স্থানে পৌঁছে যায় (কবূল হয়ে যায়)। সুতরাং তোমরা প্রফুলচিত্তে কুরবানী কর।’’ -তিরমিযী; ইবন মাজাহ; মিশকাত ঃ ১৪৭০
প্রথম রক্তবিন্দুর সাথেই বান্দার গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِفَاطِمَةَ عَلَيْهَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ: قَوْمِي إِلَى أُضْحِيَّتِكَ فَاشْهَدِيهَا فَإِنَّ لَكِ بِأَوَّلِ قَطْرَةٍ تَقْطُرُ مِنْ دَمِهَا يُغْفَرُ لَكِ مَا سَلَفَ مِنْ ذُنُوبُكَ قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا لَنَا أَهْلَ الْبَيْتِ خَاصَّةً أَوْ لَنَا وَلِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً؟ قَالَ: بَلْ لَنَا وَلِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً (المستدرك علي الصحيحين للحاكم : ٧٥٢٥)
“হে ফাতেমা! তুমি তোমার কুরবানীর পশুর দিকে যাও এবং (পশুর কুরবানীকার্য) প্রত্যক্ষ কর। কেননা পশু থেকে নির্গত প্রথম রক্ত বিন্দুর অসিলাতেই তোমার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। ফাতেমা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন; ইয়া রাসূলালাহ! এ প্রতিদান কি শুধু আমাদের (নবীর পরিবারের) জন্যই নির্ধারিত নাকি আমাদের ও সমস্ত মুসলানদের জন্যই নির্ধারিত? তিনি বললেন: না বরং আমাদের ও সমস্ত মুসলমানের জন্যই নির্ধারিত।’’ – মুস্তাদরাকে হাকিম ঃ ৭৫২৫; বাযযার
পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ: قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ؟ قَالَ: سُنَّةُ أبيكم إِبْرَاهِيم عَلَيْهِ السَّلَام قَالُوا: فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ . قَالُوا: فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَة (رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَه)
“(একদিন) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কোরবানী কী? জবাবে হুজুর ﷺ বললেন ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত (ঐতিহ্য)। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের জন্য কী (সওয়াব) রয়েছে? তিনি বলেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে পুন্য হবে (এদের পশম তো অনেক বেশি)? তিনি বলেন, পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি কওে নেকী রয়েছে।’’ -ইবন মাজাহ ঃ ৩২৪৭; আহমদ ঃ ১৮৭৯৭; মিশকাত ঃ ১৪৭৬
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী না করার সতর্কতা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“যার সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” — Sunan Ibn Majah, হাদিস: ৩১২৩
৭. কুরবানী থেকে অর্জিত শিক্ষা
কুরবানীর মধ্যে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এখানে কয়েকটি শিক্ষা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল :
১. ত্যাগের শিক্ষা
কুরবানী শেখায়—
নফসের কুরবানী
গুনাহের কুরবানী
অহংকারের কুরবানী
হারাম সম্পর্কের কুরবানী
২. ধৈর্যের শিক্ষা
ইসমাইল (আ.) ছিলেন ধৈর্যের প্রতীক।
৩. আনুগত্যের শিক্ষা
মুমিনের কাজ—
“শুনলাম এবং মানলাম।”
৪. পরিবার গঠনের শিক্ষা
ইবরাহিম (আ.) এর পরিবার ছিল তাকওয়াভিত্তিক পরিবার।
৫. সমাজে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি
কুরবানীর গোশত ধনী-গরিবের দূরত্ব কমায়।
কুরবানির আরো কিছু শিক্ষা-
১. কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হল, আল্লাহর প্রতি তাওহীদের বিশ্বাসকে দৃঢ়, পরিপূর্ণ ও নিখুঁত করা। কুরবানী আমাদের এ শিক্ষা দেয় যে, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ, আর কোনো কিছু ইবাদতের উপযুক্ত নয়। সুতরাং ইবাদত একমাত্র আল্লাহর করব। আল্লাহ ছাড়া আর কারো, আর কোনো কিছুর ইবাদত করব না। কোথাও উপাসনাধর্মী কোনো কাজ গায়রুল্লাহর জন্য হলে আমি তাতে শরীক হব না।
আল্লাহ তাআলা নবীজীকে বলেন-
قُلْ اِنَّنِيْ هَدٰىنِيْ رَبِّيْۤ اِلٰي صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ دِيْنًا قِيَمًا مِّلَّةَ اِبْرٰهِيْمَ حَنِيْفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، قُلْ اِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ، لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ.
আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরলপথ প্রদর্শন করেছেন, যা বিশুদ্ধ দ্বীন, ইবরাহীমের মিল্লাত, যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী। -সূরা আনআম (৬) : ১৬১-৬৩
এ আয়াতগুলোতে নবীজীকে নিখুঁত ও পরিপূর্ণ তাওহীদের ঘোষণা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর পশু যবেহ করার সময় তাওহীদের এই ঘোষণা উচ্চারণ করতেন।
জাবির রা. থেকে বর্ণিত, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দুটি দুম্বা জবাই করেছেন। তিনি যখন এগুলোকে কেবলামুখী করে শোয়ালেন তখন বললেন-
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ، عَلى مِلَّةِ إِبْرَاهِيْمَ حَنِيْفًا، وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. لَا شَرِيْكَ لَهٗ، وَبِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ.
আমি আমার মুখ তাঁর অভিমুখী করলাম, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ২৮৯৯
২. কুরবানীর আরেকটি বড় শিক্ষা হল আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা। তাঁর আদেশকে শিরোধার্য করা। তাঁর হুকুম-আহকাম পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কুরবানীর ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ইবরাহীম আ. আল্লাহর নির্দেশে বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্ত একমাত্র সন্তান ইসমাঈল আ.-কে যবেহ করার জন্য খুশিমনে রাজি হয়েছিলেন।
৩. কুরবানীর আরেকটি বড় শিক্ষা হল যে কোনো নেক কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা। কুরবানীর এ শিক্ষা উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীস থেকেই আমরা পাই। অন্যত্র তা আরো পরিষ্কারভাবে এসেছে।
হাদীসেও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، مَنْ فَعَلَهُ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلُ، فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِأَهْلِهِ، لَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِي شَيْءٍ.
ঈদের দিন আমরা প্রথমে নামায আদায় করি। অতঃপর ফিরে এসে কুরবানী করি। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে, সে আমাদের নিয়ম মতো করল। আর যে নামাযের আগেই পশু জবাই করল সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে, কুরবানী হবে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬১
এ হাদীস থেকে বোঝা গেল, কুরবানী শরীয়তের বিধান মোতাবেক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করতে হবে। অন্যথায় তা কুরবানী হবে না; বরং নিছক গোশত খাওয়ার আয়োজন হবে।
৪. কুরবানীর আরেকটি শিক্ষা হল, কোনো কাজেই এমনকি যদি অনেক বড় কোনো নেক কাজেরও তাওফীক হয়ে যায়, তবু অহংকার না করা, আত্মমুগ্ধতার শিকার না হওয়া; বরং বিনয়ী হওয়া এবং অন্তরে এই অনুভূতি থাকা চাই যে, এটা একমাত্র আল্লাহর দয়াই আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। অন্যথায় আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। কুরবানীর ইতিহাসে আমরা লক্ষ করেছি, ইবরাহীম আ. যখন ইসমাঈল আ.-এর কাছে নিজ স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করে তাঁর অভিমত জানতে চেয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি দুম্বা কুরবানী করেন- একটি নিজের পক্ষ থেকে, আরেকটি উম্মতের পক্ষ থেকে। দুম্বা দুটি জবাই করার সময় তিনি বলেন- اَللّٰهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ.
হে আল্লাহ! এটা তোমার পক্ষ থেকেই এবং তোমার জন্যই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ২৮৯৯
নবীজীর বিনয় দেখুন, দুটি দুম্বা কুরবানী করা সত্ত্বেও তিনি অহংকার করেননি; বরং এই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন যে, এটা আল্লাহরই দান, তিনিই এর তাওফীক দান করেছেন।
৫. কুরবানীর আরেকটি শিক্ষা হল, সন্তানকে আল্লাহর অনুগত বানানোর চেষ্টা করা। কুরবানীর ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ইবরাহীম আ. মনে মনে এমন সন্তানের কথাই ভাবতেন এবং আল্লাহর কাছেও এমন সন্তানই প্রার্থনা করতেন, যে আল্লাহর পূর্ণ অনুগত হবে, আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। তিনি তা বাস্তবে প্রমাণ করেছেন।
৮. বর্তমান সমাজে কুরবানীর বাস্তবতা
যদিও কুরবানীর মূল শিক্ষা আত্মত্যাগ, তাকওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা, কিন্তু আজকের তরুণ প্রজন্মের এক বড় অংশের কাছে কুরবানী হয়ে উঠেছে একটি ‘উৎসবভিত্তিক সামাজিক ইভেন্ট’। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করা হলো:
১. বাহ্যিকতা ও ভোগবাদের আধিক্য:
বর্তমান তরুণদের অনেকেই কুরবানীকে ধর্মীয় অনুভূতির বদলে সামাজিক প্রতিযোগিতা ও বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে দেখছে। পশু কেনার ক্ষেত্রে ‘দাম কত’, ‘ওজন কত’, ‘গরুটা কত বড়’, এসব নিয়ে অহংকার ও গর্ব প্রকাশ করে। কুরবানীর উদ্দেশ্য যেখানে আত্মত্যাগ, সেখানে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে একধরনের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’। এমনকি যারা কুরবানী দিতে সক্ষম নয়, তাদের সামাজিকভাবে ছোট করে দেখার মতো মানসিকতাও গড়ে উঠছে।
২. সোশ্যাল মিডিয়ার অশোভন ব্যবহার:
কুরবানী উপলক্ষে পশুর ছবি, ভিডিও, লাইভ, কাটার দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া এখন যেন একপ্রকার ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। তরুণরা নিজের ‘ধার্মিকতা’ বা ‘সক্ষমতা’ প্রদর্শনের মাধ্যমে জনসমক্ষে বাহবা নিতে চায়। অথচ ইসলাম নির্দেশ করে—কুরবানী আল্লাহর জন্য, তা লোক দেখানোর জন্য নয়।
৩. ধর্মীয় উপলব্ধির অভাব:
অনেক তরুণের মধ্যে কুরবানীর ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। তারা জানেই না কেন কুরবানী দিতে হয়, এর ইতিহাস কী, আল্লাহ কিসে সন্তুষ্ট হন। ফলে কুরবানী হয়ে যায় শুধুই পারিবারিক বা সামাজিক রেওয়াজ। ধর্মীয় শিক্ষা থেকে দূরে থাকা, কুরআন-হাদীসের সাথে সম্পর্ক না থাকায় এই অবস্থা তৈরি হয়েছে।
৪. অর্থের অপব্যয় ও শো-অফ কালচার:
অনেকে অতি দামি পশু কিনে, বড় মেজবান দিয়ে, প্রচুর মাংস নিজের জন্য রেখে এবং মাত্রাতিরিক্ত খরচ করে কুরবানীকে অপচয় ও বিলাসিতার মাধ্যমে সম্পন্ন করে। অথচ ইসলামে মধ্যমপন্থা এবং মিতব্যয়িতা উৎসাহিত করা হয়েছে। এই প্রজন্ম অনেক সময় কুরবানীর প্রকৃত সুবিধাভোগী—গরীব-দুঃখীদের কথা ভুলেই যায়।
৫. কুরবানীর মানসিকতা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে অনুপস্থিত:
তরুণরা কুরবানী উপলক্ষে সাময়িকভাবে উৎসাহী হলেও, বছরের অন্য সময় আত্মত্যাগ, সহানুভূতি, দান, তাকওয়া বা সেবামূলক কাজে তেমন যুক্ত থাকে না। তারা কুরবানীর শিক্ষাকে জীবনের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ না করে শুধুই একটি বার্ষিক ইভেন্ট হিসেবে পালন করে।
বিদ্যমান বাস্তবতায় আমাদের করণীয়:
১. ধর্মীয় শিক্ষা ও চেতনা জোরদার করা:
প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হলো তরুণদের কুরবানীর মূল ইতিহাস, তাৎপর্য ও ইসলামী আদর্শ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়া। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের কাহিনী, কুরবানীর শর্তাবলি, উদ্দেশ্য ও উপকারিতা সম্পর্কে পাঠক্রমভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ধর্মীয় বক্তারা তরুণবান্ধব ভাষায়, বাস্তব উদাহরণসহ এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন।
২. পারিবারিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো:
পরিবারকে তরুণদের কুরবানী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। পশু নির্বাচন, পরিচর্যা, জবাই ও বিতরণে সন্তানদের যুক্ত করলে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও অনুভূতি গড়ে উঠবে। কুরবানীকে একটি পারিবারিক শিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যেখানে ধর্মীয় আবেগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা একত্রে শেখানো হয়।
৩. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতা:
সোশ্যাল মিডিয়াকে ধর্মীয় শিক্ষা ও মানবিক বার্তা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। তরুণদের উৎসাহিত করা উচিত—‘কুরবানী দেখানোর জন্য নয়, বোঝার জন্য’, এবং সামাজিক মাধ্যমে বিনয়ী, শিক্ষামূলক ও মানবিক বার্তা প্রচার করতে। ইসলামী স্কলার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের উচিত এ বিষয়ে ইতিবাচক রোল মডেল তৈরি করা।
৪. কুরবানী ও মানবসেবা সংযুক্ত করা:
তরুণদের শেখাতে হবে—কুরবানী শুধুই জবাই নয়, এটি মানবসেবার চেতনার এক প্রকাশ। গরীব, অসহায়, দুস্থ মানুষের কাছে কুরবানীর মাংস পৌঁছে দেওয়া, স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশ নেওয়া, প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া—এসব কর্মকাণ্ড তরুণদের মানসিকতা ও মানবিকতা গঠনে সহায়ক হতে পারে। কুরবানীকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন বা মসজিদভিত্তিক ভলান্টিয়ার কার্যক্রম গড়ে তোলা যেতে পারে।
৫. মিডিয়া জগতের দায়িত্বশীল ভূমিকা:
ইব্রাহিমী আত্মত্যাগ, তাকওয়া, বিনয়, পশুপ্রেম এবং মানবতা ফুটে ওঠে এমন গল্প ও চরিত্র তৈরি করা।
৬. অহংকার ও প্রতিযোগিতা নিরুৎসাহিত করা:
সমাজে এমন মানসিকতা গড়ে তোলা দরকার যেখানে কুরবানীর বাহ্যিক রূপ নয়, বরং অন্তর্নিহিত আত্মত্যাগ ও তাকওয়া মূল্যায়িত হবে। সামাজিকভাবে এই বার্তা ছড়ানো দরকার—‘ছোট পশু হোক, কম দামি হোক, আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড়’। ইসলাম এমন কুরবানীই কবুল করে, যা অন্তর থেকে আসে, দেখানোর জন্য নয়।
৭. কুরবানীর মূল্যবোধকে সারাবছরের চর্চায় রূপ দেওয়া:
তরুণদের বোঝাতে হবে, কুরবানীর শিক্ষা শুধুই ঈদের দিন নয়—সারা জীবনের জন্য। অন্যের জন্য কিছু ত্যাগ করা, নিজের লোভ, অহংকার, হিংসা ইত্যাদি ত্যাগ করাও কুরবানীর অংশ। আত্মসংযম, সহানুভূতি, দয়া—এসবকে দৈনন্দিন জীবনে চর্চার মাধ্যমেই প্রকৃত কুরবানী বাস্তবায়ন সম্ভব।
৮. প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ আয়োজন:
ইসলামিক সংগঠন বা যুব সংস্থা কুরবানী উপলক্ষে তরুণদের জন্য কর্মশালা, আলোচনা সভা, পোস্টার প্রতিযোগিতা ও লেখালেখির আয়োজন করতে পারে। এতে তারা আরও গভীরভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে।
৯. কুরবানীর সময় আমাদের করণীয়
কুরবানীর শর্তাবলির প্রতি খেয়াল রাখা
ক। এমন পশু দ্বারা কুরবানী দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হল উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এ গুলোকে কুরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আনআম’।’’ -সূরা হজ্জ ঃ ৩৪; মুসলিম-১৯৬৩
খ। শরী’য়তের দৃষ্টিতে কুরবানীর পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরী।
গ। কুরবানীর পশু যাবতীয় দোষ ত্র“টি মুক্ত হতে হবে।’’ -তিরমিযী-১৫৪৬; নাসাঈ-৪৩৭১
ঘ। যে পশুটি কুরবানী করা হবে তার উপর কুরবানী দাতার পূর্ণ মালিকানা সত্ত থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কুরবানী আদায় হবে না।
ঙ। কুরবানীর পশু কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট করা।
চ। পশুকে কষ্ট না দেয়া
যা কুরবানী বা জবেহ করা হবে তার সাথে সুন্দর আচরণ করা এবং তাকে আরাম দেওয়া।
জবাই করাতে প্রাণীর কষ্ট তো হবেই, এর বাহিরে অতিরিক্ত কোন কষ্ট যেন না হয় সে ব্যপারে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রإِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)
“আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জিনিসের বেলায়ই ইহসানকে ফরয বা অবশ্য করণীয় করে দিয়েছেন। তোমরা যখন কোন প্রাণীকে হত্যা করবে, উত্তমভাবে হত্যা করবে। যখন কোন প্রাণীকে যবেহ করবে, উত্তমভাবে যবেহ করবে। আর তোমাদের প্রত্যেকেই যেন তার ছুরিটাকে শানিত করে নেয় এবং প্রাণীকে জান বের হওয়া পর্যন্ত (আরাম) প্রশান্তি দেয়।’’-মুসলিম; মিশকাত ঃ ৪০৭৩
আমাদের আরো কিছু করণীয়
১. ইখলাসের সাথে কুরবানী করা
২. সুন্নাহ অনুযায়ী কুরবানী করা
৩. নিজ হাতে কুরবানী করা
৪. গরিবদের মাঝে গোশত বণ্টন করা
৫. সন্তানদের কুরবানীর ইতিহাস শেখানো
৬. অন্তরের কুরবানী করা
মিথ্যা ত্যাগ, সুদ ত্যাগ, হারাম ত্যাগ, অহংকার ত্যাগ
এছাড়াও এ মাসের কয়েকটি স্বরণ করিয়ে দিচ্ছি। সেগুলো হলো–
তাকবীরে তাশরীক
জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজরের সালাত থেকে ১৩ তারিখ আসরের সালাত পর্যন্ত (২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর একবার নিæের তাকবীরটি বলা ওয়াজিব। জামাতে হউক বা একা, নারী হউক বা পূরুষ, মুকিম হউক চাই মুসাফির প্রত্যেকের জন্যই ইহা ওয়াজিব, তবে নারীরা নিæ আওয়াজে এবং পুরুষরা উঁচু আওয়াজে বলবেন। এ তাকবীরটি একবারই ওয়াজিব একের অধিক বলা খেলাফে সুন্নত।’’ -মাসায়েলে ঈদাইন ও কুরবানী-পৃ. ৫৫
তাকবীরটি নিম্মরূপ
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ واللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وللَّه الْحمد
জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের ইবাদত
জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশক খুবই ফজীলতপূর্ণ। তাই এ কারণেও এর যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে। এ দিনগুলোতে হজ্জের কতিপয় আমল সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এ কারণেও এ দিনগুলো ফজিলতের অধিকারী।
হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,“জিলহজ্জের এই প্রথম দশ দিনগুলো ব্যতীত এমন কোন দিন নেই যে দিনের সৎ কর্ম (ইবাদত) আল্লাহ তা‘আলার নিকট অধিক পছন্দনীয়। সাহাবাগণ আরয করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি নয়? তিনি বললেন: জিহাদও না, তবে যে ব্যক্তি জান ও মাল নিয়ে যুদ্ধে বের হয়ে আর কোনটা নিয়েই সে ফিরে আসে নাই (শহীদ হয়ে গেছে, তার মর্যাদা বেশি)।’’ -বুখারী ঃ ৯৬৯; মিশকাত ঃ ১৪৬০
আরাফাতের দিনের ফজীলত
জিলহজ্জের ৯ তারিখ আরাফাতের দিনের সাওমের ফজীলত সম্পর্কে হাদীসে উলেখ রয়েছে,
صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ )رَوَاهُ مُسلم)
“রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি আল্লাহ পাকের দরবারে আরাফাত দিবসের রোজা সম্পর্কে আশা রাখি যে ইহার বিনিময়ে তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন।’’ -মুসলিম ঃ ২৬৩৬; মিশকাত ঃ ২০৪৪
গোঁফ, চুল, অবাঞ্চিত লোম, নখ ইত্যাদি কর্তন না করা
জিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে ঈদের দিন কুরবানীর পশু জবাই পর্যন্ত গোঁফ, চুল, অবাঞ্চিত লোম, নখ ইত্যাদি কর্তন না করা। চাই সে কুরবানী দিক আর না দিক, এটা সবার জন্য মুস্তাহাব। এ স¤পর্কে হাদীসে আছে,
مَنْ رَأَى هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَأْخُذْ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ أَظْفَارِهِ (رَوَاهُ مُسلم)
“যে ব্যক্তি কুরবানী করার ইচ্ছা করেছে সে জিলহজ্জের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর পশু জবাই পর্যন্ত তার চুল ও নখ যেন কর্তন না করে।’’ -মুসলিম; তিরমিযী; মিশকাত ঃ ১৪৫৯
১০. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে কুরবানীর প্রভাব
ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে কুরবানী বিশেষ প্রভাব রয়েছে, যেমন
ক। ইব্রাহীম (আঃ) এর ন্যায় আবেগ, অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতার সাথে পশু কুরবানী করা।
খ। আল্লাহর পথে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার দৃপ্ত শপথ গ্রহণের মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
গ। পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে প্রবৃত্তির গলায় ছুরি চালিয়ে নিষ্কলুষ মানুষে পরিণত হওয়ার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
ঘ। আল্লাহ প্রেমে পাগলপারা হয়ে পাপাচারের কালিমা মুক্ত হওয়ার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী। ঙ। হাজীগণের মিনায় পশু কুরবানী করার সাথে ইসলামী ঐতিহ্যের সাদৃশ্য রক্ষা করার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
চ। মহানবী ﷺ এর সুন্নাত পালন করা ও ধর্মের প্রতি আনুগত্যশীল হওয়ার সাক্ষ্য দেয়ার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
ছ। পার্থিব জগতের কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পাথেয় সংগ্রহের মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
সমাজ জীবনে কুরবানীর প্রভাব
ক। ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করে অনৈসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে সমাজকে রক্ষা করার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
খ। সামাজিক সাম্য ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
গ। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে সম্প্রীতির সমাজ গঠন করার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
ঘ। গর্ব-অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে জনসেবা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার শপথ গ্রহণ করার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
ঙ। মুসলিম ভ্রাতৃত্ব কায়েম ও সম্প্রসারণের মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
চ। আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করার মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
ছ। দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার প্রত্যয় গ্রহণের মাধ্যম হলো আমাদের কুরবানী।
সমাপ্তি আলোচনা
কুরবানী একটি মহান আত্মত্যাগের শিক্ষা, যা শুধুমাত্র পশু জবাইয়ের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য, নৈতিকতা, সহানুভূতি, সমাজসেবা ও আত্মসংযমের একটি সামগ্রিক জীবনব্যাপী আহ্বান। বাঙ্গালী মুসলিম সমাজ যদি এই শিক্ষা হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে, তাহলে তারা হবে একটি নৈতিক ও মানবিক সমাজের স্থপতি। আধুনিক জীবনের চ্যালেঞ্জ ও বাহ্যিক প্রভাব মোকাবিলা করে যদি তরুণরা কুরবানীর আত্মিক শক্তিকে নিজের জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে, তবেই কেবল সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব। আজকে যারা তরুণদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের নেতৃত্ব, এবং সেই নেতৃত্বকে আলোকিত করতে কুরবানীর আদর্শ হতে পারে এক অনন্য প্রেরণা।
আমাদের একাডেমীর সেসকল কোর্সে ভর্তি চলছে সেগুলোর তালিকা
বিজ্ঞপ্তি-২
সহজ পদ্ধতিতে সহীহ কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা কোর্স
১৩তম ব্যাচে ভর্তি চলছে (সম্পূর্ণ ফ্রী)
বিস্তারিত জানতে ও রেজিষ্ট্রেশন করতে নিচের লিংকে ভিজিট করুন-
https://huzuracademy.com/learning-tilawat/
বিজ্ঞপ্তি-৩
সহীহ নাজিরা তিলাওয়াত শিক্ষা কোর্স
৭ম ব্যাচে ভর্তি চলছে (কোর্স ফি প্রযোজ্য)
বিস্তারিত জানতে ও রেজিষ্ট্রেশন করতে নিচের লিংকে ভিজিট করুন-
https://huzuracademy.com/nazira-tilawat-learning/
বিজ্ঞপ্তি-৪
ধারাবাহিক তাফসীর শুনি কোর্স
ভর্তি চলছে (সম্পূর্ণ ফ্রী)
বিস্তারিত জানতে ও রেজিষ্ট্রেশন করতে নিচের লিংকে ভিজিট করুন-
https://huzuracademy.com/listen-tafsir/
বিজ্ঞপ্তি-৫
গুরুত্বপূর্ণ সূরা, আয়াত ও দোয়া হিফজ কোর্স
৬ষ্ঠ ব্যাচে ভর্তি চলছে (কোর্স ফি প্রযোজ্য)
বিস্তারিত জানতে ও রেজিষ্ট্রেশন করতে নিচের লিংকে ভিজিট করুন-
https://huzuracademy.com/memorise-surah-ayat/
বিজ্ঞপ্তি-৬
অর্থসহ ২৮ ও ২৯তম পারা হিফজ কোর্স
২য় ব্যাচে ভর্তি চলছে (কোর্স ফি প্রযোজ্য)
বিস্তারিত জানতে ও রেজিষ্ট্রেশন করতে নিচের লিংকে ভিজিট করুন-
https://huzuracademy.com/hifjul-quran-28th-29th-para-with-bangla/
