চেতনায় কারবালা; হৃদয়ে আশুরা
উপস্থাপনায়ঃ ইসমাইল বিন ইবরাহীম
ভূমিকা ও স্বাগত ভাষণ
[আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু]
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
আজকের এই মহিমান্বিত সেমিনারের সম্মানিত সভাপতি উস্তাদ উমর ফারুক হাফিজাহুল্লাহ, উপস্থিত দ্বীনপ্রিয় আমাদের কুরআনের সাথী ভাই ও বোনেরা-
ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে কালজয়ী, আবেগঘন এবং চেতনা জাগানিয়া একটি অধ্যায় নিয়ে কথা বলতে আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। আমাদের আজকের সেমিনারের মূল শিরোনাম—“চেতনায় কারবালা; হৃদয়ে আশুরা।
মহররমের এই ১০ তারিখ তথা ‘আশুরা’কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল কালিতে লেখা কোনো সাধারণ ছুটির দিন নয়। এটি মুমিনের হৃদয়ের এমন এক স্পন্দন, যা একই সাথে আমাদের চোখকে অশ্রুসিক্ত করে, আবার আমাদের ঈমানী চেতনাকে করে তোলে ইস্পাতকঠিন। আশুরা শব্দটির সাথে মিশে আছে একাধারে বিজয়ের আনন্দ এবং অন্যদিকে চরম আত্মত্যাগের বেদনাবিধুর ইতিহাস।
অনেকের ধারণা, আশুরা মানেই কেবল কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর রক্তঝরা শাহাদাতের অবিস্মরণীয় ঘটনা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, মানবজাতির ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আশুরার দিনটি সত্যের মুক্তি এবং মিথ্যার পতনের এক চিরন্তন স্মারক। এই পবিত্র দিনেই আল্লাহ তাআলা জালিম ফেরাউনের হাত থেকে হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর কওমকে অলৌকিক উপায়ে মুক্তি দিয়েছিলেন। আর এই একই দিনে, শত বছর পর, ফোরাতের তীরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কলিজার টুকরো, জান্নাতের যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হুসাইন বিন আলী (রা.) অন্যায়, স্বৈরাচার আর বাতেলের সামনে মাথা নত না করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
তাই আশুরা আমাদের হৃদয়ে কেবল শোকের মাতম তুলতে আসে না; বরং এটি আমাদের অন্তরে হুসাইনী চেতনা জাগ্রত করতে আসে। এটি আমাদের শেখায়—শরীর মরে গেলেও আদর্শ কখনো মরে না। আজ এই নাতিদীর্ঘ আলোচনায় আমরা আশুরার সেই সুপ্রাচীন ইতিহাস, কারবালার রক্তিম মহাকাব্য এবং কীভাবে এই দিনটি আজ আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এক অবিচল বিপ্লবের প্রেরণা হতে পারে—তা বিশ্বাসের গভীর থেকে আলোচনা করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের আজকের এই আয়োজনকে কবুল করুন। আমীন
আজকের সেমিনারের আলোচনটি আমরা দুইটি পর্বে উপস্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ
১ম পর্বঃ চেতনায় কারবালা – ২য় পর্বঃ হৃদয়ে আশুরা- ৩য় পর্বঃ মতামত/ প্রশ্নোত্তর
উদ্দেশ্যঃ মুসলিমদের হৃদয়ে কারবালা চেতনা ও আশুরার শিক্ষা জাগ্রত করার প্রয়াসে আজকের এই সেমিনার
১ম পর্বঃ চেতনায় কারবালা
কারবালা কোনো সাধারণ যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এবং ১০ই মহররম কেবল কোনো শোক পালনের দিন নয়। কারবালা হলো সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক জীবন্ত প্রতীক। এটি অন্যায়, জুলুম এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঈমানী চেতনার এক আপসহীন বিপ্লব। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে ফোরাত নদীর তীরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন বিন আলী (রা.) তাঁর পরিবার ও মুষ্টিমেয় সঙ্গী নিয়ে যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, তা কি কেবলই এক রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল খিলাফতের আদর্শ রক্ষা এবং উম্মাহর আত্মশুদ্ধির এক মহান চেতনা? আজ এই সেমিনারের আলোচনায় আমরা কারবালার সেই সত্য ইতিহাস এবং আমাদের জীবনে এর গভীর শিক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।
১. কারবালার ঐতিহাসিক পটভূমি ও খিলাফতের বিবর্তন
কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনার মূল উৎস বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।
খিলাফতে রাশেদার অবসান:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের সোনালী যুগ ছিল ‘খিলাফতে রাশেদা’। হযরত আবু বকর (রা.), উমর (রা.), উসমান (রা.) এবং আলী (রা.)-এর সময় পর্যন্ত ইসলামের শাসনব্যবস্থা চলেছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং কিতাব ও সুন্নাহর ভিত্তিতে। ৪০ হিজরিতে হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এক চরম রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়।
আমীরে মুয়াবিয়া (রা.) ও শান্তি চুক্তি:
উম্মাহর ভাঙন রোধে হযরত হাসান (রা.) এক মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের খাতিরে নিজের খিলাফতের অধিকার ত্যাগ করে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই বছরটিকে ‘আমুল জামায়াত’ বা ঐক্যের বছর বলা হয়।
রাজতন্ত্রের সূচনা ও ইয়াজিদের মনোনয়ন:
দীর্ঘকাল সুশাসনে পরিচালনার পর ৬০ হিজরিতে আমীরে মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পূর্বে তিনি তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী শাসক হিসেবে মনোনীত করেন। এখানেই ইসলামের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মোড় ঘোরে। খিলাফতের যে শুরা বা পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থা ছিল, তা রাজতন্ত্রে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়।
ইয়াজিদের চরিত্র ও বায়আতের সংকট:
ইয়াজিদ যখন ক্ষমতায় বসে, তখন সে মুসলিম জাহানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে আনুগত্য বা ‘বায়আত’ দাবি করে। বিশেষ করে মদীনার চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের বায়আত তার জন্য জরুরি ছিল:
১. হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রা.)
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.)
৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)
৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)
ইমাম হুসাইন (রা.) স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইয়াজিদের মতো একজন নীতিহীন ও ভোগবিলাসী ব্যক্তির হাতে উম্মাহর নেতৃত্ব চলে গেলে ইসলামের মূল স্পিরিট বা খিলাফতের আদর্শ ধ্বংস হয়ে যাবে। এটি কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার লোভ ছিল না, বরং ইসলামের শাসনতান্ত্রিক পবিত্রতা রক্ষার তাগিদ ছিল।
২. কুফাবাসীর আহ্বান ও ইমামের মক্কা ত্যাগ
ইয়াজিদের অন্যায় বায়আত অস্বীকার করে ইমাম হুসাইন (রা.) মদীনা থেকে মক্কায় চলে আসেন।
কুফা থেকে চিঠির বন্যা:
এই সময় ইরাকের কুফা নগরীর সাধারণ মানুষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ইমাম হুসাইনের কাছে শত শত চিঠি পাঠাতে শুরু করে। তাদের বক্তব্য ছিল: “আমরা ইয়াজিদের শাসন মানি না। আপনি কুফায় আসুন, আমরা আপনার হাতে বায়আত হব এবং আপনাকে আমির হিসেবে গ্রহণ করব।”
মুসলিম ইবনে আকীলের মিশন:
কুফাবাসীদের আন্তরিকতা যাচাই করার জন্য ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম ইবনে আকীল (রা.)-কে কুফায় পাঠান। কুফায় পৌঁছে মুসলিম ইবনে আকীল উথলে পড়া জনসমর্থন দেখেন এবং ইমামকে কুফায় আসার জন্য চিঠি লেখেন।
কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতা:
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইয়াজিদ কুফার গভর্নর হিসেবে নিষ্ঠুর ও চতুর ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে নিযুক্ত করে। ইবনে জিয়াদ কুফাবাসীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও ভীতি প্রদর্শন শুরু করে। ফলে, যে কুফাবাসীরা ইমামের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিল, তারা ভয়ে পিছু হটে। একা হয়ে পড়া মুসলিম ইবনে আকীলকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়।
মক্কা থেকে যাত্রা ও সাহাবিদের পরামর্শ:
এদিকে কুফার এই পটপরিবর্তনের খবর ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। যাত্রাকালে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের, আবু সাইদ খুদরী, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর, আবু ওয়াকিদ আল-লাইসি, উমরা বিনতে আব্দুর রহমান, আবু বকর ইবনে আব্দুর রহমান ইবনুল হারিস,আব্দুল্লাহ ইবনে মুতি, সাইদ ইবনুল মুসাইব (রা.) -এর মতো প্রবীণ সাহাবিরা তাঁকে কুফাবাসীদের অতীতের বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মক্কা না ছাড়ার অনুরোধ করেছিলেন।
যেমন আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) তাকে হিতোপদেশের সুরে বলেছেন, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এমন সম্প্রদায়ের কাছে, যারা আপনার পিতাকে হত্যা, আর ভাইকে আক্রমণ করেছে?’ তখন হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমার কাছে এই হারামের (মক্কা) অভ্যন্তরে নিহত হওয়ার চেয়ে অমুক অমুক স্থানে নিহত হওয়াই উত্তম।” কিন্তু ইমাম হুসাইন (রা.) মুসলিম উম্মাহর সংস্কার এবং অন্যায়ের প্রতিবাদকে নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে তাঁর যাত্রায় অটল থাকেন।
মক্কার গভর্নরের শেষ চেষ্টা
হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু ৬০ হিজরীর ৮ই যিলহজ মক্কা থেকে প্রস্থান করেন। মক্কার গভর্নরের কাছে যখন তার এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের কথা পৌঁছায়, তখন তার ভাই ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ ইবনুল আসের নেতৃত্বে তিনি একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। তারা হুসাইনের অবস্থান থেকে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন; কিন্তু, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তখন তারা বলেন, ‘হে হুসাইন, আপনি কি আল্লাহকে ভয় করেন না? আপনি কি উম্মতকে পৃথক করতে মুসলিমদের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে যাচ্ছেন?’ জবাবে হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু একথা বলে তাদের মত প্রত্যাখ্যান করেন,
لِّیۡ عَمَلِیۡ وَ لَكُمۡ عَمَلُكُمۡ ۚ اَنۡتُمۡ بَرِیۡٓـــُٔوۡنَ مِمَّاۤ اَعۡمَلُ وَ اَنَا بَرِیۡٓءٌ مِّمَّا تَعۡمَلُوۡنَ
‘আমার কাজের জন্য আমি দায়ী, আর তোমাদের কাজের জন্য তোমরা দায়ী, আমি যা করি তার দায়-দায়িত্ব থেকে তোমরা মুক্ত, আর তোমরা যা কর তার দায়-দায়িত্ব থেকে আমি মুক্ত।’ (সূরা ইউনুস, ১০:৪১)
৩. কারবালার ময়দান: অবরুদ্ধ ইমাম ও চরম ত্যাগ
২রা মহররম, ৬১ হিজরি। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাফেলা ইরাকের ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা নামক এক প্রান্তরে এসে পৌঁছায়।
চারদিক থেকে অবরুদ্ধ কাফেলা:
কুফার গভর্নর ইবনে জিয়াদের নির্দেশে উমর ইবনে সা’দের নেতৃত্বে হাজার হাজার সশস্ত্র সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী ইমামের মাত্র ৭২ জনের (যার মধ্যে নারী ও শিশুও অন্তর্ভুক্ত ছিল) ক্ষুদ্র কাফেলাকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।
পানি বন্ধের অমানবিক অধ্যায়:
৭ই মহররম থেকে ফোরাত নদীর পানি ইমামের শিবিরের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মরুভূমির তীব্র গরমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র পরিবারের সদস্যরা, নিষ্পাপ শিশুরা পানির জন্য হাহাকার করতে থাকে। কিন্তু ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাথা অন্যায়ের কাছে নত হয়নি।
শান্তির শেষ চেষ্টা:
ইমাম হুসাইন (রা.) যুদ্ধ চাননি। তিনি ইয়াজিদের বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন:
১. আমাকে মক্কায় বা মদীনায় ফিরে যেতে দাও।
২. অথবা আমাকে ইসলামের কোনো সীমান্ত অঞ্চলে চলে যেতে দাও, যেখানে আমি সাধারণ মুসলমানের মতো জীবন কাটাব।
৩. অথবা আমাকে সরাসরি ইয়াজিদের কাছে নিয়ে চলো, আমি তার সাথে সরাসরি কথা বলব।
কিন্তু ইবনে জিয়াদ ও শিমার ইবনুল জাওশানের মতো নিষ্ঠুর জহ্লাদ দল কোনো প্রস্তাব মানেনি। তাদের একমাত্র দাবি ছিল— আগে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে ইবনে জিয়াদের হাতে বায়আত হতে হবে, অন্যথায় যুদ্ধ। ইমাম হুসাইন (রা.) এক ঐতিহাসিক জবাব দিলেন: “আল্লাহর শপথ! আমি কখনো উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের নির্দেশ মানব না।”
১০ই মহররমের সেই রক্তক্ষয়ী দিন:
৬১ হিজরীর ১০ই মহররম সকালে যুদ্ধ শুরু হয়। এক অসম যুদ্ধ। একদিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হাজার হাজার সৈন্য, অন্যদিকে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এক ক্ষুদ্র দল। ইমামের সঙ্গীরা বীরত্বের সাথে লড়াই করে একে একে শহীদ হতে থাকেন। ইমামের ভাই আব্বাস, পুত্র আলী আকবর, ভাতিজা কাসিম, এমনকি ৬ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু আলী আসগরও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তীরের আঘাতে শহীদ হয়।
ইমামের শাহাদাত:
অবশেষে ইমাম হুসাইন (রা.) একাকী হয়ে পড়েন। তিনি তৃষ্ণার্ত ও রক্তাক্ত অবস্থায়ও বীরের মতো লড়াই করেন। ফলে শাম্মার ইবনে ফুল-জাওশানের বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয়। তাই, তিনি চিৎকার করে হুসাইনকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। এ চিৎকার ও নির্দেশই তাদের হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে। তাকে আঘাত করে ঘুরআ ইবনে শরীক আত-তামিমী। অতঃপর শিমারের নির্দেশে সিনান ইবনে আনাস আন-নাখয়ী তাকে আঘাত করে তার মাথা সংরক্ষণ করে। কেউ কেউ বলেন, তাকে হত্যা করে আমর ইবনে বাত্তার আত-তাগলিবী ও যায়েদ ইবনে রিকাদা আল-হিনী। আবার কারও মতে, শাম্মার ইবনে যুল-জাওশানের নেতৃত্বে তাকে হত্যা করা হয়। আর তার শিরচ্ছেদ করে ইবনে যিয়াদ খাওলি ইবনে ইয়াযীদ আল-আসবাহী। হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে শহীদ হন ৭২ জন।
৪. আমরা কী শিক্ষা নেব?
কারবালার এই মহান আত্মত্যাগ কেবল ইতিহাসের পাতায় অশ্রু ফেলার জন্য নয়। এটি আমাদের ঈমানী চেতনাকে জাগ্রত করার এক চিরন্তন উপাদান। আসুন আমরা সংক্ষেপে এর প্রধান শিক্ষাগুলো বোঝার চেষ্টা করি:
ক) অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা
কারবালার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, সত্যের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। শাসক যদি জালিম হয়, সমাজ যদি কলুষিত হয়, তবে নিজের জীবন বিপন্ন হলেও তার প্রতিবাদ করতে হবে। ইমাম হুসাইন (রা.) আমাদের শিখিয়েছেন, অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা মুমিনের লক্ষণ নয়।
খ) আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ
মুমিনের কাছে নিজের জীবন, পরিবার বা দুনিয়াবী সম্পদের চেয়ে আল্লাহর দ্বীন এবং রসূলের আদর্শ অনেক বড়। ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর পুরো পরিবারকে উৎসর্গ করে প্রমাণ করেছেন যে, সত্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেকোনো মূল্য চুকানো সম্ভব।
গ) খিলাফত বনাম রাজতন্ত্রের পার্থক্য
কারবালা আমাদের শিক্ষা দেয় ইসলাম কোনো বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র বা স্বৈরাচার সমর্থন করে না। ইসলামের নেতৃত্ব হবে যোগ্যতা, তাকওয়া এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে। ইয়াজিদতন্ত্রের বিরুদ্ধে হুসাইনী চেতনা মূলত আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
ঘ) চরম বিপদেও ইবাদত ও ধৈর্য
কারবালার ময়দানে যখন চারদিকে তীরের বৃষ্টি হচ্ছিল, তখনও ইমাম হুসাইন (রা.) নামায ত্যাগ করেননি। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু আল্লাহর প্রতি তাঁর কোনো অভিযোগ ছিল না। এই চরম ধৈর্য (সবর) ও আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) প্রতিটি মুসলমানের জন্য জীবনের সবচেয়ে বড় পাথেয়।
চেতনায় কারবালা: প্রতিরোধের প্রথম দৃষ্টান্ত
আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী ১৫ মুহাররম ১৪১২ হি. মোতাবেক ২৮ জুলাই ১৯৯১ ঈ. লক্ষ্ণৌর মাওলানা আব্দুস শাকুর হলে দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণে: প্রতিরোধের প্রথম দৃষ্টান্ত হিসেবে কারবালার চেতনাকে তুলে ধরেছেন এভাবে-
আমি এখন আপনাদের বলছি, আল্লাহ তাআলা এই পদ্ধতিতেই আদর্শ ধারাটি চালু রেখেছেন। এ ধারারই পর্যায়ক্রম ছিল হযরত হাসান রাযি. ও হযরত হোসেন রাযি.-এর পদক্ষেপ। পরিষ্কার ভাষায় বলছি, হযরাত হাসানাইন (হাসান ও হোসাইন) রাযি.-এর পদক্ষেপ ছিল আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আল্লাহ তাআলা যে বিশেষ বিশেষ মুআমালা করেছেন এবং তাঁকে দুনিয়ার সর্বোত্তম যেসব নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে এই দুটি ফুলেরও অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। তাদেরকে উপাধি দেওয়া হয়েছিল ‘রায়হানাতাই রাসূলিল্লাহ’-রাসূলুল্লাহর দুই ফুল।
আমি আমার ইতিহাস অধ্যয়নের আলোকে বলতে পারি, হযরত মুআবিয়া রাযি.-এর সঙ্গে হযরত হাসান রাযি. যে আচরণ করেছেন, যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা ছিল সম্পূর্ণ সঠিক। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসানের দিকে তাকিয়ে ইরশাদ করেছিলেন-
فَقَالَ الْحَسَنُ وَلَقَدْ سَمِعْتُ أَبَا بَكْرَةَ يَقُوْلُ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى الْمِنْبَرِ وَالْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ إِلَى جَنْبِهِ وَهُوَ يُقْبِلُ عَلَى النَّاسِ مَرَّةً وَعَلَيْهِ أُخْرَى وَيَقُوْلُ إِنَّ ابْنِيْ هَذَا سَيِّدٌ وَلَعَلَّ اللهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيْمَتَيْنِ مِنْ الْمُسْلِمِيْنَ
হাসান (বসরী) (রহ.) বলেন, আমি আবূ বকরাহ (রাঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে আমি মিম্বরের উপর দেখেছি, হাসান বিন ‘আলী (রাঃ) তাঁর পাশে ছিলেন। তিনি একবার লোকদের দিকে আরেকবার তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আমার এ সন্তান একজন নেতা। সম্ভবত তার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলিমদের দু’টি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করাবেন।’(বুখারী: ২৭০৪)
এই কথাটি হযরত হাসান রাযি.-এর জন্য কেবল একটি ভবিষ্যত-সংবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল নবীজীর পক্ষ থেকে একটি অসিয়্যতও, এবং একটি মনোচাহিদা বা দাবিও। এটি মনোচাহিদা ছিল আল্লাহর রাসূলের, ছিল প্রিয় নানাজীরও। হযরত হাসান রাযি. তাই সেটিকে নিখাঁদ নববী নির্দেশ হিসেবেই গ্রহণ করেছেন এবং সঠিক পদক্ষেপটি নিয়েছেন হযরত মুআবিয়া রাযি.-এর সঙ্গে। যিনি সাহাবী ছিলেন, কাতেবে ওহী ছিলেন এবং তাঁর নিকটাত্মীয়ও ছিলেন। সশস্ত্র অভিযান ও তলোয়ার কোষমুক্ত করার কোনো উপদান তখন ছিল না। মুআবিয়া রাযি.-এর বিরুদ্ধে তাঁর দ্বারা সেনা-অভিযান পরিচালিত হলে অহেতুক রক্তপাত ছাড়া আর কিছুই হত না। অথচ আবেগে-উত্তেজিত কিছু লোক তাকে কটাক্ষ করে বলেছে, এই সন্ধি তো বড়ই লজ্জা ও গ্লানির বিষয়। তখন তিনি প্রশান্ত মনে উত্তর দিয়েছেন-العار خير من النار অগ্নির চেয়ে লজ্জা ভাল।
এই ধারা বেয়ে যখন ইয়াযীদের বিয়টি সামনে এল তখন হযরত হোসাইন রাযি.ও শতভাগ সঠিক পদক্ষেপটি নিলেন। কারণ, সেটিই ছিল তাঁর করণীয়। তিনি তা না করলে কেয়ামত পর্যন্ত বিচ্যুত শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে থাকতো না। যখন কোনো ভুল ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সমাজে অনাচারের ধস নামার অশঙ্কা জেগে উঠে আর ভালোর আহবান ও মন্দের প্রতিরোধ এবং তাকওয়া-তাহারাত জাগানো ও খোদাভীতি ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির পরিবর্তে শুরু হয় ভ্রমণ-শিকার ও আমোদ-প্রমোদের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধির আয়োজন, চলতে থাকে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার গলদ ব্যবহার* তখন আমাদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত থাকা দরকার হয়ে পড়ে যে, এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কোনো বান্দা দাঁড়িয়ে গেছেন, এসবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন এবং প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন। যদি এমনটি না ঘটতো তাহলে আপনারা ইসলামের পরবর্তী যুগের ইতিহাসে দুঃশাসকদের ব্যাপারে কেবল সমর্থন ও নীরবতার নমুনাই দেখতে পেতেন। সবাই শুধু এ পংক্তিরই অনুসরণ করত-
বাতাস যেদিকেই বয়ে যাক
তুমি এই একদিকেই এগিয়ে চল
তাদের মনোভাব থাকত এমন যে, যত দুঃশাসনই প্রতিষ্ঠা হোক আর যত দুরাচরী সরকারই ক্ষমতায় আসুক-আমরা শুধু তাদের আনুগত্য করে যাব। এটাই আমাদের তকদীর। কারণ আমাদের সামনে দুঃশাসনের আনুগত্য না করার ক্ষেত্রে কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কিছু করার মতো অনুসরণীয় কোনো উদাহরণ নেই। তাছাড়া এ আশংকাও থাকতো যে, এতে ইসলামী ঐক্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মুসলমানদের সংঘবদ্ধতা পড়ে যাবে ঝুঁকির মুখে। তাই সবাই নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকত।
এজন্যই হযরত হোসাইন রাযি.-এর এই দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে যে, না, এভাবে চলবে না। সবাই চোখবন্ধ আনুগত্য করবে না। বরং কিছু লোকের এমনও হওয়া উচিত যে, এ দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরোয়াহীনভাবে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এরই ফল হল, পরের যুগের মুজাহিদদের ইতিহাস। যদি আপনারা পড়ে দেখেন সে ইতিহাস, অধ্যয়ন করেন তাদের মনস্তত্ব ও মানসিকতা। তাদের সংলাপ ও বক্তব্য তাহলে অবশ্যই অনুভব করবেন বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে যেসব সংস্কারবাদী আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, যেসব বৈপ্লবিক প্রয়াস উচ্চকিত হয়েছে, সেসব কটিরই পেছনে হযরত হোসাইন রাযি.-এর স্থাপিত দৃষ্টান্ত ভূমিকা রেখেছে। আমীর আবদুল কাদের জাযায়েরী, আবদুল করীম রেফী, শায়খ সান্নুসী, শায়খ শামিল দাগিস্তানী অথবা সাইয়েদ আহমদ শহীদ আর শাহ ইসলামইল শহীদ, যার কথাই ধরুন, এদের প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস বাড়িয়ে তোলা আর সংগ্রামের আবেগ ও প্রত্যয় জাগিয়ে তোলার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল হযরত হোসাইন-এর এই দৃষ্টান্ত। তারা ওই দৃষ্টান্ত থেকে অনুধাবন করেছেন, এজাতীয় প্রতিরোধ শিশুসুলভ কোনো চাঞ্চল্য নয়, নয় কোনো উত্তেজক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অস্থিরতা। বরং এটি হচ্ছে হোসাইনী সুন্নত। হযরত হোসাইনের আদর্শ-নীতি।
যুগে যুগে যারা কারবালার চেতনা লালন করেছেন তাদের সংখ্যা অনেক তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন-
পরবর্তী সময়ের ইতিহাস আপনারা দেখুন। হযরত হোসাইন রাযি.-এর নাতি ও হযরত যয়নুল আবেদীন রাহ.-এর সাহেবযাদা যায়েদ ইবনে আলী ইবনে হোসাইন যখন হিশাম ইবনে আব্দুল মালেকের মোকাবেলায় রুখে দাঁড়ালেন তখন ইমাম আবু হানিফা রাহ. দশ হাজার দিরহাম-যা ওই যুগের হিসাবে এবং ইমাম আবু হানিফা রাহ.-এর পক্ষ থেকে অনেক বড় অংকের অনুদান ছিল-তার কাছে পাঠালেন এবং বলে দিলেন আপনি এ টাকা কাজে লাগান।’
এর পর হযরত মুহাম্মাদ যুন্নাফস যাকিয়্যা (হযরত হাসান-এর ধারায় হযরত আলী রাযি.-এর পঞ্চম পুরুষ।) যখন খলিফা মনসুরের মোকাবেলায় রুখে দাঁড়ালেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তখন ইমাম আবু হানিফা রাহ. ও ইমাম মালেক রাহ. তাকে সমর্থন দিয়েছেন এবং আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন।
তাছাড়া খলিফা মনসুরের সেনাপতি হাসান ইবনে কুহতবাকে ইমাম আবু হানিফা এ কথা বলে নিবৃত্ত করেন যে, মুহাম্মাদ যুন্নাফস যাকিয়্যা ও তার ভাই ইবরাহীমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা তোমার জন্য জায়েয হবে না। এরা ছিলেন দু’ভাই। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (যুন্নাফস) রুখে দাঁড়িয়েছিলেন মদীনায় এবং সেখানে শাহদত বরণ করেছিলেন। অপর ভাই ইবরাহীম রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বাগদাদে। তবে, ইমাম আবু হানিফা রাহ. ও ইমাম মালেক রাহ. দু’জনকেই সমর্থন ও অর্থসহযোগিতা দিয়েছিলেন। (এ পর্যন্ত – আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) এর ভাষন )
আমির আব্দুল কাদির বিন মুহিউদ্দীন
যিনি আব্দুল কাদির আল–জাজায়িরি নামে অধিক পরিচিত–[১] ছিলেন একজন রাজনৈতিক ও সামরিক প্রধান, যিনি আলজেরিয়ায় ফরাসি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জিহাদ-লড়াই করার একজন মুজাহিদ হিসেবে দীর্ঘ পনের বছর ধরে এই জনপ্রিয় প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যখন ফ্রান্স আলজেরিয়ায় প্রাথমিক আক্রমণ শুরু করেছিল। তাকে আধুনিক আলজেরীয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তিনি ফরাসি উপনিবেশ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আলজেরীয় প্রতিরোধের প্রতীক।
সাইয়িদ মুহাম্মদ ইবনে আলি আস-সানুসি
তার রহস্যময় জিহাদি আন্দোলন আফ্রিকা জুড়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি লিবিয়াকে ইতালি থেকে তার স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করেছিল। শেখ ওমর মুখতার ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সানুসি দ্বারা শুরু করা সেই সানুসি সামরিক অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
মরুর সিংহ ওমর আল-মুখতার
(আরবি: عمر المختار) বা শেরে সাহারা (أسد الصحراء) এবং উপনিবেশিক ইতালীয়দের মধ্যে মনিফার মাতারি নামে পরিচিত[৫], লিবিয়ার সিরেনিকায় জানযুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি একজন জনপ্রিয় কুরআনের শিক্ষক ছিলেন।[৬] ১৯১২ সাল থেকে শুরু করে প্রায় বিশ বছর তিনি লিবিয়ায় ইতালীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯৩১ সালে তিনি ইতালীয়দের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
শেরে দাগিস্তান ইমাম শামিল
ইমাম শামিল- একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। ১৮৩৪ সাল থেকে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক লড়াকু যোদ্ধা ইমাম শামিল। আগ্রাসী রাশিয়ার অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্রও অকেজো হয়ে পড়েছিল যে মহান বীরের নগন্য ও আদিযুগের যুদ্ধাস্ত্রের সামনে, তিনিই হলেন ইমাম শামিল। রাশিয়ার রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে অজপাড়া গাঁয়ের কুঁড়েঘর পর্যন্ত সবার কাছেই যিনি “শেরে দাগিস্তান” বা দাগিস্তানের সিংহ নামে পরিচিত, তিনিই ইমাম শামিল। ইতিহাসে আজও তিনি আযাদীর শ্রেষ্ঠ সিপাহসালার হিসেবেই প্রসিদ্ধ। আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জনক মনে করা হয় তাকে। যুগের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও অভিনব রণকৌশল মুখ থুবড়ে পড়েছিল এই মহান বীরের সামনে। সন্ত্রাসী রাশিয়ার এমন কেউ ছিল না, যে ইমাম শামিলকে ভয় করত না। রাশিয়ার সৈনিকদের জন্য তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত। রাশিয়ার মায়েরা নিজ সন্তানদের ঘুম পাড়াত ইমাম শামিলের নাম শুনিয়ে। সাহসিকতার জন্য তাঁকে “ককেশাসের ঈগল” বলা হতো
শহীদ হাসান আল-বান্না।
মুসলিম ব্রাদারহুড বা ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মিশরীয় ইসলামি চিন্তাবিদ ও শিক্ষক হাসান আল-বান্না। তিনি ১৯২৮ সালে মিশরের ইসমাইলিয়া শহরে এই আন্তর্জাতিক সুন্নি ইসলামি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের পাঠানোর পরে, রাজতন্ত্র এবং এই সংস্থার মধ্যে দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। জনসাধারণের মধ্যে ব্রাদারহুডের ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তা এবং জনপ্রিয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেইসাথে ব্রাদারহুড রাজতন্ত্র এবং মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করছে এমন গুজব থেকে শঙ্কিত হয়ে, প্রধানমন্ত্রী নকরাশি পাশা ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে সংগঠনটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। ব্রাদারহুডের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং এর অনেক সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়।
১২ ফেব্রুয়ারী ১৯৪৯ তারিখে, আল-বান্না এবং তার শ্যালক আব্দুল করিম মনসুরের কায়রোতে জামাইয়্যাত আল-শুব্বান আল-মুসলিমীন সদর দফতরে সরকারের প্রতিনিধি, মন্ত্রী জাকি আলী পাশার সাথে আলোচনা করার কথা ছিল-কিন্তু মন্ত্রী আসেনি বিকেল ৫টার মধ্যে আল-বান্না এবং তার শ্যালক চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা যখন ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন দুজন লোক তাদের গুলি করে। আল-বান্না শেষ পর্যন্ত তার ক্ষত থেকে মারা যান। মিশরের রাজা ফারুক এবং তার আয়রন গার্ডকে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায়ী করা হয়।
তিনি বলেছিলেন “যে উম্মাহ মৃত্যুভীতি জয় করতে জানে এবং সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করতে অভ্যস্ত, আল্লাহ তাদের দুনিয়াতে সম্মানিত জীবন এবং পরকালে চিরস্থায়ী সাফল্য দান করেন।”
সাইয়েদ কুতুব শহীদ
তাফসীর ফি জিলালিল কুরআনসহ ১৮টি কালজয়ী গ্রন্থের রচয়িতা সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রহ.)কে ফাসি দেয়া হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ২৯শে আগস্ট, ফজরের নামাজের পর।
কারণ: তার লেখা বিশ্বখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ ‘ফী যিলালিল কুরআন’ ও রাজনৈতিক ইশতেহার ‘মাআলিম ফিত-তারীক’ (মাইলস্টোনস)-এ ইসলামি অনুশাসনের প্রচার এবং মিশরের সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) সরকার ও পশ্চিমা সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা।
প্রত্যাখ্যান: সরকার তাকে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে আপস করার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি মাথা নত করতে বা নিজের আদর্শ থেকে সরে আসতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানান।
ঐতিহাসিক উক্তি: ফাঁসির আগে তাকে কালেমা পড়ানোর জন্য একজন ইমামকে পাঠানো হলে, তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, “যেই কালেমা পড়ানোর কারণে তুমি সরকারি বেতন-ভাতা পাও, সেই কালিমার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়ার অপরাধেই আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে।”
সৈয়দ আহমাদ বেরলভি
ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী এক সুসংগঠিত স্বাধীনতা আন্দোলন ভারতীয় মুসলমানদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। এ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন সৈয়দ আহমদ। তার আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ভারতে একটি অখণ্ড ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।[৪] তিনি মুসলমানদের কাছে আমিরুল মোমেনীন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।[৫] তৎকালীন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে শুরু করে মর্দান পর্যন্ত এ বিশাল অঞ্চলে তিনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইসলামি শাসনব্যবস্থা চালু করেন।[৬][৭]
১৮৩১ সালের ৬ই মে মোতাবেক ২৪ জ্বিলকদ, ১২৪৬ হিজরিতে জুম‘আর দিনে সৈয়দ আহমদ বেরলভির মুজাহিদ বাহিনী মানসেহরা জেলার পর্বতময় উপত্যকা বালাকোট ময়দানে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেন। উল্লেখ্য যে, মুজাহিদ বাহিনীতে সর্বমোট যোদ্ধা ছিল ৭০০ জন এবং শিখ সৈন্যদের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। সৈয়দ আহমদ বেরলভি মুজাহিদ বাহিনীর অগ্রভাগে ছিলেন। তার সাথে ছিলেন একান্ত সহযোগী শাহ ইসমাঈল। সৈয়দ আহমদ বেরলভি এবং শাহ ইসমাঈল শাহাদত বরণ করেন।
মীর নিসার আলী তিতুমীরঃ
১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে যান।[১১] তিনি সেখানে আরবের স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও ওয়াহাবি মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। সেখান থেকে এসে (১৮২৭) তিতুমীর তার গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এবং তার অনুসারীরা তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে ধুতির বদলে ‘তাহ্বান্দ’ নামে এক ধরনের বস্ত্র পরিধান শুরু করেন। তিতুমীর হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের উপর বৈষম্যমূলকভাবে আরোপিত ‘দাড়ির খাজনা’ এবং মসজিদের করের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিতুমীর ও তার অনুসারীদের সাথে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। আগেই তিতুমীর পালোয়ান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং পূর্বে জমিদারের লাঠিয়াল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলেন।
তিতুমীরের অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে এক সময় ৫,০০০ এ গিয়ে পৌঁছায়।[১২] তারা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়। ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর বারাসতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তারা বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। বাঁশ এবং কাদা দিয়ে তারা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই কেল্লা নির্মাণ করেন।
বারাসাতের যুদ্ধ ও তিতুমীরের মৃত্যু
তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অধিকার নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নিজেকে ‘বাদশাহ করে মৈনুদ্দিন নামে জনৈক ওয়াহাবীকে প্রধানমন্ত্রী ও তার ভাগ্নে গোলাম মাসুমকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। স্থানীয় জমিদারদের নিজস্ব বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের হাতে বেশ কয়েকবার পরাজয় বরণ করে। তন্মধ্যে বারাসত বিৃদ্রোহ অন্যতম। উইলিয়াম হান্টার বলেন, ঐ বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধ করেন।
অবশেষে ১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, “ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইতে হার-জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যাদাৎ অনেক। তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে । আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।”[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
১৪ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিং-এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার অনুসারীদের আক্রমণ করে।[১৩] তাদের সাধারণ তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে তিতুমীর ও তার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দাঁড়াতে পারে নি। ১৯ নভেম্বর[১৪] তিতুমীর ও তার চল্লিশ জন সহচর শহীদ হন। তার বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
আজাদী আন্দোলনের ফজলে হক খায়রাবাদি
ফজলে হক খয়রাবাদি লক্ষ্ণৌর প্রধান বিচারক ছিলেন। ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা ফজলে হক খায়রাবাদী ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের প্রাক্কালে ইংরেজ বিরোধী ফতোয়া দেওয়ার অভিযোগে আন্দামান দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছিলেন।[৭] সে দ্বীপে তাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল তার এক হৃদয় বিদারক বর্ণনা এবং উপ মহাদেশে ইংরেজদের ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে সাথে থাকা কাপনের কাপড়ে কয়লা দিয়ে তিনি এক কিতাব লিখেছিলেন। অবশেষে সারা দুনিয়া ব্যাপী বিশ্বখ্যাত এ জ্ঞান সাধকের কারা নির্যাতনের প্রতিবাদ ও আল্লামা খায়রাবাদী (রাহঃ) এর জ্ঞান প্রতিভার প্রতি আকৃষ্ট ঊর্ধ্বতন এক ইংরেজ কর্মকর্তার জোর তদবিরে কয়েক বছর পর তাকে বৃটেনের প্রিভি কাউন্সিল মুক্তির নির্দেশ দিতে বাধ্য হয়। এ মুক্তির নির্দেশ নামা নিয়ে খায়রাবাদী এর ছেলে যখন আন্দামানে গিয়ে উপস্থিত হলেন, দেখলেন আন্দামানবাসীরা একটি জানাজার নামাজে মিলিত হচ্ছেন। উক্ত জানাজায় শরীক হয়ে জানতে পারলেন এটা তার পিতা বিশ্বখ্যাত জ্ঞান সাধক আল্লামা খায়রাবাদী ‘র জানাজা। অবশেষে এক হৃদয় বিদারক ঘটনা অবতারণার পর পিতার কাফনে লিখিত কিতাব খানি নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল তাকে। আল্লামা ফজলে হক খায়রাবাদী’র শত শত কিতাবের মধ্যে এটিও একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী কিতাব যাতে ব্রিটিশ শাসনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
এদিকে ডেপুটি জেলার সাহেব তার কাছে রক্ষিত একটি মূল্যবান ফার্সি পাণ্ডুলিপির যোগ্য অনুবাদকের খুঁজতে গিয়ে মাওলানা ফজলে হকের নাম পেলেন। তাই কারাকর্তা কাগজ-কলম দিয়ে পাণ্ডুলিপিগুলো তাঁর কাছে পাঠালেন। অসুস্থতা ও অস্বাভাবিক মানসিকতা সত্বেও মাওলানা টিকাসহ অনুবাদের কাজ শেষ করলেন। সেই সংগে তথ্যগুলো কোন লেখকের কোন পুস্তকের কোন খণ্ড থেকে নেয়া হয়েছে তাও লিখে দিলেন। জেলার সাহেব সেটা পড়ে বিস্ময়ে হতবাক হলেন এই জন্য যে, কোন পুস্তকের সাহায্য ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা তো আসলেই বিস্ময়কর। তাই তিনি ফজলে হকের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। ঠিক এই সময়েই মাওলানা সাহেব পায়খানা পরিষ্কার করে বিষ্ঠামাখা টিন ও ঝাঁটা নিয়ে অর্দ্ধোলঙ্গ পোশাক পরে ধীরে ধীরে আসছিলেন। সাহেব তাকে হাত খালি করে দাঁড়াতে বললেন। তারপর মূল্যবান পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই মাওলানাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। ক্ষমা চাইলেন ভুলবশতঃ তাঁকে ময়লা পরিষ্কারের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য।
ফজলে হক নিজেও কেঁদে ফেললেন এবং ক্ষমা করে দিলেন। এরপর জেলার সাহেব তাঁকে পুরস্কার দিতে চাইলে তিনি বললেন,”আমি আল্লাহর কাছ থেকেই পুরস্কার নেব। মানুষের কাছ থেকে নয়।”
জেলার তাঁকে বললেন, আপনি আমাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র ধরেছেন এবং আমাদের সাথে যুদ্ধ করাকে ওয়াজিব বলে ফতোয়া দিয়েছেন আপনার অপরাধ অমার্জনীয়। কাজেই আপনাকে মুক্তি দেয়া ভারতের বড়লাটের ক্ষমতার বহির্ভূত। আপনাকে মুক্তি দিতে পারে একমাত্র লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল। আমি সেখানেই আপনার মুক্তির জন্য সুপারিশ করবো।
ফজলে হক বললেন, আপনার এ উদ্যোগের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে মুক্তি দেয়া মানে আমাকে অনুগ্রহ করা। আমি ব্রিটিশের অনুগ্রহ নিব না। লক্ষ্মৌর হাইকোর্ট আমাকে বলেছিল, আমি ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করলেই আমাকে মুক্তি দেয়া হবে। কাজেই যে আনুগত্যের অনুগ্রহ তখন নেই নি, তা এখনও নিব না। আপনি একজন জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তি তাই বলছি। আমাদের কুরআনে আছে,-“তোমরা কিছুই চাইতে পারবে না,কিন্তু আল্লাহ যা চান,তাই হয়।” কাজেই আমি যে এখানে আছি তা আল্লাহর ইচ্ছাতেই আছি।
মাওলানা সাহেব তাঁর মনের অন্তিম কথাগুলো তিনি কাফনের উপর লিখে যেতেন তাই তিনি ঐ জেলারকে আগেই বলেছিলেন,” আমার আনা কাফনখানি আমি আমার ছেলেদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। যদি আমার মৃত্যু এখানেই হয় তাহলে আপনারা সরকার অনুমোদিত কাফন দিয়েই আমার কবর দেবেন।”ঐ কাপড়ের উপর নির্বাসিত জীবনে বসে কাব্য আকারে যে কাহিনী তিনি আরবী ভাষার যে লিখেছিলেন সেটাই সুবিখ্যাত “আসসাওরাতুল হিন্দিয়া”(ভারতীয় বিদ্রোহ) এর পাণ্ডুলিপি।
এ প্রতিরোধের ধারা আমাদের এ যুগেও চালু আছে। আজকের দিনেও যদি কেউ ইয়াজিদ হতে চেষ্টা করে হুসাইনের সৈনিকেরা কারবালার মতো রাজপথকে রক্তে রন্জিত করে প্রতিরোধ করবে ইনশাআল্লাহ
স্বাধীনতাকামীদের পুরোধা রঈসুল আহরার মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার তো যথার্থই বলেছেন-
رنگ لاتى ہے حنا پس جانے كے بعد ـ اسلام زندہ ہوتا ہے ہر كربلا كے بعد.
রঙ লাতি হ্যায় হেনা পিস জানে কে বাদ,
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বাদ।
অর্থ: “মেহেদি পিষে নেওয়ার পরই তার রং প্রকাশ পায়;
তেমনি প্রতিটি কারবালার (ত্যাগ ও পরীক্ষার) পর ইসলাম নতুনভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠে।”
قتلِ حسینؓ اصل میں مرگِ یزید ہے
اسلام زندہ ہوتا ہے ہر کربلا کے بعد
কাত্লে হুসাইন (রাঃ) আসল মে মর্গ-এ ইয়াযীদ হ্যায়,
ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কে বা’দ।
অর্থ: “হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাত প্রকৃতপক্ষে ইয়াযীদের মৃত্যুরই নামান্তর;
কারণ প্রতিটি কারবালার পর ইসলাম নতুন প্রাণ ফিরে পায়।”
দ্বিতীয় পর্বঃ হৃদয়ে আশুরা
মুহাররম মাস একটি ফজীলতপূর্ণ মাস। পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহ তায়ালার নিকট মাসের সংখ্যা বারটি, এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। যথাঃ মুহাররম, জিলক্বদ, জিলহজ্জ্ব, রজব। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ
“নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন।” (সূরা তওবা ঃ ৩৬)
আশুরার সম্মান ও মহত্বঃ
হিজরী সনের প্রথম মাস হলো মুহাররম । এর ১০ম দিবসটি আশুরা হিসাবে পরিচিত । মূলত আশুরা শব্দটি আরবী আশারা থেকে এসেছে । আর আশারা শব্দের অর্থ দশ । আশুরার দিবসকে জাহিলী যুগেও আরবের অধিবাসীরা অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাশীল হিসেবে বিবেচনা করত। তারা মুহাররম মাসে অন্যায়, অবিচার, জুলুম, অত্যাচার, ঝগড়া-বিবাদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রাহাজানি, হানাহানি এবং যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে বিরত থাকত। আর আশুরার দিনে তারা সাওম পালন করত ।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَدِمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ، فَرَأَى الْيَهُودَ تَصُومُ يَوْمَ عَاشُورَاءَ، فَقَالَ ” مَا هَذَا ”. قَالُوا هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ، هَذَا يَوْمٌ نَجَّى اللَّهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ، فَصَامَهُ مُوسَى. قَالَ ” فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ ”. فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ.
হাদীসে এসেছে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ‘‘রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) মদীনায় এসে দেখেন যে, ইহুদীরা আশুরার দিনে সিয়াম পালন করে। তিনি তাদেরকে বলেন, এ দিনটির বিষয় কি যে তোমরা সিয়াম পালন কর? তারা বলল, এটি একটি মহান দিবস। এদিনে আল্লাহ্ মূসা (আঃ) ও তার জাতিকে পরিত্রান দান করেন এবং ফিরআউন ও তার জাতিকে নিমজ্জিত করেন। এজন্যে মুসা (আঃ) কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এ দিন সিয়াম পালন করেন। তাই আমরা এদিন সিয়াম পালন করি। তখন রাসুল (সাঃ) বলেন, মূসার (আঃ) বিষয়ে আমাদের অধিকার বেশী এর পর তিনি এ দিবসে সিয়াম পালন করেন এবং সিয়াম পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। (বুখারী-১৮৭৮ ই,ফা, মুসলিম-২৫২৭ ই.ফা.বা)
عَبْدَ اللَّهِ، بْنَ عَبَّاسٍ – رضى الله عنهما – يَقُولُ حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ – إِنْ شَاءَ اللَّهُ – صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ ” . قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم.
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) যখন আশুরার সিয়াম পালন করেন এবং সাহাবীদেরকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দেন তখন সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)! ইহুদী ও নাসারাগণ এ দিনকে সম্মান করে থাকে। এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও সিয়াম পালন করব। রাবী বলেন আগামী বছর আসার আগে রাসূল (সাঃ) দুনিয়া থেকে চলে গেলেন।” (মুসলিম-২৫৩৭ ই.ফা)
আশুরার সিয়ামের ফজিলতঃ
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ الْأَنْصَارِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ؟ فَقَالَ: وَصِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
আবু কাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্নিত, তিনি বলেন -রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ,তিনি বলেন, “আমি আশা করি যে, আশুরার দিনে রোযা রাখলে পেছনের এক বছরের গোনাহ ক্ষমা হয়ে যাবে।” (মুসলিম-২৬১৭,ই.ফা.বা)
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلَّا هَذَا الْيَوْمَ: يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَهَذَا الشَّهْرُ يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَان رواه البخاري
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ “আমি রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কে এ সওম ছাড়া অন্য কোন সওমকে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি। আর তা হল আশুরার সওম ও এই রমজান মাসের সওম।” (বুখারী-ইফা-১৮৮০, ইসে-১৮৬৫)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، – رضى الله عنه – قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “ أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ ”
হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-“রমজান মাসের পরে উত্তম রোজা হলো মুর্হারাম মাসের রোজা। ফরজ নামাজের পর উত্তম নামাজ হলো রাতের নফল নামাজ। (মুসলিম-২৬২৬.ই.ফা.বা)
আশূরার ছিয়াম পালনের নিয়ত
উল্লেখ্য যে, ১০ই মুহাররম তারিখে পৃথিবীতে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ন্যায় ৬১ হিজরী সনে হযরত হোসায়েন (রাঃ)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু সেজন্য নফল ছিয়াম পালনের বা কোন অনুষ্ঠান বা দিবস পালনের বিধান ইসলামে নেই। অতএব আশূরার ছিয়াম পালনের নিয়ত হবে ‘নাজাতে মূসার শুকরিয়া’ হিসাবে, ‘শাহাদাতে হোসায়েন-এর শোক’ হিসাবে নয়। এটি মনে রাখতে হবে।
আশুরার প্রধানতম ঘটনা যেটি পবিত্র কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী নবীগণের যুগে ঘটেছে এমন অনেক সত্য ঘটনা আশুরার দিনের সাথে সম্পর্ক করা হয়, যার সহীহ বর্ণনা পাওয়া যায়নি বলে আমরা এখানে উল্লেখ করলাম না। তবে মূসা (আঃ) ফিরআউনের কবল থেকে রক্ষা পেয়ে ছিলেন এবং সে ও তার দলবল নদীতে ডুবে মরে ছিল। এটি এই দিনের সাথে সংশ্লিষ্ট বলে সহীহ হাদীস পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য যেসব ঘটনার কথা বলা হয়, তাও সত্য ঘটনা। কিন্তু এর সাথে আশুরার দিনের সম্পর্ক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
মূসা ও ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
نَتْلُوا عَلَيْكَ مِن نَّبَإِ مُوسَى وَفِرْعَوْنَ بِالْحَقِّ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ- إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلاَ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعاً يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِيْنَ- (القصص ৩-৪)-
‘আমরা আপনার নিকটে মূসা ও ফেরাঊনের বৃত্তান্ত সমূহ থেকে সত্য সহকারে বর্ণনা করব বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য। ‘নিশ্চয়ই ফেরাঊন তার দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং তার জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল। তাদের মধ্যকার একটি দলকে সে দুর্বল করে দিয়েছিল। সে তাদের পুত্র সন্তানদের হত্যা করত ও কন্যা সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখত। বস্ত্ততঃ সে ছিল অনর্থ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (ক্বাছাছ ২৮/৩-৪)
পবিত্র কুরআনে ফেরাঊনের আলোচনা যত এসেছে, পূর্ব যুগের অন্য কোন নরপতি সম্পর্কে এত বেশী আলোচনা আসেনি। এর মাধ্যমে ফেরাঊনী যুলুমের বিভিন্ন দিক স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যাতে ইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যে, যুগে যুগে ফেরাঊনরা আসবে এবং ঈমানদার সৎকর্মশীলদের উপরে তাদের যুলুমের ধারা ও বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রূপ হবে। যদিও পদ্ধতি পরিবর্তিত হবে। কোন যুগই ফেরাঊন থেকে খালি থাকবে না। তাই ফেরাঊন সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়ার জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই নরাধম সম্পর্কে এত বেশী আলোচনা করেছেন। যাতে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সাবধান হয় এবং যালেমদের ভয়ে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত না
ফেরাউনের ঘটনা ছিল এমন-
وَإِذْ نَجَّيْنَاكُم مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَسُومُونَكُمْ سُوءَ الْعَذَابِ يُذَبِّحُونَ أَبْنَاءَكُمْ وَيَسْتَحْيُونَ نِسَاءَكُمْ ۚ وَفِي ذَٰلِكُم بَلَاءٌ مِّن رَّبِّكُمْ عَظِيمٌ
আর (স্মরণ কর) সে সময়ের কথা, যখন আমি তোমাদিগকে মুক্তিদান করেছি ফেরআউনের লোকদের কবল থেকে যারা তোমাদিগকে কঠিন শাস্তি দান করত; তোমাদের পুত্রসন্তানদেরকে জবাই করত এবং তোমাদের স্ত্রীদিগকে অব্যাহতি দিত। বস্তুতঃ তাতে পরীক্ষা ছিল তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে, মহা পরীক্ষা। [সূরা বাকারাহ্: ৪৯]
২য় বারঃ বনু ইস্রাঈলের নবজাতক পুত্রসন্তানদের হত্যার নির্দেশ জারি
ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের নেতারা ইতিপূর্বে ফেরাঊনকে বলেছিল, أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُواْ فِي الأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآلِهَتَكَ ‘আপনি কি মূসা ও তার সম্প্রদায়কে এমনি ছেড়ে দিবেন দেশময় ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বাতিল করে দেবার জন্য? (আ‘রাফ ৭/১২৭)। নেতারা মূসা ও হারূণের ঈমানী দাওয়াতকে ‘ফাসাদ’ বলে অভিহিত করেছিল। এক্ষণে দেশময় মূসার দাওয়াতের ব্যাপক প্রসার বন্ধ করার জন্য এবং ফেরাঊনের নিজ সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকদের ব্যাপকহারে মূসার দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার স্রোত বন্ধ করার জন্য নিজেদের লোকদের কিছু না বলে নিরীহ বনু ইস্রাঈলদের উপরে অত্যাচার শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ফেরাঊন বলল, سَنُقَتِّلُ أَبْنَاءَهُمْ وَنَسْتَحْيِـي نِسَاءَهُمْ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ- (الأعراف ১২৭)- ‘আমি এখুনি টুকরা টুকরা করে হত্যা করব ওদের পুত্র সন্তানদেরকে এবং বাঁচিয়ে রাখব ওদের কন্যা সন্তানদেরকে। আর আমরা তো ওদের উপরে (সবদিক দিয়েই) প্রবল’ (আরাফ ৭/১২৭)।
এভাবে মূসার জন্মকালে বনু ইস্রাঈলের সকল নবজাতক পুত্র হত্যা করার সেই ফেলে আসা লোমহর্ষক নির্যাতনের পুনরাবৃত্তির ঘোষণা প্রদান করা হল।
আসন্ন বিপদের আশংকায় ভীত-সন্ত্রস্ত কওমের লোকদের সান্ত্বনা দিয়ে মূসা (আঃ) বললেন, عَسَى رَبُّكُمْ أَن يُّهْلِكَ عَدُوَّكُمْ وَيَسْتَخْلِفَكُمْ فِي الأَرْضِ فَيَنْظُرَ كَيْفَ تَعْمَلُونَ ‘তোমাদের পালনকর্তা শীঘ্রই তোমাদের শত্রুদের ধ্বংস করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দেশে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন কাজ কর’ (আ‘রাফ ৭/১২৯)। তিনি বললেন, اسْتَعِينُوا بِاللهِ وَاصْبِرُوْا إِنَّ الأَرْضَ ِللهِ يُوْرِثُهَا مَنْ يَّشَآءُ مِنْ عِبَادِهِ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর আল্লাহর নিকটে এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ই এ পৃথিবী আল্লাহর। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। বস্ত্ততঃ চূড়ান্ত পরিণাম ফল আল্লাহভীরুদের জন্যই নির্ধারিত’ (আ‘রাফ ৭/১২৮)।
মূসা (আঃ) তাদেরকে আরও বলেন,
يَا قَوْمِ إِنْ كُنتُمْ آمَنتُمْ بِاللهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوْا إِنْ كُنتُم مُّسْلِمِينَ- فَقَالُواْ عَلَى اللهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لاَ تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ- وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ-
‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যদি আল্লাহর উপরে ঈমান এনে থাক, তবে তাঁরই উপরে ভরসা কর যদি তোমরা আনুগত্যশীল হয়ে থাক’। জবাবে তারা বলল, আমরা আল্লাহর উপরে ভরসা করছি। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের উপরে এ যালেম কওমের শক্তি পরীক্ষা করো না’। ‘আর আমাদেরকে অনুগ্রহ করে কাফের সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও’ (ইউনুস ১০/৮৪-৮৬)।
উপরোক্ত আয়াত সমূহে বুঝা যায় যে, পয়গম্বর সূলভ দরদ ও দূরদর্শিতার আলোকে মূসা (আঃ) স্বীয় ভীত-সন্ত্রস্ত কওমকে মূলতঃ দু’টি বিষয়ে উপদেশ দেন।
এক- শত্রুর মোকাবেলায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং
দুই- আল্লাহর সাহায্য না আসা পর্যন্ত সাহসের সাথে ধৈর্য ধারণ করা।
সাথে সাথে একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, সমগ্র পৃথিবীর মালিকানা আল্লাহর। তিনি যাকে খুশী এর উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেন এবং নিঃসন্দেহে শেষফল মুত্তাক্বীদের জন্যই নির্ধারিত।
ফেরাঊনের বিরুদ্ধে মূসার বদ দো‘আ
وَقَالَ مُوسَى رَبَّنَا إِنَّكَ آتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلأَهُ زِينَةً وَأَمْوَالاً فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا رَبَّنَا لِيُضِلُّوْا عَنْ سَبِيلِكَ رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَلاَ يُؤْمِنُوْا حَتَّى يَرَوُا الْعَذَابَ الأَلِيمَ- قَالَ قَدْ أُجِيبَتْ دَّعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِيمَا وَلاَ تَتَّبِعَآنِّ سَبِيلَ الَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ-
‘মূসা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি ফেরাঊনকে ও তার সর্দারদেরকে পার্থিব আড়ম্বর সমূহ ও সম্পদরাজি দান করেছ, যা দিয়ে তারা লোকদেরকে তোমার রাস্তা থেকে বিপথগামী করে। অতএব হে আমাদের প্রভু! তুমি তাদের সম্পদরাজি ধ্বংস করে দাও ও তাদের অন্তরগুলিকে শক্ত করে দাও, যাতে তারা অতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান না আনে, যতক্ষণ না তারা মর্মান্তিক আযাব প্রত্যক্ষ করে’(৮৮)। জবাবে আল্লাহ বললেন, তোমাদের দো‘আ কবুল হয়েছে। অতএব তোমরা দু’জন অটল থাক এবং অবশ্যই তোমরা তাদের পথে চলো না, যারা জানে না’ (ইউনুস ১০/৮৮-৮৯)।
মূসা ও হারূণের উপরোক্ত দো‘আ আল্লাহ কবুল করলেন। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সঙ্গে সঙ্গে করলেন না। বরং সময় নিলেন অন্যূন বিশ বছর। এরূপ প্রলম্বিত কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহ মাযলূমের ধৈর্য পরীক্ষার সাথে সাথে যালেমেরও পরীক্ষা নিয়ে থাকেন এবং তাদের তওবা করার ও হেদায়াত প্রাপ্তির সুযোগ দেন। যাতে পরে তাদের জন্য ওযর পেশ করার কোন সুযোগ না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, وَلَوْ يَشَاءُ اللهُ لاَنتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لِّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৪)।
লোহিত সাগরে ফেরাউনের ডুবে যাওয়ার ঘটনা
ক্রমাগত পরীক্ষা ও অবকাশ দানের পরও যখন কোন জাতি সম্বিত ফিরে পায় না। বরং উল্টা তাদের অহংকার বাড়তে বাড়তে তুঙ্গে ওঠে, তখন তাদের চূড়ান্ত ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ পাক বলেন,
وَلَقَدْ أَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي فَاضْرِبْ لَهُمْ طَرِيقاً فِي الْبَحْرِ يَبَساً لاَّ تَخَافُ دَرَكاً وَّلاَ تَخْشَى-
‘আমরা মূসার প্রতি এই মর্মে অহী করলাম যে, আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিযোগে বের হয়ে যাও এবং তাদের জন্য সমুদ্রে শুষ্কপথ নির্ধারণ কর। পিছন থেকে এসে তোমাদের ধরে ফেলার আশংকা কর না এবং (পানিতে ডুবে যাওয়ার) ভয় কর না’ (ত্বোয়াহা ২০/৭৭)।
আল্লাহর হুকুম পেয়ে মূসা (আঃ) রাত্রির সূচনা লগ্নে বনু ইস্রাঈলদের নিয়ে রওয়ানা হলেন। তাঁরা সমুদ্রের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এ সমুদ্র কোনটা ছিল এ ব্যাপারে মুফতী মুহাম্মাদ শফী তাফসীর রূহুল মা‘আনীর বরাত দিয়ে ৮৬০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন যে, ওটা ছিল ‘ভূমধ্যসাগর’।[30] একই তাফসীরে ৪৭৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন ‘লোহিত সাগর’। কিন্তু মাওলানা মওদূদী খ্যাতনামা পাশ্চাত্য মনীষী লুইস গোল্ডিং-এর তথ্যানুসন্ধান মূলক ভ্রমণ কাহিনী IN THE STEPS OF MOSSES, THE LAW GIVER -এর বরাতে লিখেছেন যে, ওটা ছিল ‘লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হরদ’। মিসরের আধুনিক তাফসীরকার তানতাভীও (মৃঃ ১৯৪০ খৃঃ) বলেন যে, লোহিত সাগরে ডুবে মরা ফেরাঊনের লাশ ১৯০০ খৃষ্টাব্দের মে মাসে পাওয়া গিয়েছিল’যদিও তা ১৯০৭ সালে পাওয়া যায়।
মূসা (আ.) এর জন্য এটা ছিল পরীক্ষা ও নাজাতের উসিলা
মূসার নবুঅতী জীবনে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইবরাহীমের অগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এটিও ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক মহা পরীক্ষা। পিছনে ফেরাঊনের হিংস্র বাহিনী, সম্মুখে অথৈ সাগর। এই কঠিন সময়ে বনু ইস্রাঈলের আতংক ও হাহাকারের মধ্যেও মূসা ছিলেন স্থির ও নিস্কম্প। দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় তিনি আল্লাহর উপরে বিশ্বাসে অটল থাকেন এবং সাথীদের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করেন। হিজরতের রাতে একইরূপ জীবন-মরণ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)।
যাই হোক ফেরাঊন খবর জানতে পেরে তার সেনাবাহিনীকে বনু ইস্রাঈলদের পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দিল। আল্লাহ বলেন,
فَأَتْبَعُوهُم مُّشْرِقِينَ- فَلَمَّا تَرَاءى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ- قَالَ كَلاَّ إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ- فَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنِ اضْرِبْ بِعَصَاكَ الْبَحْرَ فَانفَلَقَ فَكَانَ كُلُّ فِرْقٍ كَالطَّوْدِ الْعَظِيمِ- وَأَزْلَفْنَا ثَمَّ الْآخَرِينَ- وَأَنجَيْنَا مُوسَى وَمَن مَّعَهُ أَجْمَعِينَ- ثُمَّ أَغْرَقْنَا الْآخَرِينَ-
‘সূর্যোদয়ের সময় তারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল’ (শো‘আরা ২৬/৬০)। ‘অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা (ভীত হয়ে) বলল, إِنَّا لَمُدْرَكُونَ ‘আমরা তো এবার নিশ্চিত ধরা পড়ে গেলাম’ (৬১)। ‘তখন মূসা বললেন, কখনই নয়, আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা। তিনি আমাকে সত্বর পথ প্রদর্শন করবেন’(৬২)। ‘অতঃপর আমরা মূসাকে আদেশ করলাম, তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর। ফলে তা বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড় সদৃশ হয়ে গেল’(৬৩)। ‘ইতিমধ্যে আমরা সেখানে অপরদলকে (অর্থাৎ ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনীকে) পৌঁছে দিলাম’(৬৪)। ‘এবং মূসা ও তার সঙ্গীদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিলাম’(৬৫)। ‘অতঃপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম’ (শোআরা ২৬/৬০-৬৬)।
এখানে ‘প্রত্যেক ভাগ’ বলতে তাফসীরকারগণ বারো গোত্রের জন্য বারোটি ভাগ বলেছেন। প্রত্যেক ভাগের লোকেরা পানির দেওয়াল ভেদ করে পরস্পরকে দেখতে পায় ও কথা বলতে পারে, যাতে তারা ভীত না হয়ে পড়ে। সাড়ে ছয় লক্ষ লোক এবং তাদের সওয়ারী ও গবাদি পশু ও সাংসারিক দ্রব্যাদি নিয়ে নদী পার হবার জন্য যে বিরাট এলাকা প্রয়োজন, সেই এলাকাটুকু বাদে দু’পাশে দু’ভাগে যদি সাময়িকভাবে পানি দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেটাতে বিশ্বাস করাই শ্রেয়। ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলংকার সাগরে যে ‘সুনামী’ (TSUNAMI) হয়ে গেল, তাতে ৩৩ ফুট উঁচু ঢেউ দীর্ঘ সময় যাবত দাঁড়িয়ে ছিল বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাই মূসার যামানায় সাগর বিদীর্ণ হয়ে তলদেশ থেকে দু’পাশে পানি দাঁড়িয়ে থাকা মোটেই বিচিত্র নয়। আল্লাহর হুকুমে সবকিছুই হওয়া সম্ভব।
মূসা ও বনু ইস্রাঈলকে সাগর পাড়ি দিয়ে ওপারে চলে যেতে দেখে ফেরাঊন সরোষে ঘোড়া দাবড়িয়ে সর্বাগ্রে শুষ্ক সাগর বক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিছনে তার বিশাল বাহিনীর সবাই সাগরের মধ্যে নেমে এলো। যখন তারা সাগরের মধ্যস্থলে পৌঁছে গেল, তখন আল্লাহর হুকুমে দু’দিক থেকে বিপুল পানি রাশি ধেয়ে এসে তাদেরকে নিমেষে গ্রাস করে ফেলল। আল্লাহ বলেন, فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ بِجُنُودِهِ فَغَشِيَهُم مِّنَ الْيَمِّ مَا غَشِيَهُمْ- (طه ৭৮)- ‘অতঃপর ফেরাঊন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। কিন্তু সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে ফেলল’ (ত্বোয়াহা ২০/৭৮)।
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْياً وَعَدْواً حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنتُ أَنَّهُ لآ إِلَهَ إِلاَّ الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ-
‘আর বনু ইস্রাঈলকে আমরা সাগর পার করে দিলাম। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনী বাড়াবাড়ি ও শত্রুতা বশতঃ। অতঃপর যখন সে (ফেরাঊন) ডুবতে লাগল, তখন বলে উঠল, আমি ঈমান আনছি এ বিষয়ে যে, সেই সত্তা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, যার উপরে ঈমান এনেছে বনু ইস্রাঈলগণ এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের একজন।’ (ইউনুস ১০/৯০)।
আল্লাহ বললেন,
آلآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ- فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنَّ كَثِيراً مِّنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ-
آلآن ‘এখন একথা বলছ? অথচ তুমি ইতিপূর্বে না-ফরমানী করেছিলে এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। ‘অতএব আজ আমরা তোমার দেহকে (বিনষ্ট হওয়া থেকে) বাঁচিয়ে দিচ্ছি। যাতে তোমার পশ্চাদ্বর্তীদের জন্য তুমি নিদর্শন হতে পার। বস্ত্ততঃ বহু লোক এমন রয়েছে যারা আমাদের নিদর্শনাবলীর বিষয়ে বেখবর’ (ইউনুস ১০/৯১-৯২)।
স্মর্তব্য যে, সাগরডুবির দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার পরেও ভীত-সন্ত্রস্ত বনু ইস্রাঈলীরা ফেরাঊন মরেছে কি-না বিশ্বাস করতে পারছিল না। ফলে মূসা (আঃ) আল্লাহর নিকট দোআ করলেন। তখন আল্লাহ তার প্রাণহীন দেহ বের করে দিলেন। অতঃপর মূসার সাথীরা নিশ্চিন্ত হল।
ফেরাঊনের পরিচয়
‘ফেরাঊন’ কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটি হ’ল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। ক্বিবতী বংশীয় এই সম্রাটগণ কয়েক শতাব্দী ব্যাপী মিসর শাসন করেন। এই সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড (PYRAMID), স্ফিংক্স (SPHINX) প্রভৃতি তাদের সময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে। হযরত মূসা (আঃ)-এর সময়ে পরপর দু’জন ফেরাঊন ছিলেন। সর্বসম্মত ইস্রাঈলী বর্ণনাও হ’ল এটাই এবং মূসা (আঃ) দু’জনেরই সাক্ষাৎ লাভ করেন। লুইস গোল্ডিং (LOUIS GOLDING)-এর তথ্যানুসন্ধানমূলক ভ্রমণবৃত্তান্ত IN THE STEPS OF MOSSES, THE LAW GIVER অনুযায়ী উক্ত ‘উৎপীড়ক ফেরাঊন’-এর (PHARAOH, THE PERSECUTOR) নাম ছিল ‘রেমেসিস-২’ (RAMSES-11) এবং ডুবে মরা ফেরাঊন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ (منفطه) বা মারনেপতাহ (MERNEPTAH)। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হরদে তিনি সসৈন্যে ডুবে মরেন। যার ‘মমি’ ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয়। সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম তীরে ‘জাবালে ফেরাঊন’ নামে একটি ছোট পাহাড় আছে। এখানেই ফেরাঊনের লাশ প্রথম পাওয়া যায় বলে জনশ্রুতি আছে। গোল্ডিংয়ের ভ্রমণ পুস্তক এবং এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, ‘থেব্স’ (THEBES) নামক স্থানের সমাধি মন্দিরে ১৮৯৬ সালে একটি স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়, যাতে মারনেপতাহ-এর আমলের কীর্তি সমূহ লিপিবদ্ধ ছিল। অতঃপর ১৯০৬ সালে বৃটিশ নৃতত্ত্ববিদ স্যার ক্রাঁফো ইলিয়ট স্মিথ (SIR CRAFTON ELLIOT SMITH) মমিগুলো খুলে মমিকরণের কলাকৌশল অনুসন্ধান শুরু করেন। এভাবে তিনি ৪৪টি মমি পরীক্ষা করেন এবং অবশেষে ১৯০৭ সালে তিনি ফেরাঊন মারনেপতাহ-এর লাশ শনাক্ত করেন। ঐসময় তার লাশের উপরে লবণের একটি স্তর জমে ছিল। যা দেখে সবাই স্তম্ভিত হন। এ কারণে যে, অন্য কোন মমি দেহে অনুরূপ পাওয়া যায়নি।[3] উক্ত লবণের স্তর যে সাগরের লবণাক্ত পানি তা বলাই বাহুল্য। এভাবে সূরা ইউনুস ৯২ আয়াতের বক্তব্য দুনিয়াবাসীর নিকটে সত্য প্রমাণিত হয়ে যায়। যেখানে আল্লাহ বলেছিলেন যে, ‘আজকে আমরা তোমার দেহকে (বিনষ্ট হওয়া থেকে) বাঁচিয়ে দিলাম। যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত হ’তে পার’… (ইউনুস ১০/৯২)। বস্ত্ততঃ ফেরাঊনের লাশ আজও মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে। যা দেখে লোকেরা উপদেশ হাছিল করতে পারে।
ফেরাঊনের ছয়টি কুটচাল
জাদুকরদের পরাজয়ের পর ফেরাঊন তার রাজনৈতিক কুটচালের মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। তার চালগুলি ছিল,
(১) সে বলল: এই জাদুকররা সবাই মূসার শিষ্য। তারা চক্রান্ত করেই তার কাছে নতি স্বীকার করেছে। এটা একটা পাতানো খেলা মাত্র। আসলে ‘মূসাই হ’ল বড় জাদুকর’ (ত্বোয়াহা ২০/৭১)।
(২) সে বলল, মূসা তার জাদুর মাধ্যমে ‘নগরীর অধিবাসীদেরকে সেখান থেকে বের করে দিতে চায়’ (আ‘রাফ ৭/১১০) এবং মূসা ও তার সম্প্রদায় এদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।
(৩) সে বলল মূসা যেসব কথা বলছে ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে সেসব কথা কখনো শুনিনি’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৬)।
(৪) সে বলল, হে জনগণ! এ লোকটি তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে ও দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে’ (মুমিন/গাফের ৪০/২৬)।
(৫) সে বলল, মূসা তোমাদের উৎকৃষ্ট (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক) জীবন ব্যবস্থা রহিত করতে চায়’ (ত্বোয়াহা ২০/৬৩)।
(৬) সে মিসরীয় জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিয়েছিল (ক্বাছাছ ২৮/৪) এবং একটির দ্বারা অপরটিকে দুর্বল করার মাধ্যমে নিজের শাসন ও শোষণ অব্যাহত রেখেছিল। আজকের বহুদলীয় গণতন্ত্র বা দলতন্ত্র ফেলে আসা ফেরাঊনী তন্ত্রের আধুনিক রূপ বলেই মনে হয়। নিজেই সবকিছু করলেও লোকদের খুশী করার জন্য ফেরাঊন বলল, فَمَاذَا تَأْمُرُونَ ‘অতএব হে জনগণ! তোমরা এখন কি বলতে চাও’? (শো‘আরা ২৬/৩৫; আ‘রাফ ৭/১১০)। এযুগের নেতারা যেমন নিজেদের সকল অপকর্ম জনগণের দোহাই দিয়ে করে থাকেন।
ফেরাঊনী কুটনীতির বিজয় ও জনগণের সমর্থন লাভ
অধিকাংশের রায় যে সবসময় সঠিক হয় না বরং তা আল্লাহর পথ হতে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তার বড় প্রমাণ হ’ল ফেরাঊনী কুটনীতির বিজয় ও মূসার আপাত পরাজয়। ফেরাঊনের ভাষণে উত্তেজিত জনগণের পক্ষে নেতারা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, হে সম্রাট! أَتَذَرُ مُوسَى وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُواْ فِي الأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَآلِهَتَكَ- (الأعراف ১২৭)- ‘আপনি কি মূসা ও তার সম্প্রদায়কে এমনিই ছেড়ে দেবেন দেশময় ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বাতিল করে দেবার জন্য’ (আরাফ ৭/১২৭)।
ফেরাঊনের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
জাদুকরদের সঙ্গে মুকাবিলা তথা সত্য ও মিথ্যার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ফেরাঊনের নেককার স্ত্রী ও মূসার পালক মাতা (أمه البديلة) ‘আসিয়া’ উক্ত মুকাবিলার শুভ ফলাফলের জন্য সদা উদগ্রীব ছিলেন। যখন তাঁকে মূসা ও হারূণের বিজয়ের সংবাদ শোনানো হ’ল, তখন তিনি কালবিলম্ব না করে বলে ওঠেন, آمَنْتُ بِرَبِّ مُوْسَى وَ هَارُوْنَ ‘আমি মূসা ও হারূণের পালনকর্তার উপরে ঈমান আনলাম’।
নিজ স্ত্রীর ঈমানের এ খবর শুনে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ফেরাঊন তাকে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে।[27] মৃত্যুর পূর্বে বিবি আসিয়া কাতর কণ্ঠে স্বীয় প্রভুর নিকটে প্রার্থনা করেন। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَضَرَبَ اللهُ مَثَلاً لِلَّذِينَ آمَنُوا اِمْرَأَةَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتاً فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ-
‘আল্লাহ ঈমানদারগণের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন ফেরাঊনের স্ত্রীর, যখন সে বলেছিল, ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ কর! আমাকে ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের হাত থেকে উদ্ধার কর এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও’ (তাহরীম ৬৬/১১)।
আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত কওমে ফেরাঊনের ইতিহাস কেন গুরুত্বপূর্ণ
আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, ছামূদ, লূত্ব ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পর ষষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসাবে কওমে ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ পাক কুরআনের ২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, কওমে মূসা ও ফেরাঊন সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের মোট ৪৪টি সূরায় ৫৩২টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
কুরআনে সর্বাধিক আলোচিত বিষয় হল এটি। যাতে ফেরাঊনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ও তার যুলুমের নীতি-পদ্ধতি সমূহ পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এযুগের ফেরাঊনদের বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মাদী হুঁশিয়ার হয়। ফেরাঊনের কাছে প্রেরিত নবী মূসা ও হারূণ (আঃ) সম্পর্কে কুরআনে সর্বাধিক আলোচনা স্থান পেয়েছে। কারণ মূসা (আঃ)-এর মুজেযা সমূহ অন্যান্য নবীদের তুলনায় যেমন বেশী ছিল, তাঁর সম্প্রদায় বনী ইস্রাঈলের মূর্খতা ও হঠকারিতার ঘটনাবলীও ছিল বিগত উম্মতগুলির তুলনায় অধিক এবং চমকপ্রদ।
এতদ্ব্যতীত মূসা (আঃ)-কে বারবার পরীক্ষা নেবার মধ্যে এবং তাঁর কওমের দীর্ঘ কাহিনীর আলোচনা প্রসঙ্গে বহু জ্ঞাতব্য বিষয় ও আদেশ-নিষেধের কথাও এসেছে। সর্বোপরি শাসক সম্রাট ফেরাঊন ও তার ক্বিবতী সম্প্রদায় কর্তৃক সংখ্যালঘু অভিবাসী বনু ইস্রাঈল সম্প্রদায়ের উপর যুলুম-অত্যাচারের বিবরণ ও তার প্রতিরোধে মূসা (আঃ)-এর প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ বিশ বছর ধরে যালেম সম্প্রদায়ের উপরে আপতিত বিভিন্ন গযবের বর্ণনা ও অবশেষে ফেরাঊনের সদলবলে সলিল সমাধির ঘটনা যেন জীবন্ত বাণীচিত্র হয়ে ফুটে উঠেছে বিভিন্ন সূরায় বর্ণিত কুরআনের অনুপম বাকভঙ্গীতে।
মোটকথা কুরআন পাক মূসা (আঃ)-এর কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছু বর্ণিত হয়েছে। কারণ এই কাহিনীতে অগণিত শিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপার শক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্য সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এগুলোতে কর্মোদ্দীপনা ও চারিত্রিক সংশোধনের নির্দেশিকা সমূহ প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান রয়েছে।
ফেরাঊনী আচরণ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ
(১) দুষ্টু শাসকগণ তার পদে অন্য কাউকে ভাবতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘ফেরাঊন পৃথিবীতে উদ্ধত হয়ে উঠেছিল’ (ইউনুস ১০/৮৩)। সে দাবী করেছিল, ‘আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ পালনকর্তা’ (নাযে‘আত ৭৯/২৪)। অতএব ‘আমি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে আমি জানি না’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৮)। যেহেতু সে তৎকালীন পৃথিবীর এক সভ্যতাগর্বী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের একচ্ছত্র সম্রাট ছিল, সেহেতু তার এ দাবী মিথ্যা ছিল না। এর দ্বারা সে নিজেকে ‘সৃষ্টিকর্তা’ দাবী করত না বটে, কিন্তু নিজস্ব বিধানে প্রজাপালনের কারণে নিজেকেই সর্বোচ্চ পালনকর্তা ভেবেছিল। তার অহংকার তার চক্ষুকে নবী মূসার অহীর বিধান মান্য করা থেকে অন্ধ করে দিয়েছিল। যুগে যুগে আবির্ভূত স্বেচ্ছাচারী শাসকদের অবস্থা এ থেকে মোটেই পৃথক ছিল না। আজও নয়। প্রত্যেকে নিজেকে শ্রেষ্ঠ শাসক মনে করে এবং ঐ পদে কাউকে শরীক ভাবতে পারে না।
(২) তারা তাদের বিরোধীদেরকে ধর্ম বিরোধী ও সমাজ বিরোধী বলে। ফেরাঊন বলেছিল, তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও। সে ডাকুক তার পালনকর্তাকে। আমি আশংকা করছি যে, সে তোমাদের দ্বীন এবং প্রচলিত উৎকৃষ্ট রীতিনীতি পরিবর্তন করতে চায় এবং দেশে ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় (মুমিন ৪০/২৬, ত্বোয়াহা ২০/৬৩)। সকল যুগের ফেরাঊনরা তাদের বিরুদ্ধ বাদীদের উক্ত কথাই বলে থাকে।
(৩) তারা সর্বদা নিজেদেরকে জনগণের মঙ্গলকামী বলে। নিজ সম্প্রদায়ের জনৈক গোপন ঈমানদার ব্যক্তি যখন মূসাকে হত্যা না করার ব্যাপারে ফেরাঊনকে উপদেশ দিল, তখন তার জবাবে ফেরাঊন বলল, ‘আমি তোমাদেরকে কেবল মঙ্গলের পথই দেখিয়ে থাকি’ (মুমিন ৪০/২৯)। সকল যুগের ফেরাঊনরাও একই কথা বলে আল্লাহর বিধানকে এড়িয়ে চলে এবং নিজেদের মনগড়া বিধান প্রতিষ্ঠায় জনগণের নামে জনগণের উপরে যুলুমের স্টীম রোলার চালিয়ে থাকে।
(৪) তাদের দেওয়া জেল-যুলুম ও হত্যার হুমকির বিপরীতে ঈমানদারগণ সর্বদা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন ও পরিণামে মযলূম বিজয়ী হয় ও যালেম পর্যুদস্ত হয়। যেমন কারাদন্ড ও হত্যার হুমকি ও ফেরাঊনী যুলুমের উত্তরে মূসার বক্তব্য ছিল: وَقَالَ مُوسَى إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّنْ كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لاَّ يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ ‘আমি আমার ও তোমাদের পালনকর্তার আশ্রয় প্রার্থনা করছি সকল অহংকারী থেকে যে বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না’ (মুমিন ৪০/২৭)। ফলে ‘আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং পরে ফেরাঊন গোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করল’ (মুমিন ৪০/৪৫)। এযুগেও মযলূমের কাতর প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করে থাকেন ও যালেমকে বিভিন্নভাবে শাস্তি দিয়ে থাকেন।
সমাপ্তি আলোচনা
সম্মানিত সুধীবৃন্দ,
আজকের এই দীর্ঘ আলোচনা শেষে আমরা এই সত্যে উপনীত হতে পারি যে, আশুরার চেতনা কেবল একটি নির্দিষ্ট যুগের বা কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি যুগে যুগে সত্যের জয় এবং মিথ্যার পরাজয়ের এক মহিমান্বিত স্মারক। এই ১০ই মহররমের ইতিহাস আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে, যখন জালিম ফেরাউনের খোদায়ী দাবি আর অত্যাচারের হাত থেকে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.) এবং বনী ইসরাইলকে অলৌকিকভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন আর লোহিত সাগরের বুকে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন অহংকারী ফেরাউনকে।
পবিত্র আশুরার সেই আদি ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, বাহ্যিক শক্তি যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর মহাশক্তির সামনে তা খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে বাধ্য। আর ঠিক একইভাবে, ৬১ হিজরির এই দিনে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর পরিবারসহ আত্মত্যাগের মাধ্যমে ফেরাউনি শক্তিরই নতুন রূপ—ইয়াজিদের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
“বাতিলের শক্তি সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্যের আলো চিরন্তন।” হযরত মুসা (আ.)-এর বিজয় এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত—উভয় ঘটনাই আমাদের হৃদয়ে এই একই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, অন্যায়ের সামনে কখনো মাথা নত করা যাবে না।
আসুন, আশুরার এই দ্বিমুখী চেতনাকে—হযরত মুসা (আ.)-এর আমলের সত্যের বিজয় এবং কারবালার প্রান্তরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামকে—আমরা আমাদের হৃদয়ে ধারণ করি। আজকের সেমিনারের মূল অঙ্গীকার হোক: আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সকল আধুনিক ‘ফেরাউন’ আর ‘ইয়াজিদি’ খাসলত বা অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ন্যায় ও ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আশুরার সঠিক শিক্ষা বুকে ধারণ করে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন।
ওয় আখিরু দা’ওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু