সেমিনারঃ
“বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক: পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণ ও প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা”
উপস্থাপনায়ঃ ইসমাইল বিন ইবরাহীম
সূচনা বক্তব্যঃ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে আয়োজিত আজকের এই সেমিনারের সম্মানিত সভাপতি উস্তাদ উমর ফারুক হাফিজাহুল্লাহ, উপস্থিত দ্বীনপ্রিয় আমাদের কুরআনের সাথী ভাই ও বোনেরা- আল-ফুরক্বন ও হুজুর একাডেমী পক্ষ থেকে আপনাদের সকলকে জানাচ্ছি স্বাগতম।
সম্মানিত কুরআনের সাথীরা! একটি শান্ত সুন্দর সুশৃংখল সমাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হল পবিত্র পারিবারিক বন্ধন। আর এই বন্ধনের মূলে রয়েছে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও গভীর বিশ্বাস। কিন্তু আধুনিক এই ডিজিটালাইজেশনের যুগে লিভ টুগেদার, ফ্রিমিক্সিং এর নামে অবাধে মেলামেশা, অপসংস্কৃতি ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে পরকীয়া বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়ে বাঙ্গালী মুসলিম পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক/পরকীয়ার মত অনৈতিক কার্যকলাপ ব্যাপকভাবে মহামরির মতো ব্যধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ব্যাধি কেবল একটি সুন্দর সংসারই ধ্বংস করে না বরং সন্তানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে গোটা সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। সাময়িক এই আবেগ কেবল দুজন মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে চূর্ণ করে না; তা আঘাত করে সন্তানের মনোজগতে, কাড়ে বৃদ্ধ মা-বাবার শান্তি এবং গোটা পরিবারকে নিয়ে দাঁড় করায় সামাজিক বিপর্যয় ও গভীর মানসিক বেদনার মুখে।
তাই পরকীয়া ও ব্যাভিচারের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা এর সূচনাতেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন وَلَا تَقْرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ فَـٰحِشَةً وَسَآءَ سَبِيلاً “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।” (সূরা ইসরা, আয়াত- ৩২)
ইসলাম কেবল অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পর শাস্তির বিধান দেয় না বরং যে পথগুলো মানুষকে পরকীয়ার দিকে পরিচালিত করে। যেমন, দৃষ্টি সংযমের অভাব, অবাধ মেলামেশা ও অপসংস্কৃতি চর্চার উপর আগাম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই সাথে বৈবাহিক জীবনে তাকওয়া, পারস্পরিক অধিকার আদায় এবং ভালোবাসা বজায় রাখার এক পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা প্রদান করে। আজকের এই সেমিনারে আমরা ইসলামের সেই সুবিবেচনা ও দূরদর্শী সমাধান গুলো বিশ্লেষণ করবো, যা অনুসরণ করলে মুসলিম পরিবারের সদস্যদের মধ্য থেকে পরকীয়ার মত সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করে একটি সুস্থ, সুন্দর, সুশৃংখল ও তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ গঠন করা সম্ভব।
আজকের এই সেমিনারের মূল লক্ষ্য কাউকে অভিযুক্ত বা হেয় করা নয়; বরং বর্তমান যুগের বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কীভাবে আমরা কুরআন ও সুন্নাহর সুদৃঢ় নীতি অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের সংসারগুলোকে প্রশান্তির নীড় হিসেবে সুরক্ষিত রাখব—তারই পথ খোঁজা।
আজকের সেমিনারের আলোচনটি আমরা তিনটি পর্বে উপস্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ
১ম পর্বঃ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক: পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণ
২য় পর্বঃ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক: প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা
৩য় পর্বঃ মতামত/ প্রশ্নোত্তর
উদ্দেশ্যঃ
সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালাভাষাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ভয়াবহ পরিণতির হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়াসে আজকের এই সেমিনার।
১ম পর্বঃ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক: পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণ
ইসলামে বিবাহের উদ্দেশ্য
একজন মুসলিমের বিবাহের উদ্দেশ্য জানা জরুরী। কেননা কোন কিছুর সঠিক উদ্দেশ্য জানা না থাকলে তার আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্চুত হতে পারে। ইসলামে বিবাহ শুধু নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমই নয়; বরং এটি একটি পবিত্র সামাজিক ও নৈতিক বন্ধন। কুরআন-হাদিসের আলোকে ইসলামে বিবাহের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো- ক. মানসিক প্রশান্তি অর্জন খ. ভালোবাসা ও দয়া প্রতিষ্ঠা গ. বৈধ উপায়ে যৈবিক চাহিদা পূরণ ঘ. বংশধারা সংরক্ষণ ঙ. পরিবার গঠন চ. চরিত্র ও সতীত্ব রক্ষা ছ. সন্তানদের সুস্থ পরিবেশে লালন-পালন জ. সমাজে নৈতিকতা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা।
সৃষ্টির প্রথম মানুষ আদম (আ.) জান্নাতে যখন একাকীত্ব অনুভব করলেন, তখন তার সঙ্গী হিসেবে হাওয়া (আ.)-কে জোড়া বানিয়ে দিয়েছেন আল্লাহ। পৃথিবীর প্রথম দম্পতির বিয়ে স্বয়ং আল্লাহ পড়িয়েছেন। সে থেকেই শুরু নারী-পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ ও শূন্যতাবোধ। সৃষ্টির সেই সময় থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে এই বিয়ের রীতি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, وَ مِنۡ اٰیٰتِهٖۤ اَنۡ خَلَقَ لَكُمۡ مِّنۡ اَنۡفُسِكُمۡ اَزۡوَاجًا لِّتَسۡكُنُوۡۤا اِلَیۡهَا وَ جَعَلَ بَیۡنَكُمۡ مَّوَدَّۃً وَّ رَحۡمَۃً ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِكَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَكَّرُوۡنَ ‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো— তিনি তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জীবনসঙ্গিনী, যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ করতে পারো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম : ২১)। এজন্য প্রাপ্তবয়স্ক ও সামর্থ্যবান প্রতিটি নারী-পুরুষের বিয়ে করা মানবিক, প্রাকৃতিক ও ইমানি দায়িত্ব। বিয়ে শুধু জৈবিক চাহিদাই নয়, বরং একটি মহান ইবাদতও বটে। বিয়ের মাধ্যমে ইহ ও পরকালীন কল্যাণ সাধিত হয়। বিয়ে মানুষের জীবন পরিশীলিত, মার্জিত ও পবিত্র করে তোলে।
বিয়ের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা, যিনি নারী ও পুরুষকে সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই নয়, যারা বিয়ে করেছে, তাদের প্রতি আল্লাহ সরাসরি এ নির্দেশ দিয়েছে—যারা বিয়ে করেনি তাদের বিয়ে করিয়ে দাও। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। যারা বিয়েতে সামর্থ্য নয়, তারা যেন সংযম অবলম্বন করে—যে পর্যন্ত না আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাদের অভাবমুক্ত করে দেন।’ (সুরা নুর : ৩২-৩৩)। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়, কেননা তা চক্ষুকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান রক্ষা করে। (বুখারি : ৫০৬৬; মুসলিম : ১৪০০)
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কী?
বিবাহ বহির্ভূত বলতে সাধারণত আমরা পরকিয়া বুঝি। যদিও পরকীয়া বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কেরই একটি রূপ। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক একটি বিস্তৃত শব্দ। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক (Extra marital affairs) বলতে সাধারণত বৈবাহিক চুক্তির বাইরে কোনো বিবাহিত ব্যক্তির অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে গড়ে তোলা প্রেমমূলক অবৈধ ঘনিষ্ঠতা বা শারীরিক, মানসিক কিংবা আবেগীয় গোপন সম্পর্ককে বোঝায়। যা সামাজিক, ধর্মীয় এবং আইনগতভাবে দাম্পত্য বিশ্বস্ততার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত।
সমাজবিজ্ঞান, মানববিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন মনীষী ও গবেষক এটিকে নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন: প্রখ্যাত মার্কিন যৌনবিজ্ঞানী আলফ্রেড কিনসির (Alfred Knsey), সমাজবিজ্ঞানী জন স্ক্যানজোনির (John Scanzoni), প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ এস্তার পেরেল (Esther Perel) সহ অনেকেই এটার সংজ্ঞা দিয়েছেন যেগুলোর মূল বক্তব্য হলো- পরকীয়া বলতে সাধারণভাবে বোঝায় বিবাহিত কোনো ব্যক্তি নিজের স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে এমন গোপন আবেগপূর্ণ, ঘনিষ্ঠ বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা, যা বৈবাহিক বিশ্বস্ততার পরিপন্থী। এর শুরু অনেক সময় বন্ধুত্ব, অতিরিক্ত ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আবেগের আদান-প্রদান কিংবা গোপন কথোপকথনের মাধ্যমে হলেও তা ধীরে ধীরে গুরুতর অনৈতিক সম্পর্কে রূপ নিতে পারে।
ইসলামী স্কলারদের মতে- প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (র.) এর মতে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক হলো এমন যেকোনো অনাকাঙ্খিত ও অবৈধ সামাজিক বা দৈহিক ঘনিষ্ঠতা, যা ইসলাম স্বীকৃত বিবাহ (নিকাহ) বা আইনসম্মত পন্থার বাইরে কোনো পুরুষ ও নারীর মধ্যে সংঘটিত হয়। তিনি এ ধরনের সম্পর্ককে সমাজ ও পরিবারের নৈতিক ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী (র.) এর মতে, ইসলামি সমাজব্যবস্থায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বলতে বুঝায় এমন যেকোনো শারীরিক, আবেগীয় বা পরোক্ষ যৌন সম্পর্ক যা শরিয়তসম্মত বৈবাহিক চুক্তির সীমানা লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠে। এটি কেবল একটি নৈতিক অপরাধই নয়, বরং তা সমাজের পারিবারিক কাঠামোর পবিত্রতা ও বংশধারার (নসব) পরিচ্ছন্নতা বিনষ্ট করার মূল কারণ।
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক হলো এমন একটি সম্পর্ক, যা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ছাড়া কোনো নর-নারীর মধ্যে গড়ে ওঠে। ইসলামে এ ধরনের সব সম্পর্ককে ব্যভিচার (যিনা) ও তার মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিষয়টি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে করোনা মহামারীর চেয়েও ভয়ঙ্কর মহামারী হলো পরকীয়া। করোনার মতো বিশ্বে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে পারিবারিক কলহ। আমাদের সমাজে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে পরকীয়া। পরকীয়ার ফাঁদে আটকা পড়ে আত্মহনন করছেন অগণিত নারী-পুরুষ; বলি হচ্ছেন নিরপরাধ সন্তান, স্বামী অথবা স্ত্রী। পরকীয়ার পথে বাধা হওয়ায় নিজ সন্তানকেও নির্মমভাবে হত্যা করছে মমতাময়ী মা।
আজ পরকীয়া শুধু বাস্তব জীবনে নয়, বরং ভার্চুয়াল জগতেও ভয়ানক রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা অবৈধ সম্পর্ক অনেক সংসার ভেঙে দিচ্ছে। ইসলাম এ ধরনের ‘গোপন সম্পর্ক’, ‘চ্যাটে প্রেম’, ‘ভার্চুয়াল ব্যভিচার’, সবকিছুকেই হারাম ঘোষণা করেছে।
শুধু তাই নয় এটার কারণে সমাজে জারজ/অবৈধ সন্তান বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটা হচ্ছে সরাসরি পরকীয়ার মাধ্যমে আরেকটা হচ্ছে পরকীয়া করে ধরা খেয়ে আবার আগের স্বামীর কাছে ফিরে আসছে যিনি হয়তো তাকে তালাক দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে “বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক/পরকীয়া” শব্দটির সাথে একটি তীব্র সামাজিক নেতিবাচকতা ও আইনি জটিলতা জড়িয়ে থাকায়, এই সম্পর্কগুলোকে স্বাভাবিক (Normalize) করতে বা আড়াল করতে মানুষ সাধারণত কিছু বিশেষ সামাজিক, কথ্য এবং আধুনিক শব্দ ব্যবহার করে থাকে। বিশেষ করে শহুরে বা তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই শব্দগুলোর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। যেমন-
১. সম্পর্কের ধরন আড়াল করার শব্দ (Linguistic Cushioning)
- বেস্ট ফ্রেন্ড (Best Friend) বা বেস্টি (Bestie): এটি বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দ। বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে কারো সাথে অতিরিক্ত সময় কাটানো বা চ্যাটিং করাকে “ও তো আমার জাস্ট বেস্ট ফ্রেন্ড” বলে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়।
- জাস্ট ফ্রেন্ড (Just Friend): গভীর মানসিক বা রোমান্টিক যোগাযোগ প্রকাশ পেয়ে গেলে “আমরা জাস্ট ফ্রেন্ড, আমাদের মধ্যে ওসব কিছু নেই” বলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়।
- মেন্টর (Mentor) বা গাইড (Guide): কর্মক্ষেত্রে বা পড়াশোনার জায়গায় সিনিয়র কারো সাথে সম্পর্কে জড়ালে তাকে “লাইফ মেন্টর” বা “ক্যারিয়ার গাইড” হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়, যাতে কেউ সন্দেহ না করে।
- শুভাকাঙ্ক্ষী বা ওয়েল উইশার (Well Wisher): পার্টনারের চেয়ে বাইরের কোনো মানুষ বেশি গুরুত্ব পেলে তাকে “ও আমার বিপদের বন্ধু” বা “নিঃস্বার্থ শুভাকাঙ্ক্ষী” বলা হয়।
২. মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় অজুহাত (Emotional Excuses)
- মানসিক মিল বা ভাইব ম্যাচ (Vibe Match): বর্তমান জীবনসঙ্গীর সাথে ঝগড়া বা দূরত্বের অজুহাতে বলা হয়, “ওর সাথে আমার ভাইব ম্যাচ করে” অথবা “ও আমার মানসিক অবস্থাটা বোঝে, যা আমার হাসবেন্ড/ওয়াইফ বোঝে না”।
- টক্সিক রিলেশনশিপ (Toxic Relationship): নিজের পরকীয়াকে আড়াল করতে অনেকেই নিজের বর্তমান বৈবাহিক জীবনকে “টক্সিক” বা বিষাক্ত বলে প্রচার করেন। এটি মূলত বাইরের মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার একটি কৌশল।
- কম্প্রোমাইজড ম্যারেজ (Compromised Marriage): “বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সমাজকে দেখানোর জন্য একসঙ্গে আছি, কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো ভালোবাসা নেই”—এই কথাটি বলে বাইরের সম্পর্ককে নৈতিকভাবে সঠিক দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
৩. আধুনিক ও ওয়েস্টার্ন পরিভাষা (শহুরে প্রেক্ষাপটে)
ওপেন ম্যারেজ (Open Marriage): ঢাকা বা বড় শহরগুলোর উচ্চবিত্ত বা অতি-আধুনিক কিছু সার্কেলে এই ধারণার চল দেখা যায়, যেখানে দাবি করা হয়—”আমরা দুজনেই নিজেদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ব্যাপারে সচেতন।”
স্পেস দেওয়া (Giving Space): সম্পর্কে স্বাধীনতা বা “স্পেস” নেওয়ার নামে অন্য কারো সাথে ডেটিং বা চ্যাটিং করাকে আধুনিকতা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।
প্লাটোনিক লাভ (Platonic Love): শারীরিক সম্পর্ক না থাকলে অনেকেই গভীর ভালোবাসার পরকীয়াকে “প্লাটোনিক” বা “পবিত্র আত্মিক প্রেম” বলে দাবি করেন।
৪. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত শব্দ (Social Media & Chat Lingo)
চ্যাট বাডি (Chat Buddy) / লেট নাইট টকার (Late Night Talker): মাঝরাত পর্যন্ত অন্য কারো সাথে টেক্সট বা কথা বলা ধরা পড়লে বলা হয়, “ও জাস্ট একজন চ্যাট বাডি, একাকীত্ব কাটানোর জন্য কথা বলি।”
হেলদি ফ্লার্টিং (Healthy Flirting): অন্য কারো সাথে রোমান্টিক কথোপকথন বা প্রশংসা আদান-প্রদানকে “নির্দোষ আনন্দ” বা “হেলদি ফ্লার্টিং” বলে হালকা করার চেষ্টা করা হয়।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণ সমূহ
‘পরকীয়ার’ একটি বিষাক্ত সম্পর্ক। এই সম্পর্ক একটি সুখের সংসারকে নিমিষেই গুঁড়িয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে। কেউ নিজের ইচ্ছায় এই বিষাক্ত সম্পর্কের পথে পা বাড়ান আবার কেউ মনের অজান্ত্মেই জড়িয়ে পড়েন। মনের মত স্বামী কিংবা স্ত্রী না পেলে অনেকে সচেতন ভাবেই পরকীয়া করেন। আবার অনেকে একে অপরের কাছ থেকে অবহেলার শিকার হয়ে মনের অজান্ত্মেই অন্য কারো সাথে পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এছাড়াও যারা এই বন্ধনটি ছিন্ন করতে পারছেনন না কিংবা করতে চাচ্ছেন না তাদের মধ্যে অনেকেই আবার পরকীয়ার মত অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন। তবে যে কারণেই হোউক না কেন পরকীয়ার বিষ সংসারে ঢুকলে সুখ শান্ত্মি কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। তখন বিয়ের মত একটি পবিত্র বন্ধনকেও বিষাক্ত মনে হয়।
ক. আল্লাহভীতি বা তাকওয়ার দুর্বলতা:
ঈমান ও আল্লাহভীতি দুর্বল হয়ে গেলে মানুষ গোপন পাপকে সহজ মনে করতে পারে। আল্লাহর জবাবদিহিতার অনুভূতি একজন মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপন উভয় ধরনের পাপ থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ বলেন- إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।”(সূরা আন-নিসা, ৪:১) আল্লাহর সার্বক্ষণিক সবকিছু পর্যবেক্ষণের অনুভূতি দুর্বল হয়ে গেলে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও পরকীয়ার মত গোপন পাপের প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
খ. দৃষ্টির হেফাজত না করা:
অনেক অনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হতে পারে অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি থেকে। ইচ্ছাকৃতভাবে পরনারী/পরপুরুষের দিকে কামনামিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকানো বা বারবার তাকানোর অভ্যাস অনেক সময় মনের আকর্ষণ ও কল্পনার দরজা খুলে দিতে পারে।
গ. অপ্রয়োজনীয় ও অন্তরঙ্গ কথাবার্তা:
অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ কথাবার্তা অনেক সময় পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায়। তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরকীয়া ঘটায় না; মানুষের নিয়ত, সীমারেখা ও আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিকতাটি এভাবে বোঝা যায়:
অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ: প্রয়োজন না থাকলেও বারবার কথা বলা বা মেসেজ করা।
ব্যক্তিগত আলোচনা: নিজের দুঃখ, একাকিত্ব, দাম্পত্য সমস্যা বা ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করা। আবেগীয় নির্ভরতা: ধীরে ধীরে মনে হতে পারে,“এই মানুষটিই আমাকে সবচেয়ে ভালো বোঝে।”
অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা: প্রশংসা, আদুরে কথা, রসিকতা বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের ঝুঁকি: আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা আরও এগিয়ে গেলে শারীরিক সম্পর্কসহ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ঘ. একান্ত নির্জনে নারী-পুরুষের অবস্থান:
ইসলামী পরিভাষায়, মাহরাম নয় এমন নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থানকে খালওয়া বলা হয় এবং এ বিষয়ে ইসলামে সতর্কতা রয়েছে। উদ্দেশ্য হলো শুধু একটি কাজ নিষিদ্ধ করা নয়; বরং এমন পরিস্থিতির দরজা বন্ধ করা, যেখান থেকে বড় ধরনের নৈতিক অবক্ষয় জনিত ক্ষতি সৃষ্টি হতে পারে। একান্ত নির্জনে নারী-পুরুষের অবস্থান- শুরুতে সম্পর্কটি নির্দোষ মনে হলেও ধীরে ধীরে এমন আচরণ হতে পারে যা বৈবাহিক বিশ্বস্ততার সীমা অতিক্রম করে ফলে পরকীয়া বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
ঙ. দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব:
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান, সময় দেওয়া ও পারস্পরিক যোগাযোগের ঘাটতি কখনো কখনো সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করতে পারে। তবে এসব সমস্যা পরকীয়াকে বৈধ করে না;বরং বৈধ উপায়ে সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তা বাড়ায়। বোঝাপড়ার অভাব যে ভাবে পাকীয়া ও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারে-
বোঝাপড়ার অভাব → মানসিক দূরত্ব → একাকিত্ব ও অসন্তুষ্টি → বাইরের কারও প্রতি আবেগীয় নির্ভরতা → গোপন ঘনিষ্ঠতা → পরকীয়ার ঝুঁকি।
চ. অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ বা অবাধ মেলামেশা:
পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে ওঠার অন্যতম একটি কারণ হলো নারী-পুরুষের মধ্যে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপের কারণে এই যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে। ফলে সরাসরি দেখা না হলেও নিয়মিত চ্যাট, ব্যক্তিগত ছবি বা অনুভূতি বিনিময় এবং গভীর রাত পর্যন্ত কথোপকথনের মাধ্যমে আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে। যা পরবর্তীতে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও পরকীয়ায় রূপ নেয়।
ছ. গোপন যোগাযোগ ও ডিজিটাল মাধ্যমের অপব্যবহার:
“গোপন যোগাযোগ ও ডিজিটাল মাধ্যমের অপব্যবহার” বলতে বোঝায় স্বামী বা স্ত্রীর অজান্তে অন্য নারী বা পুরুষের সঙ্গে নিয়মিত ব্যক্তিগত যোগাযোগ করা এবং মোবাইল ফোন, মেসেঞ্জার, অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনভাবে ব্যবহার করা, যা ধীরে ধীরে অনৈতিক ঘনিষ্ঠতার দিকে নিয়ে যায়। সাধারণ বন্ধুত্বের জায়গা থেকে প্রশংসা, রোমান্টিক কথা, ব্যক্তিগত ছবি বা গভীর রাতের কথোপকথনের মতো আচরণ শুরু হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনলাইন ঘনিষ্ঠতা পরবর্তীতে সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎ ও শারীরিক সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
জ. দাম্পত্য জীবনে অবহেলা:
দাম্পত্য জীবনে অবহেলা বলতে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ, ভালোবাসা, সম্মান, যত্ন ও মানসিক সমর্থনের ঘাটতিকে বোঝানো যায়। দীর্ঘদিনের অবহেলা দাম্পত্য সম্পর্কে মানসিক দূরত্ব তৈরি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে মানুষকে বাইরের কারও কাছ থেকে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যে চেষ্টা পরকীয়া ও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের মতো ঘৃণিত সম্পর্ক তৈরী করতে পারে। অবহেলা থেকে পরকীয়ার সম্ভাব্য ধাপ-
দাম্পত্যে অবহেলা → মানসিক দূরত্ব → একাকিত্ব ও অসন্তুষ্টি → বাইরের কারও কাছ থেকে মনোযোগ → আবেগীয় নির্ভরতা → গোপন ঘনিষ্ঠতা → পরকীয়ার ঝুঁকি।
ঝ. অশ্লীলতায় আসক্ত হওয়া:
অশ্লীলতা মানুষের চিন্তা, দৃষ্টি ও আচরণকে প্রভাবিত করে এবং দাম্পত্যের বাইরে অনৈতিক আকর্ষণ তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অশ্লীল ছবি, ভিডিও, বিনোদন, কথাবার্তা মানুষের মধ্যে অনৈতিক আকর্ষণ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এসব বিষয়ের সঙ্গে নিয়মিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে যুক্ত থাকলে মানুষের দৃষ্টি, চিন্তা ও কল্পনায় এর প্রভাব পড়ে ফলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে এবং বৈবাহিক সম্পর্কের সীমারেখা অতিক্রম করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ঞ. প্রবৃত্তির অনুসরণ:
আল্লাহ বলেন, “তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না;তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।” (সূরা সাদ: ২৬) মানুষ যখন বিবেক, নৈতিকতা ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের পরিবর্তে নিজের কামনা-বাসনা ও তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষাকে অনুসরণ করে, তখন সে ধীরে ধীরে বৈবাহিক সম্পর্কের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে।
ট. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যোগাযোগের অভাব:
অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব দাম্পত্য জীবনে দূরত্ব ও অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততার কারণে একজন স্বামী বা স্ত্রী যখন মনে করেন যে তাঁর জীবনসঙ্গী তাঁর কথা শোনেন না, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন না বা প্রয়োজনের সময় পাশে থাকেন না, তখন তাঁর মধ্যে একাকিত্ব ও মানসিক অপূর্ণতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এই অবস্থায় অন্য কোনো ব্যক্তি যদি মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে, সহানুভূতি দেখায় এবং মানসিক সমর্থন দেয়, তাহলে তার প্রতি আকর্ষণ বা নির্ভরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
ঠ. পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার ঘাটতি:
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও যত্ন। যখন একে অপরের প্রতি সম্মান, মূল্যায়ন, স্নেহ ও ভালোবাসার প্রকাশ কমে যায়, তখন দাম্পত্য সম্পর্কে ধীরে ধীরে মানসিক দূরত্ব ও অসন্তুষ্টি তৈরি হতে পারে।
একজন স্বামী বা স্ত্রী যদি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, অপমান, অবমূল্যায়ন বা ভালোবাসার অভাব অনুভব করেন, তাহলে তাঁর মধ্যে একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক অপূর্ণতা সৃষ্টি হতে পারে। এই অবস্থায় বাইরের কোনো ব্যক্তি যদি তাকে সম্মান করে, গুরুত্ব দেয়, প্রশংসা করে বা আন্তরিকভাবে ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করে, তাহলে তার প্রতি মানসিক আকর্ষণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ড. প্রতারণা ও মিথ্যাচার:
অনেক সময় বিবাহিত ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভন্ন জায়গায় নিজেদের অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে একের পর এক অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করছে বলে বিভিন্ন কেস ষ্টাডিতে দেখা যাচ্ছে।
ঢ. দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্ব:
দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিনের মানসিক দূরত্ব পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঝুঁকি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। স্বামী-স্ত্রী একই সংসারে বসবাস করলেও যদি তাদের মধ্যে ভালোবাসা, আন্তরিকতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, কথা বলা ও অনুভূতি ভাগাভাগির অভাব থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে।
ণ. পারিবারিক মূল্যবোধের দুর্বলতা:
পারিবারিক মূল্যবোধের দুর্বলতা বলতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চা কমে যাওয়াকে বোঝায়। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, স্বার্থপরতা, পারিবারিক যোগাযোগের অভাব এবং অর্থনৈতিক চাপসহ বিভিন্ন কারণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
ত. দায়িত্বহীনতা ও আত্মসংযমের অভাব:
দায়িত্বহীনতা ও আত্মসংযমের অভাব বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অন্যতম কারণ হতে পারে। দাম্পত্য জীবনের প্রতি দায়িত্ববোধ কমে গেলে এবং নিজের আবেগ, আকর্ষণ ও ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে একজন ব্যক্তি বিবাহের বাইরে অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন।
থ. সাময়িক আবেগকে স্থায়ী সিদ্ধান্তের ওপর প্রাধান্য দেওয়া:
সাময়িক আবেগ, আকর্ষণ বা উত্তেজনাকে বিবাহের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও দায়িত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের একটি কারণ হতে পারে। দাম্পত্য জীবনে কোনো সমস্যা, একাকিত্ব বা মানসিক অসন্তোষ দেখা দিলে কেউ কেউ ভবিষ্যৎ পরিণতি বিবেচনা না করে মুহূর্তের আবেগে অন্য ব্যক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তখন বিবাহের প্রতিশ্রুতি, পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তান ও সামাজিক প্রভাবের মতো স্থায়ী বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়।
দ. সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর যখন নারীর শরীরে কিছুটা পরিবর্তন হয়
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর যখন নারীর শরীরে কিছুটা পরিবর্তন হয়, তখন স্বামীর আর তাকে ভালো লাগে না! এত দায়িত্ব পালন করতেও ভালো লাগেনা! তখন তিনি অন্য নারীতে আসক্ত হয়ে পড়েন! যে নারীরা খুব ফিটফাট চলাফেরা করে! রিলাক্স থাকে, টেনশন মুক্ত থাকে, স্বামী তখন ভাবে ওই নারীই তাকে সুখ দিতে পারবে!ফলশ্রুতিতে তৈরি হয় পরকীয়া!
বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক/পরকীয়ার কুফল
ক. ঈমান ও তাকওয়ার ক্ষতি:
হারাম সম্পর্ক মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি ও লজ্জাবোধ দুর্বল করতে পারে এবং পাপের প্রতি সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। গুনাহ অন্তরকে প্রভাবিত করে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন: “কখনোই নয়; বরং তারা যে কুকর্ম করে, তা তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। (সূরা আল-মুতাফফিফীন, ৮৩:১৪) রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে…”এরপর সে তওবা করলে তা দূর হয়ে যায়; কিন্তু গুনাহ করতে থাকলে সেই দাগ বৃদ্ধি পায়। (জামে‘ আত-তিরমিজি, ৩৩৩৪) অর্থাৎ গুনাহকে বারবার করতে থাকলে অন্তরের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং পাপের প্রতি মানুষের অনুভূতি ও সচেতনতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
খ. সুনাম/সুখ্যাতি নষ্ট হয়:
একজন ব্যক্তির অনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব শুধু ওই ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; স্বামী/স্ত্রী, সন্তান এবং উভয় পরিবারের ওপর এমনকি তিলে তিলে গড়ে তোলা সুনাম/সুখ্যাতি নষ্ট করে।
গ. পরিবারের সুনাম/সুখ্যাতি নষ্ট হয়:
একজন ব্যক্তির অনৈতিক সম্পর্কের কারণে ঐ পরিবারের সুনাম/সুখ্যাতি নষ্ট হয় এবং অন্যদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ঘ. দাম্পত্য বিশ্বাস নষ্ট হয়:
বিবাহের অন্যতম ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, বিশ্বস্ততা ও অঙ্গীকার। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক শুধু একটি ব্যক্তিগত অনৈতিকতা নয়; বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়া এই ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা, নিরাপত্তা ও অঙ্গীকারকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্বাস ভেঙে গেলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ, মানসিক দূরত্ব ও অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
ঙ. নৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে:
দাম্পত্য সম্পর্কে মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং বিশ্বাসের খেয়ানত করা স্বাভাবিকভাবেই পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ধরনের আচরণের গুরুতর নৈতিক অবস্থার অবনতির দিকটি স্পষ্ট করে।
চ. পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়:
একজনের অনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব শুধু ওই ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; স্বামী/স্ত্রী, সন্তান এবং উভয় পরিবারের ওপরও পড়ে। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক দাম্পত্য জীবনের শান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে নষ্ট করে পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ, সন্দেহ ও মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
ছ. সন্তানের মানসিক ক্ষতি সাধিত হয়:
দাম্পত্য কলহ ও পারিবারিক ভাঙন শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তাবোধ, মানসিক স্থিতি ও পারিবারিক সম্পর্কের ধারণাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে পরিবারে ঝগড়া, অবিশ্বাস ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি হলে সন্তান সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে তার মধ্যে ভয়, অনিরাপত্তা, হতাশা ও বাবা-মায়ের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
জ. মিথ্যা ও প্রতারণার বিস্তার লাভ করে:
পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গোপন রাখতে অনেক সময় মিথ্যা বলা, তথ্য গোপন করা ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়। ফলে দাম্পত্য জীবনে বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মিথ্যাচার ও প্রতারণার সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়” (বুখারি, ৬০৯৪; মুসলিম, ২৬০৭)। তাই পরকীয়া শুধু একটি সম্পর্কগত সমস্যা নয়; এটি সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও নৈতিকতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঝ. সামাজিক আস্থার অবক্ষয় ঘটে:
বিবাহ যদি বিশ্বস্ততা ও দায়িত্বের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিশ্বাসকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং সমাজে বৈবাহিক অঙ্গীকার, বিশ্বস্ততা ও নৈতিকতার প্রতি আস্থা দুর্বল করতে পারে। তাই বিশ্বাসভঙ্গের প্রবণতা ব্যক্তি ও পরিবার ছাড়িয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়লে পারস্পরিক আস্থা ও নৈতিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়।
ঞ. আখিরাতের ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়:
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক মানুষকে গুরুতর গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং তা যিনা পর্যন্ত গড়ালে আখিরাতে কঠিন শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ ব্যভিচারীদের জন্য আখিরাতের শাস্তির সতর্কতাও দিয়েছেন (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৮–৬৯)। রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও ব্যাভিচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন (বুখারি, ২৪৭৫; মুসলিম, ৫৭)।
আপনার স্বামী বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়াচ্ছেন কিনা বুঝবেন কিভাবে?
পরকীয়াকারী পুরুষ চেনার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নেই, তবে কিছু আচরণগত পরিবর্তন এবং বৈশিষ্ট্য দেখে সন্দেহ জাগতে পারে। এগুলো কেবল সন্দেহের কারণ হতে পারে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও গভীরে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। নিচে কিছু সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ উল্লেখ করা হলো:
আচরণগত পরিবর্তন: খেয়াল করুন আপনার স্বামী কি হঠাৎ করেই আগের চেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, অথবা তার কথা বলার ধরন বা মনোযোগের ধরনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না। বাসা থেকেও আগের সময়ের থেকে অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়ে বের হন, আবার ফেরেনও অনেক দেরিতে।
* অতিরিক্ত গোপনীয়তা: আগে তেমন না থাকলেও হঠাৎ করে ফোন বা কম্পিউটারে পাসওয়ার্ড দেওয়া, ফোন ব্যবহারের সময় আশেপাশে কেউ এলে অস্বস্তি বোধ করা অথবা আড়ালে গিয়ে কথা বলা।
* মিথ্যা বলা: ছোটখাটো বিষয়েও যদি তিনি মিথ্যা বলতে শুরু করেন, তবে তা সন্দেহের কারণ হতে পারে। কীভাবে বুঝবেন স্বামী মিথ্যা বলছে:–স্বামী হয়তো আপনার সঙ্গে হাসিমুখে মিথ্যা বলছেন। তবে বাস্তবতা হলো, মানসিক চাপের প্রভাব পড়তে পারে মুখে। অস্বাভাবিকভাবে লালচে হয়ে যেতে পারে তার গাল। কিছু লক্ষণ দেখলে বুঝবেন আপনাকে মিথ্যা বলছে-১/ মিথ্যা বলার সময় অনেকেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হাত নেড়ে কথা বলে। ২/অনেক বেশি মাথা নাড়ানো। ৩/স্বাভাবিকের তুলনায় খুব বেশি দ্রুত কথা বলে অথবা খুব আস্তে, ভেবে ভেবে মিথ্যা বলে।
* সময়সূচীর পরিবর্তন: আগে নিয়মিত রুটিন থাকলেও হঠাৎ ঘন ঘন মিটিং, অফিসের কাজ বা অন্য কোনো অজুহাতে দেরিতে বাড়ি ফেরা বা রাতে বাইরে থাকা।
* আর্থিক অস্বচ্ছতা: ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা ক্রেডিট কার্ডের বিল লুকানো, নতুন কোনো অপ্রত্যাশিত খরচ বেড়ে যাওয়া অথবা হিসাব দিতে না চাওয়া।
* পোশাক-পরিচ্ছদ ও চেহারায় পরিবর্তন: হঠাৎ করে নিজের সৌন্দর্য ও পোশাকের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া, নতুন স্টাইল অনুসরণ করা বা অপ্রত্যাশিতভাবে নিজের যত্ন নেওয়া।
* মেজাজের পরিবর্তন: কারণ ছাড়াই খিটখিটে মেজাজ দেখানো, অতিরিক্ত রাগ করা অথবা অস্বাভাবিক নীরব থাকা। আবার কখনো কখনো অতিরিক্ত হাসিখুশি বা উৎফুল্ল থাকা।
* যোগাযোগে পরিবর্তন: আগেকার মতো স্বাভাবিকভাবে কথা না বলা, প্রশ্নের অস্পষ্ট উত্তর দেওয়া বা কথা বলার সময় এড়িয়ে যাওয়া।
* আগ্রহের পরিবর্তন/অবহেলা: আপনার প্রতি তার মনোযোগ কমে যাওয়া, বা আপনার সাথে আগের মতো সময় না কাটানোও একটি লক্ষণ।
* বন্ধুদের সাথে মেলামেশা কমে যাওয়া: আগে নিয়মিত বন্ধুদের সাথে দেখা করলেও হঠাৎ করে সেটি কমে যাওয়া বা তাদের সম্পর্কে কোনো কথা না বলা।
* শারীরিক দূরত্ব: স্ত্রীর প্রতি আগের মতো আবেগ বা আকর্ষণ অনুভব না করা, শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ কমে যাওয়া।
আত্মরক্ষামূলক হওয়া: ছোটখাটো বিষয়েও যদি তিনি আত্মরক্ষামূলক বা আক্রমণাত্মক হন, তবে তা পরকীয়ার একটি লক্ষণ হতে পারে। যদি আপনি কোনও নির্দোষ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন, যেমন তিনি দুপুরের খাবারে কি খেয়েছেন? তবুও সে রেগে যাবে।
নতুন কোন নাম:– আপনার স্বামীর মুখে যদি নতুন কোনো একটি নাম ঘন ঘন শুনতে পান, তবে একেও পরকীয়ার লক্ষণ হিসেবে নিতে পারেন। সঙ্গীর যে বন্ধুটির কথা আগে কখনো শোনেননি, এমন কারো কথা ঘনঘন শুনলে তাকে জিজ্ঞেস করুন এবং তার মুখের ভাব লক্ষ্য করুন।
* গাড়িতে বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের স্থানে অন্য কোনো মহিলার জিনিসপত্র বা গন্ধ পাওয়া।
* সামাজিক মাধ্যমে (যেমন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) অপরিচিত কারো সাথে অতিরিক্ত যোগাযোগ রাখা।
নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি হলে:–অনেক সময় অতিরিক্ত ইমোশনাল হয়ে যেতে পারে, যেমন হঠাৎ করেই বলে- ‘বৃষ্টি হচ্ছে’, ‘চাঁদ উঠেছে’ ইত্যাদি।
* অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার:যদি তিনি ফোন নিয়ে অতিরিক্ত সময় কাটান, বিশেষ করে আপনার সাথে থাকার সময়, তাহলে এটি একটি লক্ষণ হতে পারে মোবাইল ফোনে দীর্ঘক্ষণ ব্যস্ত থাকা এবং মেসেজ বা কল হিস্টোরি দ্রুত মুছে ফেলা।
স্ত্রী অনেক সময় অনুভব করেন:–স্বামী যেন বদলে গেছেন। আচরণ, মনোযোগ বা দৈনন্দিন ব্যবহারেও যেন আগের মতো নেই। এই পরিবর্তন যদি হঠাৎ ও ব্যাখ্যাতীত হয়, তবে কিছু লক্ষণ হতে পারে পরকীয়ার আভাস।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই লক্ষণগুলো অন্য কারণেও হতে পারে। তাই নিশ্চিত না হয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। সন্দেহ হলে সরাসরি এবং শান্তভাবে সঙ্গীর সাথে কথা বলুন। বিশ্বাস ভেঙে গেলে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য আলোচনা এবং উভয়ের চেষ্টা জরুরি।
আপনার স্ত্রী বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়াচ্ছেন কিনা বুঝবেন কিভাবে?
১। স্ত্রী যদি ফোন বা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েন
মোবাইল সবসময় পাসওয়ার্ড দিয়ে লক রাখা, ফোনের স্ক্রিন লুকিয়ে রাখা এবং হঠাৎ করে মেসেজ বা কল এলে দূরে গিয়ে কথা বলা। আপনার প্রিয় সঙ্গীটি ফোনের পেছনে কতটা সময় ব্যয় করছেন সেদিকে নজর রাখুন। আপনারা একসাথে থাকলে কিংবা ঘুরতে গেলে যদি তিনি ফোন নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, মেসেজ বা ইন্টারনেট ব্রাউজিং করেন- তাহলে তা নিশ্চিতভাবে অন্য একটি সম্পর্কেরই ইঙ্গিত। এছাড়া দিনের বেশিরভাগ সময়ে তাকে যদি ফোনালাপে ব্যস্ত পাওয়া যায় তাহলেও বিষয়টি লক্ষণীয়। শুধুমাত্র ফোন নয়, ফেসবুক কিংবা অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যমের প্রতি আসক্তির মাত্রার ওপরও নজর দেবেন।
২। তিনি যদি আপনার ও পরিবারের পেছনে কম সময় ব্যয় করেন
তিনি যদি আপনাকে আগের চাইতে কম সময় দেয়া শুরু করেন, তাহলে এটিও একটি লক্ষণ হিসেবে ধরে নেয়া যায়। খুব ভালো করে আপনার সঙ্গীর প্রতিদিনকার কাজকর্ম লক্ষ্য করুন। যদি বুঝতে পারেন যে আগের চাইতে কম সময় পাচ্ছেন, তাহলে বোঝার চেষ্টা করুন সেই বাড়তি সময়টা তিনি কীভাবে ব্যয় করছেন। আপনি তাকে সময় দেয়ার কথা বলে দেখুন, , তাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার আমন্ত্রন জানান, আত্মীয় স্বজনদের ও পারিবারিক বন্ধুদের সময় দেয়ার কথা বলুন। তিনি যদি আপনাকে অজুহাত দেখিয়ে না বলেন তাহলে জানার চেষ্টা করুন অজুহাতটি সত্যি কিনা। সঙ্গী যদি পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে বিনা কারণে, তাহলে ধরে নিতে পারেন তিনি পরকীয়ায় লিপ্ত।
৩। নতুন কোন নাম
কথাবার্তায় বা ফোনের চ্যাটে এমন কারও নাম বারবার আসা যা আগে কখনো শোনা যায়নি বা সে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাওয়া। আপনার সঙ্গীটির মুখে যদি নতুন কোন একটি নাম ঘন ঘন শুনতে পান, তবে একেও পরকীয়ার লক্ষণ হিসেবে নিতে পারেন। সঙ্গীর যে বন্ধুটির কথা আগে কখনো শোনেননি, এমন কারো কথা ঘনঘন শুনলে তাকে জিজ্ঞেস করুন এবং তার মুখের ভাব লক্ষ্য করুন। যদি তিনি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান, কিংবা তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায় তবে বিষয়টি অবশসই চিন্তার।
৪। অকারণে রেগে যাওয়া
আরও একটি বিষয় আছে যা বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়। তা হল আপনার সঙ্গীর কথায় রাগের সুর। খেয়াল করে দেখুন তো, আগে যে বিষয়গুলো আপনার সঙ্গীর রাগের উদ্রেক করতো না সেসব বিষয়ে কি তিনি রেগে যাচ্ছেন? কিংবা কথায় কথায় আপনাদের দাম্পত্য জীবনকে অভিশাপ হিসেবে অভিহিত করছেন? তার এসব কথার কোন যুক্তি আছে কিনা এইসব ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করুন। বিনা কারণে অযৌক্তিক রাগ করা, কিংবা সব সময় খিটখিট করা পরকীয়ার অন্যতম লক্ষণ। তবে আবার এই কথা নয়- আমি বলে তোমার সংসার করে গেলাম, অন্য কেউ তোমার সংসার রেখে কবেই চলে যেতো। এটা জাতিয় ডাইলগ।
৫। আপনার সাথে সেক্সুয়াল একটিভিতে উদাসীনতা
সঙ্গী যদি আপনার সাথে সেক্সুয়াল একটিভিতে নেতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন তাহলে আপনি এটি পরকীয়ার নিশ্চিত লক্ষন হিসেবে ধরতে পারেন। যিনি অন্যের সাথে সময় কাটিয়ে আপনার প্রতি উদাসীন, তার মুখের অভিব্যক্তিই আপনাকে সব কথা বলে দেবে। আপনার সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সঙ্গী আগ্রহী নন, অর্থাৎ তার চাহিদাটি পূরণ হচ্ছে অন্য কারো মাধ্যমে। এছাড়াও অভ্যাস বশত যৌন সম্পর্ক করছেন কিনা স্রেফ আপনাকে খুশি করতে, সেটিও লক্ষ্য করুন।
৬। আপনার প্রতিদিনের রুটিন খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করা
এছাড়া খেয়াল করে দেখুন তিনি আপনার প্রতিদিনকার রুটিন সম্পর্কে হঠাৎ অতিরিক্ত নজর দিচ্ছেন কিনা অর্থাৎ আপনি কয়টায় বাড়ি ফিরবেন বা কোন কোন জায়গায় কখন যাবেন এই ধরনের প্রশ্ন করছেন কিনা। তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনার চোখ এড়িয়ে নিরাপদে সম্পর্ক চালিয়ে যেতেই তার এত জিজ্ঞাসা।
৭। তিনি যদি হঠাৎ নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে উঠেন
আপনারস্ত্রী যদি হঠাৎ করে নিজের পোশাক-আশাক, রূপচর্চা, পারফিউম কিংবা ফিটনেসের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া। হঠাৎ নিজের ত্বক, সাজগোজ, শারীরিক গঠন কিংবা পরিহিত পোশাক আশাকের দিকে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে শুরু করেন, তাহলে আপনি একে পরকীয়ার একটি লক্ষণ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। এখানে একটি বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া দরকার যে সঙ্গী আপনার জন্যই নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছেন কিনা। কারন অনেক স্বামী-স্ত্রীই আছেন যারা দাম্পত্য জীবনে পুনরায় রোমান্স ফিরিয়ে আনতে এই পন্থা বেছে নেন। কিন্তু আপনি এই দ্বিধাবোধের অবসান করতে পারেন নিজেকে দুই থেকে তিনটি প্রশ্ন করে। আর তা হল, আপানার সঙ্গী কি আপনার পছন্দ অনুযায়ী নিজেকে উপস্থাপন করছেন? তিনি কি শুধুমাত্র আপনাকে দেখানর জন্যই বিশেষ পোশাক ও সাজগোজ করেন? আমাকে কেমন দেখাচ্ছে এই ধরনের প্রশ্ন আপনাকে করা হচ্ছে কিনা সেটাও লক্ষ্য করুন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি “না” হয়, তাহলে আপনি ধরে নিতে পারেন আপনার সঙ্গী পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িত আছেন।
৮. খিটখিটে মনোভাব ও তুচ্ছ বিষয়ে বিরক্তি:
বিনা কারণে অযৌক্তিক রাগ করা, দোষ চাপানো এবং কথায় কথায় তুলনা করা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: এই লক্ষণগুলো অন্য কারণেও হতে পারে। তাই নিশ্চিত না হয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা উচিত নয়। সন্দেহ হলে সরাসরি এবং শান্তভাবে সঙ্গীর সাথে কথা বলুন। বিশ্বাস ভেঙে গেলে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য আলোচনা এবং উভয়ের চেষ্টা জরুরি।
২য় পর্বঃ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক: প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলাম মানব জাতির পরিপূর্ণ জীবন বিধান। সকল সমস্যার সুন্দর সমাধান রয়েছে ইসলামে। তাই পরিবার বিধ্বংসী পরকীয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ইসলামে রয়েছে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা। নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করার মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজেকে পরকীয়া থেকে বাঁচাতে পারেন।-
১. আল্লাহকে ভয় করা :
পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো অন্তরে আল্লাহভীতি (তাকওয়া) ও পরকালের জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি করা। মানুষ যখন বিশ্বাস করবে যে সে যেখানেই থাকুক আল্লাহ তাকে দেখছেন— إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষণকারী’। (সূরা নিসা, আয়াত- ১) এই প্রকৃত আল্লাহভীতি মানুষকে সকল প্রকার পাপাচার থেকে বিরত রাখতে পারে। আবূ যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন,اتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ، ‘তুমি যখন যেভাবে থাকবে, আল্লাহকে ভয় করবে। কোন পাপ কাজ হয়ে গেলে সাথে সাথেই ভালো কাজ করবে। কারণ ভালো কাজ পাপকে মুছে দিবে। আর মানুষের সাথে সদাচরণ করবে’। (জামে‘ আত-তিরমিজি: হাদিস ১৯৮৭)
এক্ষেত্রে পরকীয়ার দুনিয়াবী শাস্তির পাশাপাশি পরকালীন শাস্তির কথা স্মরণে রাখতে হবে এবং সৎপথে অবিচল থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। অতএব মুমিন পুরুষ-নারীদের উচিত কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন যাপন করা।
২. অপসংস্কৃতি / অশ্লীল বিনোদন পরিহার করা :
পরকীয়া রাতারাতি রূপ নেওয়া অপরাধ নয়; অনেক সময় তা গোপনে গোপনে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। আর এক্ষেত্রে অপসংস্কৃতি যেমন— বেহায়াপনা, দুর্নীতি, অবাধ পরকীয়া পরপুরুষ এবং পরনারীকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করা, অশ্লীল গান-বাজনা, অশালীন পোশাক ও আচরণ, সামাজিক মাধ্যমে অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত মেলামেশা, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি, গোপন আড্ডা ও আবেগ আদান-প্রদান ইত্যাদি প্রসঙ্গকে নাটক-সিনেমা বা সামাজিক মাধ্যমে রোমাঞ্চকর বা স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা— এসব মানুষের চিন্তা-চেতনায় ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে। দেশি-বিদেশি কিছু চ্যানেল আছে যাদের কাজই হলো এগুলোকে স্বাভাবিক করা অথচ ইসলাম সবকিছুর পবিত্রতা রক্ষার জন্য শুরুতেই সতর্ক করেছে।
অপসংস্কৃতি প্রথমে চোখকে আকর্ষণ করে, মন-চিন্তাকে পরিবর্তন করে, নৈতিক চিন্তাকে দুর্বল করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে এমন পথে নিয়ে দাঁড় করায় যা অত্যন্ত অনুশোচনীয়।
৩। বিবাহের পূর্বে পরস্পর দেখাদেখি ও ছেলে–মেয়েদের সম্মতিতে বিয়ে দেয়া:
পরকীয়ার আর একটি কারণ হ’ল, ছেলে-মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের অমতে বিয়ে দেওয়া। অভিভাবকরা নিজেদের কথা ভাবেন এবং অনেক তাড়াহুড়া করে তাদের সন্তানদের বিয়ে দেন। কিন্তু ছেলে-মেয়ের পছন্দ বা মতামতকে অনেক ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেন না। ফলে এসব ছেলে-মেয়েদের বিবাহিত জীবন সুখের হয় না। ছেলে-মেয়ে প্রথমে মেনে নিলেও পরে তাদের মধ্যে পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি হয়। পরিবারের ভয়ে কিছু না বললেও এক সময় তারা উভয়ে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইসলামী শরীয়ায় নারী – পুরুষ উভয়ের মতামতের ভিত্তিতে বিবাহ সম্পন্ন হওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি প্রথমে নারীর অনুমতি গ্রহণ করা বাধ্যতামুলক করেছে।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলল, আমি আনছারদের এক মেয়েকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক। তিনি বললেন, ‘তুমি তাকে প্রথমে দেখে নাও। কারণ আনছার মহিলাদের চোখে দোষ থাকে। (মুসলিম হা/১৪২৪; মিশকাত হা/৩০৯৮)
তিনি আরো বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোন পাত্রীকে প্রস্তাব দিবে সম্ভব হ’লে সে যেন পাত্রীকে দেখে নেয়। যা বিবাহের জন্য সহায়ক হবে’। (আবুদাঊদ হা/২০৮২; মিশকাত হা/৩১০৬; ছহীহাহ হা/৯৯) তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের কেউ কোন নারীর প্রতি বিয়ের প্রস্তাব প্রদানের পর তাকে দেখলে কোন গুনাহ হবে না, যদিও তার অজান্তেই দেখে’ । (মুসনাদে আহমাদ হা/২৩৬৫০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৯৭।) অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘পাত্রী দর্শনে পরস্পরে মহববত সৃষ্টি হয়’।
৪. বিয়েতে সমতা রক্ষা করা :
বিয়েতে বর ও কনের মধ্যে সমতা বা সাদৃশ্য রাখার দিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। বয়স, সম্পদ, দ্বীনদারী, বংশমর্যাদা ও আর্থিক দিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমতা হ’লে দাম্পত্য জীবন সুন্দর হয়। আর দাম্পত্য জীবন সুখের হ’লে পরকীয়া থেকে দূরে থাকা সহজ হয়। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, تَخَيَّرُوْا لِنُطَفِكُمْ وَانْكِحُوا الأَكْفَاءَ وَأَنْكِحُوْا إِلَيْهِمْ. ‘তোমরা ভবিষ্যত বংশধরদের স্বার্থে উত্তম মহিলা গ্রহণ কর এবং সমতা (কুফূ) বিবেচনায় বিবাহ কর, আর বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো’। [ইবনু মাজাহ হা/১৯৬৮; ছহীহাহ হা/১০৬৭।]
৫. বিয়ের পর মানিয়ে নেওয়া :
দু’টি ভিন্ন পরিবারের দু’জন ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিবাহের পর দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সাথী হয়তো অনেকই পান না। ফলে তারা অধৈর্য হয়ে যান, আবার বিভিন্ন চাপে বিবাহ বিচিছন্নও করতে পারেন না। অথচ ইসলাম এক্ষেত্রে মানিয়ে নেওয়া ও ছাড় দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,فَإِنْ كَرِهْتُمُوْهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوْا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيْرًا، ‘যদি তোমরা তাদের অপসন্দ কর, (তবে হ’তে পারে) তোমরা এমন বস্ত্তকে অপসন্দ করছ, যার মধ্যে আল্লাহ প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন’ (নিসা ৪/১৯)। তাই স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য হবে দুনিয়ার অল্প সময় ও আখেরাতের দীর্ঘস্থায়ী নে‘মতের দিকে লক্ষ্য রেখে যেকোন বিষয়ে ছাড় দিয়ে মানিয়ে নেওয়া। এতে পরকীয়া থেকে বাঁচা যাবে।
৬. পরিবারে ইসলামী শিক্ষার ব্যবস্থা থাকা :
পরিপূর্ণ ইসলামী পরিবেশ ও ইসলামী শিক্ষা পরকীয়ার মত পরিবার বিধ্বংসী পাপ থেকে নারী-পুরষকে রক্ষা করতে পারে। ইসলামী শিক্ষা, পর্দা প্রথা, দৃষ্টি নিমণগামী রাখার নির্দেশ, বিনা প্রয়োজনে মাহরাম থেকে দূরে থাকার বাস্তবধর্মী আমলগুলোই মানুষকে পরকীয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। পরিবারে কুরআন-হাদিসের তালিম-তারবিয়াত থাকতে হবে। (আমাদের একাডেমীর তাফসীর ক্লাসে যুক্ত থাকতে পারেন)
৭. পরস্পরকে ক্ষমা করা, ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করা ও সংশোধন করে দেওয়া :
ছোট ছোট বিষয়ে মনোমালিন্য, ঝগড়া-বিবাদ থেকেই পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম হয়। ফলে একটু সুখের আশায় মানুষ পরকীয়ার দিকে পা বাড়ায়। এজন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছোট-খাটো ভুল-ক্রটিগুলো ক্ষমা করে পরস্পরকে সংশোধন করে দিতে হবে।
৮. ঝগড়া-বিবাধ থেকে দূরে থাকা :
ঝগড়া-বিবাদ থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একজন অন্যজনকে পর ভাবতে থাকে। আর শয়তান এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরকীয়ার দিকে ধাবিত করে। শয়তানের কাজ হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া বাধিয়ে দেওয়া। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ইবলীস (শয়তান) সমুদ্রের পানির উপর তার সিংহাসন স্থাপন করে। অতঃপর মানুষের মধ্যে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার জন্য সেখান থেকে তার বাহিনী চারদিকে প্রেরণ করে। এদের মধ্যে সে শয়তানই তার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত যে শয়তান মানুষকে সবচেয়ে বেশী ফিতনায় নিপতিত করতে পারে। তাদের মধ্যে একজন ফিরে এসে বলে, আমি এরূপ এরূপ ফিতনা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করেছি। তখন ইবলীস বলে, তুমি কিছুই করনি। রাসূল (ছাঃ) বলেন, অতঃপর এদের অপর একজন এসে বলে, আমি মানব সন্তানকে ছেড়ে দেইনি, এমনকি দম্পতির মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিয়েছি। শয়তান এ কথা শুনে তাকে নিকটে বসায় আর বলে, তুমিই উত্তম কাজ করেছ। বর্ণনাকারী আ‘মাশ বলেন, আমার মনে হয় জাবের (রাঃ) এটাও বলেছেন যে, ‘অতঃপর ইবলীস তার সাথে আলিঙ্গন করে’। [মুসলিম হা/২৮১৩; ছহীহাহ হা/৩২৬১; ছহীহুত তারগীব হা/২০১৭; আহমাদ হা/১৪৩৭৭।]
৯. পরিপূর্ণ পর্দা করা :
পরকীয়া থেকে বাচাঁর অন্যতম উপায় হ’ল পরিপূর্ণ পর্দা মেনে চলা। বেপর্দা হয়ে চলাচলের কারণে একে অন্যের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, নিজেদের মধ্যে অবৈধ ভাব বিনিময় হয়, স্বামী-স্ত্রীর দুর্বল দিক নিয়ে কথা হয় এবং পরবর্তীতে পরকীয়ার দিকে ধাবিত হয়। মুসলিম মহিলাদের উপর পর্দা ফরয করে মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِيْنَ يُدْنِيْنَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللهُ غَفُوْرًا رَحِيْمًا، ‘হে নবী! তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিনা স্ত্রীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের বড় চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (আহযাব ৩৩/৫৯)।
১০. গায়র মাহরাম থেকে দূরে থাকা:
মাহরাম নয়, এমন পরপুরুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ না রাখা। কেননা চারিত্রিক নির্মলতা ও মানসিক পবিত্রতা রক্ষায় এটি খুবই যরূরী। শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে। [আবু দাউদ হা/৪৭১৯; ছহীহুল জামে‘ হা/১৬৫৮।] কোন গায়র মাহরাম মহিলার সাথে একাকী অবস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে অশ্লীল কাজে লিপ্ত করা শয়তানেরই কাজ। এজন্যই শরী‘আত উক্ত রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ، ‘কোন পুরুষ একজন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হ’লে তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয় শয়তান’। [তিরমিযী হা/১১৭১; মিশকাত হা/৩১১৮।] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يَدْخُلَنَّ رَجُلٌ بَعْدَ يَوْمِى هَذَا عَلَى مُغِيْبَةٍ إِلاَّ وَمَعَهُ رَجُلٌ أَوِ اثْنَانِ ‘আমার আজকের এই দিনের পর থেকে কোন পুরুষ একজন বা দু’জন পুরুষ সঙ্গী ব্যতীত কোন স্বামী থেকে দূরে থাকা মহিলার সাথে নির্জনে দেখা করতে পারবে না’। [মুসলিম হা/২১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৮১।]
১১. প্রয়োজন ছাড়া গায়র মাহরামের সাথে সাক্ষাৎ না করা :
স্বামীর বা নিজের নিকটাত্মীয় তথা দেবর, ভাসুর, চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো ও খালাতো ভাই, ভগ্নিপতি (দুলাভাই) বেয়াই প্রভৃতি ব্যক্তিদেরকে নিজ ঘরে প্রবেশের সুযোগ না দেয়া। বিনা প্রয়োজনে তাদের সাথে যোগাযোগ বা দেখা-সাক্ষাৎ না করা। একান্ত প্রয়োজন হ’লে পূর্ণ পর্দার সঙ্গে সামনে না এসে আড়াল থেকে কথা বলা। সামনাসামনি হ’লে দৃষ্টি নিন্মগামী রাখা। আল্লাহ বলেন,قُلْ لِلْمُؤْمِنِيْنَ يَغُضُّوْا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللهَ خَبِيْرٌ بِمَا يَصْنَعُوْنَ، ‘তুমি মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্রতর। নিশ্চয়ই তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবহিত’ (নূর ২৪/৩০)। মহানবী (ছাঃ) বলেন, زِنَا الْعَيْنِ النَّظَرُ ‘চোখের যিনা দৃষ্টিপাত করা’। [বুখারী হা/৬২৪৩; মুসলিম হা/২৬৫৭; মিশকাত হা/৮৬] পরকীয়া থেকে বাঁচতে পুরুষদের ন্যায় মহিলারাও বেগানা পুরুষের পানে কুমতলবে তাকাবে না। আল্লাহ বলেন,وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ‘আর তুমি মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান সমূহের হেফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে যেটুকু বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পায় সেটুকু ব্যতীত’ (সূরা নূর ২৪/৩১)।
১২. দূরবর্তীর সফরে সাথে মাহরাম থাকা :
চাকুরী, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদি কারণে দূরে কোথাও যাতায়াতকালে গায়র মাহরাম নারী পুরুষ একসাথে চলাফেরা করে, পরস্পর কথা-বার্তা বলে থাকে। ইসলাম এটাকে হারাম করেছে। জাবীর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تَلِجُوا عَلَى الْمُغِيبَاتِ فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَجْرِى مِنْ أَحَدِكُمْ مَجْرَى الدَّمِ. قُلْنَا وَمِنْكَ قَالَ وَمِنِّى وَلَكِنَّ اللهَ أَعَانَنِى عَلَيْهِ فَأَسْلَمُ. ‘যাদের স্বামী অনুপস্থিত, সে সকল মহিলাদের নিকট তোমরা যেও না। কেননা শয়তান তোমাদের প্রত্যেকের শিরা-উপশিরায় বিচরণ করে। আমরা বললাম, আপনার মধ্যেও কি? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমার মধ্যেও। কিন্তু আমাকে আল্লাহ সাহায্য করেছেন, তাই আমি নিরাপদ’।[তিরমিযী হা/১১৭২; মুসনাদ আহমাদ হা/১৪৩২৪।]
পরকীয়া থেকে বাঁচতে দূরের সফর হ’লে অবশ্যই স্বামী অথবা মাহরাম সাথে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلاَّ مَعَ ذِى مَحْرَمٍ، وَلاَ يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلاَّ وَمَعَهَا مَحْرَمٌ، ‘ মহিলারা মাহরাম (যার সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ) ব্যতীত অন্য কারো সাথে সফর করবে না। মাহরাম কাছে নেই এমতাবস্থায় কোন পুরুষ কোন মহিলার নিকট গমন করতে পারবে না’। [বুখারী হা/১৮৬২; মুসলিম হা/১৩৪১] তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে এমন কোন মহিলার জন্য বৈধ নয় যে, সে তার পিতা, পুত্র, স্বামী, ভাই অথবা কোন মাহরাম পুরুষ ছাড়া তিন দিন বা তার বেশী দূরত্বে সফর করে’। [মুসলিম, আবু দাউদ হা/১৭২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৭৬৫০] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ ثَالِثُهُمَا، ‘কোন মহিলার সাথে কোন পুরুষ নির্জনে একত্রিত হ’লে তাদের সাথে তৃতীয়জন হয় শয়তান’। [তিরমিযী হা/১১৭১; মুসনাদে আহমাদ হা/১১৪] মহিলারা একাকী সফরের কারণে অনেক সময় শ্লীলতাহানির শিকার হয়। চলন্ত বাসে বা গাড়ীতে ধর্ষণের শিকার হয়। বখাটের ইভটিজিং-এর শিকার এবং শারীরিক ও মানসিক যৌনতার শিকার হয়।
১৩। অবৈধ সম্পর্ক থেকে বাঁচতে দৃষ্টি সংযত রাখা।
অবৈধ সম্পর্ক বা পরকীয়া অনেক সময় হঠাৎ করে তৈরি হয় না। একটি অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি, এরপর আকর্ষণ, কল্পনা, অতিরিক্ত যোগাযোগ এভাবে ধীরে ধীরে মানুষ এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ইসলাম শুরুতেই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা বন্ধ করতে বলেছে— দৃষ্টি সংযত করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। (সূরা আন-নূর -৩০)
পরের আয়াতে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। (সূরা আন- নূর – ৩১)। অর্থাৎ ইসলাম শুধু অবৈধ সম্পর্কের শেষ পর্যায়কে নিষেধ করেনি, বরং সেই পথে নিয়ে যেতে পারে এমন প্রাথমিক কারণগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করতে শিক্ষা দিয়েছে। অন্য আরেক হাদিসে নবী (সা:) বলেছেন— চোখের যিনা হল দৃষ্টি দেয়া – فَزِنَا الْعَيْنِ النَّظَرُ ‘চোখের ব্যভিচার হলো দৃষ্টি। (বুখারী- ৬২৪৩)
আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা যায় যে, দৃষ্টি ও মনোযোগ মানুষের আকর্ষণ, চিন্তা এবং আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো আকর্ষনীয় উদ্দীপকের দিকে বারবার মনোযোগ দিলে সেটি নিয়ে চিন্তা ও মানসিক আসক্ততা গড়তে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বারবার একই ধরনের আকর্ষনীয় ছবি বা ভিডিও দেখা— এটি attention loop তৈরি করতে পারে: এজন্য পরকীয়া থেকে বাঁচতে চোখের হিফাযতের কোন বিকল্প নেই।
১৪. বিবাহ বৈধ এমন কারো দেহে স্পর্শ না করা :
পরকীয়ার একটি ধাপ হ’ল, পর নারী-পুরুষ একে অপরকে স্পর্শ করা। ইসলাম এটাকে হারাম করেছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,لأَنْ يُطْعَنَ في رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لاَ تَحِلُّ لَهُ، ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কারো মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ঐ মহিলাকে স্পর্শ করা থেকে অনেক শ্রেয়, যে তার জন্য হালাল নয়’। [ছহীহুত তারগীব হা/১৯১০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২২৬।] নিঃসন্দেহে এটা হাতের যিনা। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَالْيَدَانِ تَزْنِيَانِ وَالرِّجْلاَنِ تَزْنِيَانِ وَالْفَرْجُ يَزْنِى، ‘দু’চোখ যিনা করে, দু’হাত যিনা করে, দু’পা যিনা করে এবং লজ্জাস্থানও যিনা করে’। [আহমাদ হা/৩৯১২; ছহীহুল জামে‘ হা/৪১২৬।] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে অধিক পবিত্র মনের মানুষ আর কে আছে? অথচ তিনি বলেছেন, إِنِّى لاَ أُصَافِحُ النِّسَاءَ ‘আমি নারীদের সাথে মুছাফাহা করি না’। [আহমাদ হা/২৭৫৩; ছহীহাহ হা/২৫০৯।]
তিনি আরও বলেছেন, إِنِّيْ لاَ أَمُسُّ أَيْدِيَ النِّسَاءِ ‘আমি নারীদের হাত স্পর্শ করি না’।[তাবারাণী কাবীর, ২৪/৩৪২; ছহীহুল জামে‘ হা/৭১৭৭।] মা আয়েশা (রাঃ) বলেছেন,لاَ وَاللهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ، غَيْرَ أَنَّهُ بَايَعَهُنَّ بِالْكَلاَمِ، ‘আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাত কখনই কোন বেগানা নারীর হাত স্পর্শ করেনি। তিনি মৌখিক বাক্যের মাধ্যমে তাদের বায়‘আত নিতেন’।[বুখারী হা/৫২৮৮; মুসলিম হা/১৮৬৬।]
১৫. আকর্ষণীয় কণ্ঠে কথা না বলা :
পরপুরুষের সাথে নারীর প্রগল্ভতার সাথে কিংবা আকর্ষণীয় কণ্ঠে কথোপকথন করাও ব্যভিচারের পথসমূহের অন্যতম ছিদ্রপথ। পরকীয়া থেকে বাচঁতে হ’লে প্রয়োজনীয় কথা বলার ক্ষেত্রে মহিলাদের মোহনীয় কন্ঠ পরিহার করতে হবে, যাতে দুর্বল হৃদয়ের মানুষগুলো আকৃষ্ট না হয়। এ বিষয়ে সাবধান করে আল্লাহ বলেন,يَانِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِيْ فِيْ قَلْبِهِ مَرَضٌ، ‘হে নবীপত্নীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না। তাহ’লে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়ে পড়বে’ (আহযাব ৩৩/৩২)। মহান আল্লাহ নারীদের কণ্ঠকে কোমল করে সৃষ্টি করেছেন। তাদের মিষ্টি কথায় কোন কোন পুরুষের মনে যৌনানুভূতি জাগ্রত হ’তে পারে। তাই পরপুরুষের সাথে মোলায়েম কণ্ঠ পরিহার করে কেবল জরূরী কথা বলবে।
১৬. পরিবারের সাথে থাকা :
আজকাল বিভিন্ন কারণে নারী-পুরুষ আলাদা থাকে। ফলে শয়তানের কুমন্ত্রণা ও কু-প্রবৃত্তির তাড়নায় তারা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে যাদের স্বামী দূরে অবস্থান করে তাদের সাথে পরপুরুষ একাকী হবে না। সন্তানদের সঙ্গে রাখবে। সন্তান না থাকলে মা, বোন, ভাগ্নী-ভাতিজী, ননদ, শাশুড়ী, পিতা, আপন ভাই কিংবা নিকটাত্মীয় নারীদের সঙ্গে থাকবে। স্বামী-স্ত্রী কোন কারণে একত্রে থাকা সম্ভব না হ’লে নিয়মিত নফল ছিয়াম পালন, কুরআন তেলাওয়াত, সীরাতুর রাসূল, ছাহাবী চরিত ও ইসলামী বই-পুস্তক বেশী বেশী পাঠ করা এবং পারিবারিক ও অন্যান্য কাজকর্মে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা।
১৭. স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের আমানত রক্ষা করা:
স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কের ব্যাপারে সাবধান থাকবে ও নিজের সতীত্ব হেফাযতের মাধ্যমে আমানত রক্ষা করবে, কোনভাবেই খেয়ানত করবে না। তাই সে কোন পরপুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত করবে না। সে পরপুরুষের সাথে সম্মোহনী কথা বলবে না এবং অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত হবে না। সে স্বামী বা অভিভাককে ধোঁকা দিয়ে পরপুরুষের সাথে সাক্ষাত করবে না। বস্ত্তত এসব কাজ তার দ্বীন-ধর্ম ও ইয্যত-আব্রুকে কদর্য করে দেয়। সুতরাং স্বীয় চোখের দৃষ্টি অবনমিত করা, গলার আওয়াজ নীচু করা এবং স্বীয় যবান ও হাতকে অন্যায়, অশ্লীলতা ও কদর্যতা থেকে হেফাযত করা অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَاحَفِظَ اللهُ ‘অতএব সতী-সাধ্বী স্ত্রীরা হয় অনুগত এবং আল্লাহ যা হেফাযত করেছেন, আড়ালেও (সেই গুপ্তাঙ্গের) হেফাযত করে’ (নিসা ৪/৩৪)।
১৮. উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে পরস্পরে আলোচনা করা ও সমাধানের চেষ্টা করা :
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হ’লে, অবিশ্বাস সৃষ্টি হ’লে, কারো প্রতি সন্দেহ হ’লে পরস্পর খোলামেলা আলোচনা করা ও সমাধানের চেষ্টা করা। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের পরিবারের সদস্যদের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে। আল্লাহ বলেন,
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللهُ بَيْنَهُمَا إِنَّ اللهَ كَانَ عَلِيمًا خَبِيرًا،
‘আর যদি তোমরা (স্বামী-স্ত্রী) উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের আশংকা কর, তাহ’লে স্বামীর পরিবার থেকে একজন ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত কর। যদি তারা উভয়ে মীমাংসা চায়, তাহ’লে আল্লাহ উভয়ের মধ্যে (সম্প্রীতির) তাওফীক দান করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও তোমাদের সবকিছু অবগত’ (নিসা ৪/৩৫)। এক্ষেত্রে পারিবারিক বৈঠকের বিকল্প নেই। পরিবারের সকল সদস্য যদি সপ্তাহে নির্দিষ্ট একদিন তাদের পরিবার নিয়ে আলোচনা করেন তাহ’লে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে।
১৯। স্বামী স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতা।
পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায় এমন কিছু টিপস গ্রহণ করতে স্বামী-স্ত্রীকে ইসলাম আদেশ দিয়েছে। যেমন স্বামী-স্ত্রী মাঝেমধ্যে একই পাত্র থেকে আহার গ্রহণ করা, একে অপরের মুখে লোকমা উঠিয়ে দেয়া। আম্মাজান আয়েশা (রা.) গ্লাসের যে অংশে মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন হুজুর (সা.) ও সেই অংশে নিজের মুখ লাগিয়ে অবশিষ্ট পানি পান করতেন।
গোশতের হাড্ডির যে অংশ থেকে দাঁত দ্বারা কামড়ে খেতেন নবীজি (সা.) ও সে অংশে মুখ রেখে অবশিষ্ট গোশত কামড়িয়ে খেতেন। এটাই স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার শিক্ষা। স্বামীকে কোনো বিষয়ে চিন্তিত দেখলে তার পাশে বসা, তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়া ও তাকে সাহস যুগানো স্ত্রীর অন্যতম একটি দায়িত্ব। আম্মাজান খাদিজা (রা.) রাসুলের দুঃখের সময় তার পাশে ছিলেন। তাকে সাহস যুগিয়েছেন। অভয় বাণী শুনিয়েছেন।
রান্না-বান্না ও সাংসারিক কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করা স্বামীর দায়িত্ব। এতে স্ত্রীর মনে স্বামীর প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেবে পরকীয়া রোধের সবচেয়ে বড় উপায় হলো হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সময় দেয়া, কিছু সময় একান্তে কাটানো, পরস্পর খোশগল্প করা, রোমান্টিক কথাবার্তা বলা, ভালোবাসার আদান-প্রদান করা। একে অপরকে সুখ-দুঃখ শেয়ার করা। সংসারের আয়-উন্নতি, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পর আলোচনা করা। অফিসে থাকা অবস্থায় মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা বলা তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করা- মোটকথা স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সম্পর্ককে দৃঢ় ও মজবুত করা, নিজেদের শারীরিক কিংবা মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ না দেয়া।
২০। স্বামী/স্ত্রীকে খারাপ সঙ্গ থেকে বিরত রাখা।
পরকীয়া ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক থেকে নিজেকে/জীবনসঙ্গীকে রক্ষা করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো অসৎ সঙ্গীদের থেকে বিরত থাকা। কারণ মানুষ তার সঙ্গীদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। একটি বিখ্যাত হাদিসে নবী (সা:) ভালো ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ দিতে গিয়ে আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের সাথে তুলনা করেছেন। ভালো সঙ্গী মানুষের জীবন কল্যাণের সুবাস ছড়ায়, আর মন্দ সঙ্গী ক্ষতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। কস্তুরী বহনকারী হয়তো তোমাকে কিছু উপহার দেবে, অথবা তুমি তার কাছ থেকে তা কিনবে। (সহীহ বুখারী- ৫৫৩৪)
তাই যে ব্যক্তি পরকীয়া, অশালীনতা, অবৈধ সম্পর্ক ও অপসংস্কৃতিকে স্বাভাবিক মনে করে— তার সঙ্গ থেকে দূরে থাকা এবং যারা সালাত আদায়কারী, চরিত্রবান, পরিচ্ছন্ন ও আল্লাহকে ভয় করে তাদের সঙ্গ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সৎ সঙ্গের সাথে চললে তারা বিপদের সময় সতর্কতা দেবে, ভুলের থেকে পা বাড়ালে বাধা প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও পরকালের স্মরণে ফিরিয়ে দেবে। এজন্য আল্লাহ তাআলা বলেন: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। (সূরা তাওবা- ১১৯)
২১। শাস্তির বিধান সম্পর্কে সতর্ক করা।
নৈতিক অবক্ষয়জনিত বিভিন্ন অপরাধের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করলে এবং সতর্ক করলে এ অবক্ষয় দূর হবে। আল্লাহ বলেন—
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ ۖ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِر وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَِ
ব্যভিচারিণী নারী বা ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশতটি করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সূরা নূর, আয়াত – ০২)
২২। দাম্পত্য জীবনে কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করা ।
এ ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে মহান আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا ۖ وَلَا تَعْضُلُوهُنَّ لِتَذْهَبُوا بِبَعْضِ مَا آتَيْتُمُوهُنَّ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرً
তোমরা তাদের সাথে সৎ ভাবে জীবন যাপন করো তারপর তোমরা যদি তাদের অপছন্দ কর, তবে এমন হতে পারে যে, তোমরা এরূপ জিনিসকে অপছন্দ করছ যাতে আল্লাহ প্রভুত কল্যাণ রেখেছেন। (সূরা নিসা- ১৯)
স্ত্রীর একটি গুণ অপছন্দ হলেও অন্য গুনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ কোন মমিন পুরুষ যেন কোন মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে তার কোন একটি স্বভাব অপছন্দ হলেও অন্য কোন স্বভাব পছন্দ হবে। (মুসলিম-১৪৬৯) স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ করার শ্রেষ্ঠ আচরণ। হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে উত্তম আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম। (তিরমিজি-৩৮৯৫)
আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা: মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা যদি আমার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো তাহলে আমি তোমাদেরকে যে নিয়ামত দিয়েছি তা বাড়িয়ে দেব আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে কঠিন শাস্তি দিয়ে তোমাদেরকে গ্রেফতার করবো। (সূরা ইব্রাহীম-৯)
২৩। পোশাকের শালীনতার বিষয়ে প্রেষণা।
পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও মূল্যবোধের একটি বাহ্যিক প্রকাশ। ইসলামে পোশাকের উদ্দেশ্য শুধু শরীর আবৃত করা নয়; বরং লজ্জাশীলতা, আত্মমর্যাদা, শালীনতা ও আল্লাহভীতির পরিচয় বহন করাও এর গুরুত্বপূর্ণ দিক। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَىٰ ذَٰلِكَ خَيْرٌ
অর্থ: “হে আদমসন্তান! আমি তোমাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং সৌন্দর্যস্বরূপ; আর তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম।” সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:২৬
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আপনি মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযুক্ত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে এবং তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশ থাকে তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে আর তারা যেন তাদের চাদর স্বীয় বক্ষের ওপর জড়িয়ে রাখে। আর তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য কারো কাছে প্রকাশ না করে।
২৪। দাম্পত্য জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারনা রাখা।
আল্লাহ প্রদত্ত একটি নিয়ামত ও আমানত: মহান আল্লাহ বলেন, وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকে স্ত্রীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া। নিশ্চয় এতে ওই সকল লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা গভীরভাবে চিন্তা করে। (সূরা রুম-২১) এ আয়াতে দাম্পত্য জীবনের তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্যে পাওয়া যায় এক: সাকিনা অর্থাৎ প্রশান্তি দুই: মাওয়াদ্দাহ অর্থাৎ ভালোবাসা তিন: রহমাহ অর্থাৎ দয়া।
রাসুল (সঃ) স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণের ব্যাপারে বলেছেন, أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ ঈমান ও উত্তম চরিত্রের পরিচয় এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন “মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সে, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীদের প্রতি উত্তম। (তিরমিজি ১১৬২)
২৫। সালাতের প্রশিক্ষণ, নেকের ইবাদত ও আমলে অভ্যস্ত হওয়া।
একজন মুসলমানের উপর মহান আল্লাহর প্রথম ও প্রধান আদেশ হলো সালাত আদায় করা। বালিগ মুসলিম নর-নারী সকলকে সালাত আদায় করতে হয়। এমনকি ভীষণ অসুস্থতা, যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ চলাকালেও সালাত ত্যাগ করার অনুমতি নেই। বস্তুত সালাত হলো আল্লাহর সাথে বান্দার মুখোমুখি কথোপকথন। সালাত সব অনাচার ও অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে পারে। আল্লাহ বলেন: إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ
নিশ্চয় নামাজ অশ্লীল ও অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখে।( সূরা আনকাবুত – আয়াত- ৪৫)
২৬। আল্লাহর সম্পর্কে বিশ্বাস দৃঢ় করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন— أَلَمْ يَعْلَمْ بِأَنَّ اللَّهَ يَرَىٰ “সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখছেন?” (সূরা আল-আলাক, আয়াত ১৪) পরকীয়ার একটি বিপজ্জনক দিক হলো, অনেক সময় মানুষ মনে করে, পরিবার জানে না, কেউ দেখছে না, তাই বিষয়টি গোপনই থাকবে। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও আল্লাহর জ্ঞান থেকে কিছুই গোপন নয়। আল্লাহর স্মরণ মানুষকে শুধু মানুষের ভয়ে নয়, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও জবাবদিহির অনুভূতি থেকে পাপ বর্জন করতে শেখায়।
২৭। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সতর্ক করা:
সমাজে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পরকীয়া সম্পর্ক। যুবক থেকে বৃদ্ধ সব মহলেই এর আগ্রাসন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। বেলজিয়ামের মনস্তাত্ত্বিক এস্থার পেরেল তাঁর ‘দ্য স্টেট অব অ্যাফেয়ার’ বইয়ে পরকীয়াকে ক্যান্সারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জীবনযন্ত্রণার অন্যতম কারণ দ্বিতীয় কোনো নারী বা পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া।
আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের সহজ মাধ্যম হলো আধুনিক প্রযুক্তি। বর্তমান যুগে অশ্লীল সিনেমা, অনৈতিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অশালীন বিনোদন পরকীয়ার অন্যতম কারণ। তাই এসব থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
‘নিশ্চয়ই যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না। (সুরা নুর, আয়াত- ১৯)
সমাপ্তি কথা।
সম্মানিত উপস্থিতি, একবার একটু নিজের হৃদয়ের কাছে প্রশ্ন করি—ক্ষণিকের আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে আমরা কি আমাদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, বিশ্বাস, সন্তানদের নিষ্পাপ হাসি এবং পরিবারের শান্তিকে বিসর্জন দিতে চাই? যে মানুষটি আমাদের বিশ্বাস করে, যার চোখে আমরা নিরাপত্তার আশ্রয়, যার দোয়ায় আমাদের নাম জড়িয়ে আছে—আমরা কি সেই মানুষটির হৃদয় ভেঙে দিতে পারি?
মনে রাখবেন, একটি গোপন সম্পর্ক হয়তো কিছু মুহূর্তের আবেগ দিতে পারে, কিন্তু তার আঘাত একটি পরিবারকে বছরের পর বছর কাঁদাতে পারে। একজন স্বামী বা স্ত্রীর বিশ্বাসভঙ্গ শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; কখনো তা সন্তানদের নিরাপত্তাবোধ, মানসিক প্রশান্তি এবং ভবিষ্যৎকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তাই আসুন, আমরা শুধু অন্যের ভুল খুঁজে না বেড়িয়ে নিজেদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করি। আমাদের দৃষ্টিতে থাকুক সংযম, আচরণে থাকুক শালীনতা, সম্পর্কে থাকুক বিশ্বস্ততা এবং অন্তরে থাকুক আল্লাহর প্রতি জবাবদিহির অনুভূতি।
দাম্পত্য জীবনে সমস্যা দেখা দিলে গোপন সম্পর্কের পথ নয়, বরং পারস্পরিক আলোচনা, ক্ষমাশীলতা, দায়িত্ববোধ ও ইসলামের নির্দেশনার আলোকে সমাধানের পথ বেছে নিই।
আসুন, আমরা এমন স্বামী-স্ত্রী হই, যাদের কাছে ঘর মানে প্রশান্তি; এমন বাবা-মা হই, যাদের ভালোবাসায় সন্তান নিরাপত্তা খুঁজে পায়; আর এমন মুমিন হই, যারা মানুষের অনুপস্থিতিতেও আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়।
পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি—তিনি যেন আমাদের দাম্পত্য জীবনকে ভালোবাসা ও রহমতে পরিপূর্ণ করেন, আমাদের দৃষ্টি ও চরিত্রের হেফাজত করেন, সব ধরনের অনৈতিক সম্পর্ক থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদের পরিবারগুলোকে ভাঙনের নয়, বরং ঈমান, বিশ্বস্ততা ও প্রশান্তির কেন্দ্র হিসেবে কবুল করেন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।