ইসলামে সহকর্মীর সাথে ভাল ব্যবহার করার গুরুত্ব
ভূমিকাঃ
ইসলামী শরিয়ত নিকটবর্তী ও দূরবর্তী স্থায়ী প্রতিবেশীদের অধিকার সংরক্ষণকে যেমন ওয়াজিব করে দিয়েছে, তেমনিভাবে সহকর্মী বা সাহচর্যের অধিকার বা হককেও অপরিহার্য করেছে। আরবিতে সাহেবে বিল জাম্বের শাব্দিক অর্থ হলো সহকর্মী। সহকর্মী বলতে সেসব লোককে বোঝায়, যারা কোনো সাধারণ বা বিশেষ বৈঠক বা অধিবেশনে আমাদের সঙ্গে উপবেশন করে থাকে। এতে সেসব সফরসঙ্গীও অন্তর্ভুক্ত, যারা রেল, জাহাজ, বাস, মোটর প্রভৃতি যানবাহনে পাশাপাশি বসে ভ্রমণ করে। কোনো কোনো তাফসিরকার বলেছেন, প্রতিটি লোকই সাহেবে বিল জাম্বের অন্তর্ভুক্ত যে কোনো কাজে, কোনো পেশায় বা কোনো বিষয়ে আপনার সঙ্গে জড়িত বা আপনার অংশীদার। তা শিল্পশ্রমেই হোক অথবা অফিস-আদালতের চাকরিতে হোক কিংবা কোনো সফরে বা স্থায়ী বসবাসেই হোক (রুহল-মাআনি)।
সহকর্মীর সংজ্ঞাঃ
কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার উদ্দেশ্য সিদ্ধি, লক্ষ্য অজর্ন , কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য সম্মিলিতভাবে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যারা কার্যসম্পাদন করে তাদেরকে সহকর্মী বলে । শুধু তাই নয় দৈনন্দিন জীবনে আমরা যারা একসঙ্গে , মজলিশে চলাফেরা করি, সেটা মুসলমান, অমুসলমান, আত্মীয়, অনাত্মীয়- ইসলামের দৃষ্টিতে আমরা সবাই সমান। আমাদের সবার সঙ্গেই সদ্ব্যবহার করার হেদায়েত করা হয়েছে। এর সর্বনিম্ন পর্যায়ের আদব হলো, আপনার কোনো কথায় বা কাজে যেন সহকর্মী কষ্ট না পায়। এমন কোনো কথা বলবেন না, যাতে তিনি মর্মাহত হতে পারেন। এমন কোনো আচরণ করবেন না, যাতে তিনি বিব্রত হন। উদাহরণস্বরূপ যেমন সিগারেট খেয়ে তার দিকে ধোঁয়া ছাড়া, পান খেয়ে তার দিকে পিক ফেলা এবং এমনভাবে বসা যেন তার বসার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায় ইত্যাদি। আপনার সহকর্মীকে সম্মান করুন, তিনি যদি আপনার অধীন কর্মীও হয়, তার সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো কাজ তাকে দিয়ে করাবেন না। হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না, যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে (মুসলিম)। অন্যত্র বলা হয়েছে- ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা পোষণকারী দুই ব্যক্তির একজন যদি থাকে প্রাচ্যে এবং অন্যজন যদি থাকে পাশ্চাত্যে, তবুও আল্লাহ তাদের উভয়কে কিয়ামতের দিন একত্র করে বলবেন, যার প্রতি তুমি আমার জন্য ভালোবাসা করতে সে ব্যক্তিটি হচ্ছে এই (বায়হাকি)।
কোরআনের হেদায়েত অনুযায়ী যদি সবাই আমল করতে শুরু করি, তাহলে বাস, রেল, জাহাজে চলার ক্ষেত্রে সংঘটিত সব বিবাদ-বিসংবাদের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। প্রত্যেকের লক্ষ্য করা প্রয়োজন, চলার পথে নিজের যতটুকু জায়গার অধিকার আছে, সহযাত্রীরও ততটুকু জায়গারই অধিকার রয়েছে। সফরের অবস্থায় আপনার কাছে এসে কেউ যদি উপস্থিত হয় বা আপনার মেহমান হয়ে যায় আর যেহেতু সেই অজানা-অচেনা লোকটির কোনো আত্মীয় বা সম্পর্কীয় লোক সেখানে উপস্থিত থাকে না, সেহেতু ইসলামী তথা মানবীয় সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে তার হকও আপনার ওপর অপরিহার্য বলে সাব্যস্ত হয় তাহলো, সামর্থ্য ও সাধ্যানুযায়ী তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা। কোরআনেও মানুষের এ গুণটির প্রশংসা করা হয়েছে অর্থাৎ তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা রয়েছে অনটনের মধ্যে।
সহকর্মীদের অধিকারের বেলায় সমতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রতিটি মানুষের নৈতিক, সামাজিক ও আইনগত প্রাপ্য অধিকারকে পূর্ণ্য ইমানদারির সঙ্গে আদায় করার অধিকার শরিয়ত তাকে দান করেছে। অর্থাৎ একজন মুসলমান তার ভাইয়ের সব শরিয়তসম্মত প্রাধিকার আদায় করবে। পবিত্র কোরআনেও ‘আল্লাহ আদল (সুবিচার) ও ইহসানের ওপর অবিচল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন’ (সুরা নাহল-৯)।
সহকর্মীর প্রকারভেদঃ সহকর্মী দ্ইু ভাগে বিভক্ত।
যথাঃ উর্ধ্বতন সহকর্মী ও অধঃস্তন সহকর্মী।
আল-কোরআনে সহকর্মীদের সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশঃ
মুসলীম জীবন মানেই পরম দেশাত্মবোধে সচেতন এক শৃংখলা পূর্ণ বিপুল আল্লাহ কর্মময় জীবন। এই কর্মময় সাংগঠনিকজীবনে একজন মুসলিমকে অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয় । তম্মধ্যে সহকর্মীদের প্রতি কর্তব্য পালন ও ভাল ব্যবহার একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমন মহান আল্লাহ বলেন-
وَاعْبُدُوا اللَّھَ وَلَا تُشْرِكُوا بِھِ شَیْئًا وَبِالْوَالِدَیْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْیَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِینِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِیلِ وَمَا مَلَكَتْ أَیْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّھَ لَا یُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا
আর তোমরা আলাহর ইবাদাত কর, তাঁর সাথে অপর কাউকে শরীক করো না । পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সহকর্মী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতি ও সৎ ও সদয় ব্যবহার কর । নিশ্চয়ই আল্লাহদাম্ভিক-গর্বিতজনকে পছন্দ করেন না । (সূরা নিসা- ৩৬ )
সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহারের ধরণঃ সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহারের ধরন নিম্নরুপ-
ক। প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার ।
খ। সামাজিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার ।
গ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার ।
১। অধস্তন সহকর্মীর সাথে উর্ধ্বতন সহকর্মীর ভাল ব্যবহারের গুরুত্বঃ
ক। উর্ধ্বতন সহকর্মী অধিনস্থদের রক্ষকঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
عن عَبْدِ اللَّھِ بْنِ عُمَرَ یَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّھِ صَلَّى اللَّھُ عَلَیْھِ وَسَلَّمَ یَقُولُ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِیَّتِھِ الْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِیَّتِھِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَھْلِھِ وَھُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِیَّتِھِ وَالْمَرْأَةُ رَاعِیَةٌ فِي بَیْتِ زَوْجِھَا وَمَسْئُولَةٌ عَنْ رَعِیَّتِھَا وَالْخَادِمُ رَاعٍ فِي مَالِ سَیِّدِهِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِیَّتِھِ قَالَ وَحَسِبْتُ أَنْ قَدْ قَالَ وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي مَالِ أَبِیھِ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِیَّتِھِ وَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِیَّتِھِ
আব্দুলাহ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সুতরাং ঈমাম বা শাসক-প্রশাসক একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সর্ম্পকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুর¦ষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। তাকে তার সে দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে । স্ত্রী তার স্বামীর ঘর সংসার এবং সন্তানের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাকে এ দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে। খাদিম বা অধীনস্থও তার মালিকের সম্পদের ব্যাপারে একজন দায়িত্বশীল। সেদিন তাকেও তার দায়িত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (বুখারী – ৫৩৭৬, রিয়াযুস-সালিহীন-৩৮/৩০৫)
খ। উর্ধ্বতন সহকর্মী অধিনস্থদের আমানতদারঃ হাদীসে এসেছে-
فِیھَا عَنْ أَبِي ذَرٍّ،قَالَ: قُلْتُ: یَارَسُولَ اللهِ، أَلَاتَسْتَعْمِلُنِي؟ قَالَ: فَضَرَبَ بِیَدِهِ عَلَى مَنْكِبِي، ثُمَّ قَالَ: یَا أَبَاذَرٍّ،إِنَّ كَضَعِیفٌ،وَإِنَّھَاأَمَانَةُ، وَإِنَّھَایَوْمَ الْقِیَامَةِخِزْيٌ وَنَدَامَةٌ، إِلَّامَنْ أَخَذَھَا بِحَقِّھَا،وَأَدَّى الَّذِي عَلَیْھِ فِیھَا
আবুযার (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট আরজ করলাম, হে আলাহর রাসূল (সাঃ), আপনি আমাকে সরকারী কোন পদে কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন না? তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে গর্দানে ধাক্কা মেরে বললেন- হে আবুযার, তুমি খুবই দূর্বল প্রকৃতির লোক, আর সরকারী পদ হলো একটি আমানত বিশেষ। এটা কিয়ামতের দিন অপমান ও অনুতাপের কারণ হবে। তবে যারা এর যথার্থ ব্যবহার করতে পারবে এবং তার উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে তা যথাযথভাবে আদায় করবে তাদের কথা স্বতন্ত্র । (মুসলিম -৪/৪৬১৩, প্রশাসন ও নেতৃত্ব অধ্যায় )
গ। অধিনস্থদের প্রতি নরম ও কোমল ব্যবহারঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-
اللھُمَّ،مَنْ وَلِىَ مِنْ أَمْرِأُمَّتِي شَیْئًا فَشَقَّ عَلَیْھِمْ،فَاشْقُقْ عَلَیْھِ،وَمَنْ وَلِيَ مِنْ أَمْرِأُمَّتِي شَیْئًا فَرَفَقَ بِھِمْ،فَارْفُقْ بِھِ
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোন কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়। অতঃপর সে অধিনস্থদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করে তুমি তাদের সাথে কঠোরতা প্রদর্শন কর। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কোন কাজের দায়িত্বে নিযুক্ত হয়, অতঃপর সে অধিনস্থদের প্রতি নরম ও কোমল আচরণ করে তুমি তাদের প্রতি কোমল ও নরম আচরণ কর। (মুসলিম -৫/৪৬১৬, প্রশাসন ও নেতৃত্ব অধ্যায়)
ঘ। অধিনস্থদের প্রতি সুধারণা পোষণঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
عَنْ عَوْفِ بْنِ مَالِكٍ،عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَیْھِ وَسَلَّمَ قَالَ: خِیَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِینَ تُحِبُّونَھُم وَیُحِبُّونَكُمْ وَیُصَلُّونَ عَلَیْكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَیْھِمْ،وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِین تُبْغِضُونَ ھُمْ وَیُبْغِضُونَكُمْ،وَتَلْعَنُونَ ھُمْ وَیَلْعَنُونَكُمْ
আউফ ইবনে মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে উত্তম শাসক তারা যাদেরকে তোমরা ভালবাস ও তারাও তোমাদের ভালবাসে। তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করে। তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট শাসক তারা যাদেরকে তোমরা অপছন্দ কর এবং তারাও তোমাদেরকে অপছন্দ করে এবং তোমরা তাদের প্রতি অভিসম্পাত কর এবং তারাও তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। (মুসলিম-১৭/৪৬৯৮, প্রশাসন ও নেতৃত অধ্যায়)
ঙ। সৎ পরামর্শদাতা নিয়োগ ও পরামর্শ গ্রহণঃ
মুসলমানদের যাবতীয় কর্ম হবে পরামর্শ ভিত্তিক। এ প্রসংগে আল্লাহপাক বলেন- وَأَمْرُ ھُمْ شُوْرَى بَیْنِھُمْ অর্থ-তারা (মুমিনগণ) নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে তাদের কার্যসমূহ সম্পাদন করে। (সূরা আশ-শুরা -৪২ ঃ ৩৮)
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন
وَعَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّھِ صَلَّى اللَّھُ عَلَیْھِ وَسَلَّمَ: إِذَا أَرَادَ اللَّھُ بِالْأَمِیرِ خَیْرًا جَعَلَ لَھُ وَزِیرَ صِدْقٍ إِنْ نَسِيَ ذَكَّرَهُ وَإِنْ ذَكَرَ أَعَانَھُ. وَإِذَا أَرَادَ بِھِ غَیْرَ ذَلِكَ جَعَلَ لَھُ وَزِیرَ سُوءٍ إِنْ نَسِيَ لَمْ یُذَكِّرْهُ وَإِنْ ذَكَرَ لَمْ یُعِنْھُ
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সাঃ) বলেছেন আল্লাহ যখন কোন শাসকের কল্যাণ সাধনের ইচ্ছা করেন তখন তার জন্য সত্যের পরামর্শ দানকারী নিযুক্ত করে দেন। শাসক কোন বিষয় ভূলে গেলে সে তাকে তা ম্মরণ করিয়ে দেয় এবং তা তার ম্মরণে থাকলে সে তাকে সাহায্য ও সহায়তা করে। (আবু দাউদ -২৯৩২, কর, ফাই ও প্রশাসন অধ্যায়)
২। উর্ধ্বতন সহকর্মীর সাথে অধস্তন সহকর্মীর ভাল ব্যবহারঃ
ক। আনুগত্যঃ
উর্ধ্বতন সহকর্মীর আনুগত্য করা অধিনস্থদের উপর অপরিহার্য কর্তব্য। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
یَا أَیُّھَا الَّذِینَ آمَنُوا أَطِیعُوا اللَّھَ وَأَطِیعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّھِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّھِ وَالْیَوْمِ الْآخِرِ ذَٰلِكَ خَیْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِیلًا
হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর মহান আলাহর, আনুগত্য কর তাঁর রাসূলের এবং তোমাদের (ধর্মীয় ও সামাজিক) নেতৃত্বের আনুগত্য কর। যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয় তাহলে তোমরা মহান আল্লাহও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরে আস। যদি তোমরা আল্লাহও পরকালে ঈমান এনে থাক। ইহাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং এর পরিণতি খুবই উত্তম। (সূরা আলে-ইমরান ৪ ঃ ৫৯)
عَنْ أَبِي ھُرَیْرَةَ،قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَیْھِ وَسَلَّمَ: عَلَیْكَ السَّمْعَ وَالطَّاعَةَ فِي عُسْرِكَ وَیُسْرِكَ وَمَنْشَطِكَ وَمَكْرَھِكَ وَأَثَرَةٍ عَلَیْكَ
” আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, সুদিনে ও দুর্দিনে, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিতে এবং তোমার অধিকার খর্ব হওয়া বা তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে শাসকের নির্দেশ শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা তোমার জন্য অপরিহার্য । (মুসলিম -৮/৪৬৪৮,প্রশাসন ও নেতৃত অধ্যায়)
খ। অবাধ্য না হওয়াঃ
عَنْ أَبِي ھُرَیْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله علیھ وسلم قَالَ ” مَنْ أَطَاعَنِي فَقَدْ أَطَاعَ اللَّھَ وَمَنْ یَعْصِنِي فَقَ دْ عَصَى اللَّھَ وَمَنْ یُطِعِ الأَمِیرَ فَقَدْ أَطَاعَنِي وَمَنْ یَعْصِ الأَمِیرَ فَقَدْ عَصَانِي
আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আলাহরই আনুগত্য করলো। আর যে আমার অবাধ্য হলো সে আল্লাহরই অবাধ্য হলো। অনুরূপ যে আমীরের আনুগত্য করলো, সে আমারই আনুগত্য করলো এবং যে আমীরের অবাধ্য হলো, সে আমারই অবাধ্য হলো। (মুসলিম-৮/৪৬৪৩, প্রশাসন ও নেতৃত অধ্যায়)
গ। কল্যাণ কামনা করাঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন-
عَنْ تَمِیمٍ الدَّارِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله علیھ وسلم قَالَ ” الدِّینُ النَّصِیحَةُ ” قُلْنَا لِمَنْ قَالَ لِلَّھِ وَلِكِتَابِھِ وَلِرَسُولِھِ وَلأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِینَ وَعَامَّتِھِمْ
তামীম দারী (র) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন- কল্যাণ কামনাই দ্বীন। আমরা আরজ করলাম, কার জন্য কল্যাণ কামনা ? তিনি বললেনঃ আল্লাহর, তাঁর কিতাবের, তাঁর রাসূলের, মুসলিম শাসক এবং মুসলিম জনগণের। (সহীহ্ মুসলিম-৯৮, ঈমান অধ্যায়)।
৩। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহারঃ
ক। সহকর্মীদের প্রতি দায়িত্বঃ
সহকর্মীদের প্রতি সর্বপ্রথম দায়িত্ব হচ্ছে সৎ কাজের প্রতি আদেশ প্রদান এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা । যেমন মহান আল্লাহ বলেন-
كُنتُمْ خَیْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْھَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّھِ
তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমারদের কে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে এবং মহান আলাহর প্রতি ঈমান রাখবে (স‚রা আলে-ইমরান-৩ঃ১১০)।
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُھُمْ أَوْلِیَاءُ بَعْضٍ یَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَیَنْھَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَیُقِیمُونَ
মুমিনগণ পরস্পর পরস্পরের বন্ধু । তারা একে অপরকে সৎ কাজের আদেশ করে আর অসৎ কাজের নিষেধ করে । (সূরা আত তাওবা- ৯ ঃ ৭১)
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
أَبُو سَعِیدٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّھِ صلى الله علیھ وسلم یَقُولُ ” مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْیُغَیِّرْهُ بِیَدِهِ فَإِنْ لَمْ یَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِھِ فَإِنْ لَمْ یَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِھِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِیمَانِ
আবু সাঈদ (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ দেখে, তাহলে সে যেন হাত দ্বারা এর সংশোধন করে দেয়। যদি এর ক্ষমতা না থাকে, তাহলে মুখের দ্বারা, যদি তাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তর দ্বারা (উক্ত কাজ কে ঘৃণা করবে), আর এটাই ঈমানের নিম্নস্তর। (সহিহ্ -মুসলিম-৭৯, ঈমান অধ্যায়)
খ। পরস্পর সম্মান প্রদর্শন ও স্নেহ করাঃ
এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বড়দের সম্মান করবে না এবং ছোটদের স্নেহ করবে না সে আমার দলভুক্ত নয়। (তিরমিজি-১৯২০, বিয়াদুস সলিহীন-৩৫৯)
৪। সামাজিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সহকর্মীদের প্রতি ভাল ব্যবহারঃ
ক। ভ্রাতৃত্ব সর্ম্পক গড়ে তোলা
সহকর্মীদের সাথে সুসর্ম্পক গড়ে তোলা প্রয়োজন। কর্ম ক্ষেত্রে একের সাথে অন্যের সম্পর্ক মধুর হলে কাজে শান্তি পাওয়া যায় । সর্ম্পক ভাল করার জন্য একের প্রতি অপরের অনেক কিছু করণীয় আছে। নিজ বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েই তা নিরুপন করতে হয়। একে অপরকে এরূপ সমান মনে করতে পারলে সহকর্মীদের সাথে ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে ।
যেমন মহান আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَیْنَ أَخَوَیْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّھَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আলাহে ক ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। (সূরা হুজরাত- ৪৯ ঃ ১০)।
খ। সহযোগিতার মনোভাব রাখাঃ
প্রত্যেক কাজে সহকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব রাখা অপরিহার্য কর্তব্য। আর সহযোগিতার ফলে ভ্রাতৃত্ব বোধ বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভবনা অত্যন্ত বেশী।
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَاتَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوااللَّھَ إِنَّ اللَّھ شَدِیدُ الْعِقَابِ
তোমরা একে অপরকে ভাল ও আল্লাহভীতিমূলক কাজে সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালঙ্গনে কেউ কাউকে সহযোগিতা কর না । আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি দানে অত্যন্ত কঠোর। (সূরা আল মায়িদা- ৫ ঃ ২)
গ। একে অপরকে বিশ্বাস করাঃ
মুমিনের অন্যতম কর্তব্য হচ্ছে সহকর্মীদের বিশ্বাস করা। একে অপরের প্রতি অস্থা রাখা। সহকর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস যত বেশী হবে তাদের মধ্যে সর্ম্পক ততই দৃঢ় হবে।
ঘ। মর্যাদা রক্ষাকরাঃ
প্রত্যেক মানুষেরই আত্নমর্যাদাবোধ আছে। তাই সহকর্মীদের কর্তব্য তার অন্য সহকর্মীদের মর্যাদা রক্ষা করা। নিজের মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়া যেমন কেউ পছন্দ করেনা; তেমনি অন্যের মর্যাদা যাতে ক্ষুন্ন না হয় তার প্রতি লক্ষ রাখা প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য।
ঙ। স্বার্থপরতা পরিত্যাগ করাঃ
কথায় বলে আপন ভাল পাগলেও বুঝে। বস্তুতঃ নিজের ভাল কেনা চায়। কিন্তু নিজের ভাল চাইতে গিয়ে স্বার্থকে বড় করে দেখা উচিত নয়। নিজের স্বার্থের সাথে সহকর্মীদের স্বার্থ ও বড় করে দেখা প্রয়োজন। وَیُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِھِمْ وَلَوْكَانَ بِھِم خَصَاصَةٌ তারা নিজেরা অভাব অনটনে থাকা সত্বেও নিজের উপর অপরের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। (সূরা হাশর- ৫৯ ঃ ৯)
চ। পরমতের প্রতি সহনশীল হওয়াঃ
কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন চিন্তা ও মতের মানুষের অবস্থান। তাই নির্দিষ্ট কোন ব্যাপারে সকলের পক্ষে একই মত পোষণ করা সম্ভব নাও হতে পার। তাই কোন ব্যাপারে ধৈর্য হারানো যাবেনা। প্রত্যেকের অবশ্যই ধৈর্যের সাথে অন্যের মতামতের প্রতি সম্মান রক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। یَاأَیُّھَاالَّذِینَ آمَنُوااصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَ رَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّھَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থঃ হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, পরস্পর ধৈর্যের প্রতিযোগিতা কর এবং স্বীয় দায়িত্বে অবিচল থাকো, তাহলে তোমরা সফল হবে। (সূরা আলে-ইমরান-৩ ঃ ২০০)
উপসংহারঃ
মহান আল্লাহ তায়ালা উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদেরকে সহকর্মীর সাথে ভাল ব্যবহার করার গুরুত্ব বুঝার এবং আমাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলতে এবং দেশ ও জাতির যে কোন প্রয়োজনে নিজেকে নিবেদিত রাখতে তাওফিক দিন।
সহকর্মীর সাথে ভালো ব্যবহার এর গুরুত্ব কী? কেন ভালো ব্যবহার করব এর উত্তর সঠিক ভাবে আসলে উপকৃত হতাম।