ইসলামের আলোকে দেশপ্রেম

ইসলামের আলোকে দেশপ্রেম

সংকলক- ইসমাইল বিন ইবরাহীম

ভূমিকাঃ

দেশপ্রেম শুধু আবেগ নয়, এটি দায়িত্ব, আমানত এবং ইবাদত। আল্লাহ পাক মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তৈরী করেছেন। শ্রেষ্ঠজীব হিসেবে মানুষের যে সমস্ত গুনাবলী থাকা প্রয়োজন তন্মধ্যে দেশপ্রেম অন্যতম। স্বদেশের প্রতি ভালবাসা মানব চরিত্রের একটি মহৎগুণ। মাতৃভূমির মাটি ও মানুষের প্রতি ভালবাসা ধর্মপ্রাণ মানুষের স্বাভাবিক ও সহজাত প্রবৃত্তি। মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি এ তিনটি জিনিস মানুষের কাছে মহামূল্যবান।

গভীর অনুভূতি ও মমত্ববোধকে স্বদেশপ্রেম বলে। মাতৃভূমি ও জন্মস্থানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বা ভালবাসা, আল্লাহ্পাকের পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত। যে ব্যক্তি দেশের প্রতি কর্তব্য সমূহ পালন করে সে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে। আর যে ব্যক্তি দেশের প্রতি কর্তব্যসমূহ পালন করে না, সে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না। সে পূর্ণ মু’মিন নয়। এ জন্য আরবী প্রবাদে বলা হয়-  দেশপ্রেম ঈমানের অংশ।

ইসলামের দৃষ্টিতে দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে হলে স্বদেশ প্রেম অত্যাবশ্যক। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের ও প্রয়োজন হতে পারে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে না পারলে মান-সম্মান, স্বাধিকার, ঈমান ও আমল রক্ষা করা যায় না। এ জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে স্বদেশ প্রেমের গুরুত্ব অত্যাধিক। ইসলামে স্বদেশের প্রতি ভালবাসার জোরালো দিক নির্দেশনা রয়েছে।

দেশ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ব্যাপক আলোচনা এসেছেঃ

১. মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন

إِنَّ ٱلَّذِى فَرَضَ عَلَيْكَ ٱلْقُرْءَانَ لَرَآدُّكَ إِلَىٰ مَعَادٍ ۚ

অনুবাদ: “নিশ্চয় যিনি আপনার প্রতি কুরআনের বিধান আরোপ করেছেন, তিনি অবশ্যই আপনাকে পুনরায় ফিরিয়ে দেবেন স্বদেশে (মক্কায়)।“ (সূরা আল-কাসাস ২৮:৮৫)

এই আয়াতে নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এটি মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে।

২. দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অত্যাচারীদের দমন করার আহ্বান

وَ مَا لَكُمۡ لَا تُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ الۡمُسۡتَضۡعَفِیۡنَ مِنَ الرِّجَالِ وَ النِّسَآءِ وَ الۡوِلۡدَانِ الَّذِیۡنَ یَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَاۤ اَخۡرِجۡنَا مِنۡ هٰذِهِ الۡقَرۡیَۃِ الظَّالِمِ اَهۡلُهَا ۚ وَ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ وَلِیًّا ۚۙ وَّ اجۡعَلۡ لَّنَا مِنۡ لَّدُنۡكَ نَصِیۡرًا

অনুবাদ: “তোমরা কেন আল্লাহর পথে এবং দুর্বল-অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে যুদ্ধ করছ না, যারা বলছে: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের এ জালিম জনপদ থেকে উদ্ধার করো এবং আমাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী দান করো।” (সূরা আন-নিসা ৪:৭৫)

অন্যায় থেকে মুক্তি, স্বাধীনতা ও শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের নির্দেশ আছে, যা পরোক্ষভাবে দেশপ্রেমেরই অংশ।

 ৩. দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের জন্য দোয়া করা

وَإِذْ قَالَ إِبْرَٰهِـۧمُ رَبِّ ٱجْعَلْ هَـٰذَا ٱلْبَلَدَ ءَامِنًۭا

অনুবাদ: “যখন ইবরাহিম বলেছিলেন, হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ করুন।” (সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৫) এই আয়াতে ইবরাহিম (আ.) তাঁর মাতৃভূমির জন্য শান্তি কামনা করেছেন, এটি দেশপ্রেমের একটি মহান নিদর্শন।

 ৪. দেশে শান্তি ও নিরাপত্তার আহ্বান

وَ لَا تُفۡسِدُوۡا فِی الۡاَرۡضِ بَعۡدَ اِصۡلَاحِهَا وَ ادۡعُوۡهُ خَوۡفًا وَّ طَمَعًا ؕ اِنَّ رَحۡمَتَ اللّٰهِ قَرِیۡبٌ مِّنَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ

আর তোমরা যমীনে ফাসাদ করো না তার সংশোধনের পর এবং তাঁকে ডাক ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী। (সূরা আরাফ ৭:৫৬)

وَإِذَا تَوَلَّىٰ سَعَىٰ فِى ٱلْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ ٱلْحَرْثَ وَٱلنَّسْلَ ۗ وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلْفَسَادَ

অনুবাদ: “সে ক্ষমতা পেলে পৃথিবীতে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও ধ্বংস সাধনের চেষ্টা করে, অথচ আল্লাহ ফিতনা ও ধ্বংস পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারা ২:২০৫)

নিজ দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা।

৫. অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গঠন করা

كُنۡتُمۡ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخۡرِجَتۡ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ تَنۡهَوۡنَ عَنِ الۡمُنۡكَرِ وَ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ ؕ

অনুবাদ: “ তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত,যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান পোষণ করবে।“ (সূরা আলে ইমরান ৩:১১০)

দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য সংঘর্ষ নয়, বরং শান্তি ও সংশোধনমূলক চেতনা থাকা দরকার, যা প্রকৃত দেশপ্রেমিকের বৈশিষ্ট্য।

 ৬. দেশে মানবতা রক্ষা

وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا ٱلنَّاسَ جَمِيعًۭا

অনুবাদ: “যে একটি প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন পুরো মানব জাতিকে রক্ষা করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩২) একটি প্রাণ বাঁচানো, সমাজ রক্ষা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাও দেশপ্রেমের অংশ।

৭. শান্তিপূর্ণ দেশ গঠনের জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ

اِنَّ اللّٰهَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَ الۡاِحۡسَانِ وَ اِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ یَنۡهٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَ الۡمُنۡكَرِ وَ الۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُوۡنَ

অনুবাদ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচার, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে সাহায্য করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও জুলুম করতে নিষেধ করেন।” (সূরা আন-নাহল ১৬:৯০)

সুবিচার ও মানবিক আচরণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে ইসলাম উৎসাহিত করে।

 ৮. দেশকে শত্রুর আক্রমন থেকে রক্ষা করার জন্য সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা

وَ اَعِدُّوۡا لَهُمۡ مَّا اسۡتَطَعۡتُمۡ مِّنۡ قُوَّۃٍ وَّ مِنۡ رِّبَاطِ الۡخَیۡلِ تُرۡهِبُوۡنَ بِهٖ عَدُوَّ اللّٰهِ وَ عَدُوَّكُمۡ وَ اٰخَرِیۡنَ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ ۚ لَا تَعۡلَمُوۡنَهُمۡ ۚ اَللّٰهُ یَعۡلَمُهُمۡ ؕ وَ مَا تُنۡفِقُوۡا مِنۡ شَیۡءٍ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ یُوَفَّ اِلَیۡكُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لَا تُظۡلَمُوۡنَ

অনুবাদ: “আর তাদের মুকাবিলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ব বাহিনী প্রস্তুত কর, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও, যাদেরকে তোমরা জান না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। আর তোমরা যা আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর, তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণ দেয়া হবে, আর তোমাদেরকে যুলম করা হবে না।” (সূরা আনফাল ৮:৬০)

 ৯. দেশ রক্ষায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকা

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُواْ وَرَابِطُوا وَاتَّقُواْ اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ .

অনুবাদ: হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ধারণ কর ধৈর্যের প্রতিযোগীতা কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার। (সূরা আলে-ইমরান ৩: ২০০)

 নবীদের দেশপ্রেমঃ

সব নবীগণই তাঁদের নিজ জাতি ও সমাজের কল্যাণে কাজ করেছেন। কারও জাতি পথভ্রষ্ট হলে তাঁরা তাদের সংশোধনের চেষ্টা করেছেন; কেউ অত্যাচারী হলে তা প্রতিরোধ করেছেন; সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক যাঁদের আদর্শ অনুসরণ করেই একজন সেনাসদস্য দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত হতে পারে।

১. নবী মুহাম্মদ ﷺ – মক্কার প্রতি ভালোবাসা

হিজরতের সময় রাসুল ﷺ যখন মক্কা ত্যাগ করছিলেন, তখন তিনি কষ্টভরা হৃদয়ে বলেছিলেন:

“তুমি (মক্কা) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় শহর। যদি আমার কওম আমাকে এখান থেকে বের না করত, তবে আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” (তিরমিজি: ৩৯২৬) এই বক্তব্য নবীজি ﷺ-র মক্কার প্রতি গভীর ভালোবাসা, দেশপ্রেম ও জন্মভূমির প্রতি টান প্রকাশ করে।

নবী মুহাম্মদ ﷺ – মদীনার প্রতি ভালোবাসা

আবার নবীজি যখন মদীনায় হিজরত করেছিলেন সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি মদীনা সনদ প্রনয়ণ করেছিলেন। তার প্রবর্তিত মদীনা সনদে ইয়াসরিব বা মদীনা রাষ্ট্রের অখন্ডতা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি চির দেদীপ্যমান।

মদীনা সনদের কয়েকটি ধারা উপরোক্ত কথার সাক্ষ্য বহন করে। ধারাগুলো হলো :

১. তারা সবাই (ইয়াসরিববাসী) মুমিন, মুশরিক ও ইয়াহুদী মিলে অন্যান্যদের মুকাবিলায় এক উম্মত, এক জাতি।

২. ইয়াসরিব (মদীনা রাষ্ট্র) উপত্যকা এ চুক্তিনামার (মদীনা সনদের) সকল পক্ষের লোকের কাছে পবিত্র ভূমি বলে গণ্য হবে।

৩. এ চুক্তি সকল পক্ষের লোক ইয়াসরিব (মদীনা) আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে পরস্পর সহযোগিতা করবে।

৪. এ চুক্তিনামা গ্রহণকারী পক্ষসমূহের মধ্যে যদি এমন কোন নতুন সমস্যা বা বিরোধ সৃষ্টি হয়, যা থেকে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে তা আল্লাহ ও মুহাম্মদ ﷺ এর নিকট মীমাংসার্থে উত্থাপন করতে হবে।

৫. এ চুক্তিনামায় যা কিছু রয়েছে তার প্রতি সর্বাধিক নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততা আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। (দ্র. ইবন হিশাম, খ. ২, পৃ. ২৬)

মদীনা সম্পর্কে মহানবী ﷺ বলেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রإِنَّ إِبْرَاهِيمَ حَرَّمَ مَكَّةَ فَجَعَلَهَا حَرَامًا وَإِنِّي حَرَّمْتُ الْمَدِينَةَ حَرَامًا مَا بَيْنَ مَأْزِمَيْهَا (رَوَاهُ مُسلم)

অনুবাদ:“ইবরাহীম স মক্কাকে মর্যাদাবান করেছেন, যার কারণে মক্কা সম্মানিত হয়েছে। আর আমি মদীনাকে মর্যাদাবান করেছি সুতরাং মদীনাও সম্মানিত হলো।’’ -বুখারী; মিশকাত ঃ ২৭৩২

মদীনার প্রতি মহানবী ﷺ-এর ভালোবাসা সম্পর্কে এক হাদীসে আনাস যবলেন,

عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانَ إِذَا قَدِمَ مِنْ سَفَرٍ، فَنَظَرَ إِلَى جُدُرَاتِ المَدِينَةِ، أَوْضَعَ رَاحِلَتَهُ وَإِنْ كَانَ عَلَى دَابَّةٍ حَرَّكَهَا مِنْ حُبِّهَا

“নবী করীম ﷺ যখন কোনো সফর থেকে ফিরে আসতেন, দূর থেকে মদীনার জনপদ নজরে আসতেই তিনি তাঁর উটনীর গতি বাড়িয়ে দিতেন, অথবা কোনো চতুষ্পদ জন্তুর উপর থাকলে তাকে নাড়াতে থাকতেন। বস্তুত মদীনার প্রতি ভালোবাসার দরুনই তিঁনি এমনটি করতেন।’’ (বুখারী; মিশকাত: ২৭৪৪)

মদীনা সম্পর্কে তিনি দু‘আয় বলতেন,

عَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم اللَّهُمَّ اجْعَلْ بِالْمَدِينَةِ ضِعْفَىْ مَا بِمَكَّةَ مِنَ الْبَرَكَةِ

অনুবাদ:“আনাস য নবী করীম ﷺ হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি এই দু‘আ করেছেন, হে আল্লাহ মক্কায় যা তুমি বরকত দান করেছ মদীনায় তার দ্বিগুণ বরকত দান কর।” (বুখারী; মুসলিম; মিশকাত: ২৭৫৪)

২. নবী ইবরাহিম (আঃ) নিজের জাতির কল্যাণ কামনা

নবী ইবরাহিম (আঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন:

رَبِّ اجْعَلْ هَـٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا

অনুবাদ:“হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ করুন।” (সূরা ইব্রাহিম: ৩৫)

তিনি আরোও দোয়া করেছিলেন এভাবে

رَبِّ اجْعَلْ هَـٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ

অনুবাদ:“হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ করুন এবং এর অধিবাসীদেরকে রিজিক দিন।” (সূরা বাকারা: ১২৬)

তিনি কা’বা ঘরের আশপাশের শহর ও জনগণের জন্য দোয়া করেছেন—এটাই দেশপ্রেমের প্রকৃত উদাহরণ।

৩. নবী ইউসুফ (আঃ) এর রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা

নবী ইউসুফ (আঃ) মিসরের রাজাকে বলেছিলেন:

اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ

অনুবাদ:“আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্ব দিন। আমি আমানতদার ও জ্ঞানী।” (সূরা ইউসুফ: ৫৫)

তিনি দেশ ও জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এসেছিলেন—এটি দায়িত্বশীল দেশপ্রেমের নিদর্শন।

৪. নবী মূসা (আঃ) নিজের জাতি ও মিসরের মুক্তি কামনা করেছিলেন

মূসা (আঃ) নিজ জাতিকে ফিরআউনের জুলুম থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁর জাতির মুক্তি এবং উন্নত ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করতেন। তিনি নিজের জাতির জন্য জান-মাল দিয়ে সংগ্রাম করেছেন যা গভীর দেশপ্রেমের প্রকাশ।

৫. নবী শুআইব (আঃ) এর নিজের সম্প্রদায়কে শুদ্ধ পথে ফিরাতে চেষ্টা

শুআইব (আঃ) তাঁর নিজ সম্প্রদায়কে অর্থনৈতিক অনিয়ম, অন্যায় ও প্রতারণা থেকে ফেরাতে বারবার দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছিলেন:

وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ

অনুবাদ:“তোমরা মাপে ও ওজনে ন্যায্যতা অবলম্বন কর।” (সূরা আনয়াম: ১৫২) দেশ ও সমাজের সুশাসনের জন্য তাঁর আপ্রাণ চেষ্টা দেশপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

৬. নবী লূত (আলাইহিস সালাম)

তিনি নিজ জাতির চারিত্রিক অধঃপতন ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি সমাজের অনৈতিক কার্যকলাপের বিরোধিতা করে তাদের শুদ্ধ পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার জাতিকে বারবার বলতেন:

إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ

অনুবাদ:“আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রাসূল।” (সূরা আশ-শু’আরা: ১৬২)

সমাজে নৈতিকতা ও সুস্থতা প্রতিষ্ঠার জন্য লূত (আঃ)-এর সংগ্রাম ছিল তার জাতির কল্যাণে নিবেদিত এক মহৎ উদাহরণ।

৭. নবী হুদ (আলাইহিস সালাম)

তিনি ‘আদ জাতিকে অহংকার, অন্যায় ও জুলুম থেকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন। তিনি বলেন:

وَاتَّقُوا الَّذِي أَمَدَّكُم بِمَا تَعْلَمُونَ

অনুবাদ:“তোমরা তাঁর ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে সে সব কিছু দিয়েছেন, যা তোমরা জানো।” (সূরা আশ-শু’আরা: ১৩২) তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জাতি অহংকার ও ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে এসে আল্লাহভীতি ও শৃঙ্খলার পথে চলে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ুক।

৮. নবী দাউদ (আলাইহিস সালাম) ও সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)

এরা দু’জনই ছিলেন নবী এবং একইসাথে ন্যায়বিচারক শাসক। তাঁরা তাঁদের রাষ্ট্রে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। দাউদ (আঃ): ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের জন্য কুরআনে প্রশংসিত। সুলাইমান (আঃ): জ্ঞান, নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, উন্নত সমাজ গঠন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, ইনসাফ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের দেশপ্রেমের নিদর্শন।

মহান আল্লাহ বলেন,

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ .

আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতির মানদন্ড যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচন্ড রণশক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার । (সূরা- হাদীদ ৫৭: ২৫)

দেশের শাসকের দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ۔

তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি- সামর্থ্য দান করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। (সূরা- হজ্জ ২২: ৪১)

সাহাবায়ে কিরামও স্বদেশকে খুব ভাল বাসতেনঃ

হিজরতের পর আবু বকর (রাঃ) ও বিলাল (রাঃ) জ্বরে আক্রান্ত হলে তাদের মনে প্রাণে স্বদেশ মক্কার স্মৃতিচিহ্ন জেগে উঠেছিল। তারা জন্মভূমি মক্কার দৃশ্যাবলী স্মরণ করে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। এমতাবস্থায় নবী করিম (সাঃ) সাহাবীদের মনের এ দূরাবস্থা দেখে প্রাণভরে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ আমরা মক্কাকে যেমন ভালবাসি তেমনি তার চেয়ে বেশী মদীনাকে ভালবাসা আমাদের অন্তরে দান করুন। (বুখারী)

দেশ ও জাতির জন্য ক্ষমার অতুলনীয় দৃষ্টান্তঃ

দেশের জন্য নিবেদিত মানুষেরা সমাজের চোখে যেমন সম্মানিত তেমনি আল্লাহর কাছে ও অত্যন্ত গৌরবময় মর্যাদার অধিকারী। নবুয়ত লাভের পর সুদীর্ঘ ১৩ বছর মহানবী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীরা স্বদেশ মক্কায় ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হয়েছেন এবং নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত দেশ ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। অতঃপর ১০ম হিজরীতে বিজয়ীর বেশে মহানবী (সাঃ) যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন, মক্কার মুসলমানদের উপর যে ভীষণ অন্যায় ও অত্যাচার করা হয়েছিল, তা ভুলে গেলেন এবং দেশবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয় দেশ প্রেম, উদারতা ও মহানুভবতার আদর্শ স্থাপন করেন।

তিনি ইউছুফ (আঃ) তাদের ভাইদের ব্যাপারে যা বলেছিলেন তিনিও সেই ঘোষণা প্রদান করেনঃ

যা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে এসেছে,

قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ۔

আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। (সূরা ইউছুফ ১২: ৯২)

দেশ প্রেমের ফলে মানুষের মন উদার ও মহৎপ্রাণ হয়। অপরের জন্য কল্যাণবোধ জন্ম লাভ করে। তাই দেশের স্বার্থ বিরোধীদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে রক্ষার জন্য জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালানো উচিত।

দেশের সীমান্ত রক্ষার ফজিলতঃ

দেশের সীমান্ত প্রহরীদের সম্পর্কে রাসূলে আকরাম (সাঃ) ঘোষণা করেনঃ

رِبَاطُ يَوْمٍ فِي سَبِيْلِ اللهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَهَا

একদিন আল্লাহর রাস্তায় সীমানা পাহারা দেয়া পৃথিবী ও পৃথিবীর উপরস্থ সব কিছু থেকে উত্তম। (বুখারী-২৮৯২ ও মুসলিম-৪৮৩২)

অপর হাদীসে এসেছে,

عَنْ سَلْمَانَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولِ اللهِ (ص) يَقُولُ رِبَاطُ يَوْمِ وَلَيَلَةٍ خَيْرٌ مِنْ صِيَامٍ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ فِيهِ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلَهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُ وَأَجْرَى عَلَيْهِ رِزْقَهُ وَآمِنَ الْفِتَانِ –

সালমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছি, একদিন ও একরাত রাষ্ট্রের সীমানা পাহারা দেয়া একমাস রোজা রাখা ও রাতে ইবাদতের চেয়ে উত্তম। এ অবস্থায় যদি সে মারা যায় তাহলে যে কাজ সে করে যাচ্ছিল। মারা যাওয়ার পরও তা তার জন্য জারী থাকবে, তার রিজিক ও জারী থাকবে এবং কবরের পরীক্ষা থেকে সে নিরাপদ থাকবে। (মুসলিম- জিহাদ অধ্যায়)

দেশের সীমান্ত পাহারা দেয়া জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়ঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বাণী:

عَيْنَانِ لَاتَمَسَّهُمَا النَّارُ عَيْنُ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللهِ وَعَيْنُ بَاتَتْ تَحْرِسٌ فِي سَبِيْلِ اللهِ –

দু’টি চোখকে জাহান্নামের আগুণ স্পর্শ করবে না। যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দিয়েছে। (তিরমিজি- ১৬৩৯)

শেষ কথাঃ

ইসলামের আলোকে দেশপ্রেম ও দেশাত্ববোধ মানুষকে স্বদেশ রক্ষায় উদ্ধুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে দেশ প্রেমিক নিজের জান-মাল উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। স্বদেশকে হেফাযত করতে না পারলে ধর্মকে হেফাযত করা যায় না। দেশের মানুষকে রক্ষা করা যায় না। তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা যায় না। দেশ প্রেমিক ধর্মভীরু মানুষকে স্বদেশের উন্নতি সাধনে সজাগ রাখে। দেশের জাতীয় সম্পদ অপচয় রোধে উদ্বুদ্ধ করে। আর দেশাত্ববোধ ব্যতীত কোন দেশের স্বাধীনতা স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না।

Add Your Heading Text Here

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

Leave a Reply