সেমিনারঃ সীরাতে রহমাতাল্লিল আলামীন ﷺ– প্রেক্ষিত: বদর প্রান্তর
উপস্থাপনায়: ইসমাইল বিন ইবরাহীম
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا ونبينا محمد، وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد—
ভূমিকা
মানব ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা হয়ে থাকে না; বরং যুগের পর যুগ মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, সংগ্রাম ও আদর্শকে প্রভাবিত করে। ইসলামের ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ তেমনই একটি ঘটনা। এটি শুধু দুটি বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি নবীন ঈমানি সমাজের অস্তিত্ব রক্ষা, সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা।
বদরের প্রান্তরে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অল্প, সামরিক সরঞ্জাম ছিল সীমিত, প্রস্তুতিও ছিল তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে কুরাইশ বাহিনী ছিল সংখ্যায় ও সমরসজ্জায় অধিক শক্তিশালী। কিন্তু ইতিহাসের এই সংঘর্ষ প্রমাণ করেছিল—বিজয়ের একমাত্র নির্ধারক বস্তুগত শক্তি নয়; বরং ঈমান, সঠিক নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা, ত্যাগ এবং সর্বোপরি আল্লাহর সাহায্যই প্রকৃত বিজয়ের ভিত্তি।
আজকের সেমিনারে বদরের যুদ্ধকে কেবল যুদ্ধের ঘটনাপঞ্জি হিসেবে নয়, বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাতের আলোকে নেতৃত্ব, দাওয়াত, ধৈর্য, কৌশল, শূরা, তাওয়াক্কুল, মানবিকতা এবং বিজয়ের দর্শন হিসেবে আলোচনা করা হবে। ইনশাআল্লাহ
উদ্দেশ্য
রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সীরাতের আলোকে বদরের প্রান্তরের ইতিহাস, ঈমান, নেতৃত্ব, ত্যাগ, কৌশল ও মানবিক শিক্ষাগুলো অনুধাবন করে তা আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের প্রেরণা অর্জন করা।
সীরাতে রহমাতাল্লিল আলামীন ﷺ-এর আলোকে বদরের প্রান্তর
আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ সম্পর্কে বলেন:وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ“আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।”—সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭
তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন রহমাতাল্লিল আলামীন—সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত। কিন্তু তাঁর জীবন কেবল কোমলতা ও ব্যক্তিগত ইবাদতের জীবন ছিল না। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, দাঈ, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারক, সমাজসংস্কারক এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে একজন দূরদর্শী সেনানায়ক। এখানেই বদরের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধকে ভালোবাসতেন না, রক্তপাতকে উৎসাহিত করতেন না এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধকে জীবনের নীতি বানাননি। কিন্তু যখন মদিনার মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, তখন তিনি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
অতএব বদরের যুদ্ধ আমাদের সামনে রহমতের নবী ﷺ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—রহমত কখনো দুর্বলতা নয়; ন্যায় ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ়তাও রহমতের অংশ।
আসুন বদরের প্রান্তরের পরিচয় জানি-
হিজরতের অনধিক ১৯ মাস পর ২য় হিজরীর ১৭ই রামাযান শুক্রবার সকালে (৬২৪ খৃ. ১১ই মার্চ) ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[ওয়াক্বেদী, মাগাযী ১/২; ইবনু সা‘দ ২/৮; ইবনু হিশাম ১/২৪০] এই যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে ৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনছারসহ মোট ১৪ জন শহীদ হন। কাফের পক্ষে ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দী হয় (আর-রাহীক্ব ২২৪ পৃঃ)।
বদর হ’ল মদীনা থেকে ১৬০ কি. মি. দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্রের নাম। যেখানে পানির প্রাচুর্য থাকায় স্থানটির গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক। এখানেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসে তাওহীদ ও শিরকের মধ্যকার প্রথম সশস্ত্র মুকাবিলা। ১৯ মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে মদীনা থেকে বের করে দেবার জন্য নানাবিধ অপচেষ্টা চালায়। যেমনভাবে তারা ইতিপূর্বে হাবশায় হিজরতকারী মুসলমানদের সেখান থেকে বের করে দেবার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু সেখানে তারা ব্যর্থ হয়েছিল।
পক্ষান্তরে ইয়াছরিব ছিল কুরায়েশদের খুবই পরিচিত এলাকা। যার উপর দিয়ে তারা নিয়মিতভাবে সিরিয়াতে ব্যবসার জন্য যাতায়াত করত। তাছাড়া তাদের সঙ্গে ভাষাগত মিল এবং আত্মীয়তাও ছিল। অধিকন্তু রাস্তা ছিল স্থলপথ, যেখানে নদী-নালার কোন বাধা নেই। দূরত্ব বর্তমানের হিসাবে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার হ’লেও সেখানে যাতায়াতে তারা অভ্যস্ত ছিল। এখন আমরা বদর যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পরোক্ষ কারণগুলি সংক্ষেপে বর্ণনা করব।-
যে কারণে বদরের প্রান্তরে গেলেন রহমাতাল্লিল আলামিন
(১) মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের নিকটে কুরায়েশ নেতাদের পত্র প্রেরণ। উল্লেখ্য যে, আব্দুল্লাহ তখনও ইসলাম কবুল করেননি। রাসূল (ছাঃ)-এর আগমনের কারণে ইয়াছরিবের নেতৃত্ব লাভের মোক্ষম সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তিনি ছিলেন মনে মনে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ। রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি তার এই ক্ষোভটাকেই কুরায়েশরা কাজে লাগায় এবং নিম্নোক্ত ভাষায় কঠোর হুমকি দিয়ে তার নিকটে চিঠি পাঠায়।- إِنَّكُمْ آوَيْتُمْ صَاحِبَنَا وَإِنَّا نُقْسِمُ بِاللهِ لَتُقَاتِلُنَّهُ أَوْ لَتُخْرِجُنَّهُ أَوْ لَنَسِيرَنَّ إِلَيْكُمْ بِأَجْمَعِنَا حَتَّى نَقْتُلَ مُقَاتِلَتَكُمْ وَنَسْتَبِيحَ نِسَاءَكُمْ‘তোমরা আমাদের লোকটিকে (মুহাম্মাদকে) আশ্রয় দিয়েছ। এজন্য আমরা আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, হয় তোমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ও তাকে বের করে দিবে নতুবা আমরা তোমাদের উপরে সর্বশক্তি নিয়ে হামলা করব। তোমাদের যোদ্ধাদের হত্যা করব ও নারীদের হালাল করব’।[আবুদাঊদ হা/৩০০৪ ‘খারাজ’ অধ্যায় ‘বনু নাযীর-এর বর্ণনা’ অনুচ্ছেদ-২৩।]
এই পত্র পেয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই দ্রুত তার সমমনাদের সাথে গোপন বৈঠকে বসে গেল। কিন্তু সংবাদ রাসূল (ছাঃ)-এর কানে পৌঁছে গেল। তিনি সরাসরি তাদের বৈঠকে এসে হাযির হ’লেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, আমি দেখছি কুরায়েশদের হুমকিকে তোমরা দারুণভাবে গ্রহণ করেছ। অথচ এর মাধ্যমে তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে যে পরিমাণ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে যাচ্ছ, কুরায়েশরা তোমাদের সেই পরিমাণ ক্ষতি করতে সক্ষম হবে না। أَتُرِيدُونَ أَنْ تُقَاتِلُوا أَبْنَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ ‘তোমরা কি তোমাদের সন্তান ও ভাইদের সাথে (অর্থাৎ মুসলমানদের সাথে) যুদ্ধ করতে চাও’? রাসূল (ছাঃ)-এর মুখে এ বক্তব্য শুনে বৈঠক ভেঙ্গে গেল ও দল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।[আবুদাঊদ হা/৩০০৪; মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক্ব হা/৯৭৩৩, সনদ ছহীহ।] যদিও আব্দুল্লাহর অন্তরে হিংসার আগুন জ্বলতে থাকল। তবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মুনাফিক ও ইহূদীদের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলতে থাকেন। যাতে হিংসার আগুন জ্বলে না ওঠে।
(২) আউস গোত্রের নেতা সা‘দ বিন মু‘আয (রাঃ) ওমরাহ করার জন্য মক্কায় যান ও কুরায়েশ নেতা উমাইয়া বিন খালাফের অতিথি হন। উমাইয়ার ব্যবস্থাপনায় দুপুরে নিরিবিলি ত্বাওয়াফ করতে দেখে আবু জাহল তাকে ধমকের সুরে বলেন, أَلاَ أَرَاكَ تَطُوفُ بِمَكَّةَ آمِنًا، وَقَدْ أَوَيْتُمُ الصُّبَاةَ؟ ‘তোমাকে দেখছি মক্কায় বড় নিরাপদে ত্বাওয়াফ করছ। অথচ তোমরা ধর্মত্যাগী লোকগুলোকে আশ্রয় দিয়েছ! … আল্লাহর কসম! যদি তুমি আবু ছাফওয়ানের (উমাইয়া বিন খালাফের) সাথে না থাকতে, তবে নিরাপদে ফিরে যেতে পারতে না’। একথা শুনে সা‘দ চীৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, তুমি আমাকে এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ালে আমি তোমার জন্য এর চেয়ে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়াবো। আর তাতে মদীনা হয়ে তোমাদের ব্যবসায়ের রাস্তা বন্ধ হবে’।[বুখারী হা/৩৯৫০ ‘মাগাযী’ অধ্যায় ২ পরিচ্ছেদ।]
(৩) কুরায়েশ নেতারা ও তাদের দোসররা হর-হামেশা তৎপর ছিল মুহাজিরগণের সর্বনাশ করার জন্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এতই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, তিনি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতেন না। আয়েশা (রাঃ) বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রায়ই বিনিদ্র রজনী কাটাতেন। এক রাতে তিনি বললেন,لَيْتَ رَجُلاً صَالِحًا مِنْ أَصْحَابِىْ يَحْرِسُنِى اللَّيْلَةَ ‘যদি আমার ছাহাবীগণের মধ্যে যোগ্য কেউ এসে আমাকে রাতে পাহারা দিত’! আয়েশা (রাঃ) বলেন, এমন সময় হঠাৎ অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, কে? জবাব এল, আমি সা‘দ ইবনু আবী ওয়াকক্বাছ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, কি উদ্দেশ্যে আগমন? সা‘দ বললেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে আমার অন্তরে ভয় উপস্থিত হ’ল। তাই এসেছি তাঁকে পাহারা দেবার জন্য। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার জন্য কল্যাণের দো‘আ করলেন ও ঘুমিয়ে গেলেন। এমনকি আমরা তাঁর নাক ডাকানোর শব্দ শুনতে পেলাম’।[বুখারী হা/৭২৩১; মুসলিম হা/২৪১০ (৪০); মিশকাত হা/৬১০৫।] এরপর থেকে এরূপ পাহারাদারীর ব্যবস্থা নিয়মিত চলতে থাকে। যতক্ষণ না নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়- وَاللهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ‘আল্লাহ তোমাকে লোকদের হামলা থেকে রক্ষা করবেন’ (মায়েদাহ ৫/৬৭)। উক্ত আয়াত নাযিলের পর রাসূল (ছাঃ) ছাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ انْصَرِفُوْا عَنِّى فَقَدْ عَصَمَنِى اللهُ عَزَّ وَجَلَّ ‘হে লোক সকল! তোমরা ফিরে যাও! মহান আল্লাহ আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন’।[তিরমিযী হা/৩০৪৬, সনদ হাসান ‘তাফসীর’ অধ্যায়।] কুরায়েশদের অপতৎপরতা কেবল রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধেই ছিল না; বরং সাধারণ মুহাজির মুসলমানের বিরুদ্ধেও ছিল। আর এটাই স্বাভাবিক।
৪) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সিরিয়া ফেরত মক্কার ব্যবসায়ী কাফেলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও তাদের পুরা খবরাখবর সংগ্রহের জন্য তালহা বিন উবায়দুল্লাহ ও সাঈদ বিন যায়েদকে প্রেরণ করেন। তারা ‘হাওরা’ (الْحَوْرَاءُ) নামক স্থানে পৌঁছে জানতে পারেন যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে বিরাট এক ব্যবসায়ী কাফেলা মক্কার পথে সত্বর ঐ স্থান অতিক্রম করবে। যাদেরকে ইতিপূর্বে যুল-‘উশায়রা পর্যন্ত গিয়েও ধরা যায়নি। যে কাফেলায় রয়েছে এক হাযার উট বোঝাই কমপক্ষে ৫০,০০০ স্বর্ণমুদ্রার মাল-সম্পদ এবং তাদের প্রহরায় রয়েছে আমর ইবনুল ‘আছ সহ ৩০ থেকে ৪০ জন সশস্ত্র জোয়ান। উল্লেখ্য যে, এই বাণিজ্যে মক্কার সকল নারী-পুরুষ অংশীদার ছিল। তারা দ্রুত মদীনায় ফিরে এসে রাসূল (ছাঃ)-কে এই খবর দেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) চিন্তা করলেন, এই বিপুল সম্পদ মক্কায় পৌঁছে গেলে তার প্রায় সবই ব্যবহার করা হবে মদীনায় মুহাজিরগণকে ধ্বংস করার কাজে। অতএব আর মোটেই কালক্ষেপণ না করে তিনি তখনই বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন ওই কাফেলাকে আটকানোর জন্য।[ইবনু হিশাম ১/৬০৬, আর-রাহীক্ব ২০৪ পৃঃ, ওয়াক্বেদী, মাগাযী ১/২০০।
বদরের প্রন্তরের উদ্দেশ্যে রওনা করলেন রহমাতাল্লিল আলামিনের মাদানী বাহিনী
বিগত অভিযানগুলির ন্যায় এ অভিযানেরও উদ্দেশ্য ছিল কুরায়েশ কাফেলাকে আটকানো। তাই অন্যান্য অভিযানের মতই এটাকে ভাবা হয়েছিল। ফলে কেউ যোগ দিয়েছিল, কেউ দেয়নি এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কাউকে অভিযানে যেতে বাধ্য করেননি। অবশেষে ৮ই রামাযান সোমবার অথবা ১২ই রামাযান শনিবার ৩১৩, ১৪ বা ১৭ জনের একটি কাফেলা নিয়ে সাধারণ প্রস্ত্ততি সহ তিনি রওয়ানা হ’লেন। যার মধ্যে ৮২, ৮৩ অথবা ৮৬ জন ছিলেন মুহাজির এবং বাকীগণ ছিলেন আনছার। আনছারগণের মধ্যে ৬১ জন ছিলেন আউস এবং ১৭০ জন ছিলেন খাযরাজ গোত্রের।[ইবনু হিশাম ২/৬১২; ইবনু সা‘দ ২/৮; আর-রাহীক্ব ২০৪-০৫ পৃঃ।] বি’রে সুক্বইয়া নামক স্থানে এসে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ক্বায়েস বিন আবু ছা‘ছা‘আহকে সংখ্যা গণনা করতে বললেন। পরে সংখ্যা জানতে পেরে রাসূল (ছাঃ) খুশী হয়ে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বললেন, তালূতের সৈন্য সংখ্যাও তাই ছিল’।[বুখারী হা/৩৯৫৯; মুসলিম হা/১৭৬৩; বায়হাক্বী-দালায়েল, ৩/৭৩; কুরতুবী হা/৩১৮৮।] তিন শতাধিক লোকের এই বাহিনীতে মাত্র ২টি ঘোড়া ছিল যুবায়ের ইবনুল ‘আওয়াম ও মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদের এবং ৭০টি উট ছিল। যাতে দু’তিন জন করে পালাক্রমে সওয়ার হয়ে চলতে হ’ত। রাসূল (ছাঃ), আলী ও আবু লুবাবাহ এবং পরবর্তীতে তার বদলে মারছাদ বিন আবু মারছাদ গানাভীর জন্য একটি উট বরাদ্দ ছিল। যাতে পায়ে হাঁটার পালা আসলে রাসূল (ছাঃ) নিজেও হাঁটতেন। এ সময় মদীনার আমীর নিযুক্ত হন অন্ধ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ)।
মাদানী বাহিনীর অবস্থান ও পরামর্শ সভা
আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলার নিরাপদে নিষ্ক্রমন এবং আবু জাহলের নেতৃত্বে মাক্কী বাহিনীর দ্রুত ধেয়ে আসা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যাফরানে (ذَفرَان) অবস্থানকালেই অবহিত হন। এই অনাকাংখিত পরিস্থিতি এবং অবশ্যম্ভাবী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মুকাবিলা কিভাবে করা যায়, এ নিয়ে তিনি মদীনা থেকে ৬৮ কি. মি. দক্ষিণে ‘রাওহা’ (الرَّوْحَاء)-তে অবতরণ করে উচ্চ পর্যায়ের পরামর্শ বৈঠক আহবান করলেন’ (ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আনফাল ৭ আয়াত)। কেননা তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্ততি নিয়ে মদীনা থেকে বের হননি।
মুহাজিরগণের মধ্যে হযরত আবুবকর ও ওমর (রাঃ) তাদের মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করলেন। অতঃপর মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রাঃ) দাঁড়িয়ে তেজস্বিনী ভাষায় বললেন, يَا رَسُولَ اللهِ، امْضِ لِمَا أَرَاكَ اللهُ فَنَحْنُ مَعَكَ، واللهِ لاَ نَقُولُ لَكَ كَمَا قَالَتْ بَنُو إسْرَائِيلَ لِمُوسَى: اذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقاتِلاَ، إِنَّا هَاهُنا قاعِدُونَ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর দেখানো পথে আপনি এগিয়ে চলুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহর কসম! আমরা আপনাকে ঐরূপ বলব না, যেরূপ বনু ইস্রাঈল তাদের নবী মূসাকে বলেছিল যে, ‘তুমি ও তোমার রব যাও গিয়ে যুদ্ধ কর! আমরা এখানে বসে রইলাম’ (মায়েদাহ ৫/২৪)। বরং আমরা বলব, اِذْهَبْ أَنْتَ وَرَبُّكَ فَقَاتِلاَ إنَّا مَعَكُمَا مُقَاتِلُونَ ‘আপনি ও আপনার রব যান ও যুদ্ধ করুন, আমরা আপনাদের সাথে যুদ্ধরত থাকব’। فَوَ الَّذِيْ بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَوْ سِرْتَ بِنَا إلَى بِرْكِ الْغِمَادِ لَجَالَدْنَا مَعَكَ مِنْ دُونِهِ حَتَّى تَبْلُغَهُ ‘সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনি আমাদেরকে নিয়ে ‘বারকুল গিমাদ’ পর্যন্ত চলে যান, তবে আমরা অবশ্যই আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে সেই পর্যন্ত পৌঁছে যাব’। [বারকুল গিমাদ : এটির অবস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, স্থানটি ইয়ামন সীমান্তে অবস্থিত। কেউ বলেছেন, হিজরের শেষ প্রান্তে। তবে সুহায়লী বলেন, আমি কোন একটি তাফসীরের কিতাবে দেখেছি যে, এটি হাবশার একটি শহর (ইবনু হিশাম ১/৬১৫, টীকা-১)। তাফসীর ইবনু কাছীর সূরা আনফাল ৮ আয়াতের টীকায় বলা হয়েছে, এটি হল মক্কার আগে পাঁচ দিনের দূরত্বে সাগরের তীরবর্তী স্থান।] মিক্বদাদের এই জোরালো বক্তব্য শুনে আললাহর রাসূল (ছাঃ) খুবই প্রীত হ’লেন এবং তার জন্য কল্যাণের দো‘আ করলেন’(دَعَا لَهُ بِخَيْرٍ)।[আহমাদ হা/১৮৮৪৭; ছহীহাহ হা/৩৩৪০।]
সংখ্যালঘু মুহাজিরগণের উপরোক্ত তিন নেতার বক্তব্য শোনার পর সংখ্যাগুরু আনছারদের পরামর্শ চাইলে আউস গোত্রের নেতা সা‘দ বিন মু‘আয (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি হয়ত আশংকা করছেন যে, আমাদের সঙ্গে আপনার চুক্তি অনুযায়ী আনছারগণ কেবল (মদীনা) শহরে অবস্থান করেই আপনাদের সাহায্য করা কর্তব্য মনে করে। জেনে রাখুন, আমি আনছারদের পক্ষ থেকেই বলছি, যেখানে চান সেখানে আপনি আমাদের নিয়ে চলুন। যার সঙ্গে চান আপনি সন্ধি করুন বা ছিন্ন করুন- সর্বাবস্থায় আমরা আপনার সাথে আছি। যদি আপনি অগ্রসর হয়ে ‘বারকুল গিমাদ’ পর্যন্ত চলে যান, তবুও আমরা আপনার সাথেই থাকব।لَوْ اسْتَعْرَضْتَ بِنَا هَذَا الْبَحْرَ فَخُضْتَهُ لَخُضْنَاهُ مَعَكَ ‘যদি আমাদেরকে নিয়ে আপনি এই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে আমরাও আপনার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ব’। مَا تَخَلَّفَ مِنَّا رَجُلٌ وَاحِدٌ، فَسِرْ بِنَا عَلَى بَرَكَةِ اللهِ ‘আমাদের একজন লোকও পিছিয়ে থাকবে না। অতএব আপনি আমাদের নিয়ে আল্লাহর নামে এগিয়ে চলুন’। সা‘দের উক্ত কথা শুনে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) খুবই খুশী হ’লেন ও উদ্দীপিত হয়ে বললেন, سِيرُوا عَلَى بَرَكَةِ اللهِ وَأَبْشِرُوا، فَإِنَّ اللهَ تَعَالَى قَدْ وَعَدَنِي إحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ واللهِ لَكَأَنِّي الْآنَ أَنْظُرُ إلَى مَصَارِعِ الْقَوْمِ‘আল্লাহর রহমতের উপর তোমরা বেরিয়ে পড়ো এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আমাকে দু’টি দলের কোন একটির বিজয় সম্পর্কে ওয়াদা দান করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি এখন ওদের বধ্যভূমিগুলো দেখতে পাচ্ছি’।[ইবনু হিশাম ১/৬১৫; আহমাদ হা/১৮৮৪৭; ছহীহাহ হা/৩৩৪০; তাফসীর ত্বাবারী হা/১৫৭২০ সনদ ছহীহ; ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আনফাল ৮ আয়াত; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৫৯ পৃঃ।]
একথাটি কুরআনে এসেছে এভাবে,
وَإِذْ يَعِدُكُمُ اللهُ إِحْدَى الطَّائِفَتِيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّوْنَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُوْنُ لَكُمْ وَيُرِيْدُ اللهُ أَنْ يُحِقَّ الحَقَّ بِكَلِمَاتِهِ وَيَقْطَعَ دَابِرَ الْكَافِرِيْنَ- لِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ وَلَوْ كَرِهَ الْمُجْرِمُوْنَ- (الأنفال ৭-৮)
‘আর যখন আল্লাহ দু’টি দলের একটির ব্যাপারে তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, সেটি তোমাদের হস্তগত হবে। আর তোমরা কামনা করছিলে যে, যাতে কোনরূপ কণ্টক নেই, সেটাই তোমাদের ভাগে আসুক (অর্থাৎ বিনা যুদ্ধে তোমরা জয়ী হও)। অথচ আল্লাহ চাইতেন সত্যকে স্বীয় কালামের মাধ্যমে (প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে) সত্যে পরিণত করতে এবং কাফিরদের মূল কর্তন করে দিতে’। ‘যাতে তিনি সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে দেন, যদিও পাপাচারীরা এটাকে অপছন্দ করে’ (আনফাল ৮/৭-৮)।
পরামর্শ সভায় আবু আইয়ূব আনছারীসহ কিছু ছাহাবী বাস্তব অবস্থার বিবেচনায় এবং এই অপ্রস্ত্তত অবস্থায় যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। কেননা তাঁরা এসেছিলেন বাণিজ্য কাফেলা আটকানোর জন্য, বড় ধরনের কোন যুদ্ধ করার জন্য নয়। কিন্তু আল্লাহ এতে নাখোশ হয়ে আয়াত নাযিল করেন,
كَمَا أَخْرَجَكَ رَبُّكَ مِنْ بَيْتِكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ فَرِيْقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِيْنَ لَكَارِهُوْنَ- يُجَادِلُوْنَكَ فِي الْحَقِّ بَعْدَ مَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُوْنَ إِلَى الْمَوْتِ وَهُمْ يَنْظُرُوْنَ- (الأنفال ৫-৬)-
‘যেমনভাবে তোমাকে তোমার গৃহ থেকে তোমার পালনকর্তা বের করে এনেছেন সত্য সহকারে। অথচ মুমিনদের একটি দল তাতে অনীহ ছিল’। ‘তারা তোমার সাথে বিবাদ করছিল সত্য বিষয়টি (অর্থাৎ যুদ্ধ) প্রকাশিত হওয়ার পর। তাদেরকে যেন মৃত্যুর দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং তারা যেন তা স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে’। [আনফাল ৮/৫-৬; ঐ, তাফসীর ইবনে কাছীর; ফাৎহুল বারী হা/৩৭৩৬ ‘তাফসীর’ অধ্যায়; হায়ছামী বলেন, ত্বাবারাণী বলেছেন, সনদ হাসান।] অর্থাৎ অসত্যকে প্রতিহত করার জন্য ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নবীকে তার পালনকর্তা যেভাবে মদীনার গৃহ থেকে বের করে এনেছেন, তেমনিভাবে তিনি কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্ত্ততির জন্য এখন যা কিছু করছেন, সবই আল্লাহর হুকুমে করছেন। অতএব তোমাদের উচিত তাকে পূর্ণ সহযোগিতা করা। এভাবে আল্লাহ কোনরূপ পূর্ব ঘোষণা ও প্রয়োজনীয় প্রস্ত্ততি ছাড়াই উভয় বাহিনীকে মুখোমুখি করে দিলেন। যার মধ্যে ছিল তাঁর একটি অত্যন্ত দূরদর্শী পরিকল্পনা। যেমন আল্লাহ বলেন,
إِذْ أَنْتُمْ بِالْعُدْوَةِ الدُّنْيَا وَهُمْ بِالْعُدْوَةِ الْقُصْوَى وَالرَّكْبُ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَلَوْ تَوَاعَدْتُمْ لاَخْتَلَفْتُمْ فِي الْمِيعَادِ وَلَكِنْ لِيَقْضِيَ اللهُ أَمْرًا كَانَ مَفْعُولاً لِيَهْلِكَ مَنْ هَلَكَ عَنْ بَيِّنَةٍ وَيَحْيَى مَنْ حَيَّ عَنْ بَيِّنَةٍ وَإِنَّ اللهَ لَسَمِيعٌ عَلِيمٌ
‘স্মরণ কর, যখন তোমরা (মদীনার) নিকট প্রান্তে ছিলে এবং কাফের বাহিনী ছিল দূরপ্রান্তে। আর (আবু সুফিয়ানের ব্যবসায়ী) কাফেলা ছিল তোমাদের নিম্নভূমিতে। যদি তোমরা উভয় দল আগে থেকে যুদ্ধের ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ হ’তে, তাহ’লে (সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে) তোমরা সে ওয়াদা রক্ষায় মতবিরোধ করতে। কিন্তু আল্লাহ (উভয় দলকে যুদ্ধে সমবেত করার) এমন একটি কাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন, যা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। এটা এজন্য যাতে যে ধ্বংস হয় সে যেন (ইসলামের) সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ধ্বংস হয় এবং যে বেঁচে থাকে সে যেন সত্য প্রতিষ্ঠার পর বেঁচে থাকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী’ (আনফাল ৮/৪২)।
পরামর্শ সভায় সবধরনের মতামত আসতে পারে। এটা কোন দোষের ছিল না। কিন্তু ছাহাবায়ে কেরামের উচ্চ মর্যাদার সঙ্গে এই সামান্যতম ভীরুতাকেও আল্লাহ পসন্দ করেননি। তাই উপরোক্ত ধমকিপূর্ণ আয়াত নাযিল হয়। যা ছাহাবায়ে কেরামের ঈমান শতগুণে বৃদ্ধি করে।
পরামর্শ সভায় যুদ্ধে অগ্রগমনের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর আবু লুবাবাহ ইবনু আব্দিল মুনযিরকে ‘আমীর’ নিযুক্ত করে মদীনায় ফেরৎ পাঠানো হয়। অতঃপর কাফেলার মূল পতাকা বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয় মদীনায় প্রথম দাঈ মুছ‘আব বিন ওমায়ের (রাঃ)-কে। ইতিপূর্বেকার সকল পতাকার ন্যায় আজকের এ পতাকাও ছিল শ্বেত বর্ণের। ডান বাহুর সেনাপতি নিযুক্ত হন যুবায়ের ইবনুল ‘আওয়াম এবং বাম বাহুর জন্য মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রাঃ)। পুরা বাহিনীতে এ দু’জনেরই মাত্র দু’টি ঘোড়া ছিল। পশ্চাদ্ভাগের সেনাপতি নিযুক্ত হন ক্বায়েস বিন আবু ছা‘ছা‘আহ (রাঃ)। এতদ্ব্যতীত মুহাজিরগণের পতাকা বাহক হন আলী (রাঃ) এবং আনছারগণের সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ) অথবা হুবাব ইবনুল মুনযির। উভয় পতাকাই ছিল কালো রংয়ের। আর সার্বিক কম্যান্ডের দায়িত্বে থাকেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)। [আর-রাহীক্ব ২০৪-০৫ পৃঃ; ইবনু হিশাম ১/৬১২-১৩; আল-বিদায়াহ ৩/২৬০; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৫৬।]
কুরায়েশ বাণিজ্য কাফেলার অবস্থা
কুরায়েশ বাণিজ্য কাফেলার নেতা আবু সুফিয়ান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পথ চলছিলেন। যাকেই পেতেন, তাকেই মদীনা বাহিনী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। তিনি একটি সূত্রে জানতে পারলেন যে, কাফেলার উপরে হামলা করার জন্য মুহাম্মাদ নির্দেশ দিয়েছেন। এ সংবাদে ভীত হয়ে তিনি যামযাম বিন আমর আল-গিফারী(ضَمْضم بن عمرو) কে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন, যাতে দ্রুত সাহায্যকারী বাহিনী পৌঁছে যায়। এরপর বদর প্রান্তর অতিক্রম করার আগেই তিনি কাফেলা থামিয়ে দিয়ে নিজে অগ্রসর হন এবং মাজদী বিন আমর(مَجْدِى بن عمرو) এর কাছে মদীনা বাহিনীর খবর নেন। তার কাছে জানতে পারেন যে, দু’জন উষ্ট্রারোহীকে তারা দেখেছিল, যারা টিলার পাশে তাদের উট বসিয়ে মশকে পানি ভরে নিয়ে চলে গেছে। সুচতুর আবু সুফিয়ান সঙ্গে সঙ্গে টিলার পাশে গিয়ে উটের গোবর থেকে খেজুরের আঁটি খুঁজে বের করে বুঝে নেন যে, এটি মদীনার উটের গোবর। ব্যস! তখনই ফিরে এসে কাফেলাকে নিয়ে বদরকে বামে রেখে মূল রাস্তা ছেড়ে ডাইনে পশ্চিম দিকে উপকূলের পথ ধরে দ্রুত চলে গেলেন। এভাবে তিনি স্বীয় কাফেলাকে মদীনা বাহিনীর কবল থেকে বাঁচিয়ে নিতে সক্ষম হ’লেন। অতঃপর তিনি নিরাপদে পার হয়ে আসার খবর মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। যাতে ইতিপূর্বে পাঠানো খবরের কারণে তারা অহেতুক যুদ্ধে বের না হয়। [আর-রাহীক্ব ২০৭ পৃঃ; ইবনু হিশাম ১/৬১৮।]
মাক্কী বাহিনীর অগ্রযাত্রা
আবু সুফিয়ানের প্রথম পত্র পেয়ে বাণিজ্য কাফেলা উদ্ধারের জন্য ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবু জাহলের নেতৃত্বে ১৩০০ মাক্কী ফৌজ রওয়ানা হয়ে যায়। অতঃপর রাবেগ-এর পূর্ব দিকে জুহফা নামক স্থানে পৌঁছলে পত্রবাহকের মাধ্যমে আবু সুফিয়ানের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের খবর পেয়ে বাহিনীর সবাই মক্কায় ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু আবু জাহলের দম্ভের সামনে কারু মতামত গ্রাহ্য হ’ল না। তবু তার আদেশ অমান্য করে আখনাস বিন শারীক্ব আছ-ছাক্বাফী(الْأَخْنَسُ بْنُ شَرِيق الثَّقَفِيُّ)-এর নেতৃত্বে বনু যোহরা(بَنُو زُهْرَة) গোত্রের ৩০০ লোক মক্কায় ফিরে গেল। আখনাস ছিলেন ত্বায়েফের ছাক্বীফ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তিনি ছিলেন বনু যোহরা গোত্রের মিত্র ও নেতা। তাঁর এই দূরদর্শিতার কারণে তিনি উক্ত গোত্রে আজীবন সম্মানিত নেতা হিসাবে বরিত ছিলেন। বনু হাশেমও ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু মুহাম্মাদ-এর স্বগোত্র হওয়ায় তাদের উপরে আবু জাহলের কঠোরতা ছিল অন্যদের চেয়ে বেশী। ফলে তারা ক্ষান্ত হন।
উল্লেখ্য যে, আলী (রাঃ)-এর বড় ভাই ত্বালিব বিন আবু ত্বালিব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও জনৈক কুরায়েশ নেতার সাথে বাদানুবাদের প্রেক্ষিতে প্রত্যাবর্তনকারীদের সাথে মক্কায় ফিরে যান (ইবনু হিশাম ১/৬১৯)।
অতঃপর আবু জাহল বদর অভিমুখে রওয়ানা হন এবং দর্পভরে বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা বদরে যাব ও সেখানে তিনদিন থাকব ও আমোদ-ফূর্তি করে পান ভোজন করব। এর ফলে সমগ্র আরব জাতির উপরে আমাদের শক্তি প্রকাশিত হবে ও সকলে ভীত হবে। এই সময় সব মিলিয়ে মাক্কী বাহিনীতে এক হাযার ফৌজ ছিল। তন্মধ্যে দু’শো অশ্বারোহী, ছয়শো লৌহবর্ম ধারী এবং গায়িকা বাঁদী দল তাদের বাদ্যযন্ত্রাদি সহ ছিল। প্রতি মনযিলে খাদ্যের জন্য তারা ৯টি বা ১০টি করে উট যবেহ করত।
উল্লেখ্য যে, আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলায় সকল গোত্রের লোকদের মালামাল ছিল। তাছাড়া মাক্কী বাহিনীতে বনু ‘আদী ব্যতীত কুরায়েশদের সকল গোত্রের লোক বা তাদের প্রতিনিধি যোগদান করেছিল। অথবা যোগদানে বাধ্য করা হয়েছিল। যেমন রাসূল (ছাঃ)-এর চাচা আববাস, হযরত আলীর দু’ভাই ত্বালেব ও ‘আক্বীল। রাসূল (ছাঃ)-এর জামাতা আবুল ‘আছ সহ বনু হাশেমের লোকেরা। তারা আসতে অনিচ্ছুক ছিলেন। নেতাদের মধ্যে কেবল আবু লাহাব যাননি। তিনি তার বদলে তার কাছে ঋণগ্রস্ত একজন ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিলেন।[ইবনু হিশাম ১/৬১৮-১৯; আল-বিদায়াহ ৩/২৬০।]
রওয়ানাকালে আবু জাহল এর দোয়া
আবু জাহল মক্কা থেকে রওয়ানার সময় দলবল নিয়ে কা‘বাগৃহের গেলাফ ধরে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করেছিল, اللَّهُمَّ انْصُرْ أَقْرَانَا لِلضَّيْفِ وَأَوْصَلَنَا لِلرَّحِمِ وَأَفَكَّنَا لِلْعَانِيْ، إِنْ كَانَ مُحَمَّدٌ عَلَى حَقٍّ فَانْصُرْهُ وَاِنْ كُنَّا عَلَى حَقٍّ فَانْصُرْنَا، وَرُوِي اَنَّهُمْ قَالُوْا : اللهُمَّ انْصُرْ أَعْلَى الْجُنْدَيْنِ وَأَهْدَى الْفِئَتَيْنِ وَاَكْرَمَ الْحِزْبَيْنِ ‘হে আল্লাহ! তুমি সাহায্য কর আমাদের মধ্যেকার সর্বাধিক অতিথি আপ্যায়নকারী, সর্বাধিক আত্মীয়তা রক্ষাকারী ও বন্দী মুক্তি দানকারী দলকে’। ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ যদি সত্যের উপরে থাকে, তবে তুমি তাকে সাহায্য কর। আর যদি আমরা সত্যের উপর থাকি, তবে আমাদেরকে সাহায্য কর’। ‘হে আল্লাহ! তুমি সাহায্য কর আমাদের দু’দলের মধ্যকার সেরা সেনাদলকে, সেরা হেদায়াতপ্রাপ্ত ও সেরা সম্মানিত দলকে’।[তাফসীর কাশশাফ, বাহরুল মুহীত্ব, ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আনফাল ১৯ আয়াত; ইবনু হিশাম ১/৬৬৮; বায়হাক্বী, দালায়েল ৩/৭৪ টীকা-৪ (৩); যাদুল মা‘আদ ৩/১৬০; আল-বিদায়াহ ৩/২৮২।
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আবু জাহল আল্লাহকে সর্বশক্তিমান হিসাবে বিশ্বাস করত। যাকে ‘তওহীদে রুবূবিয়াত’ বলা হয়। এর ফলে কেউ মুসলমান হ’তে পারে না। কেননা মুসলিম হওয়ার জন্য ‘তওহীদে ইবাদত’-এর উপর ঈমান আনা জরূরী। যার মাধ্যমে মানুষ সার্বিক জীবনে আল্লাহর দাসত্ব করতে স্বীকৃত হয়। সেই সাথে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর ঈমান ও তাঁর আনীত শরী‘আতের বিধানসমূহ পালন করা অপরিহার্য।
অতঃপর রওয়ানা হওয়ার সময় তাদের মনে পড়ল বনু বকর গোত্রের কথা। যাদের সঙ্গে তাদের শত্রুতা ছিল। পথিমধ্যে তারা হামলা করতে পারে। ফলে মাক্কী বাহিনী দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। কিন্তু শয়তানী প্ররোচনায় গর্বোদ্ধত হয়ে তারা বেরিয়ে পড়ল।
[প্রসিদ্ধ আছে যে, ইবলীস এ সময় বনু কিনানাহ গোত্রের নেতা সুরাক্বাহ বিন মালেক বিন জু‘শুম আল-মুদলিজীর রূপ ধারণ করে এসে বলল, ‘আমি তোমাদের বন্ধু’ (أَنَا لَكُمْ جَارٌ)। আমি তোমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিচ্ছি। এই আশ্বাস পাওয়ার পর কুরায়েশগণ মদীনা অভিমুখে খুব দ্রুতবেগে বদর প্রান্তরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায় (আর-রাহীক্ব ২০৬ পৃঃ; ইবনু হিশাম ১/৬১২)। বর্ণনাটি ‘মুরসাল’ বা যঈফ (মা শা-‘আ ১০৮ পৃঃ)।] বস্ত্ততঃ আবু জাহল শয়তানের ধোঁকায় পড়েই রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে রওয়ানা হয়েছিল। অতঃপর কুরায়েশ বাহিনী যথারীতি দ্রুতবেগে এসে বদর উপত্যকার শেষপ্রান্তে টিলার অপর পার্শ্বে শিবির সন্নিবেশ করে।
রহমাতাল্লিল আলামিন এর মাদানী বাহিনীর বদরে উপস্থিতি
রাওহাতে অনুষ্ঠিত পরামর্শ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ‘বদর’ অভিমুখে রওয়ানা হন। অতঃপর ‘ছাফরা’ টিলা সমূহ অতিক্রম করে বদর প্রান্তরের নিকটবর্তী স্থানে অবতরণ করেন। সেখান থেকে তিনি বাসবাস বিন আমর আল-জুহানী এবং ‘আদী বিন আবুয যাগবা আল-জুহানীকে বদরের খবরাখবর নেবার জন্য পাঠান’ (মুসলিম হা/১৯০১)।
এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী, যুবায়ের ও সা‘দ বিন আবু ওয়াকক্বাছের নেতৃত্বে একটি গোয়েন্দা দল পাঠান শত্রুপক্ষের আরও তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য। তারা গিয়ে দেখেন যে, দু’জন লোক বদরের ঝর্ণাধারা থেকে পানির মশক ভরছে। তাঁরা তাদের পাকড়াও করে নিয়ে এলেন। অতঃপর জিজ্ঞাসাবাদে ও সামান্য পিটুনী দেওয়ার পরে জানতে পারলেন যে, এরা আবু সুফিয়ানের লোক নয়। বরং তারা কুরায়েশ বাহিনীর লোক। কুরায়েশ বাহিনী উপত্যকার শেষপ্রান্তে টিলার অপর পার্শ্বে শিবির গেড়েছে। তাদের জন্য সে উটের পিঠে করে পানি বহন করে নিয়ে যাচ্ছে’।[ইবনু হিশাম ১/৬১৬; যাদুল মা‘আদ ৩/১৫৬।] তারপর ওদের নেতৃবর্গের নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি আবু জাহল, উৎবা, শায়বা, উমাইয়া বিন খালাফ প্রমুখ মক্কার সেরা ব্যক্তিবর্গের নামগুলি জানতে পারেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘এইটি অমুকের নিহত হওয়ার স্থান, এইটি অমুকের নিহত হওয়ার স্থান’। রাবী আনাস (রাঃ) বলেন, ‘তাদের নিহতদের কেউই উক্ত ইশারার স্থান থেকে দূরে যেতে পারেনি’। [মুসলিম হা/১৭৭৯; আবুদাঊদ হা/২৬৮১।] তবে তারা সঠিক সংখ্যা বলতে পারল না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, দৈনিক কয়টা উট যবহ করা হয়? তারা বলল, নয়টা অথবা দশটা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তাহ’লে ওদের সংখ্যা নয়শত অথবা হাযার-এর মধ্যে হবে। কেননা একটি উট ১০০ জনের বা তার কাছাকাছিদের জন্য। [আহমাদ হা/৯৪৮, সনদ ছহীহ; ইবনু হিশাম ১/৬১৬-১৭।]
এরপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশে মুসলিম বাহিনী দ্রুত গিয়ে এশার সময় বদরের উপরে দখল নিল, যা ছিল ঝর্ণাধারার পাশেই। অতঃপর আউস নেতা সা‘দ বিন মু‘আয (রাঃ)-এর প্রস্তাবক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর-পূর্ব পার্শ্বে একটি উঁচু টিলার উপরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য তাঁবুর (عَرِيْشٌ) ব্যবস্থা করা হ’ল। সেখানে তাঁর সাথে কেবল আবুবকর (রাঃ) রইলেন এবং পাহারায় রইলেন সা‘দ বিন মু‘আয-এর নেতৃত্বে একদল আনছার যুবক। সা‘দ সেখানে বিশেষ সওয়ারীও প্রস্ত্তত রাখলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বললেন, যদি আমরা যুদ্ধে পরাজিত হই, তাহ’লে আপনি এই সওয়ারীতে করে দ্রুত মদীনায় চলে যাবেন। কেননা فَقَدْ تَخَلَّفَ عَنْكَ أَقْوَامٌ، يَا نَبِيَّ اللهِ، مَا نَحْنُ بِأَشَدَّ لَكَ حُبًّا مِنْهُمْ … يَمْنَعُكَ اللهُ بِهِمْ، يُنَاصِحُونَكَ وَيُجَاهِدُونَ مَعَكَ ‘সেখানে রয়েছে হে আল্লাহর নবী! আপনার জন্য আমাদের চাইতে অধিক জীবন উৎসর্গকারী একদল ভাই। আপনাকে ভালোবাসায় আমরা তাদের চাইতে অধিকতর অগ্রগামী নই। যারা যুদ্ধে কখনোই আপনার থেকে পিছনে থাকবে না। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে আপনাকে হেফাযত করবেন। তারা আপনার শুভাকাংখী এবং তারা আপনার সঙ্গে থেকে জিহাদ করবে’। সা‘দের এ বীরত্বব্যঞ্জক কথায় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) অত্যন্ত প্রীত হ’লেন ও তার জন্য কল্যাণের দো‘আ করলেন(دَعَا لَهُ بِخَيْرٍ)। [ইবনু হিশাম ১/৬২০-২১; আর-রাহীক্ব ২১১-১২ পৃঃ; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৬২।]
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যুদ্ধ কৌশল অনুযায়ী সেনাদলকে বিন্যস্ত করেন এবং সুষ্ঠুভাবে শিবির সন্নিবেশ করেন।
(১) প্রসিদ্ধ আছে যে, এ সময়ে রাসূল (ছাঃ) বলে ওঠে هَذِهِ مَكَّةُ قَدْ أَلْقَتْ إلَيْكُمْ أَفْلاَذَ كَبِدِهَا-‘এই যে মক্কা তার কলিজার টুকরাগুলোকে তোমাদের কাছে নিক্ষেপ করেছে’ বর্ণনাটির সনদ ‘মুরসাল’ (আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ২২২ পৃঃ; মা শা-‘আ ১০৬ পৃঃ)।
(২) আরও প্রসিদ্ধ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বদরে পৌঁছে শত্রুবাহিনীর তথ্য জানার জন্য পায়ে হেঁটে নিজেই রওয়ানা হন আবুবকর (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে। সেখানে এক বৃদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ হ’লে তিনি তার কাছে উভয় বাহিনী সম্পর্কে জানতে চান। বৃদ্ধ তাদেরকে তারা কোন বাহিনীর লোক সেকথা জানানোর শর্তে তথ্য দিল যে, আমি রওয়ানা হবার যে সংবাদ পেয়েছি, তাতে মুহাম্মাদের বাহিনী আজকে অমুক স্থানে রয়েছে এবং কুরায়েশ বাহিনী অমুক স্থানে রয়েছে। বৃদ্ধের অনুমান সঠিক ছিল। এবার শর্তানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জবাব দিলেন, نَحْنُ مِنْ مَاءٍ ‘আমরা একই পানি হ’তে’ (অর্থাৎ একই বংশের)। রাসূল (ছাঃ)-এর এই ইঙ্গিতপূর্ণ জবাবে বৃদ্ধ কিছুই বুঝতে না পেরে বিড় বিড় করতে করতে চলে গেল (ইবনু হিশাম ১/৬১৬; আর-রাহীক্ব ২১০ পৃঃ)। বর্ণনাটির সনদ মুনক্বাতি‘ (যঈফ), মা শা-‘আ ১০৫ পৃঃ।
প্রসিদ্ধ আছে যে, এ সময় সামরিক বিষয়ে দক্ষ ছাহাবী হুবাব ইবনুল মুনযির ইবনুল জামূহ (حُباب بن المنذر ابن الجموح) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! এখানে কি আল্লাহর নির্দেশক্রমে অবতরণ করলেন, না-কি যুদ্ধকৌশল হিসাবে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যুদ্ধকৌশল মনে করে’। তখন তিনি বললেন, ‘এটি উপযুক্ত স্থান নয়। কেননা এখান থেকে আগে বা পিছে যাবার কোন সুযোগ নেই’। অতএব আরো এগিয়ে কুরায়েশ শিবিরের নিকটবর্তী প্রস্রবণটি আমাদের দখলে নিতে হবে এবং সবগুলি ঝর্ণাস্রোত ঘুরিয়ে এক জায়গায় এনে পানি এক স্থানে সঞ্চয় করতে হবে। কুরায়েশরা টিলার মাথায় উচ্চভূমিতে অবস্থান করছে। যুদ্ধ শুরু হ’লে পানির প্রয়োজনে ওরা নীচে এসে আর পানি পাবে না। তখন পানির সঞ্চয়টি থাকবে আমাদের দখলে’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং এগিয়ে গিয়ে কুরায়েশ বাহিনীর নিকটবর্তী পানির প্রস্রবণটি দখলে নিলেন। তারপর অন্যান্য সব ব্যবস্থা শেষ করলেন (ইবনু হিশাম ১/৬২০; আর-রাহীক্ব ২১১ পৃঃ; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৬০)। হুবাবের পরামর্শদানের পর জিব্রীল অবতরণ করেন ও রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, হুবাবের উক্ত রায় সঠিক’ (ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আনফাল ৭ আয়াত)। উক্ত মর্মের বর্ণনাগুলির সনদ ‘মুনকার’ ও যঈফ (আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ২২৪ পৃঃ; মা শা-‘আ ১১০ পৃঃ)। বরং ছহীহ হাদীছসমূহ দ্বারা এটাই প্রমাণিত যে, রাসূল (ছাঃ) তাঁর ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শক্রমেই যুদ্ধকৌশল নির্ধারণ করেছিলেন। ‘অহি’ বহির্ভূত সকল বিষয়ে তিনি এভাবেই সিদ্ধান্ত নিতেন।
বর্ষাস্নাত রাত্রি ও গভীর নিদ্রা
বদর যুদ্ধের পূর্বরাত। সৈন্যদের শ্রেণীবিন্যাস শেষ হয়েছে। সবাই ক্লান্ত-শ্রান্ত। হঠাৎ সামান্য বৃষ্টি এলো। মুসলিম বাহিনী কেউ গাছের নীচে কেউ ঢালের নীচে ঘুমে এলিয়ে পড়ল। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বাহিনীর সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল এবং যুদ্ধের জন্য দেহমন প্রস্ত্তত হয়ে গেল। বালু-কংকর সব জমে দৃঢ় হয়ে গেল। ফলে চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য এল। সেই সাথে অধিকহারে বৃষ্টির পানি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেল।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, إِذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ أَمَنَةً مِّنْهُ وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُم مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِّيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَانِ وَلِيَرْبِطَ عَلَى قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الأَقْدَامَ ‘স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন তিনি তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন এবং তোমাদের উপরে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে পবিত্র করার জন্য, তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূরীভূত করার জন্য, তোমাদের হৃদয়গুলি পরস্পরে আবদ্ধ করার জন্য এবং তোমাদের পাগুলিকে দৃঢ় রাখার জন্য’ (আনফাল ৮/১১)।
শয়তানের কুমন্ত্রণা এই যে, সে যেন দুর্বলচিত্ত মুসলমানদের মধ্যে এই প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেবার সুযোগ না পায় যে, আমরা যদি ন্যায় ও সত্যের পথে থাকব এবং আমরা যদি আল্লাহর বন্ধু হই, তাহ’লে আমরা এই নিম্নভূমিতে ধূলি-কাদার মধ্যে কেন থাকব? এটি নিঃসন্দেহে আমাদের পরাজয়ের লক্ষণ। অথচ কুরায়েশরা কাফের হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ ভূমিতে আছে। তারা উট যবেহ করে খাচ্ছে আর ফূর্তি করছে। এটা নিশ্চয়ই তাদের জন্য বিজয়ের লক্ষণ। সকালেই যেখানে যুদ্ধের সম্মুখীন হ’তে হবে, সেখানে রাতেই যদি সংখ্যালঘু মুসলিম বাহিনীর মধ্যে এ ধরনের বিভ্রান্তি ঢুকে যায়, তাহ’লে সেটা সমূহ ক্ষতির কারণ হবে। সেকারণ আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করে দিলেন। ফলে ঘুম থেকে উঠে প্রফুল্লচিত্তে সবাই যুদ্ধে জয়ের জন্য একাট্টা হয়ে দ্রুত প্রস্ত্তত হয়ে গেল।
আলী (রাঃ) বলেন যে, বদর যুদ্ধের রাতে এমন কেউ বাকী ছিল না যে, যিনি ঘুমাননি। কেবল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ব্যতীত। তিনি সারা রাত জেগে ছালাতে রত থাকেন। তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বারবার স্বীয় প্রভুর নিকট দো‘আ করতে থাকেন, اللَّهُمَّ إِنَّكَ إِنْ تُهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةَ لاَ تُعْبَدْ فِى الأَرْضِ أَبَداً ‘হে আল্লাহ! যদি তুমি এই দলকে ধ্বংস করে দাও, তাহ’লে জনপদে তোমার ইবাদত করার আর কেউ থাকবে না’। অতঃপর সকাল হলে তিনি সবাইকে ডাকেন, الصَّلاَةَ عِبَادَ اللهِ ‘আল্লাহর বান্দারা! ছালাত’। অতঃপর সবাই জমা হ’লে তিনি ফজরের জামা‘আত শেষে সবাইকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেন’।[আহমাদ হা/২০৮, ৯৪৮; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৬০ পৃঃ।]
আলী (রাঃ) বলেন, لَقَدْ رَأَيْتُنَا يَوْمَ بَدْرٍ وَنَحْنُ نَلُوذُ بِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم- وَهُوَ أَقْرَبُنَا إِلَى الْعَدُوِّ وَكَانَ مِنْ أَشَدِّ النَّاسِ يَوْمَئِذٍ بَأْساً ‘বদরের যুদ্ধের দিন আমরা সকলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকটে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তিনি আমাদের মধ্যে শত্রুর সর্বাধিক নিকটবর্তী ছিলেন এবং আমাদের সকলের চাইতে সর্বাধিক বড় যোদ্ধা ছিলেন’ (আহমাদ হা/৬৫৪, সনদ ছহীহ)।
মাক্কী বাহিনীর দিশাহারা অবস্থা
প্রত্যুষে কুরায়েশ বাহিনী পাহাড় থেকে নীচে অবতরণ করে হতবাক হয়ে গেল। পানির উৎসের উপরে রাতারাতি মুসলিম বাহিনীর দখল কায়েম হয়ে গেছে। হাকীম বিন হেযাম সহ অতি উৎসাহী কয়েকজন কুরায়েশ সেনা সরাসরি রাসূল (ছাঃ)-এর টিলার সম্মুখস্থ পানির হাউযের দিকে অগ্রসর হ’ল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের ছেড়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। ফলে যারা সেখান থেকে পানি পান করল, তারা সবাই পরে যুদ্ধে নিহত হ’ল। একমাত্র হাকীম পান করেননি। তিনি বেঁচে যান। পরে তিনি পাক্কা মুসলিম হয়ে যান। এ ঘটনাকে স্মরণ করে হাকীম বিন হেযাম শপথ করার সময় সর্বদা বলতেন لاَ وَالَّذِي نَجَّانِي يَوْمَ بَدْرٍ ‘ঐ সত্তার কসম! যিনি আমাকে বদরের দিন রক্ষা করেছেন’। ঘটনাটি বহু পূর্বেকার তালূত বাহিনীর ঘটনার সাথে তুলনীয়। সেদিন যারা নদীর পানি পান করেছিল, তাদের কেউই তালূতের সাথে জালূতের বিরুদ্ধে জিহাদে শরীক হ’তে পারেনি’।[ইবনু হিশাম ১/৬২২; আল-বিদায়াহ ৩/২৬৮; সূরা বাক্বারাহ ২/২৪৯ আয়াত।]
কুরায়েশ নেতারা অবস্থার ভয়াবহতা বুঝতে পারল এবং নিজেদের বোকামিতে দুঃখে-ক্ষোভে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। তারা মুসলিম বাহিনীর অবস্থা ও সংখ্যা নিরূপণের জন্য ওমায়ের বিন ওয়াহাব আল-জুমাহী নামক একজন অশ্বারোহীকে প্রেরণ করল। সে গিয়ে মুসলিম বাহিনীর চারদিক প্রদক্ষিণ করে এসে বলল, তিন শো বা তার কিছু কমবেশী হবে’। তবে আরেকটু সময় দাও, আমি দেখে আসি, ওদের পিছনে কোন সাহায্যকারী সেনাদল আছে কি-না। সে আবার ছুটলো এবং বহু দূর ঘুরে এসে বলল, ওদের পিছনে কাউকে দেখলাম না। তবে সে বলল,يَا مَعْشَرَ قُرَيْشٍ: الْبَلاَيَا تَحْمِلُ الْمَنَايَا … لَيْسَ مَعَهُمْ مَنَعَةٌ وَلاَ مَلْجَأٌ إلاَّ سُيُوفُهُمْ ‘হে কুরায়েশগণ, বিপদ এসেছে মৃত্যুকে সাথে নিয়ে। … তাদের সাথে কোন শক্তি নেই বা কোন আশ্রয় নেই কেবল তাদের তরবারি ছাড়া’। অতএব واللهِ مَا أَرَى أَنْ يُقْتَلَ رَجُلٌ مِنْهُمْ حَتّى يَقْتُلَ رَجُلاً مِنْكُمْ … فَرُوا رَأْيَكُمْ ‘আল্লাহর কসম, তোমাদের একজন নিহত না হওয়া পর্যন্ত তাদের একজন নিহত হবে না’। … অতএব তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর’।[ইবনু হিশাম ১/৬২২; সনদ জাইয়িদ; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৫৯ পৃঃ।] তার এ রিপোর্ট শুনে হাকীম বিন হেযাম বয়োজ্যেষ্ঠ কুরায়েশ নেতা উৎবা বিন রাবী‘আহর কাছে এসে যুদ্ধ না করে ফিরে যাবার ব্যাপারে বুঝাতে লাগলেন। তিনি রাযী হ’লেন। এমনকি ইতিপূর্বে নাখলা যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে রজবের শেষ দিনে হারাম মাসে নিহত আমর ইবনুল হাযরামীর রক্তমূল্য তিনি নিজ থেকে দিতে চাইলেন। উৎবা বললেন, সমস্যা হ’ল ইবনুল হানযালিয়াহকে নিয়ে (আবু জাহলের মায়ের নাম ছিল হানযালিয়াহ)। তুমি তার কাছে যাও।
অতঃপর উৎবা দাঁড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, হে কুরায়েশগণ! মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের সঙ্গে যুদ্ধ করায় তোমাদের কোন গৌরব নেই। কেননা তাতে তোমরা তোমাদের চাচাতো ভাই বা খালাতো ভাই বা মামাতো ভাইয়ের বা নিজ গোত্রের লোকদের রক্তাক্ত চেহারা দেখবে, যা তোমাদের কাছে মোটেই পসন্দনীয় হবে না।فَارْجِعُوا وَخَلُّوا بَيْنَ مُحَمَّدٍ وَبَيْنَ سَائِرِ الْعَرَبِ ‘অতএব তোমরা ফিরে চল এবং মুহাম্মাদ ও গোটা আরব দুনিয়াকে ছেড়ে দাও। যদি তারা তাকে মেরে ফেলে, তবে সেটা তাই-ই হবে, যা তোমরা চেয়েছিলে। আর যদি তা না হয়, তাহ’লে সে তোমাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এজন্য যে, তোমরা তার সাথে সেরূপ ব্যবহার করোনি, যেরূপ তোমরা চেয়েছিলে’।
এদিকে হাকীম বিন হেযাম আবু জাহলের কাছে গিয়ে নিজের ও উৎবার মতামত ব্যক্ত করে মক্কায় ফিরে যাবার জন্য তাকে অনুরোধ করলেন। এতে আবু জাহল ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বলে উঠলেন, انتفخَ واللهِ سَحْرُهُ ‘আল্লাহর কসম! উৎবার উপরে মুহাম্মাদের জাদু কার্যকর হয়েছে’।كَلاَّ واللهِ لاَ نَرْجِعُ حَتَّى يَحْكُمَ اللهُ بَيْنَنَا وَبَيْنَ مُحَمَّدٍ ‘কখনোই না। আল্লাহর কসম! আমরা ফিরে যাব না, যতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের ও মুহাম্মাদের মাঝে একটা ফায়ছালা করে দেন’। তিনি বললেন, ‘এতক্ষণে বুঝলাম যে, উৎবার পুত্র আবু হুযায়ফা যে মুসলমান হয়ে হিজরত করে আগে থেকেই মুহাম্মাদের দলে রয়েছে এবং যুদ্ধ বাধলে সে নিহত হবে, সেই ভয়ে উৎবা যুদ্ধ না করেই ফিরে যেতে চাচ্ছে’।
হাকীমের কাছ থেকে আবু জাহলের এইসব কথা শুনে উৎবার বিচারবুদ্ধি লোপ পেল। তার সুপ্ত পৌরুষ জেগে উঠলো। ক্ষুব্ধ চিৎকারে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ছুটে চললেন। ওদিকে আবু জাহল ‘আমের ইবনুল হাযরামীকে গিয়ে বললেন, দেখছ কি! তোমার ভাই আমরের রক্তের প্রতিশোধ আর নেওয়া হ’ল না। ঐ দেখ কাপুরুষ উৎবা পালাচ্ছে। শীঘ্র উঠে আর্তনাদ শুরু কর’। একথা শোনা মাত্র ‘আমের তার সারা দেহে ধুলো-বালি মাখতে মাখতে এবং গায়ের কাপড় ছিঁড়তে ছিঁড়তে নাখলা যুদ্ধে নিহত ভাই ‘আমর ইবনুল হাযরামীর নামে واعَمْراه واعَمْراه (হায় আমর! হায় আমর!) বলে আর্তনাদ করে বেড়াতে লাগল। আর যায় কোথায়। মুহূর্তের মধ্যে মুশরিক শিবিরে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠল। রণোন্মত্ত কুরায়েশ বাহিনী যুদ্ধের ময়দানে ছুটে চলল।[ইবনু হিশাম ১/৬২৩; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৩/২৬৯।] হাকীম বিন হেযামের সকল প্রচেষ্টা ভন্ডুল হয়ে গেল কেবলমাত্র আবু জাহলের হঠকারিতা ও ধূর্তামির কারণে। [তারীখু ত্বাবারী ২/৪৪৩, ৪২৪-২৫; সনদ হাসান; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৫৯ পৃঃ।]
এ সময় রাসূল (ছাঃ) লাল উটের উপরে সওয়ার উৎবা বিন রাবী‘আহর দিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, إنْ يُطِيْعُوهُ يَرْشُدُوْا ‘যদি তার দল তার আনুগত্য করত, তাহ’লে তারা সঠিক পথে থাকতো’ (ইবনু হিশাম ১/৬২১)। অর্থাৎ যদি তারা উৎবাহর কথামত মক্কায় ফিরে যেত, তাহ’লে তাদের মঙ্গল হ’ত। এর মধ্যে রাসূল (ছাঃ)-এর শান্তিবাদী নীতি ফুটে ওঠে।
আবু জাহলের দ্বিতীয়বার দো‘আ
মাক্কী বাহিনী যখন মাদানী বাহিনীর নিকটবর্তী হ’ল, তখন আবু জাহল আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করে বললেন,اللَّهُمَّ أَقْطَعُنَا لِلرَّحِمِ وَآتَانَا بِمَا لاَ نَعْرِفُ فَأَحِنْهُ الْغَدَاةَ اي فأهلكه ‘হে আল্লাহ! আমাদের উভয়দলের মধ্যে যে দল অধিক আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং আমাদের নিকট এমন বস্ত্ত (কুরআন) আনয়নকারী যা আমরা জানি না, তুমি তাকে ধ্বংস করে দাও’! [ হাকেম হা/৩২৬৪, ২/৩২৮; সনদ ছহীহ; ইবনু হিশাম ১/৬২৮; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা হা/৩৭৮২৯; তাফসীর কাশশাফ প্রভৃতি।] অন্য বর্ণনায় এসেছে, যুদ্ধের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, اللهُمَّ أَيَّنَا كَانَ أَحَبُّ إلَيْكَ وَأَرْضَى عِنْدَكَ فَانْصُرْهُ الْيَوْمَ اللَّهُمَّ اَوْلاَنَا بِالْحَقِّ فَانْصُرْهُ الْيَوْمَ ‘হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে তোমার নিকটে সর্বাধিক প্রিয় ও তুমি যার প্রতি সর্বাধিক সন্তুষ্ট, আজ তুমি তাকে সাহায্য কর। হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দল সর্বাধিক হক-এর উপরে আছে, তুমি আজ তাকে সাহায্য কর’। [যাদুল মা‘আদ ৩/১৬৫; সীরাহ হালাবিইয়াহ ২/৪১৮; আর-রাহীক্ব পৃঃ ২১৬।]
এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, إِنْ تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ وَإِنْ تَنْتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَإِنْ تَعُودُوا نَعُدْ وَلَنْ تُغْنِيَ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ ‘যদি তোমরা ফায়ছালা চাও, তবে সেটাতো তোমাদের সামনে এসেই গেছে। আর যদি ক্ষান্ত হও, তবে সেটাই তোমাদের জন্য উত্তম। কিন্তু যদি তোমরা ফের আগে বাড়ো, তাহ’লে আমরাও ফিরে আসব। (মনে রেখ) তোমাদের দল যত বড়ই হৌক, তা তোমাদের কোন কাজে আসবেনা। বস্ত্ততঃ আল্লাহ মুমিনদের সাথেই থাকেন’ (আনফাল ৮/১৯)।
বদর প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী সারিবদ্ধ হ’ল
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজের বাহিনীকে দ্রুত প্রস্ত্তত ও সারিবদ্ধ করে ফেললেন। এরি মধ্যে জনৈক সাউয়াদ ইবনু গাযিইয়াহ(سَوَّادُ بنُ غَزِيَّةَ) সারি থেকে কিছুটা আগে বেড়ে এল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার পেটে তীর দিয়ে টোকা মেরে পিছিয়ে যাবার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন,اسْتَوِ يَا سَوَّادُ ‘সমান হয়ে যাও হে সাউয়াদ!’ সাথে সাথে সে বলে উঠলো, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে কষ্ট দিয়েছেন। বদলা দিন! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তখন নিজের পেট আলগা করে দেন ও বদলা নিতে বলেন। তখন সে ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে পেটে চুমু খেতে লাগলো’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, কিজন্য তুমি এরূপ করলে? সে বলল, আমাদের সামনে যে অবস্থা আসছে তাতো আপনি দেখছেন। সেজন্য আমি চেয়েছিলাম যে, আপনার সাথে আমার শেষ আদান-প্রদান যেন এটাই হয় যে, আমার দেহচর্ম আপনার দেহচর্মকে স্পর্শ করুক’। তার এ মর্মস্পর্শী কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার জন্য কল্যাণের দো‘আ করলেন(دَعَا لَهُ بِخَيْرٍ)। [ইবনু হিশাম ১/৬২৬; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৮৩৫; আল-বিদায়াহ ৩/২৭০-৭১।] রাসূল (ছাঃ)-এর এ কাজের মধ্যে মানবিক সাম্যের এক উত্তম নমুনা রয়েছে, যা নিঃসন্দেহে এক ঈর্ষণীয় বিষয়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরকে বললেন, চূড়ান্ত নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ যুদ্ধ শুরু করবে না। ব্যাপকহারে তীরবৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত কেউ তীর ছুঁড়বে না এবং তোমাদের উপরে তরবারি ছেয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তরবারি চালাবে না’। তিনি আরও বলেন, বনু হাশেমকে জোর করে যুদ্ধে আনা হয়েছে। তাদের সাথে আমাদের কোন যুদ্ধ নয়। অতএব তাদের কোন ব্যক্তি সামনে পড়ে গেলে তাকে যেন কেউ আঘাত না করে। আববাসকে যেন হত্যা না করা হয়। অনুরূপভাবে আবুল বাখতারী বিন হেশামকেও হত্যা করো না। কেননা এরা মক্কায় আমাদের কোনরূপ কষ্ট দিত না বরং সাহায্যকারী ছিল।
উল্লেখ্য যে, বনু হাশিমের বিরুদ্ধে কুরায়েশদের বয়কটনামা যারা ছিঁড়ে ফেলেছিল, তাদের একজন ছিলেন আবুল বাখতারী। কিন্তু যুদ্ধে আবুল বাখতারী নিহত হয়েছিলেন তার নিজস্ব হঠকারিতার জন্য। তিনি তার সঙ্গী কাফের বন্ধুকে ছাড়তে চাননি। ফলে যুদ্ধে তারা উভয়ে নিহত হয়। [ইবনু হিশাম ১/৬২৮-৩০; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৬৭ পৃঃ।] অতঃপর রাসূল (ছাঃ) ও আবুবকর (রাঃ) টিলার উপরে সামিয়ানার নীচে নিজ স্থানে চলে যান।
যুদ্ধ যখন শুরু হলো বদরের প্রন্তরে
২য় হিজরীর ১৭ই রামাযান শুক্রবার সকালে যুদ্ধ শুরু হয় (ইবনু হিশাম ১/৬২৬)। ইতিমধ্যে কুরায়েশ পক্ষের জনৈক হঠকারী আসওয়াদ বিন আব্দুল আসাদ আল-মাখযূমী দৌড়ে এসে বলল, আমি এই হাউয থেকে পানি পান করব অথবা একে ভেঙ্গে ফেলব অথবা এখানেই মরব’। তখন হামযা (রাঃ) এসে তার পায়ে আঘাত করলেন। এমতাবস্থায় সে পা ঘেঁষতে ঘেঁষতে হাউযের দিকে এগোতে লাগল। হামযা তাকে দ্বিতীয় বার আঘাত করলে সে হাউযেই মরে পড়ল ও তার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ হ’ল। এরপর যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠলো এবং সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী কুরায়েশ পক্ষ মুসলিম পক্ষের বীর যোদ্ধাদের দ্বৈতযুদ্ধে আহবান করল। তাদের একই পরিবারের তিনজন সেরা অশ্বারোহী বীর উৎবা ও শায়বাহ বিন রাবী‘আহ এবং অলীদ বিন উৎবা এগিয়ে এল। জবাবে মুসলিম পক্ষ হ’তে মু‘আয ও মু‘আবিবয বিন ‘আফরা কিশোর দুই ভাই এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাসহ তিনজন আনছার তরুণ বীরদর্পে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু কুরায়েশ পক্ষ বলে উঠলো হে মুহাম্মাদ! আমাদের স্বগোত্রীয় সমকক্ষদের পাঠাও’। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, হে ওবায়দাহ, হে হামযাহ, হে আলী তোমরা যাও। অতঃপর আলী তার প্রতিপক্ষ অলীদ বিন উৎবাহকে, হামযাহ তার প্রতিপক্ষ শায়বাহ বিন রাবী‘আহকে এক নিমিষেই খতম করে ফেললেন। ওদিকে বৃদ্ধ ওবায়দাহ ইবনুল হারেছ তার প্রতিপক্ষ উৎবা বিন রাবী‘আহর সঙ্গে যুদ্ধে আহত হ’লেন। তখন আলী ও হামযাহ তার সাহায্যে এগিয়ে এসে উৎবাহকে শেষ করে দেন ও ওবায়দাহকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। কিন্তু অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে যুদ্ধশেষে মদীনায় ফেরার পথে ৪র্থ বা ৫ম দিন ওবায়দাহ শাহাদাত বরণ করেন। [আবুদাঊদ হা/২৬৬৫; আহমাদ হা/৯৪৮; মিশকাত হা/৩৯৫৭ সনদ ছহীহ; আল-বিদায়াহ ৩/২৭২।]
প্রথম আঘাতেই সেরা তিনজন বীর যোদ্ধা ও গোত্র নেতাকে হারিয়ে কুরায়েশ পক্ষ মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ সময় রাসূল (ছাঃ) শত্রুদের যথাসম্ভব দূরে রাখার জন্য নির্দেশ দিলেন, إِذَا أَكْثَبُوكُمْ فَارْمُوهُمْ وَاسْتَبْقُوا نَبْلَكُمْ ‘যখন তারা তোমাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তখন তোমরা তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ কর এবং এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা কর’ (বুখারী হা/৩৯৮৪)। অতঃপর তিনি এক মুষ্টি বালু হাতে নিয়ে শত্রুবাহিনীর দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, شَاهَتْ الْوُجُوهُ ‘চেহারাগুলো বিকৃত হৌক’। ফলে শত্রুবাহিনীর মুশরিকদের এমন কেউ থাকলো না, যার চোখে ঐ বালু প্রবেশ করেনি।
নিঃসন্দেহে এটি ছিল ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ সাহায্য। তাই আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে বলেন, وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَـكِنَّ اللهَ رَمَى ‘তুমি যখন বালু নিক্ষেপ করেছিলে, প্রকৃতপক্ষে তা তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহ নিক্ষেপ করেছিলেন’। [ইবনু হিশাম ১/৬৬৮; আনফাল ৮/১৭; হাদীছটির সনদ ‘মুরসাল’। কিন্তু ইবনু কাছীর বলেন, আয়াতটি যে বদর যুদ্ধের ঘটনায় নাযিল হয়েছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। বিদ্বানগণের নিকট যা মোটেই গোপন নয়। ঐ, তাফসীর সূরা আনফাল ১৭ আয়াত; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৬৩।]
নিঃসন্দেহে এটি ছিল রাসূল (ছাঃ)-এর একটি মু‘জেযা ও অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা তিনি হোনায়েন যুদ্ধেও করেছিলেন। [মুসলিম হা/১৭৭৭; মিশকাত হা/৫৮৯১; তাফসীর ত্বাবারী হা/১৫৮২৩, সনদ ‘মুরসাল’; ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আনফাল ১৭ আয়াত।]
বালু নিক্ষেপের পর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) স্বীয় বাহিনীকে নির্দেশ দেন, قُوْمُوا إلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ ‘তোমরা এগিয়ে চলো জান্নাতের পানে, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীন পরিব্যাপ্ত’ (মুসলিম হা/১৯০১)। রাসূল (ছাঃ)-এর এই আহবান মুসলমানদের দেহমনে ঈমানী বিদ্যুতের চমক এনে দিল। অতঃপর তিনি বললেন, وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ يُقَاتِلُهُمُ الْيَوْمَ رَجُلٌ فَيُقْتَلُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا مُقْبِلاً غَيْرَ مُدْبِرٍ إلاَّ أَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ ‘যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন, তার কসম করে বলছি, যে ব্যক্তি আজকে দৃঢ়পদে নেকীর উদ্দেশ্যে লড়াই করবে, পিছপা হবে না, সর্বদা সম্মুখে অগ্রসর হবে, অতঃপর যদি সে নিহত হয়, তবে আল্লাহ তাকে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’। [ইবনু হিশাম ১/৬২৭; হাদীছ ছহীহ (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ৭৪৯); আহমাদ হা/৮০৬১।]
জান্নাত পাগল মুমিন মৃত্যুকে পায়ে দলে শতগুণ শক্তি নিয়ে সম্মুখে আগুয়ান হ’ল ও তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এমন সময় জনৈক আনছার ছাহাবী উমায়ের বিন হোমাম(عُمَيْرُ بْنُ حُمَامٍ) ‘বাখ বাখ’(بَخْ بَخْ) বলে উঠলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমি জান্নাতবাসী হ’তে চাই’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন,فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا ‘নিশ্চয়ই তুমি তার অধিবাসী’। একথা শুনে ছাহাবী থলি হ’তে কিছু খেজুর বের করে খেতে লাগলেন। কিন্তু দ্রুত তিনি বলে উঠলেন, لَئِنْ أَنَا حَيِّيْتُ حَتَّى آكُلَ تَمَرَاتِيْ هَذِهِ إِنَّهَا لَحَيَاةٌ طَوِيْلَةٌ ‘যদি আমি এই খেজুরগুলি খেয়ে শেষ করা পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তবে সেটাতো দীর্ঘ জীবন হয়ে যাবে’ বলেই সমস্ত খেজুর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ও বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে এক পর্যায়ে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন’।[মুসলিম হা/১৯০১; মিশকাত হা/৩৮১০ ‘জিহাদ’ অধ্যায়।]
এ সময় রাসূল (ছাঃ) আল্লাহর নিকটে আকুলভাবে নিম্নোক্ত প্রার্থনা করেন,
اللَّهُمَّ أَنْجِزْ لِىْ مَا وَعَدْتَنِىْ اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَنْشُدُكَ عَهْدَكَ وَوَعْدَكَ … اللَّهُمَّ إِنْ تَهْلِكْ هَذِهِ الْعِصَابَةُ لاَ تُعْبَدْ فِى الأَرْضِ بَعْدَ الْيَوْمِ أبَدًا-
‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যে ওয়াদা করেছ তা পূর্ণ কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণের প্রার্থনা জানাচ্ছি। … হে আল্লাহ! যদি এই ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহ’লে আজকের দিনের পর তোমার ইবাদত করার মত কেউ যমীনে আর থাকবে না’। তিনি প্রার্থনায় এমন আত্মভোলা ও বিনয়ী হয়ে ভেঙ্গে পড়লেন যে, তার স্কন্ধ হ’তে চাদর পড়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে আবুবকর ছুটে এসে চাদর উঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন,حَسْبُكَ يَا رَسُولَ اللهِ فَقَدْ أَلْحَحْتَ عَلَى رَبِّكَ ‘যথেষ্ট হয়েছে হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পালনকর্তার নিকটে আপনি চূড়ান্ত প্রার্থনা করেছেন’। [বুখারী হা/৪৮৭৫, মিশকাত হা/৫৮৭২।]
যুদ্ধের প্রতীক চিহ্ন
বিভিন্ন যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিভিন্ন প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করতেন। যেমন (১) বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর প্রতীক চিহ্ন ছিল,أَحَدٌ أَحَدٌ (আহাদ, আহাদ)। [ইবনু হিশাম ১/৬৩৪। বর্ণনাটির সনদ যঈফ (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ৭৬৪)।] (২) ওহোদ যুদ্ধে ও সারিইয়া গালিব বিন লায়ছীর প্রতীক চিহ্ন ছিল, أَمِتْ، أَمِتْ (মেরে ফেল, মেরে ফেল)। [ইবনু হিশাম ২/৬৮, ৬১১; খবর ছহীহ (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ১০৯৭); আবুবকর (রাঃ)-এর নেতৃত্বে সংঘটিত যুদ্ধেও একই প্রতীক চিহ্ন ছিল (হাকেম হা/২৫১৬, হাদীছ ছহীহ; মিশকাত হা/৩৯৫০)। এছাড়া অন্যান্য যুদ্ধেও বিশেষ প্রতীক চিহ্নসমূহ ছিল।] (৩) খন্দক ও বনু কুরায়যা যুদ্ধে ছিল,حم، لاَ يُنْصَرُونَ (হা-মীম। তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’)।[ইবনু হিশাম ২/২২৬; ছহীহুল জামে‘ হা/২৩০৮; মিশকাত হা/৩৯৪৮।] (৪) বনু মুছত্বালিক্ব যুদ্ধে প্রতীক চিহ্ন ছিল,يَا مَنْصُورُ، أَمِتْ أَمِتْ (হে বিজয়ী! মেরে ফেল, মেরে ফেল’)।[ইবনু হিশাম ২/২৯৪; সনদ হাসান (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ১৪৭৯)।] (৫) মক্কা বিজয়, হোনায়েন এবং ত্বায়েফ যুদ্ধে মুহাজিরদের প্রতীক ছিলيَا بَنِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ ‘হে বনু আব্দুর রহমান’! খাযরাজদের প্রতীক ছিলيَا بَنِي عَبْدِ اللهِ ‘হে বনু আব্দুল্লাহ’! এবং আউসদের প্রতীক ছিলيَا بَنِي عُبَيْدِ اللهِ ‘হে বনু ওবায়দুল্লাহ’![ ইবনু হিশাম ২/৪০৯ (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ১৬৭৫)।]
এতে প্রমাণিত হয় যে, যুদ্ধের প্রধান পতাকা ছাড়াও অন্যান্য দলের বিশেষ পতাকা ছিল। এতে আরও প্রমাণিত হয় যে, পরিচিতির জন্য বিশেষ প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা যায়। যাকে ‘ব্যাজ’ (Badge) কিংবা মনোগ্রাম (Monogram) ইত্যাদি বলা হয়।
বদরের প্রান্তরে ফেরেশতাগণের অবতরণ
এ সময় আয়াত নাযিল হ’ল -إِذْ تَسْتَغِيْثُوْنَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ أَنِّيْ مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِّنَ الْمَلآئِكَةِ مُرْدِفِيْنَ ‘যখন তোমরা তোমাদের পালনকর্তার নিকটে কাতর প্রার্থনা করছিলে, তখন তিনি তোমাদের দো‘আ কবুল করলেন এই মর্মে যে, আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাযার ফেরেশতা দিয়ে, যারা ধারাবাহিকভাবে অবতরণ করবে’ (আনফাল ৮/৯)।[তাফসীর সূরা আনফাল ৯ আয়াত; বুখারী হা/৪৮৭৫; তিরমিযী হা/৩০৮১, সনদ হাসান।] ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, বদরের যুদ্ধে ব্যতীত অন্য কোন যুদ্ধে ফেরেশতারা যোগদান করেননি (ইবনু কাছীর)। উল্লেখ্য যে, সূরা আনফাল ৯ আয়াতে ‘এক হাযার’, আলে ইমরান ১২৪ ও ১২৫ আয়াতে যথাক্রমে ‘তিন হাযার’ ও ‘পাঁচ হাযার’ ফেরেশতা অবতরণের কথা বলা হয়েছে’। এর ব্যাখ্যায় ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘এক হাযার’ সংখ্যাটি তিন হাযার বা তার অধিক সংখ্যাকে নিষেধ করে না। কেননা উক্ত আয়াতের শেষে مُرْدِفِيْنَ শব্দ এসেছে। যার অর্থ ‘ধারাবাহিকভাবে আগত’। অতএব আল্লাহর হুকুমে যত হাযার প্রয়োজন, তত হাযার ফেরেশতা নাযিল হবে’।[ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আলে ইমরান ১২৫ আয়াত।] বস্ত্ততঃ সংখ্যায় বেশী বলার উদ্দেশ্য মুসলিম বাহিনীকে অধিক উৎসাহিত করা এবং বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করা।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছালাত অবস্থায় এক সময় সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি জেগে উঠে বললেন, أَبْشِرْ يَا أَبَا بَكْرٍ أَتَاكَ نَصْرُ اللهِ، هَذَا جِبْرِيلُ آخِذٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ يَقُودُهُ عَلَى ثَنَايَاهُ النَّقْعُ ‘সুসংবাদ গ্রহণ কর হে আবুবকর! তোমার কাছে আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই যে জিব্রীল, তার ঘোড়ার লাগাম ধরে ধূলি উড়িয়ে এগিয়ে আসছেন’। [আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ২২৫ পৃঃ, সনদ হাসান; ইবনু হিশাম ১/৬২৬-২৭, সনদ ‘মুরসাল’ (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ৭৪৭)।]
ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন,هَذَا جِبْرِيلُ آخِذٌ بِرَأْسِ فَرَسِهِ عَلَيْهِ أَدَاةُ الْحَرْبِ ‘ঐ যে জিব্রীল যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে আছেন’। অতঃপর তিনি তাঁবুর বাইরে এসে বললেন,سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّوْنَ الدُّبُرَ (‘সত্বর দলটি পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পালাবে’-ক্বামার ৫৪/৪৫)।[ইবনু হিশাম ১/৬২৭; বুখারী হা/৩৯৫৩, ৩৯৯৫; মিশকাত হা/৫৮৭২-৭৩ ‘ফাযায়েল ও শামায়েল’ অধ্যায়, মু‘জেযা অনুচ্ছেদ-৭ ; সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৬৫ পৃঃ।] অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি বাইরে এসে আঙ্গুলের ইশারা করে করে বলেন, هَذَا مَصْرَعُ فُلاَنٍ ‘এটি অমুকের বধ্যভূমি’। এটি অমুকের, ওটি অমুকের’। রাবী আনাস (রাঃ) বলেন, তাদের কেউ ঐ স্থান অতিক্রম করতে পারেনি, যেখানে যেখানে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ইশারা করেছিলেন।[মুসলিম হা/১৭৭৯ (৮৩); মিশকাত হা/৫৮৭১।]
বদরের প্রান্তরে ফেরেশতাগণের যুদ্ধে যোগদান
মুসলিম বাহিনীর এই হামলার প্রচন্ডতার সাথে সাথে যোগ হয় ফেরেশতাগণের আগমন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, إِذْ يُوحِي رَبُّكَ إِلَى الْمَلاَئِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا سَأُلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ- ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُّوا اللهَ وَرَسُولَهُ وَمَنْ يُشَاقِقِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ‘যখন তোমাদের পালনকর্তা ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন যে, আমি তোমাদের সাথে রয়েছি। অতএব তোমরা ঈমানদারগণের চিত্তকে দৃঢ় রাখো। আমি সত্বর অবিশ্বাসীদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেব। কাজেই তোমরা গর্দানের উপর আঘাত হানো এবং তাদের প্রত্যেক জোড়ায় জোড়ায় মারো’। ‘এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্য হয়েছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্য হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ (তার জন্য) কঠিন শাস্তিদাতা’ (আনফাল ৮/১২-১৩)। ইকরিমা বিন আবু জাহল (যিনি ঐ যুদ্ধে পিতার সাথে শরীক ছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের পরে মুসলমান হন) বলেন, ঐদিন আমাদের লোকদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যেত, অথচ দেখা যেতো না কে মারলো (তাবাক্বাত ইবনু সা‘দ)। আবুদাঊদ আল-মাযেনী বলেন, আমি একজন মুশরিক সৈন্যকে মারতে উদ্যত হব। ইতিমধ্যে তার ছিন্ন মস্তক আমার সামনে এসে পড়ল। আমি বুঝতেই পারলাম না, কে ওকে মারল’। রাসূল (ছাঃ)-এর চাচা আববাস যিনি বাহ্যিকভাবে মুশরিক বাহিনীতে ছিলেন, জনৈক আনছার তাকে বন্দী করে আনলে তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমাকে এ ব্যক্তি বন্দী করেনি। বরং যে ব্যক্তি বন্দী করেছে, তাকে এখন দেখতে পাচ্ছি না। তিনি একজন চুল বিহীন মাথাওয়ালা ও সুন্দর চেহারার মানুষ এবং বিচিত্র বর্ণের একটি সুন্দর ঘোড়ায় তিনি সওয়ার ছিলেন। আনছার যোদ্ধা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমিই এনাকে বন্দী করেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উক্ত আনছারকে বললেন, اسْكُتْ فَقَدْ أَيَّدَكَ اللهُ بِمَلَكٍ كَرِيمٍ ‘চুপ কর। আল্লাহ এক সম্মানিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাকে সাহায্য করেছেন’ (আহমাদ হা/৯৪৮)। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, ফেরেশতারা কোন মুশরিকের উপরে আক্রমণ করার ইচ্ছা করতেই আপনা-আপনি তার মস্তক দেহ হ’তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।[আহমাদ হা/৯৪৮, সনদ ছহীহ; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৬৬৭৯।]
ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ঐ দিন একজন মুসলিম সেনা তার সম্মুখের মুশরিককে মারতে গেলে শাণিত তরবারির ও ঘোড়ার আওয়ায শোনেন। তিনি ফেরেশতার আওয়ায শুনেছেন যে, তিনি বলছেনأَقْدِمْ حَيْزُوْمُ ‘হায়যূম আগে বাড়ো’ (‘হায়যূম’ হ’ল ফেরেশতার ঘোড়ার নাম)। অতঃপর ঐ মুশরিক সেনাকে তিনি সামনে চিৎ হয়ে পড়ে যেতে দেখেন। তিনি দেখলেন যে, তরবারির আঘাতের ন্যায় তার নাক ও মুখমণ্ডল বিভক্ত হয়ে গেছে। উক্ত আনছার ছাহাবী রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসে উক্ত ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি বলেন, صَدَقْتَ، ذَلِكَ مِنْ مَدَدِ السَّمَاءِ الثَّالِثَةِ ‘তুমি সত্য বলেছ। ওটি তৃতীয় আসমান থেকে সরাসরি সাহায্যের অংশ’।[মুসলিম হা/১৭৬৩ (৫৮); মিশকাত হা/৫৮৭৪।] কেউ কতক ফেরেশতাকে সরাসরি দেখেছেন। ঐদিন ফেরেশতাদের মাথার পাগড়ী ছিল সাদা। যা তাদের পিঠ পর্যন্ত ঝুলে ছিল। তবে জিব্রীলের মাথার পাগড়ী ছিল হলুদ বর্ণের।[ইবনু হিশাম ১/৬৩৩।]
উপরোক্ত ঘটনাবলী এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে যে, কিছু কিছু কাজের মাধ্যমে ফেরেশতাগণ মুসলমানদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তারাও যেন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন।
প্রসিদ্ধ আছে যে, ইবলীস স্বয়ং বনু কিনানাহর নেতা সুরাক্বা বিন মালেক বিন জু‘শুম আল-মুদলেজীর রূপ ধারণ করে যুদ্ধে উপস্থিত থেকে আবু জাহলকে সর্বদা উৎসাহিত করেছে এবং রাসূল (ছাঃ)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সর্বদা প্ররোচিত করেছে। কিন্তু এখন যুদ্ধের ময়দানে ফেরেশতাদের দেখতে পেয়ে সে ভয়ে পালাতে থাকে। হারেছ বিন হেশাম তাকে সুরাক্বা ভেবে আটকাতে চাইলে সে তার বুকে জোরে এক ঘুষি মেরে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে সমুদ্রের মধ্যে ডুব দিয়ে হারিয়ে যায় (আর-রাহীক্ব ২১৯ পৃঃ)।
বদরের প্রান্তরে ফেরেশতা নাযিলের উদ্দেশ্য
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَمَا جَعَلَهُ اللهُ إِلاَّ بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلاَّ مِنْ عِنْدِ اللهِ الْعَزِيْزِ الْحَكِيْمِ ‘(তোমাদের নিকটে ফেরেশতা প্রেরণের বিষয়টি ছিল) কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ হিসাবে এবং যাতে তোমাদের অন্তরে প্রশান্তি আসে। বস্ত্ততঃ সাহায্য কেবলমাত্র মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ হ’তেই এসে থাকে’ (আলে ইমরান ৩/১২৬)।
এর দ্বারা একথা বুঝানো হয়েছে যে, মুসলিম বাহিনী যেন এ বিশ্বাস দৃঢ় রাখে যে, ফেরেশতারা তাদের সাহায্যার্থে প্রস্ত্তত হয়ে পাশেই আছে। সেজন্য আল্লাহর হুকুমে তারা যৎসামান্য সাহায্য করছে। প্রকৃতপক্ষে এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের মনোবলকে বর্ধিত করা, ফেরেশতাদের দ্বারা যুদ্ধ করানো নয়। কেননা তারা সরাসরি জিহাদ করলে মুমিনদের কোন ছওয়াব থাকে না। তাছাড়া সেটা হ’লে তো এক হাযার (আনফাল ৮/৯), তিন হাযার বা পাঁচ হাযার (আলে ইমরান ৩/১২৪-২৫) কেন, একজন ফেরেশতাই যথেষ্ট ছিল কুরায়েশ বাহিনীকে খতম করার জন্য। যেভাবে জিব্রীল (আঃ) একাই লূতের কওমকে তাদের নগরীসহ শূন্যে তুলে উপুড় করে ফেলে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন আল্লাহর হুকুমে (হূদ ১১/৮২; হিজর ১৫/৭৩-৭৪)।
এ জগতে যুদ্ধ ও জিহাদের দায়িত্ব মানুষকে অর্পণ করা হয়েছে। যাতে তারা তার ছওয়াব ও উচ্চ মর্যাদা লাভে ধন্য হয়। ফেরেশতা বাহিনী দ্বারা যদি দেশ জয় করা বা ইসলামী হুকূমত প্রতিষ্ঠা করা আল্লাহর ইচ্ছা হ’ত, তাহ’লে পৃথিবীতে কাফেরদের রাষ্ট্র দূরে থাক, তাদের অস্তিত্বই থাকতো না। বরং আল্লাহর বিধান এই যে, দুনিয়াতে কুফর ও ঈমানের সংঘর্ষ চলতেই থাকবে।
ঈমানদারগণ সর্বদা আল্লাহর সাহায্য পাবেন। তারা ইহকালে ও পরকালে মর্যাদামন্ডিত হবেন। কিন্তু কাফেররা আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হবে এবং ইহকালে ও পরকালে তারা ধিকৃত ও লাঞ্ছিত হবে। নমরূদ ও ইবরাহীম, ফেরাঊন ও মূসা কি এর বাস্তব উদাহরণ নয়? আজও ফেরাঊন ও মূসার দ্বন্দ্ব চলছে এবং ক্বিয়ামত অবধি তা চলবে।
বদর প্রান্তর থেকে মাক্কী বাহিনীর পলায়ন এবং আবু জাহল এর ভয়ঙ্কর মৃত্যু
মুসলিম বাহিনীর দুর্ধর্ষ আক্রমণে পর্যুদস্ত মুশরিক বাহিনী প্রাণভয়ে পালাতে থাকল। এ দৃশ্য দেখে তাদের ধরে রাখার জন্য আবু জাহল তার লোকদের উদ্দেশ্যে জোরালো ভাষণ দিয়ে বলেন, সোরাক্বার পলায়নে তোমরা ভেঙ্গে পড়ো না। সে আগে থেকেই মুহাম্মাদের চর ছিল। ওৎবা, শায়বা ও অলীদের মৃত্যুতেও ভীত হওয়ার কারণ নেই। কেননা তাড়াহুড়োর মধ্যে তারা মারা পড়েছেন। লাত ও ‘উযযার শপথ করে বলছি, ওদেরকে শক্ত করে রশি দিয়ে বেঁধে না ফেলা পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না। অতএব তোমরা ওদেরকে মেরো না। বরং ধরো এবং বেঁধে ফেল’।
কিন্তু আবু জাহলের এই তর্জন-গর্জন অসার প্রমাণিত হ’ল। বর্ষিয়ান ছাহাবী আব্দুর রহমান বিন ‘আওফকে আনছারদের বনু সালামাহ গোত্রের কিশোর দু’ভাই মু‘আয ও মু‘আউভিয বিন ‘আফরা পৃথকভাবে এসে জিজ্ঞেস করল يَا عَمِّ أَرِنِى أَبَا جَهْلٍ! أُخْبِرْتُ أَنَّهُ يَسُبُّ رَسُوْلَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘চাচাজী! আবু জাহল-কে দেখিয়ে দিন। সে নাকি আমাদের রাসূলকে গালি দেয়’? তারা প্রত্যেকে পৃথকভাবে গোপনে এসে চাচাজীর কানে কানে একই কথা বলল। আব্দুর রহমান বিন ‘আওফ বলেন, আমি ওদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। কিন্তু ওরা নাছোড়বান্দা। ফলে বাধ্য হয়ে দেখিয়ে দিলাম। তখন ওরা দু’জন তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল এবং মু‘আয প্রথম আঘাতেই আবু জাহলের পা তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। এ সময় তার কাঁধে ইকরিমা বিন আবু জাহলের তরবারির আঘাতে মু‘আযের একটি হাত কেটে ঝুলতে থাকলে সে নিজের পা দিয়ে চেপে ধরে হেঁচকা টানে সেটাকে নিজ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। তারপর ছোট ভাই মু‘আউভিযের আঘাতে আবু জাহল ধরাশায়ী হ’লে তারা উভয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এসে গর্বভরে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আবু জাহলকে আমি হত্যা করেছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমাদের তরবারি মুছে ফেলেছ কি? তারা বলল, না। তারপর উভয়ের তরবারি পরীক্ষা করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, كِلاَكُمَا قَتَلَهُ ‘তোমরা উভয়ে তাকে হত্যা করেছ’। [বুখারী হা/৩১৪১; মুসলিম হা/১৭৫২; মিশকাত হা/৪০২৮।] অবশ্য এই যুদ্ধে মু‘আউভিয বিন ‘আফরা পরে শহীদ হন এবং মু‘আয বিন ‘আফরা হযরত ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতকাল (২৩-৩৫ হি.) পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। [উল্লেখ্য যে, মু‘আয ও মু‘আউভিয উভয়ে তাদের বীরমাতা বনু নাজ্জারের ‘আফরা’ বিনতে ওবায়েদ বিন ছা‘লাবাহ-র দিকে সম্বন্ধিত হয়ে ইবনু ‘আফরা (ابْنَا عَفْرَاء) নামে পরিচিত ছিলেন (ইবনু হিশাম ১/৬৩৫ টীকা-৫)। পিতা ছিলেন বনু নাজ্জার-এর হারেছ বিন রিফা‘আহ বিন সাওয়াদ (আল-ইছাবাহ ক্রমিক ৮১৬৮)। ‘আফরা-র মোট ৭ ছেলের প্রত্যেকে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সবাই তাদের মায়ের নামে ইবনু ‘আফরা (ابن عفراء) নামে পরিচিত ছিলেন। ‘আফরার প্রথম স্বামী হারেছ-এর ঔরসে মু‘আয ও মু‘আউভিয জন্ম গ্রহণ করেন। অতঃপর তালাকপ্রাপ্তা হয়ে তিনি মক্কায় গমন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি বুকায়ের বিন ‘আব্দে ইয়ালীল লায়ছী-এর সাথে বিবাহিতা হন। তার ঔরসে ৪ পুত্র খালেদ, ইয়াস, ‘আক্বেল ও ‘আমের জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তালাকপ্রাপ্তা হ’লে তিনি মদীনায় ফিরে আসেন এবং পুনরায় পূর্ব স্বামী হারেছ-এর সাথে বিবাহিতা হন। তার ঔরসে ‘আওফ জন্মগ্রহণ করেন। এইভাবে তিনি মোট ৭টি পুত্র সন্তানের মা হন। যারা প্রত্যেকেই ছিলেন অত্যন্ত বীর ও বদরী ছাহাবী (ইবনু সা‘দ, আল-ইছাবাহ, উসদুল গাবাহ)। ]
পরে আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ গিয়ে দেখেন যে, আবু জাহলের তখনও নিঃশ্বাস চলছে। তিনি তার দাড়ি ধরে মাথা কেটে নেবার জন্য ঘাড়ে পা রাখলে সে বলে ওঠে,وَهَلْ فَوْقَ رَجُلٍ قَتَلْتُمُوهُ ‘তোমরা কি এই ব্যক্তির চাইতে বড় কোন ব্যক্তিকে হত্যা করতে পেরেছ?’فَلَوْ غَيْرَ أَكَّارٍ قَتَلَنِيْ ‘ওহ্! আমাকে যদি (মদীনার) ঐ চাষাদের বদলে অন্য কেউ হত্যা করতো’! [ বুখারী হা/৪০২০; মুসলিম হা/১৮০০; মিশকাত হা/৪০২৯ ‘জিহাদ’ অধ্যায় ৭ অনুচ্ছেদ।] উল্লেখ্য যে, ইবনু মাসঊদ (রাঃ) মক্কায় ওক্ববা বিন আবু মু‘আইত্বের বকরীর রাখাল ছিলেন (আল-বিদায়াহ ৬/১০২)। অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, ইবনু মাসঊদ তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন,أَخْزَاكَ اللهُ يَا عَدُوَّ الله ‘আল্লাহ তোকে লাঞ্ছিত করুন রে আল্লাহর দুশমন!’ জবাবে আবু জাহল বলে ওঠে,وَبِمَاذَا أَخْزَانِي؟ هَلْ أَعْمَدُ مِنْ رَجُلٍ قَتَلْتُمُوهُ ‘কেন তিনি আমাকে লাঞ্ছিত করবেন? আমার চাইতে শ্রেষ্ঠ কোন ব্যক্তিকে তোমরা হত্যা করেছ কি?’[ইবনু হিশাম ১/৬৩৫; বুখারী হা/৩৯৬১; মুসলিম হা/১৮০০।] এখন বল, لِمَنِ الدّائِرَةُ الْيَوْمَ ‘আজ কারা জিতলো’। ইবনু মাসঊদ বললেন, للَّه وَلِرَسُولِهِ ‘আজকের জয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর জন্য’। বলেই তার মাথাটা কেটে নিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে হাযির হ’লেন এবং বললেন, يَا رَسُولَ اللهِ، هَذَا رَأْسُ عَدُوِّ اللهِ أَبِي جَهْلٍ ‘হে আল্লাহর রাসূল! এটা হ’ল আল্লাহর দুশমন আবু জাহলের মাথা। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলে ওঠেন, آلله الَّذِي لاَ إلَهَ غَيْرُهُ ‘আল্লাহর কসম? যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই’। আমি বললাম, হ্যাঁ। আল্লাহর কসম! যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই’। অতঃপর আমি তাঁর সামনে মাথাটি রেখে দিলাম তখন তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেন। [ইবনু হিশাম ১/৬৩৫-৩৬।] এভাবে মক্কার বড় ত্বাগূতটা শেষ হয়।
উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার মৃতদেহ দেখার পর বলেন,يَرْحَمُ اللهُ ابْنَيْ عَفْرَاءَ، فَهُمَا شُرَكَاءُ فِي قَتْلِ فِرْعَوْنَ هَذِهِ الْأُمَّةِ ‘আল্লাহ আফরার দুই পুত্রের উপর রহম করুন! তারা এই উম্মতের ফেরাঊনকে হত্যায় অংশীদার ছিল। আর ছিল ফেরেশতা এবং ইবনু মাসঊদ’ (আল-বিদায়াহ ৩/২৮৯)।
বদর প্রান্তরের জয়-পরাজয়
এই যুদ্ধে মুসলিম পক্ষে ৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনছার মোট ১৪জন শহীদ হন। কাফের পক্ষে ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বন্দী হন। তাদের বড় বড় ২৪ জন নেতাকে বদরের একটি পরিত্যক্ত কূয়ায় (القَلِيب) নিক্ষেপ করা হয়।[আল-বিদায়াহ ৩/২৯৩; আর-রাহীক্ব ২২৪-২৫ পৃঃ। মানছূরপুরী মুসলিম পক্ষে ২২ জন শহীদ বলেছেন (রহমাতুল্লিল ‘আলামীন ২/১৮৭)।] যাদের মধ্যে হিজরতের প্রাক্কালে রাসূল (ছাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী আবু জাহলসহ ১৪জন নেতার ১১ জন ছিল। বাকী তিনজন আবু সুফিয়ান (মৃ. মদীনায় ৩০ অথবা ৩৪ হি.), জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম (মৃ. ৫৭ হি.) ও হাকীম বিন হেযাম (মৃ. ৫৪ হি.) মক্কা বিজয়ের পর মুসলমান হন এবং তাদের ইসলাম আমৃত্যু সুন্দর ছিল।
উল্লেখ্য যে, আবু সুফিয়ান, জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম ও আবু লাহাব বদর যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। আবু লাহাব বদর যুদ্ধের সপ্তাহকাল পরে মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
শুহাদায়ে বদর
বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর যে ১৪ জন শহীদ হয়েছিলেন, তন্মধ্যে মুহাজির ছয় জন হ’লেন, (১) মিহজা‘ (مِهْجَعٌ), যিনি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাবের মুক্তদাস ছিলেন এবং তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর প্রথম শহীদ। (২) বনু আব্দিল মুত্ত্বালিব থেকে উবায়দাহ ইবনুল হারিছ বিন মুত্ত্বালিব। শত্রু পক্ষের নেতা উৎবাহ বিন রাবী‘আহ তাঁর পা কেটে দেন। পরে ‘ছাফরা’ গিয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (৩) বনু যোহরা থেকে উমায়ের বিন আবু ওয়াকক্বাছ। যিনি সা‘দ বিন আবু ওয়াকক্বাছের ভাই ছিলেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সের তরুণ হওয়ায় রাসূল (ছাঃ) তাকে ফিরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি কাঁদতে থাকেন। ফলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়। অতঃপর তিনি শহীদ হয়ে যান (আল-ইছাবাহ ক্রমিক ৬০৬১)। (৪) মুহাজিরগণের মিত্র যুশ-শিমালাইন বিন ‘আব্দে আমর আল-খুযাঈ। (৫) বনু ‘আদীর মিত্র ‘আক্বেল বিন বুকায়ের। (৬) বনুল হারেছ বিন ফিহর থেকে ছাফওয়ান বিন বায়যা।
অতঃপর আনছারদের মধ্যেকার আট জন হ’লেন, (১) বনু নাজ্জার থেকে হারিছাহ বিন সুরাক্বাহ। (২-৩) বনু গানাম থেকে ‘আফরার দুই পুত্র ‘আওফ ও মু‘আউভিয। (৪) বনুল হারেছ বিন খাযরাজ থেকে ইয়াযীদ বিন হারেছ। (৫) বনু সালামাহ থেকে উমায়ের বিন হুমাম। (৬) বনু হাবীব থেকে রাফে‘ বিন মু‘আল্লা। (৭) বনু ‘আমর বিন ‘আওফ থেকে সা‘দ বিন খায়ছামা এবং (৮) মুবাশশির বিন আব্দুল মুনযির (ইবনু হিশাম ১/৭০৬-০৮)।
নিহত কুরায়েশ নেতৃবৃন্দের কয়েকজন
বদর যুদ্ধে কুরায়েশ পক্ষের ৭০ জন নিহত ও ৭০ জন বন্দী হন (ইবনু হিশাম ১/৭১৪)। নিহতদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হ’লেন, (১-৫) বনু ‘আব্দে শামস গোত্রের উৎবাহ ও তার পুত্র অলীদ এবং ভাই শায়বাহ বিন রাবী‘আহ, হানযালা বিন আবু সুফিয়ান এবং উক্ববা বিন আবু মু‘আইত্ব। যাকে পরে হত্যা করা হয়। (৬) বনু মাখযূম গোত্রের আবু জাহল ‘আমর ইবনু হিশাম। (৭-৮) বনু জুমাহ গোত্রের উমাইয়া বিন খালাফ জুমাহী ও তার পুত্র আলী। (৯) বনু আসাদ গোত্রের আবুল বাখতারী ‘আছ বিন হিশাম ও (১০) নওফাল বিন খুওয়াইলিদ বিন আসাদ (কুরাইশের শয়তানদের অন্যতম)। (১১) বনু নওফাল গোত্রের তু‘আইমা বিন ‘আদী। জুবায়ের বিন মুত্ব‘ইম-এর চাচা। (১২) বনু ‘আব্দিদ্দার গোত্রের নযর বিন হারেছ। যাকে পরে হত্যা করা হয়। (১৩-১৪) বনু সাহম গোত্রের নুবাইহ ও মুনাবিবহ ইবনুল হাজ্জাজ দুই ভাই (ইবনু হিশাম ১/৭০৮-১৩)।
প্রসিদ্ধ কুরায়েশ বন্দীদের কয়েকজন
(১) বনু হাশেম গোত্র থেকে রাসূল (ছাঃ)-এর চাচা আববাস বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব। (২) চাচাতো ভাই ‘আক্বীল বিন আবু ত্বালিব (৩) নওফাল বিন হারেছ বিন আব্দুল মুত্ত্বালিব (৪) বনু ‘আব্দে শাম্স গোত্রের আমর বিন আবু সুফিয়ান (৫) রাসূল (ছাঃ)-এর জামাতা ‘আব্দে শামস গোত্রের আবুল ‘আছ বিন রবী‘। ইনি যয়নাবের স্বামী ছিলেন। তার বিনিময় মূল্য হিসাবে বিবাহকালে খাদীজা (রাঃ)-এর দেওয়া কণ্ঠহার দেখে রাসূল (ছাঃ) অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। পরে তাঁকে যয়নাবকে ফেরত দেওয়ার শর্তে কোনরূপ বিনিময় মূল্য ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয় (ইবনু হিশাম ১/৬৫২-৫৩)। (৬) বনু জুমাহ গোত্রের আমর বিন উবাই বিন খালাফ (ইবনু হিশাম ২/৩-৮)। ইবনু হিশাম তার তালিকায় আববাস বিন আব্দুল মুত্ত্বালিবের নাম দেননি। কারণ তিনি আগে থেকেই ‘মুসলিম’ ছিলেন। কিন্তু সম্প্রদায়ের ভয়ে তাঁর ইসলাম গোপন রেখেছিলেন (ইবনু হিশাম ২/৩-টীকা)।
বদর প্রান্তরে যুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী
(১) বদর যুদ্ধে যাত্রা পথে দু’তিন জন করে পালাক্রমে সওয়ার হয়ে চলতে হ’ত। রাসূল (ছাঃ), আলী ও আবু লুবাবা ইবনুল মুনযির এবং পরবর্তীতে তার বদলে মারছাদ বিন আবু মারছাদ গানাভীর জন্য একটি উট বরাদ্দ ছিল। যাতে পায়ে হাঁটার পালা আসলে রাসূল (ছাঃ) নিজেও হাঁটতেন। এসময় সাথীগণ নিজেরা হেঁটে তাঁকে উটে সওয়ার থাকার অনুরোধ করেন। জবাবে রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَا أَنْتُمَا بِأَقْوَى مِنِّى وَلاَ أَنَا بِأَغْنَى عَنِ الأَجْرِ مِنْكُمَا ‘তোমরা দু’জন আমার চাইতে শক্তিশালী নও এবং আমিও নেকী পাওয়ার ব্যাপারে তোমাদের চাইতে কম মুখাপেক্ষী নই’।[আহমাদ হা/৩৯০১; হাকেম হা/৪২৯৯; মিশকাত হা/৩৯১৫, সনদ হাসান।]
(২) বেলাল (রাঃ)-কে নির্যাতনকারী মনিব এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সম্মুখে ও পিছনে নিন্দাকারী নরাধম উমাইয়া বিন খালাফ-এর সাথে আব্দুর রহমান বিন ‘আওফ (রাঃ)-এর জাহেলী যুগে চুক্তি ছিল যে, তিনি মক্কায় তার লোকদের রক্ষা করবেন এবং আব্দুর রহমান মদীনায় উমাইয়ার লোকদের রক্ষা করবেন। সেকারণ যুদ্ধ শেষে তিনি উমাইয়া ও তার ছেলেকে পাহাড়ের একটি গুহায় লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু যেভাবেই হোক সেটি বেলালের নযরে পড়ে যায়। ফলে তিনি একদল আনছারের সামনে গিয়ে চীৎকার দিয়ে বলে উঠেন, ওহে আল্লাহর সাহায্যকারীগণ! শীর্ষ কাফের উমাইয়া এখানে। হয় আমি থাকব, নয় সে থাকবে’। তার ডাকের সাথে সাথে চারদিক থেকে সবাই এসে তাকে ঘিরে ফেলল। আব্দুর রহমান শত চেষ্টা করেও তাকে রক্ষা করতে পারলেন না। ফলে পিতা-পুত্র দু’জনেই সেখানে নিহত হ’ল। এতে আব্দুর রহমান-এর পা যখমী হয়। [বুখারী হা/২৩০১ ‘দায়িত্ব অর্পণ’ (الوكالة) অধ্যায়-৪০ অনুচ্ছেদ-২।]
(৩) তিনদিন অবস্থানের পর বিদায়কালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মক্কার মৃত নেতাদের উদ্দেশ্যে কূয়ার পাশে দাঁড়িয়ে একে একে পিতা সহ তাদের নাম ধরে ডেকে বলেন,
يَا فُلاَنُ بْنَ فُلاَنٍ، وَيَا فُلاَنُ بْنَ فُلاَنٍ، أَيَسُرُّكُمْ أَنَّكُمْ أَطَعْتُمُ اللهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّا قَدْ وَجَدْنَا مَا وَعَدَنَا رَبُّنَا حَقًّا، فَهَلْ وَجَدْتُمْ مَا وَعَدَ رَبُّكُمْ حَقًّا؟ قَالَ فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللهِ، مَا تُكَلِّمُ مِنْ أَجْسَادٍ لاَ أَرْوَاحَ لَهَا فَقَالَ رَسُولُ اللهِ –صلى الله عليه وسلم – وَالَّذِى نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ. قَالَ قَتَادَةُ أَحْيَاهُمُ اللهُ حَتَّى أَسْمَعَهُمْ قَوْلَهُ تَوْبِيخًا وَتَصْغِيرًا وَنَقِيمَةً وَحَسْرَةً وَنَدَمًا-
‘হে অমুকের পুত্র অমুক! হে অমুকের পুত্র অমুক! তোমরা কি এখন বুঝতে পারছ যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে তোমরা আজ খুশী হ’তে? নিশ্চয়ই আমরা আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে যে (বিজয়ের) ওয়াদা দিয়েছিলেন, আমরা তা সত্যরূপে পেয়েছি। তোমরা কি তা সত্যরূপে পেয়েছ যা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে (আযাবের) ওয়াদা করেছিলেন? এ সময় ওমর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমন দেহগুলির সাথে কথা বলছেন, যাদের মধ্যে রূহ নাই। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা তাদের চাইতে অধিক শ্রবণকারী নও, যা আমি বলছি’।
এর ব্যাখ্যায় ক্বাতাদাহ (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তাদেরকে (সাময়িকভাবে) জীবিত করেন, যাতে তারা নবীর ধিক্কারবাণীগুলি শুনতে পায় ও লজ্জিত হয়’ (বুখারী হা/৩৯৭৬)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ওমর (রাঃ) বলেন,
يَا رَسُولَ اللهِ كَيْفَ يَسْمَعُوا وَأَنَّى يُجِيبُوا وَقَدْ جَيَّفُوا قَالَ وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ لِمَا أَقُولُ مِنْهُمْ وَلَكِنَّهُمْ لاَ يَقْدِرُونَ أَنْ يُجِيبُوا
ওরা কিভাবে শুনবে এবং ওরা কিভাবে জওয়াব দিবে। অথচ ওরা মরে পচে গেছে’। জওয়াবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা ওদের চাইতে অধিক শ্রবণকারী নও, যা আমি বলছি’। কিন্তু ওরা জওয়াব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না’। [বুখারী হা/৩৯৭৬; মুসলিম হা/২৮৭৪; মিশকাত হা/৩৯৬৭, ‘জিহাদ’ অধ্যায়-১৯, ‘বন্দীদের হুকুম’ অনুচ্ছেদ-৫।]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, يَا رَسُولَ اللهِ أَتُنَادِيهِمْ بَعْدَ ثَلاَثٍ وَهَلْ يَسْمَعُونَ؟ يَقُولُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ (إِنَّكَ لاَ تُسْمِعُ الْمَوْتَى). فَقَالَ وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ مَا أَنْتُمْ بِأَسْمَعَ مِنْهُمْ وَلَكِنَّهُمْ لاَ يَسْتَطِيعُونَ أَنْ يُجِيبُوا ‘হে আল্লাহর রাসূল! তিন দিন পরে আপনি ওদের ডাকছেন। ওরা কি শুনতে পাবে? অথচ আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি শুনাতে পারো না কোন মৃতকে’ (নামল ২৭/৮০; রূম ৩০/৫২)। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, যার হাতে আমার জীবন, তাঁর কসম করে বলছি, তোমরা তাদের চাইতে অধিক শ্রবণকারী নও, যা আমি বলছি’। কিন্তু ওরা জওয়াব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না’ (আহমাদ হা/১৪০৯৬, সনদ ছহীহ)।
(৪) আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন, হারেছাহ বিন সুরাক্বা আনছারী তরুণ বয়সে বদর যুদ্ধে নিহত হন। তার মা এসে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে হারেছার অবস্থান সম্পর্কে বলবেন কি? যদি সে জান্নাতে থাকে, তাহ’লে আমি ছবর করব এবং ছবরের বিনিময়ে ছওয়াব কামনা করব। আর যদি অন্য কিছু হয়, তাহ’লে বলুন আমি কি করব? তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, কি বলছ তুমি? জান্নাত কি কেবল একটা? বহু জান্নাত রয়েছে। আর তোমার সন্তান রয়েছে সর্বোচ্চ জান্নাতুল ফেরদৌসে’ (বুখারী হা/২৮০৯, ৩৯৮২)।
(৫) এদিন উক্কাশা বিন মিহছান তার ভাঙ্গা তরবারি নিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে আসেন। তখন তিনি তাকে একটি কাঠের টুকরা দিয়ে বলেন, তুমি এটা দিয়ে যুদ্ধ কর। অতঃপর যখন তিনি সেটি হাতে নিয়ে নড়াচড়া করেন তখন সেটি লম্বা, শক্ত ও ধবধবে সাদা তরবারিতে পরিণত হয়ে যায়। অতঃপর সেটি নিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। যতক্ষণ না আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করেন। সেদিন থেকে উক্ত তরবারিটির নাম হয় আল-‘আওন (العَوْن) বা সাহায্যকারী। এরপর থেকে তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে সকল যুদ্ধে উক্ত তরবারি নিয়ে যোগদান করেন। এমনকি আবুবকর (রাঃ)-এর খিলাফতকালে রিদ্দার যুদ্ধে উক্ত তরবারি নিয়েই তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং শহীদ হন। তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ আল-আসাদী তাঁকে হত্যা করেন’ (আর-রাহীক্ব ২২৪ পৃঃ; ইবনু হিশাম ১/৬৩৭)। ইবনু ইসহাক এটি বিনা সনদে উল্লেখ করেছেন। সেকারণ এটি যঈফ (তালীক্ব, আর-রাহীক্ব ১৩২ পৃঃ; মা শা-‘আ ১১৬ পৃঃ)। ইবনু হাজার বলেন, উক্কাশা ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছাহাবী। তাঁকে হত্যাকারী তুলায়হা ‘মুরতাদ’ ছিল। পরে সে ইসলামে ফিরে আসে। রাযিয়াল্লাহু ‘আনহুম । (আল-ইছাবাহ ক্রমিক-৫৬৪৮)।
(৬) এছাড়াও একটি মু‘জেযা প্রসিদ্ধ আছে যে, রেফা‘আহ বিন রাফে‘ বিন মালেক বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন আমি তীরের আঘাতপ্রাপ্ত হই। ফলে আমার চোখ বেরিয়ে যায়। তখন রাসূল (ছাঃ) সেখানে থুথু লাগিয়ে দেন এবং আমার জন্য দো‘আ করেন। ফলে আমি পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাই’ (হাকেম হা/৫০২৪; বায়হাক্বী দালায়েল ৩/১০০)। বর্ণনাটি যঈফ (মা শা-‘আ ১২২ পৃঃ)।
মক্কায় পরাজয়ের খবর ও তার প্রতিক্রিয়া
হায়সুমান বিন আব্দুল্লাহ আল-খুযাঈ সর্বপ্রথম মক্কায় পরাজয়ের খবর পৌঁছে দেয়। এ খবর তাদের উপরে এমন মন্দ প্রভাব ফেলল যে, তারা শোকে-দুঃখে পাথর হয়ে গেল এবং সকলকে বিলাপ করতে নিষেধাজ্ঞা জারী করল। যাতে মুসলমানেরা তাদের দুঃখ দেখে আনন্দিত হবার সুযোগ না পায়। যুদ্ধ ফেরত ভাতিজা আবু সুফিয়ান বিন হারেছ বিন আব্দুল মুত্ত্বালিবকে দেখে আবু লাহাব সাগ্রহে যুদ্ধের খবর কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা এমন একটা দলের মুকাবিলা করেছি, যাদেরকে আমরা আমাদের কাঁধগুলি পেতে দিয়েছি। আর তারা ইচ্ছামত হত্যা করেছে ও বন্দী করেছে। এতদসত্ত্বেও আমি আমাদের লোকদের তিরষ্কার করছিনা এ কারণে যে, প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের মুকাবিলা এমন কিছু শুভ্রবসন লোকের সঙ্গে হয়েছিল, যারা আসমান ও যমীনের মাঝখানে সাদা-কালো মিশ্রিত(خَيْلٌ بُلْقٌ) ঘোড়ার উপরে সওয়ার ছিল। আল্লাহর কসম! না তারা কোন কিছুকে ছেড়ে দিচ্ছিল, না কেউ তাদের মুকাবিলায় দাঁড়াতে পারছিল’(وَاللهِ مَا تُلِيقُ شَيْئًا وَلاَ يَقُومُ لَهَا شَيْءٌ)। একথা শুনে পাশেই দাঁড়ানো আবু রাফে‘, যিনি আববাস-এর গোলাম ছিলেন এবং মুসলমান ছিলেন, তিনি বলে ওঠেন, تِلْكَ وَاللهِ الْمَلاَئِكَةُ ‘আল্লাহর কসম! ওঁরা ফেরেশতা’। একথা শুনে ক্ষুব্ধ নেতা আবু লাহাব তার গালে ভীষণ জোরে এক চড় বসিয়ে দিল। তখন উভয়ে লড়াই শুরু হয়ে গেল। আবু লাহাব আবু রাফে‘-কে মাটিতে ফেলে দিয়ে মারতে লাগল। তখন আববাস-এর স্ত্রী উম্মুল ফযল (রাঃ) এসে তাঁবুর একটা খুঁটি নিয়ে আবু লাহাবকে ভীষণ জোরে মার দিয়ে বললেন, اسْتَضْعَفْتَهُ أَنْ غَابَ عَنْهُ سَيِّدُهُ ‘ওর মনিব বাড়ী নেই বলে তুমি ওকে দুর্বল ভেবেছ?’ এতে লজ্জিত হয়ে আবু লাহাব উঠে গেল। এর মাত্র সাতদিনের মধ্যেই আল্লাহর হুকুমে সে আদাসাহ (عَدَسَة) নামক মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে সারা দেহ পচে গলে মারা গেল। গুটি বসন্তের ন্যায় এই রোগকে সে যুগে মানুষ কু-লক্ষণ ও সংক্রামক ব্যাধি বলে জানত।
ফলে পরিবারের লোকেরা তাকে ছেড়ে যায় এবং সে নিঃসঙ্গভাবে মৃত্যুবরণ করে। এ অবস্থায় তিনদিন লাশ পড়ে থাকলেও কেউ তার কাছে যায়নি। অবশেষে একজন লোকের সহায়তায় তার দুই ছেলে তার লাশ পাহাড়ের মাথায় নিয়ে একটা লাঠি দিয়ে ঠেলে গর্তে ফেলে তার উপর মাটি ও পাথর ছুঁড়ে পুঁতে দিল দুর্গন্ধের ভয়ে। [হাকেম হা/৫৪০৩, যাহাবী চুপ থেকেছেন; ইবনু হিশাম ১/৬৪৭।] এইভাবে এই দুরাচার দুনিয়া থেকে বিদায় হ’ল। ছাফা পাহাড়ের ভাষণের দিন রাসূল (ছাঃ)-কে تَبًّا لَكَ سَائِرَ الْيَوْمِ ‘সর্বদা তুমি ধ্বংস হও’ (বুখারী হা/৪৭৭০) বলার ১৫ বছর পরে তার এই পরিণতি হয়।
মদীনায় বিজয়ের খবর
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা আনছারীকে মদীনার উচ্চ ভূমিতে এবং যায়েদ বিন হারেছাহকে নিম্নভূমিতে পাঠিয়ে দেন মদীনায় দ্রুত বিজয়ের খবর পৌঁছানোর জন্য। ঐ সময় রাসূল (ছাঃ)-এর কন্যা ও হযরত ওছমানের স্ত্রী রুক্বাইয়া (রাঃ)-কে দাফন করে মাটি সমান করা হচ্ছিল। যার অসুখের কারণে রাসূল (ছাঃ) ওছমান ও উসামা বিন যায়েদকে মদীনায় রেখে গিয়েছিলেন তার সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য। [ইবনু হিশাম ১/৬৪২; বায়হাক্বী হা/১৮৩৬৬; হাকেম হা/৪৯৫৯, যাহাবী চুপ থেকেছেন।]
অন্য দিকে ইহূদী ও মুনাফিকরা রাসূল (ছাঃ)-এর পরাজয় এমনকি তাঁর নিহত হবার খবর আগেই রটিয়ে দিয়েছিল। অতঃপর নিশ্চিত খবর জানতে পেরে মুহাজির ও আনছার ছাহাবীগণ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মদীনা মুখরিত করে তোলেন এবং রাসূল (ছাঃ)-কে অভ্যর্থনার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন (আর-রাহীক্ব ২২৭ পৃঃ)।
গণীমত বণ্টন
যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বদরে তিনদিন অবস্থান করেন। উবাদাহ বিন ছামেত (রাঃ) বলেন যে, এরি মধ্যে গণীমতের মাল নিয়ে সৈন্যদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়, যা এক সময়ে চরমে ওঠে। যারা শত্রুদের পিছু ধাওয়া করেছিল ও কাউকে হত্যা ও কাউকে বন্দী করেছিল, তারা তার সব মাল দাবী করল। আরেক দল যারা গণীমত জমা করেছিল, তারা সব মাল তাদের বলে দাবী করল। আরেক দল যারা রাসূল (ছাঃ)-কে পাহারা দিয়ে তাঁকে হেফাযত করেছিল, তারাও সব নিজেদের বলে দাবী করল। এ সময় সূরা আনফাল ১ম আয়াত নাযিল হয়। يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ ‘লোকেরা তোমাকে প্রশ্ন করছে যুদ্ধলব্ধ গণীমতের মাল বণ্টন সম্পর্কে। বলে দাও, গণীমতের মাল সবই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং পরস্পরে মীমাংসা করে নাও। আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক’ (আনফাল ৮/১)। অতঃপর সেমতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সব মাল তার নিকটে জমা করতে বলেন।
যুদ্ধবন্দী হত্যা
অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বদর থেকে রওয়ানা দিয়ে ‘ছাফরা’ (الصَّفْرَاء) গিরি সংকট অতিক্রম করে একটি টিলার উপরে গিয়ে বিশ্রাম করেন এবং সেখানে বসে গণীমতের সমস্ত মালের এক পঞ্চমাংশ বের করে নিয়ে বাকী মাল সৈন্যদের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করে দেন। [ইবনু হিশাম ১/৬৪৩; আহমাদ হা/২২৮১৪, হাসান লিগায়রিহী; আলবানী, ফিক্বহুস সীরাহ ২৩৪ পৃঃ সনদ ছহীহ।] এর পূর্বে ছাফরা গিরিসংকটে কুরায়েশ বাহিনীর পতাকাবাহী দুষ্টমতি নযর বিন হারিছকে রাসূল (ছাঃ)-এর আদেশক্রমে হযরত আলী (রাঃ) হত্যা করেন। এই শয়তান ইরাকের ‘হীরা’ থেকে নাচগানে পারদর্শী সুন্দরী নর্তকীদের খরীদ করে এনে মক্কাবাসীদের বিভ্রান্ত করত। যাতে কেউ রাসূল (ছাঃ)-এর কথা না শোনে ও কুরআন না শোনে। এরপর ‘ইরকুয যাবিয়াহ’(عِرْقُ الظَّبْيَة) নামক স্থানে পৌঁছে আরেক শয়তানের শিখন্ডী উক্ববা বিন আবু মু‘আইত্বকে হত্যার নির্দেশ দেন’। [ইবনু হিশাম ১/৬৪৪; আল-বিদায়াহ ৩/৩০৫।] যে ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ)-কে কা‘বাগৃহে ছালাতরত অবস্থায় গলায় চাদর পেঁচিয়ে এবং পরে মাথায় উটের ভুঁড়ি চাপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিল (বুখারী, ফাৎহুল বারী হা/৬৩৭৮, ৫২০)। একে মারেন আছেম বিন ছাবিত আনছারী (রাঃ)। মতান্তরে হযরত আলী (রাঃ)। এই দু’জন ব্যক্তি বন্দীর মর্যাদা পাবার যোগ্য ছিল না। কেননা তারা ছিল আধুনিক পরিভাষায় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী (مِنْ أَكَابِرِ مُجْرِمِى الْحَرْب)।
মদীনায় অভ্যর্থনা
বিজয়ী কাফেলা রাওহা (الرَّوْحَاء) পৌঁছলে মদীনা থেকে আগমনকারী অগ্রবর্তী অভ্যর্থনাকারী দলের সাথে প্রথম মুলাকাত হয় (ইবনু হিশাম ১/৬৪৩)। তারা বিপুল উৎসাহে বিজয়ী রাসূলকে অভ্যর্থনা জানায়। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথী ছাহাবী সালামা বিন সালামাহ(سَلَمَةُ بنُ سَلاَمَة) বলেন,مَا الَّذِي تُهَنِّئُونَنَا بِهِ وَاللهِ إِنْ لَقِينَا إِلاَّ عَجَائِزَ صُلْعًا كَالْبُدْنِ الْمُعَقَّلَةِ، فَنَحَرْنَاهَا ‘তোমরা কিজন্য আমাদের মুবারকবাদ দিচ্ছ’? ‘আল্লাহর কসম! আমরা তো কিছু টেকো মাথা বুড়োদের মুকাবিলা করেছি মাত্র, যারা ছিল বাঁধা উটের মত, যাদেরকে আমরা যবহ করেছি’। তার কথা বলার ঢং দেখে রাসূল (ছাঃ) মুচকি হেসে বললেন, يَا ابْنَ أَخِي أُولَئِكَ الْمَلَأُ الأَكْبَرُ ‘হে ভাতিজা! ওরাই তো বড় বড় নেতা’।[ইবনু হিশাম ১/৬৪৩-৪৪; ত্বাবারাণী, মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/১৬৪৪৫; হাকেম হা/৫৭৬৭, সনদ ‘ছহীহ মুরসাল’; যঈফাহ হা/২২৩৫।]
এ সময় ছাহাবী উসায়েদ বিন হুযায়ের আনছারী(أُسَيدُ بنُ الْحُضَير) যিনি বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন না, তিনি সাক্ষাৎ করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি আপনাকে বিজয় দান করেছেন ও আপনার চক্ষুকে শীতল করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি একথা ভেবে বদরে গমন হ’তে পিছনে থাকিনি যে, আপনার মুকাবিলা শত্রুদের সাথে হবে। ظَنَنْتُ أَنَّهَا عِيرٌ وَلَوْ ظَنَنْتُ أَنَّهُ عَدُوٌّ مَا تَخَلَّفْتُ ‘আমি তো ভেবেছিলাম এটা স্রেফ বাণিজ্য কাফেলা আটকানোর বিষয়। যদি বুঝতাম যে, এটা শত্রুদের বিরুদ্ধে মুকাবিলা, তাহ’লে আমি কখনো পিছনে থাকতাম না’। রাসূল (ছাঃ) বললেন, (صَدَقْتَ) ‘তুমি সত্য বলেছ’ (আল-বিদায়াহ ৩/৩০৫)। পরের বছর ওহোদ যুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাকে আনছার বাহিনীর মধ্যে আউসদের পতাকাবাহী নিযুক্ত করেন। অতঃপর একদিকে কন্যা হারানোর বেদনা অন্যদিকে যুদ্ধ বিজয়ের আনন্দ এরি মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় প্রবেশ করেন।
যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে ফায়ছালা
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আগমনের একদিন পরে বন্দীদের কাফেলা মদীনায় পৌঁছে। রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে ছাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করে দেন এবং তাদের সাথে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তাঁর আদেশ যথাযথভাবে পালিত হয় এবং ছাহাবীগণ নিজেরা খেজুর খেয়ে বন্দীদের রুটি খাওয়ান (ইবনু হিশাম ১/৬৪৪-৪৫)। কেননা ঐ সময় মদীনায় খেজুর ছিল সাধারণ খাদ্য এবং রুটি ছিল মূল্যবান খাদ্য। অতঃপর তিনি ছাহাবীগণের সাথে পরামর্শ করেন। আবুবকর (রাঃ) তাদেরকে রক্তমূল্য নিয়ে ছেড়ে দিতে বলেন। কেননা এর ফলে কাফেরদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের হেদায়াত নছীব করতে পারেন এবং তারা আমাদের জন্য সাহায্যকারী হ’তে পারে। কিন্তু ওমর ফারূক (রাঃ) স্ব স্ব আত্মীয়কে স্ব স্ব হস্তে হত্যা করার পরামর্শ দেন। দয়ার নবী আবুবকরের পরামর্শ গ্রহণ করলেন এবং অধিকাংশ বন্দীকে রক্তমূল্য নিয়ে ছেড়ে দিলেন। জামাতা আবুল ‘আছ সহ কয়েকজনকে রক্তমূল্য ছাড়াই মুক্তি দেন। আবুল ‘আছ ছিলেন খাদীজার সহোদর বোনের ছেলে এবং রাসূল-কন্যা যয়নবের স্বামী। ফিদইয়া দিতে অক্ষম কয়েকজনকে মাথা প্রতি ১০ জনকে লেখাপড়া শিখানোর বিনিময়ে মদীনাতেই রেখে দেন। তাদের মেয়াদ ছিল উত্তম রূপে পড়া ও লেখা শিক্ষা দান করা পর্যন্ত। এর দ্বারা শিক্ষা বিস্তারের প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর আকুল আগ্রহের প্রমাণ মেলে। যা কোন যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের ইতিহাসে ছিল নযীরবিহীন। ওছমান (রাঃ)সহ নয় জন ছাহাবীকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও গণীমতের অংশ দেন তাদের যথার্থ ওযর ও ’/অন্যান্য সহযোগিতার কারণে।
উল্লেখ্য যে, ঐ সময় রাসূল-কন্যা রুক্বাইয়া মৃত্যু শয্যায় থাকার কারণে ওছমান গণী (রাঃ) ও উসামা বিন যায়েদ-কে রাসূল (ছাঃ) মদীনায় থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন’ (সীরাহ ছহীহাহ ২/৩৭০)। রাসূল (ছাঃ)-এর জামাতা আবুল ‘আছ বিন রবী‘-এর রক্তমূল্য বাবদ তাঁর কন্যা যয়নবের যে কণ্ঠহারটি পেশ করা হয়, তা ছিল হযরত খাদীজার দেওয়া। তা দেখে রাসূল (ছাঃ) কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, إِنْ رَأَيْتُمْ أَنْ تُطْلِقُوا لَهَا أَسِيرَهَا وَتَرُدُّوا عَلَيْهَا الَّذِى لَهَا ‘যদি তোমরা যয়নাবের জন্য তার বন্দীকে মুক্তি দিতে এবং তার কণ্ঠহারটিকে তার কাছে ফেরৎ দিতে’! তখন সবাই বলল, হ্যাঁ। অতঃপর কন্যা যয়নবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেওয়ার শর্ত করা হয়। অতঃপর বদর যুদ্ধের কাছাকাছি এক মাস পর যায়েদ বিন হারেছাহ ও একজন আনছার ছাহাবীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁকে মদীনায় ফিরিয়ে আনা হয়।[আহমাদ হা/২৬৪০৫; আবুদাঊদ হা/২৬৯২; মিশকাত হা/৩৯৭০; সনদ হাসান।]
(১) প্রসিদ্ধ আছে যে, বদর যুদ্ধে ‘খতীবু কুরায়েশ’ বলে খ্যাত বন্দী সুহায়েল বিন ‘আমরকে মুক্ত করার জন্য কুরায়েশরা যখন লোক পাঠায়, তখন ওমর (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ছেড়ে দিন, আমি সুহায়েল-এর দু’টি দাঁত উপড়ে ফেলি এবং জিহবা টেনে বের করে ফেলি। যাতে সে আপনার বিরুদ্ধে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে কখনো বক্তৃতা করতে না পারে। জওয়াবে রাসূল (ছাঃ) বলেন, আমি কখনোই তার অঙ্গহানি করব না। তাহ’লে আল্লাহ আমার অঙ্গহানি করবেন। যদিও আমি নবী’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি ওমরকে এ কথাও বলেন, সত্তর সে এমন স্থানে দাঁড়াবে যে, তুমি তাকে তিরষ্কার করবে না’ ( ইবনু হিশাম ১/৬৪৯)। বর্ণনাটি মু‘যাল বা যঈফ (মা শা-‘আ ১১৭ পৃঃ)। উল্লেখ্য যে, সুহায়েল ও রাসূল (ছাঃ)-এর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা শেষে হোদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি সম্পন্ন হয়। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম কবুল করেন। বলা হয়েছে যে, তিনি ১৮ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
(২) বদর যুদ্ধের কয়েক দিন পরে মক্কার নেতা ছাফওয়ান বিন উমাইয়ার কুপরামর্শে দুষ্টমতি ওমায়ের বিন ওয়াহাব আল-জুমাহী (عُمَيْرُ بن وَهْبٍ الْجُمَحِي) তীব্র বিষ মিশ্রিত তরবারি নিয়ে মদীনায় আগমন করে। তখন তার পুত্র ওয়াহাব বিন ওমায়ের মদীনায় বদর যুদ্ধে বন্দী হিসাবে ছিল। ছাফওয়ান তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পারলে সে তার সকল ঋণ পরিশোধ করে দিবে এবং তার সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহন করবে। অতঃপর সে মদীনায় আসে এবং রাসূল (ছাঃ)-কে জাহেলী যুগের রীতি অনুযায়ী انْعَمُوا صَبَاحًا (সুপ্রভাত) বলে অভিবাদন করে। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বলেন, আল্লাহ আমাদেরকে তোমার চাইতে সুন্দর জান্নাতবাসীদের পারস্পরিক অভিবাদন السَّلام (সালাম) দ্বারা সম্মানিত করেছেন। অতঃপর সে তার ছেলের প্রতি সহনুভূতি দেখানোর অনুরোধ জানায়। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তোমার কাঁধে তরবারি কেন? জবাবে সে আসল উদ্দেশ্য লুকাতে চাইল। তখন রাসূল (ছাঃ) তার নিকট মক্কায় বসে ছাফওয়ান ও তার মধ্যকার গোপন পরামর্শ এবং তাঁকে হত্যা পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেন। এতে সে হতবাক ও ভীত হয়ে আত্মসমর্পণ করে ও মুসলমান হয়ে যায়। পরে মক্কায় ফিরে গিয়ে তার দাওয়াতে বহু লোক ইসলাম কবুল করে’ (ইবনু হিশাম ১/৬৬১; আল-বিদায়াহ ৩/৩১৩; আর-রাহীক্ব ২৩৫-৩৬ পৃঃ)। ঘটনাটির সনদ ‘মুরসাল’ বা যঈফ (তাহকীক ইবনু হিশাম ক্রমিক ৮২৬)।
উপসংহার
বদরের প্রান্তর ইসলামের ইতিহাসে শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম নয়; এটি ঈমানের শক্তি, ত্যাগের মহিমা, আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং সত্যের জন্য অবিচল থাকার এক চিরন্তন প্রতীক। সেখানে সংখ্যায় অল্প একটি দল এমন এক শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিল, যাদের তুলনায় তাদের সামরিক প্রস্তুতি ও উপকরণ ছিল সীমিত। কিন্তু বদরের ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—বিজয় কেবল অস্ত্রের শক্তিতে আসে না, সংখ্যার আধিক্যেও নিশ্চিত হয় না; প্রকৃত বিজয়ের জন্য প্রয়োজন বিশুদ্ধ ঈমান, সঠিক উদ্দেশ্য, সুদৃঢ় নেতৃত্ব, পারস্পরিক ঐক্য, যথাযথ পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর সাহায্য।
বদরের প্রান্তরে আমরা রহমাতাল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর নেতৃত্বের এক অনন্য ও পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রত্যক্ষ করি। তিনি একদিকে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন, তাদের মতামতকে মূল্য দিয়েছেন এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৌশল নির্ধারণ করেছেন; অন্যদিকে রাতের নির্জনতায় তাঁর রবের দরবারে হাত তুলেছেন, কেঁদেছেন এবং সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। এখানেই নববী নেতৃত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য—মানুষের সাধ্যের সবটুকু চেষ্টা করা, তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করা।
বদরের ঘটনা আমাদের আরও শিক্ষা দেয় যে, সত্যের পথে চলা সবসময় সহজ নয়। কখনো সেই পথে ভয় আসবে, কখনো সংকট আসবে, কখনো সংখ্যার স্বল্পতা ও সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু একজন মুমিনের পরিচয় হলো—সে পরিস্থিতির কাছে নিজের আদর্শ বিক্রি করে না। সে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না, হতাশ হয়ে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যায় না এবং কেবল বাহ্যিক শক্তির হিসাব করে সত্যের পথ পরিত্যাগ করে না।
বদরের সাহাবিগণ আমাদের সামনে এমন এক প্রজন্মের পরিচয় তুলে ধরেছেন, যাঁদের কাছে দ্বীনের স্বার্থ ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বড় ছিল। তাঁদের কাছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনুগত্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সত্যের প্রতিষ্ঠা ছিল জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। তাঁরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন—মহান আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হয় এবং নিজের দায়িত্ব পালনে দৃঢ় থাকতে হয়।
আজকের পৃথিবীতে বদরের শিক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমরা হয়তো বদরের মতো কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু আমাদের জীবনেও প্রতিনিয়ত সত্য ও মিথ্যার সংঘর্ষ চলছে। কখনো নিজের নফসের বিরুদ্ধে, কখনো অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কখনো মিথ্যা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে, কখনো হতাশা ও দুর্বলতার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম করতে হয়। এসব ক্ষেত্রেও বদরের শিক্ষা আমাদের পথ দেখাতে পারে।
আজ আমাদের প্রয়োজন বদরের মতো ঈমান, কিন্তু শুধু আবেগ নয়; বদরের মতো তাওয়াক্কুল, কিন্তু চেষ্টা ও পরিকল্পনাকে বাদ দিয়ে নয়; বদরের মতো ঐক্য, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের ভিত্তিতে নয়; বদরের মতো নেতৃত্ব, যা ক্ষমতার অহংকারে নয় বরং দায়িত্ববোধ, শূরা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আল্লাহ তাআলা বদরের বিজয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন—
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বদরে সাহায্য করেছিলেন, যখন তোমরা ছিলে দুর্বল; অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।”—সূরা আলে ইমরান: ১২৩
এই আয়াত যেন আমাদের আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষের দুর্বলতা কখনো আল্লাহর সাহায্যের পথে বাধা হতে পারে না। যখন মানুষ তার রবের প্রতি সত্যিকার অর্থে ফিরে আসে, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে এবং সত্য ও ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকে, তখন আল্লাহ এমন পথ খুলে দিতে পারেন, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
অতএব, বদরের প্রান্তর আমাদের কাছে শুধু অতীতের একটি স্মৃতি নয়; এটি আমাদের ঈমানকে জাগ্রত করার আহ্বান। এটি আমাদের শেখায়—সংখ্যায় ছোট হলেও আদর্শে বড় হওয়া যায়; সামর্থ্যে সীমিত হলেও উদ্দেশ্যে মহান হওয়া যায়; পরিস্থিতি কঠিন হলেও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।
আসুন, আমরা সীরাতে রহমাতাল্লিল আলামীন ﷺ-এর আলোকে বদরের প্রান্তর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। আমাদের ব্যক্তি জীবনে সত্যবাদিতা, পরিবারে দায়িত্ববোধ, সমাজে ন্যায়বিচার, প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের চর্চা করি। আমরা যেন শুধু বদরের ইতিহাস বর্ণনা না করি; বরং বদরের শিক্ষা নিজেদের চরিত্রে ধারণ করি।
আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত হোক বদরের ঈমান, আমাদের কর্মে ফুটে উঠুক বদরের শৃঙ্খলা, আমাদের জীবনে প্রকাশ পাক বদরের তাওয়াক্কুল, আর আমাদের চরিত্রে প্রতিফলিত হোক রহমাতাল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-এর ন্যায়, প্রজ্ঞা ও মানবিকতা।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাতকে গভীরভাবে অনুধাবন করার, বদরের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করার এবং সেই শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও উম্মাহর জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন।