সূরা আল-বাইয়্যিনাহ এর তাফসীর

তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে

সূরাঃ বাইয়্যিনাহ/৯৮, মাদানী | (আয়াত : ৮, রুকূ’ : ১)

মুসনাদে আহমাদে হযরত আমর ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ যখন (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ )  – সূরাটি শেষ পর্যন্ত অবতীর্ণ হয় তখন হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে এ সূরাটি হযরত উবাই (রাঃ)-এর নিকট পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উবাই (রাঃ)-কে এ কথা জানানোর পর হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ “হে আল্লাহ্র রাসূল (সঃ)! সেখানে কি আমার কথা আলোচিত হয়েছে?” জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাকে বললেনঃ “হ্যা, হ্যাঁ।” হযরত উবাই (রাঃ) তখন কেঁদে ফেললেন।

মুসনাদেরই অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত উবাই (রাঃ) জিজ্ঞেস করেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আল্লাহ্ তা’আলা কি আমার নাম উচ্চারণ করেছেন?”

রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উত্তরে হ্যা’ বললেন। তখন হযরত উবাই (রাঃ) কেঁদে ফেললেন।১

মুসনাদে আহমাদের অন্য একটি রিওয়াইয়াতে আছে যে, যে সময় হযরত উবাই (রাঃ) এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন সে সময় বর্ণনাকারী হযরত উবাই (রাঃ)-কে বলেনঃ “হে আবু মুনযির (রাঃ)! তাহলে তো আপনি খুবই আনন্দিত হয়েছেন?” উত্তরে হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ কেন আনন্দিত হবো না? আল্লাহ্ রাব্বল আলামীন স্বয়ং বলেনঃ

قُلْ بِفَضْلِ اللّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُواْ هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ

অর্থাৎ “তুমি বলে দাও আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা লাভ করে যেন তারা আনন্দিত হয়। এটা তারা যা পুঞ্জীভূত করে তার চেয়ে বহুগুণে উত্তম।” (১০ ঃ ৫৮)

অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উবাই (রাঃ)-এর সামনে এ সূরাটি পড়ার পর পাঠ করেনঃ

অর্থাৎ “আদম সন্তান যদি একটা উপত্যকা পূর্ণ মাল যাঞ্চা করে, অতঃপর তাকে তা দেয়া হয় তবে অবশ্যই সে দ্বিতীয়টির জন্যে প্রার্থনা করবে, সেটাও যদি তাকে প্রদান করা হয় তবে সে তৃতীয়টির জন্যে প্রার্থনা করবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে ভরবে না। তবে যে তাওবা করবে আল্লাহ্ তার তাওবা কবুল করবেন। আল্লাহর কাছে ঐ ব্যক্তিই দ্বীনদার যে একাগ্রচিত্তে তাঁর ইবাদত করে। তবে সে মুশরিক, ইয়াহুদী এবং নাসারা হতে পারবে না। যে ব্যক্তি কোন পুণ্য কাজ করবে তার অমর্যাদা করা হবে না।”২

হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁকে বলেনঃ “হে আবুল মুনযির (রাঃ)! আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন তোমার সামনে কুরআন পাঠ করি।” হযরত উবাই (রাঃ) তখন বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি, আপনার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আপনার কাছে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেছি।” নবী করীম (সঃ) ঐ কথারই পুনরাবৃত্তি করলেন। হযরত উবাই (রাঃ) তখন আর্য। করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার কথা কি সেখানে আলোচনা করা হয়েছে?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বললেনঃ “হ্যা, তোমার নাম ও নসব এ সবই মালায়ে আ’লায় আলোচিত হয়েছে।” হযরত উবাই (রাঃ) তখন বললেনঃ “তা হলে পাঠ করুন!”৩

এটা স্মরণ রাখার বিষয় যে হযরত উবাই (রাঃ)-এর মানসিক দৃঢ়তা এবং ঈমান বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাঁর সামনে এ সূরাটি পাঠ করেছিলেন।

মুসনাদে আহমদ, সুনানে আবী দাউদ, সুনানে নাসাঈ এবং সহীহ মুসলিমে রয়েছে যে, একবার হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর কিরআত শুনে হযরত উবাই (রাঃ) অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে তিনি যেমনভাবে এ সূরার কিরআত শুনেছিলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) তেমনভাবে পড়েননি। রাগতভাবে হযরত উবাই হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ)-কে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর নিকট গমন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) উভয়ের কিরআত শুনে বলেনঃ “উভয়ের কিরআতই বিশুদ্ধ।” হযরত উবাই (রাঃ) বলেনঃ আমি এ কথা শুনে এমন সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেলাম যে, যেন অজ্ঞতার যুগের সন্দেহ আমার সামনে এসে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) এ অবস্থা দেখে আমার বুকে হাত রাখলেন। আমার বুক ঘামে ভিজে গেল। আমার উপর এমন ভয় চাপলো যে, যেন আমি রাব্বল আলামীন আল্লাহকে সামনে দেখতে পাচ্ছি। নবী করীম (সঃ) বললেনঃ “শোনো, হযরত জিবরাঈল (আঃ) আমার সামনে এসেছিলেন। তিনি বললেনঃ ‘উম্মতকে একই কিরআতে কুরআন শিক্ষা দেয়ার জন্যে আল্লাহ্ তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বললামঃ আমি আল্লাহ্ তা’আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং মাগফিরাত কামনা করছি। অতঃপর আমাকে দু’প্রকারের কিরআতের অনুমতি প্রদান করা হলো। কিন্তু আমি আরো বাড়ানোর আবেদন জানালাম। অবশেষে সাত প্রকারের কিরআত পাঠের অনুমতি দেয়া হলো।” অতঃপর এ সূরা নাযিল হলো এবং এতে রয়েছেঃ

رَسُولٌ مِّنَ اللَّهِ يَتْلُو صُحُفًا مُّطَهَّرَةً فِيهَا كُتُبٌ قَيِّمَةٌ

নবী করীম (সঃ) মানসিক দৃঢ়তার শিক্ষা দান এবং সতর্ককরণের উদ্দেশ্যে হযরত উবাই (রাঃ)-কে এ সূরাটি তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দেন। কেউ যেন এটা মনে না করে যে, শিখবার ও মনে রাখবার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উবাই (রাঃ)-এর সামনে এ সূরাটি তিলাওয়াত করেছিলেন। এসব ব্যাপারে। আল্লাহ্ তা’আলাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) একাধিক কিরআতের মাধ্যমে কুরআন কারীম পাঠ করায় হযরত উবাই (রাঃ)-এর মনে যে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল তা নিরসন কল্পেই রাসূলুল্লাহ (সঃ) এই সূরাটি হযরত উবাই (রাঃ)-কে পাঠ করে শোনান । হযরত উমর (রাঃ)-এর ঘটনাও একই ধরনের। তিনি হুদাইবিয়ার সন্ধির বছরে সন্ধির ব্যাপারে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তার মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিলঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি বলেননি যে, আমরা কা’বা শরীফে যাবো এবং তাওয়াফ করবো?” উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) বলেনঃ “হ্যা, তা বলেছিলাম বটে, কিন্তু এটা তো বলিনি যে এ বছরই এটা হবে? নিঃসন্দেহে সে সময় আসছে যখন তুমি সেখানে পৌছবে ও তাওয়াফ করবে।” হুদাইবিয়া হতে ফিরবার পথে সূরা ফাতহ নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) হযরত উমর (রাঃ)-কে ডেকে সূরাটি পড়ে শোনালেন। তাতে নিম্নের আয়াতটিও ছিলঃ

لَقَدْ صَدَقَ اللَّهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِن شَاء اللَّهُ آمِنِينَ

| .. . অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূল (সঃ)-এর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে।” (৪৮ ঃ ২৭)

হাফিয আবু নাঈম (রাঃ) তার (আসমায়ী সাহাবা) নামক গ্রন্থে একটি হাদীস সংযোজন করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ “আল্লাহ তা’আলা (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا ) এ সূরাটির কিরআত শুনে বলেনঃ হে আমার বান্দা! তুমি খুশী হয়ে যাও, আমার মর্যাদার শপথ! তোমাকে জান্নাতে এমন বাসস্থান দিবো যে, তুমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে।৪

হযরত মাতার আলমুযানী অথবা মাদানী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা’আলা (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا ) এ সূরাটির কিরআত শুনে বলেনঃ “আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতে কোন অবস্থাতেই বিস্মৃত হবো না এবং তোমাকে জান্নাতে এমন বাসস্থান দান করবো যাতে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে।”৫

—

দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

১। কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল এবং মুশরিকরা আপন মতে অবিচলিত ছিল তাদের প্রমাণ না  আসা পর্যন্ত।

২। আল্লাহর নিকট হতে এক রাসূল, যে আবৃত্তি করে পবিত্র গ্রন্থ।

৩। যাতে সু-প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাসমূহ রয়েছে।

৪। যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা তো বিভক্ত হলো তাদের নিকট সুস্পষ্ট   প্রমাণ আসার পর।

৫। তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে এবং নামায কায়েম করতে ও যাকাত প্রদান করতে, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্ম।

—

আহলে কিতাব দ্বারা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর মুশরিকীন দ্বারা বুঝানো হয়েছে মূর্তি পূজক আরব এবং অগ্নিপূজক অনারবদেরকে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তারা প্রত্যাবর্তনকারী ছিল না যে পর্যন্ত তাদের সামনে সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত হয়।

আল্লাহর কোন একজন রাসূল যিনি পবিত্র গ্রন্থ পাঠ করে শুনিয়ে দেন, যাতে আছে সঠিক বিধান, এর দ্বারা কুরআন কারীমের কথা বুঝানো হয়েছে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ

فِي صُحُفٍ مُّكَرَّمَةٍ

مَّرْفُوعَةٍ مُّطَهَّرَةٍ

بِأَيْدِي سَفَرَةٍ

كِرَامٍ بَرَرَةٍ

অর্থাৎ “ওটা আছে মহান লিপিসমূহে, যা উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন, পবিত্র, মহান, পূতঃচরিত্র লিপিকর হস্তে লিপিবদ্ধ।” (৮০ ঃ ১৩-১৬)।

সঠিক বিষয়সমূহ লিপিবদ্ধকরণের ক্ষেত্রে কোন প্রকার ভুল-ভ্রান্তি হয়নি। হযরত কাতাদা (রঃ) বলেন যে, নবী করীম (সঃ) উত্তমভাবে কুরআনের ওয়ায করেন এবং কুরআনের সুন্দর ব্যাখ্যা দেন। ইবনে যায়েদ (রঃ) বলেন যে, এ সব সহীফায় সত্য ন্যায়ের কথা সম্বলিত বিষয়সমূহ রয়েছে।

এরপর আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ আর যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছিল তাদের নিকট এই স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত হওয়ার পরই তারা বিভক্ত হয়ে গেল। যেমন বিভিন্নভাবে বর্ণিত একটি হাদীসে রয়েছেঃ ইয়াহুদীরা একাত্তর ফিরকা বা সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে গেল, আর নাসারারা বা খ্রিস্টানরা বিভক্ত হলো বাহাত্তর ফিরকায়। এই উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ) তিয়াত্তর ফিরকায় বিভক্ত। তার মধ্যে। একটি মাত্র ফিরকা ছাড়া সবাই জাহান্নামে যাবে।” জনগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! তারা কারা?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “আমি এবং আমার সাহাবীগণ যে আদর্শের উপর রয়েছি (এই আদর্শের উপর যারা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।)।”

আল্লাহ তা’আলা এরপর বলেনঃ অথচ তাদের প্রতি এই নির্দেশই ছিল যে, তারা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করবে। যেমন আল্লাহ তা’আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

অর্থাৎ “তোমার পূর্বে আমি যতো রাসূল পাঠিয়েছি সবারই কাছে এই অহী। করেছি যে, আমি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (২১ঃ২৫) এখানেও আল্লাহ পাক বলেনঃ একনিষ্ঠ হয়ে অর্থাৎ শিরক হতে দূরে থেকে এবং তাওহীদ বা একত্ববাদে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে ইবাদত করো। যেমন অন্যত্র বলেনঃ

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ

অর্থাৎ “আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি। (সেই কথা বলার জন্যে যে, তোমরা আল্লাহরই ইবাদত করো এবং তাগূত হতে দূরে থাকো।” (১৬ : ৩৬)

এরপর আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা বলেনঃ তারা নামায কায়েম করবে ও যাকাত দিবে, এটাই সঠিক দ্বীন। যাকাত দিবে এর অর্থ এই যে, ফকীর মিসকীন এবং অভাবগ্রস্তদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। এই দ্বীন অর্থাৎ ইসলাম মযবূত, সরল, সহজ এবং কল্যাণধর্মী। বহু সংখ্যক ইমাম যেমন ইমাম যুহরী (রঃ), ইমাম শাফিয়ী (রঃ) প্রমুখ এ আয়াত থেকে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, এই আয়াতের সরলতা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর ইবাদত, নামায আদায় ও যাকাত প্রদানকেই দ্বীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

—

৬। কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করে তারা এবং মুশরিকরা নরকাগ্নির মধ্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তারাই সৃষ্টির অধম।

৭। যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।

৮। তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে তাদের পুরস্কার স্থায়ী জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের উপর প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট; এটা তার জন্য যে তার প্রতিপালকের ভয় করে।

—

আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের পরিণাম বর্ণনা করছেন যে, কাফির, ইয়াহুদী, নাসারা, মুশরিক, আরব ও অনারব যেই হোক না কেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এর বিরোধ এবং আল্লাহর কিতাবকে অবিশ্বাস করে তারা কিয়ামতের দিন জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে, সেখানেই তারা চিরকাল অবস্থান করবে। কোন অবস্থাতেই তারা সেখান থেকে ছাড়া বা রেহাই পাবে না। এরাই নিকৃষ্টতম সৃষ্টি।

এরপর আল্লাহ তা’আলা পুণ্যবান বান্দাদের পরিণাম সম্পর্কে বলেনঃ নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে এবং ভাল কাজ করেছে তারাই উদ্ধৃষ্টতম সৃষ্টি। এ আয়াত থেকে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) এবং একদল আলেম ব্যাখ্যা করেন।

যে, ঈমানদার মানুষ আল্লাহর ফেরেশতাদের চেয়েও উৎকৃষ্টতর। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ তাদের প্রতিদান স্বরূপ তাদের প্রতিপালকের নিকট সর্বদা অবস্থানের জান্নাতসমূহ রয়েছে যেগুলোর নিম্নদেশে নহর সমূহ বইতে থাকবে। সেখানে তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে। আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। এটা ঐ ব্যক্তির জন্যে যে নিজের প্রতিপালককে ভয় করে অর্থাৎ যার মনে আল্লাহ তা’আলার প্রতি ভয় ভীতি রয়েছে। ইবাদত করার সময় যে মন প্রাণ দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করে, এমনভাবে ইবাদত করে যেন চোখের সামনে রাব্দুল আ’লামীন আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে। যে রাব্বল আলামীন সব কিছুরই মালিক এবং যিনি সর্বশক্তিমান।

মুসনাদে আহমাদে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সর্বোত্তম সৃষ্ট জীব কে এ সংবাদ কি আমি তোমাদেরকে দিবো না?” সাহাবীগণ উত্তরে বললেনঃ “হ্যা, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাদেরকে আপনি এ খবর দিন।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “আল্লাহর সৃষ্ট মানুষের মধ্যে ঐ মানুষ সবচেয়ে উত্তম যে জিহাদের ডাক শোনার জন্যে ঘোড়ার লাগাম ধরে থাকে, যেন শোনা মাত্রই ঘোড়ায় আরোহণ করতে পারে এবং শত্রুদলে প্রবেশ করে বীরত্বের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়। এবার আমি তোমাদেরকে এক উৎকৃষ্ট সৃষ্টির সংবাদ দিচ্ছি। যে ব্যক্তি নিজের বকরীর পালের মধ্যে অবস্থান করা সত্ত্বেও নামায আদায় করতে এবং যাকাত দিতে কৃপণতা করে না। এবার তোমাদেরকে এক নিকৃষ্ট সৃষ্টির সংবাদ দিচ্ছি। সে হলো ঐ ব্যক্তি যে (কোন অভাবগ্রস্তকে) আল্লাহর নামে কিছু চাওয়ার পর কিছু না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়।”

—

❏ টীকাঃ

১. এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ) ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম তিরমিযী (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ)ও বর্ণনা করেছেন।

২. জামে তিরমিযীতেও বর্ণনাটি রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী (রঃ) এটাকে হাসান সহীহ  বলেছেন।

৩. এ হাদীসটি হাফিজ আবুল কাসিম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন। এ পদ্ধতিতে এ হাদীসটি গারীব বা দুর্বল। পূর্বে যেটা বর্ণনা করা হয়েছে সেটাই প্রমাণিত।

৪. এ হাদীসটি উসূলে হাদীসের পরিভাষায় নিতান্ত গারীব বা দুর্বল।

৫. আবু মূসা আলমাদানী (রঃ) এবং ইবনুল আমীর (রঃ) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

 

৯৮ সূরা আল বাইয়্যিনাহ অর্থ ও তাফসীর(তাফহীম)

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ مُنفَكِّينَ حَتَّىٰ تَأْتِيَهُمُ الْبَيِّنَةُ

১) আহলি কিতাব ও মুশরিকদের ১ মধ্যে যারা কাফের ছিল ২ তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত তারা ( নিজেদের কুফরী থেকে ) বিরত থাকতে প্রস্তুত ছিল না৷৩ 
১. আহলি কিতাব ও মুশরিক উভয় দলই কুফরী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলেও দু’দলকে দু’টি পৃথক নাম দেয়া হয়েছে৷ যাদের কাছে আগের নবীদের আনা কোন আসমানী কিতাব ছিল , তা যত বিকৃত আকারেই থাক না কেন , তারা তা মেনে চলতো , তাদেরকে বলা হয় আহলি কিতাব৷ আর যারা কোন নবীর অনুসারী ছিল না৷ কোন আসমানী কিতাবও মানতো না তারা মুশরিক৷ কুরআন মজীদের বহু স্থানে আহলি কিতাবদের শির্কের উল্লেখ করা হয়েছে ৷যেমন খৃষ্টানদের সম্পর্কে বলা হয়েছে : তারা বলে ,আল্লাহ তিন খোদার একজন ৷”( আল মায়েদাহ ৭৩ )”তারা মসীহকেও খোদা বলে৷ “(আল মায়েদাহ ১৭ )”তারা মসীহকে আল্লাহর পুত্র গণ্য করে৷” (আত তাওবা ৩০ ) আবার ইহুদিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে :”তারা উযাইরকে আল্লাহর পুত্র বলে “(আত তাওবা ৩০ ) কিন্তু এসব সত্ত্বে কুরআনের কোথাও তাদের জন্য মুশরিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়নি৷বরং তাদের উল্লেখ করা হয়েছে “আহলি কিতাব” বা “যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিল ” শব্দের মাধ্যমে ৷ অথবা ইয়াহুদ ও নাসারা শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে ৷ কারণ তারা তাওহিদী ধর্ম মানতো,তারপর শিরক করতো৷ বিপরীত পক্ষে অ – আহলি কিতাবদের জন্য পারিভাষিক পর্যায়ে মুশরিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কারণ তারা শিরককেই আসল ধর্ম গণ্য করতো৷ তাওহীদকে তারা পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করতো৷ এ দু’টি দলের মধ্যকার এ পার্থক্যটা শুধুমাত্র পরিভাষার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না,শরীয়াতের বিধানের মধ্যেও এ পার্থক্য ছিল৷আহলি কিতাবার আল্লাহর নাম নিয়ে যদি কোন হালাল প্রাণীকে সঠিক পদ্ধতিতে যবেহ করে তাহলে তা মুসলমানের জন্য হালাল গণ্য করা হয়েছে৷তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করারও অনুমতি দেয়া হয়েছে৷ অন্যদিকে মুশরিকদের যবেহ করা প্রাণীও হালাল নয় এবং তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে অনুমতি দেয়া হয়নি৷
২. এখানে কুফরী শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে৷ বিভিন্ন প্রকার কুফরী দৃষ্টিভংগী এর অন্তরভুক্ত৷ যেমন কেউ এই অর্থে কাফের ছিল যে , সে আদৌ আল্লাহকে মানতো না৷ আবার কেউ আল্লাহকে মানতো ঠিকই কিন্তু তাঁকে একমাত্র মাবুদ বলে মানতো না ৷ বরং আল্লাহর সত্ত্বা ও তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্বের গুণাবলী ও ক্ষমতায় কোন না কোনভাবে অন্যদেরকে শরীক করে তাদের বন্দেগীও করতো৷ কেউ আল্লাহর একত্ব স্বীকার করতো কিন্তু এ সত্ত্বেও আবার কোন না কোন ধরনের শিরকও করতো৷ কেউ আল্লাহকে মানতো কিন্তু তাঁর নবীদেরকে মানতো না এবং নবীদের মাধ্যমে যে হেদায়াত এসেছিল তাকে মানতে অস্বীকার করতো৷ কেউ এক নবীকে মানতো কিন্তু অন্য নবীকে অস্বীকার করতো৷ মোটকথা , বিভিন্ন ধরনের কুফরীতে লোকেরা লিপ্ত ছিল৷ এখানে আহলি কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল ‘ একথা বলার অর্থ এ নয় যে , তাদের মধ্যে তাহলে কিছু লোক ছিল যারা কুফরীতে লিপ্ত ছিল না৷ বরং এর অর্থ হচ্ছে , কুফরীতে লিপ্ত দু’টি দল ছিল , একটি আহলি কিতাব ও অন্যটি মুশরিক৷ এখানে মিন ( আরবী ———-) শব্দটি কতক বা কিছু অর্থে ব্যবহৃত হয়নি৷ বরং ‘ মিন ‘ এখানে বর্ণনামূলক ৷ যেমন সূরা হজ্জের ৩০ আয়াতে বলা হয়েছে : আরবী —————————————————————- অর্থাৎ মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো৷ এর অর্থ এ নয় যে , মূর্তিদের মধ্যে যে অপবিত্রতা আছে তা থেকে দূরে থাকো৷ তেমনি আরবী ————————————————- এর অর্থ হচ্ছে : যারা কুফরী করে , যারা আহলে কিতাব ও মুশরিকদের দলের অন্তরভুক্ত ৷ এর অর্থ এ নয় যে , এই দু’টি দলের মধ্য থেকে যারা কুফরী করে৷
৩. অর্থাৎ একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে তাদেরকে কুফরীর প্রতিটি গলদ ও সত্য বিরোধী বিষয় বুঝাবে এবং যুক্তি – প্রমাণের সাহায্যে সুস্পষ্ট পদ্ধতিতে সত্য সঠিক পথ তাদের সামনে পেশ করবে , এ ছাড়া এই কুফরীর অবস্থা থেকে বের হবার আর কোন পথ তাদের সামনে ছিল না৷ এর মানে এ নয় যে , এ সুস্পষ্ট প্রমাণটি এসে যাবার পর তারা সবাই কুফরী পরিত্যাগ করবে৷ বরং এর মানে হচ্ছে এই প্রমাণটির অনুপস্থিতিতে তাদের এই অবস্থার মধ্য থেকে বের হয়ে আসা সম্ভবপরই ছিল না৷ তবে তার আসার পরও তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের কুফরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায় ৷ এরপর তারা আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতে পারবে না যে , আপনি আমাদের হোদায়াতের কোন ব্যবস্থা করেননি৷ এই ধরনের কথা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে ৷ যেমন সুরা নাহলে বলা হয়েছে : আরবী ———————————————————————–“সোজা পথ দেখানো আল্লাহরই দায়িত্ব৷ ” ( ৯ আয়াত ) সূরা লাইলে বলা হয়েছে : আরবী ———-” পথ দেখাবার দায়িত্ব আমার ৷” (১২ আয়াত ) আরবী ———————————————————————————” আমি তোমার প্রতি ঠিক তেমনিভাবে অহী পাঠিয়েছি যেভাবে নূহ ও তারপর নবীদের প্রতি পাঠিয়েছিলাম —————— এই রসূলদেরকে সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারী করা হয়েছে যাতে রসূলদের পর লোকদের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি না থাকে৷ ” ( আন নিসা ১৬৩-১৬৪ আয়াত )
আরবী ——————————————————————————–
” হে আহলি কিতাব ! রসূলদের সিলসিলা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর প্রকৃত সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্য তোমাদের কাছে আমার রসূল এসেছে৷ যাতে তোমরা বলতে না পারো আমাদের কাছে না কোন সুসংবাদদানকারী এসেছিল , না এসেছিল কোন সতর্ককারী৷ কাজেই নাও , এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদানকারী এসে গেছে এবং সতর্ককারীও ৷ ” ( আল মায়েদাহ ১৯) 
رَسُولٌ مِّنَ اللَّهِ يَتْلُو صُحُفًا مُّطَهَّرَةً
২) ( অর্থাৎ ) আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রসূল৪  যিনি পবিত্র সহীফা পড়ে শুনাবেন ,৫ 
৪. এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেই একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ বলা হয়েছে ৷ কারণ তাঁর নবুওয়াত লাভের আগের ও পরের জীবন , নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কুরআনের মতো কিতাব পেশ করা , তাঁর শিক্ষা ও সাহচর্যের প্রভাবে ঈমান গ্রহণকারীদের জীবনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন সূচীত হওয়া , তাঁর পুরোপুরি যুক্তিসংগত আকীদা – বিশ্বাস , অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ইবাদাত – বন্দেগী , চূড়ান্ত পর্যায়ের পবিত্র ও নিষ্কলুষ নৈতিক চরিত্র এবং মানব জীবন গঠনের জন্য সবচেয়ে ভালো মূলনীতি ও বিধি – বিধান শিক্ষা দেয়া , তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে পুরোপুরি সামঞ্জস্য থাকা এবং সব ধরনের বিরোধিতা ও বাধা বিপত্তির মোকাবেলায় সীমাহীন দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতা সহকারে তাঁর নিজের দাওয়াতের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া — এসব বিষয়ই তিনি যে যথার্থই আল্লাহর রসূল সে কথারই ছিল সুস্পষ্ট আলামত৷ 
৫. আভিধানিক অর্থে ‘ সহীফা ‘ বলা হয় “লিখিত পাতাকে ৷” কিন্তু কুরআন মজীদে এ শব্দটিকে পারিভাষিক অর্থে নবীগণের ওপর নাযিলকৃত কিতাব হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে৷ আর পবিত্র সহীফা মানে হচেছ এমন সব সহীফা যার মধ্যে কোন প্রকার বাতিল কোন ধরনের গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা এবং কোন নৈতিক অপবিত্রতার মিশ্রণ নেই৷ কোন ব্যক্তি এই কথাগুলোর পুরোপুরি গুরুত্ব তখনই অনুধাবন করতে পারবেন যখন তিনি – কুরআনের পাশাপাশি বাইবেল ( এবং অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থগুলোও) অধ্যয়ন করবেন৷ সেখানে তিনি দেখবেন সঠিক কথার সাথে সাথে এমন কথাও লেখা আছে , যা সত্য ও ন্যায় এবং সুস্থ বিবেক – বুদ্ধির পরিপন্থী৷ আবার এই সংগে নৈতিক দিক দিয়েও অত্যন্ত নিম্নমানের৷ এসব কথা পড়ার পর কুরআন পড়লে যে কোন ব্যক্তি তার অসাধারণ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রমাণ পেয়ে যাবেন৷ 
فِيهَا كُتُبٌ قَيِّمَةٌ
৩) যাতে একেবারে সঠিক কথা লেখা আছে৷  
وَمَا تَفَرَّقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَةُ
৪) প্রথমে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে তো বিভেদ সৃষ্টি হলো তাদের কাছে ( সত্য পথের ) সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে যাওয়ার পর৷৬ 
৬. অর্থাৎ ইতিপূর্বে আহলি কিতাবরা বিভিন্ন ভুল পথে পাড়ি জমিয়ে যেসব বিভিন্ন দল ও উপদলের উদ্ভব ঘটিয়েছিল তার কারণ এ ছিল না যে , মহান আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তাদেরকে পথ দেখাবার জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ পাঠাবার ব্যাপারে কোন ফাঁক রেখেছিলেন৷ বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশনা আসার পর তারা নিজেরাই এ কর্মনীতি অবলম্বন করেছিল৷ কাজেই নিজেদের গোমরাহীর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী ছিল৷ কারণ তাদেরকে সঠিক পথ দেখাবার জন্য পূর্ণাংগ ব্যবস্থা অবলম্বন করে প্রমাণ পূর্ণ করা হয়েছিল৷ অনুরূপভাবে এখন যেহেতু তাদের সহীফাগুলো পাক – পবিত্র ছিল না এবং তাদের কিতাব গুলো একেবারে সত্য সঠিক , শিক্ষা সম্বলিত ছিল না , তাই মহান আল্লাহ একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে নিজের একজন রসূল পাঠিয়ে এবং তাঁর মাধ্যমে পুরোপুরি সর্ত – সঠিক শিক্ষা সম্বলিত পাক পবিত্র সহীফা পেশ করে আবার তাদের ওপর প্রমাণ পূর্ণ করে দিলেন৷ফলে এর পরেও যদি তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয় তাহলে এর দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তাবে ৷ আল্লাহর মোকাবেলায় তারা কোন প্রমাণ পেশ করতে পারবে না ৷ কুরআন মজীদের বহু জায়গায় একথা বলা হয়েছে ৷ উদাহরণ স্বরূপ দেখুন সূরা আল বাকারা ২১৩- ২৫৩ আয়াত, আলে ইমরান ১৯ আয়াত, আল মায়েদাহ ৪৪- ৫০ আয়াত , ইউসুফ ৯৩ আয়াত , আশ শূরা ১৩-১৫ আয়াত , আল জাসিয়াহ ১৬-১৮ আয়াত ৷ এই সাথে তাফহীমূল কুরআনে এসব আয়াতের আমি যে ব্যাখ্যাগুলো লিখেছি সেগুলোর ওপরও যদি একবার নজর বুলানো যায় তাহলে বক্তব্যটি অনুধাবন করা আরো সহজ হবে ৷
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ ۚ وَذَٰلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
৫) তাদেরকে তো এ ছাড়া আর কোন হুকুম দেয়া হয়নি যে , তারা নিজেদের দীনকে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত করে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদাত করবে , নামায কায়েম করবে ও যাকাত দেবে, এটিই যথার্থ সত্য ও সঠিক দীন৷ ৭ 
৭. অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দীনটি পেশ করছেন ৷ আহলি কিতাবদের কাছে যেসব কিতাব নাযিল করা হয়েছিল এবং তাদের কাছে যেসব নবী এসেছিলেন তারাও তাদেরকে সেই একই দীনের তালীম দিয়েছিলেন ৷ পরবর্তীকালে যেসব বাতিল আকীদা – বিশ্বাস গ্রহণ করে বিপর্যয় সৃষ্টি কারী কাজ – কর্মের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল তার কোনটিরও হুকুম তারা দেননি ৷ সবসময় সত্য ও সঠিক দীন একটিই ছিল ৷ আর সেটি হচ্ছে : একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করতে হবে ৷ তাঁর বন্দেগীর সাথে আর কারো বন্দেগীর মিশ্রণ ঘটানো যাবে না৷ সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে এনে একমাত্র আল্লাহর পূজারী এবং তাঁর ফরমানের অনুগত হতে হবে৷ নামায কায়েম করতে হবে৷ যাকাত দিতে হবে৷ (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমূল কুরআন আল আ’রাফ ১৯ টীকা , ইউনুস ১০০ – ১০৯ টীকা , আররূম ৪৩ – ৪৭ টীকা এবং আয যুমার ৩- ৪ টীকা )
এই আয়াতে ‘দীনুল কাইয়েমা ‘ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে ৷ কোন কোন মুফাসসির একে ( আরবী ———-) অর্থাৎ ” সত্য – সঠিক পথাশ্রয়ী মিল্লাতের দ্বীন” অর্থে নিয়েছেন৷ আবার কেউ কেউ একে বিশেষ্যের সাথে বিশেষণের সম্বন্ধ হিসেবে গণ্য করেছেন এবং ( আরবী ——-) এর ( আরবী ) কে (আরবী ) ও ( আরবী ) এর মতো অত্যাধিক বৃদ্ধি অর্থে গ্রহণ করেছেন৷ আমি এখানে অনুবাদে যে অর্থ গ্রহণ করেছি তাদের মতে এর অর্থও তাই৷ 
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ أُولَٰئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ
৬) আহলি কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে৮ তারা নিশ্চিতভাবে জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে ৷ তারা সৃষ্টির অধম ৷৯ 
৮. এখানে কুফরী মানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেনে নিতে অস্বীকার করা৷ অর্থাৎ মুশরিক ও আহলি কিতাবদের মধ্য থেকে যারা এই রসূলের নবুওয়াত লাভের পর তাঁকে মানেনি৷ অথচ তাঁর অস্তিত্বই একটি সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল প্রমাণ৷ তিনি সম্পূর্ণ ও নিভুল লিপি সম্বলিত মত পবিত্র সহীফা পাঠ করে তাদেরকে শুনাচ্ছেন৷ এ ধরনের লোকদের পরিণাম তাই হবে যা সামনের দিকে বর্ণনা করা হচ্ছে৷ 
৯. অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি আর নেই৷ এমন কি তারা পশুরও অধম৷ কারণ পশুর বুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তা ও কর্মশক্তি নেই৷ কিন্তু এরা বুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তা ও কর্মশক্তি সত্ত্বেও সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়৷ 
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ
৭) যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তারা নিশ্চিত ভাবে সৃষ্টির সেরা ৷১০ 
১০. অর্থাৎ তারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবার এমনকি ফেরেশতাদেরও সেরা ৷ কারণ ফেরেশতারা আল্লাহর নাফরমানি করার স্বাধীন ক্ষমতা রাখে না৷ আর মানুষ এই নাফরমানি করার স্বাধীন ক্ষমতা রাখা সত্ত্বেও আনুগত্যের পথ অবলম্বন করে ৷
جَزَاؤُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۖ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ
৮) তাদের পুরষ্কার রয়েছে তাদের রবের কাছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত ৷ সেখানে তারা চিরকাল থাকবে ৷ আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ৷ এসব সে ব্যক্তির জন্য যে তার রবকে ভয় করে ৷১১ 
১১. অন্য কথায় যে ব্যক্তি আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভীক এবং তাঁর মোকাবিলায় দুঃসাহসী ও বেপরোয়া হয়ে জীবন যাপন করে না৷ বরং দুনিয়ায় প্রতি পদে পদে আল্লাহকে ভয় করে জীবন যাপন করে ৷ প্রতি পদক্ষেপে যে ব্যক্তি মনে করে , কোথাও আমি এমন কোন কাজ তো করে বসিনি যার ফলে আল্লাহ আমাকে পাকড়াও করে ফেলেন , তার জন্য আল্লাহর কাছে রয়েছে এই প্রতিদান ও পুরস্কার৷ 

Leave a Reply