আমানতদারীতার সাথে দায়িত্ব পালন

আমানতদারীতার সাথে দায়িত্ব পালন

ইসমাইল বিন ইবরাহীম

(মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান এর লেখার আলোকে)

আমানত শব্দটির অর্থ নিরাপদ রাখা বা কোনো কিছু গচ্ছিত রাখা। কারো কাছে কোনো অর্থ-সম্পদ, বস্তুসামগ্রী বা কথা গচ্ছিত রাখাকে আমানত বলে। ইবনে মানযুর বলেন, আমানত হলো খিয়ানতের বিপরীত। ব্যাপক অর্থে আমানত অর্থ হলো আস্থা, নিরাপত্তা, তত্ত্বাবধান, বিশ্বস্ততা, হেফাজত ইত্যাদি। মানুষের মধ্যে যেসব সৎগুণাবলি রয়েছে তম্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমানত রক্ষা করা। আমানত রক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমানতের বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করেছেন। শুধুমাত্র কোনো কিছু গচ্ছিত রাখার নাম আমানত নয়; বরং আমানত রক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক।

আল-কোরআনে আমানত রক্ষার নির্দেশনাঃ

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ۚ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا

‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহতায়ালা তোমাদেরকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’ (সুরা নিসা-৫৮)

আমানতদারিতাকে আল্লাহতায়ালা মুমিনের বিশেষ গুণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেনঃ

পবিত্র  কোরআনে সুরা মুমিনুনের প্রথম দশ আয়াতে ইমানদারের দশটি গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। যে গুণগুলো প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বভাবে পরিপূর্ণ ছিল। হজরত ইয়াযিদ ইবনে বাবনুস থেকে বর্ণিত তিনি হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে প্রশ্ন করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র কীরূপ ছিল? তিনি বলেন, তার চরিত্র তথা স্বভাবগত অভ্যাস  কোরআনেই বর্ণিত আছে। অতঃপর তিনি এই দশটি আয়াত (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ১-১০) তিলাওয়াত করে বলেন, এগুলোই হলো রাসুলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র। (সুনানে নাসাঈ শরীফ)

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ [٢٣:١]

মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে,

الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ [٢٣:٢]

যারা নিজেদের নামাযে বিনয়-নম্র;

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ [٢٣:٣]

যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত,

وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ [٢٣:٤]

যারা যাকাত দান করে থাকে

وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ [٢٣:٥]

এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে।

إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ [٢٣:٦]

তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না।

فَمَنِ ابْتَغَىٰ وَرَاءَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْعَادُونَ [٢٣:٧]

অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা সীমালংঘনকারী হবে।

وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ [٢٣:٨]

এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুশিয়ার থাকে।

وَالَّذِينَ هُمْ عَلَىٰ صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ [٢٣:٩]

এবং যারা তাদের নামাযসমূহের খবর রাখে।

أُولَٰئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ [٢٣:١٠]

তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে।

الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ [٢٣:١١]

তারা শীতল ছায়াময় উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।

উক্ত আয়াতগুলোতে বর্ণিত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পঞ্চমটি হলো আমানত প্রত্যার্পণ করা। আল্লাহ বলেন, এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে। (সুরা মুমিনুন, আয়াত-৮)

হাদীসে আমানত রক্ষার নির্দেশনাঃ

عَن أبي هُرَيْرَةَ قَالَ : بَيْنَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحَدِّثُ إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ : مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ : إِذَا ضُيِّعَتِ الْأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ. قَالَ : كَيْفَ إِضَاعَتُهَا؟ قَالَ : إِذَا وُسِّدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ، رَوَاهُ الْبُخَارِيُّ-

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু ‘আলাইহে ওয়া সাল্লাম) মজলিসে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় তাঁর কাছে একজন বেদুঈন এল এবং প্রশ্ন করল, ক্বিয়ামত কবে হবে? উত্তরে তিনি বললেন, যখন আমানত বিনষ্ট হবে তখন ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর। লোকটি বলল, তা কিভাবে বিনষ্ট হবে? তিনি বললেন, যখন অযোগ্য লোকের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করা হবে, তখন ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর’। (বুখারী হা/৬৪৯৬; মিশকাত হা/৫৪৩৯ ‘ফিতান’ অধ্যায়, ‘ক্বিয়ামতের আলামত সমূহ’ অনুচ্ছেদ।)

এখানে তিনটি বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে। এক- আমানতের খেয়ানত করার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। দুই- উক্ত প্রবণতা দূর করার জন্য প্রয়োজন শক্ত শাসন ও তদারকি। তিন- যথাযোগ্য ব্যক্তির হাতে আমানত সোপর্দ করা। এটাকে চুরি হিসাবে গণ্য করে ইসলামে রয়েছে হাত কেটে ফেলার মত সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান। (মায়েদাহ ৫/৩৮)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,يُطْبَعُ الْمُؤْمِنُ عَلَى الْخِلاَلِ كُلِّهَا إِلاَّ الْخِيَانةَ وَالْكَذِبَ- ‘মুমিন সকল স্বভাবের উপর সৃষ্টি হ’তে পারে খেয়ানত ও মিথ্যা ব্যতীত’।[ মুসনাদ বাযযার হা/১১৩৯; মুসনাদ আবী ইয়া‘লা হা/৭১১; মাজমা‘উয যাওয়ায়েদ হা/৩২৮] অর্থাৎ মুমিন কখনো খেয়ানতকারী ও মিথ্যাবাদী হ’তে পারে না। যারা এটা করে, তারা আসলে মুমিন নয়।

আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,أَرْبَعٌ إِذَا كُنَّ فِيكَ فَلاَ عَلَيْكَ مَا فَاتَكَ مِنَ الدُّنْيَا : حِفْظُ أَمَانَةٍ وَصِدْقُ حَدِيثٍ وَحُسْنُ خَلِيقَةٍ وَعِفَّةٌ فِي طُعْمَةٍ- ‘চারটি বিষয় যদি তোমার মধ্যে থাকে, তাহ’লে দুনিয়ায় তুমি কি ছেড়ে গেলে সেটা দেখার বিষয় থাকবেনা। ১. আমানত রক্ষা করা। ২. সত্য কথা বলা। ৩. সচ্চরিত্রতা এবং ৪. হালাল ও পবিত্র জীবিকা’।[ আহমাদ হা/৬৬৫২; বায়হাক্বী শো‘আব হা/৪৮৭৮; মিশকাত হা/৫২২২ ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায়; ছহীহাহ হা/৭৩৩।]

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللهِ يُكَفِّرُ الذُّنُوبَ كُلَّهَا إِلاَّ الْأَمَانَةَ، ‘আল্লাহর পথে জিহাদ সকল গোনাহের কাফফারা, আমানত ব্যতীত’।[ বায়হাক্বী শো‘আব হা/৪৮৮৫; ছহীহুত তারগীব হা/১৭৬৩; ইবনু জারীর ২০/৩৪০।] অন্য বর্ণনায় এসেছে, إِلاَّ الدَّيْنَ، ‘ঋণ ব্যতীত’।[ মুসলিম হা/১৮৮৬; মিশকাত হা/৩৮০৬ ‘জিহাদ’ অধ্যায়।] অতএব প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হবে, আমানত রক্ষা করা ও যথাসম্ভব ঋণ না করা। আর বাধ্য হয়ে ঋণ করলেও তা যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করা অথবা অছিয়ত করা। যাতে হঠাৎ মৃত্যু হয়ে গেলে ওয়ারিছগণ সর্বাগ্রে সেটি পরিশোধ করে।

হযরত আনাস (রাঃ) বলেন,قَلَّمَا خَطَبَنَا رَسُولُ اللهِ -صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- إِلاَّ قَالَ : لاَ إِيمَانَ لِمَنْ لاَ أَمَانَةَ لَهُ، وَلاَ دِينَ لِمَنْ لاَ عَهْدَ لَهُ- ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের নিকট খুব কমই ভাষণ দিতেন যেখানে তিনি বলতেন না যে, ঐ ব্যক্তির ঈমান নেই, যার আমানতদারিতা নেই। আর ঐ ব্যক্তির দ্বীন নেই, যার অঙ্গীকার ঠিক নেই’।[ বায়হাক্বী শো‘আব হা/৪০৪৫; মিশকাত হা/৩৫; ছহীহুত তারগীব হা/৩০০৪।]

আমানতের ব্যাপকতা : 

আমানত একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। যার মধ্যে আর্থিক আমানত, কথার আমানত, পরামর্শের আমানত, নছীহতের আমানত, গোপনীয়তা রক্ষার আমানত, ইযযতের আমানত, দায়িত্বের আমানত, ইলমের আমানত, ইসলামী দাওয়াতের আমানত, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আমানত, রাষ্ট্রীয় আমানত, আদালতের মাধ্যমে আল্লাহর দন্ডবিধি সমূহ বাস্তবায়নের আমানত, নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার আমানত, ন্যায়বিচারের আমানত, জনগণের আমানত, সংগঠনের আমানত, চাকুরীর আমানত, ব্যবসায়ের আমানত, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের আমানত, পরিবার পালনের আমানত প্রভৃতি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,أَدِّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلاَ تَخُنْ مَنْ خَانَكَ- ‘তুমি তার আমানত আদায় কর, যে তোমার নিকট আমানত রেখেছে। আর তোমার সাথে যে খেয়ানত করেছে, তার সাথে খেয়ানত করো না’।[ আবুদাঊদ হা/৩৫৩৫; তিরমিযী হা/১২৬৪; মিশকাত হা/২৯৩৪ রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ); ছহীহাহ হা/৪২৩০।] অর্থাৎ খেয়ানতকারীর প্রতি পাল্টা খেয়ানত করা যাবেনা।

সৃষ্টির সূচনায় আল্লাহ তাঁর দ্বীনের আমানত সোপর্দ করার জন্য আসমান, যমীন, পাহাড় ও মানুষের নিকট প্রস্তাব করেছিলেন। তখনকার সেই অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন,إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَّحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولاً- ‘আমরা আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার নিকট এই আমানত পেশ করেছিলাম। অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং এ থেকে শংকিত হ’ল। কিন্তু মানুষ তা বহন করল। বস্ত্ততঃ সে অতিশয় যালেম ও অজ্ঞ’। (আহযাব ৩৩/৭২)

আমানত যাদের সাথে সম্পৃক্তঃ

আমানতের কিছু দিক হলো আল্লাহর হক সর্ম্পকিত আরো কিছু দিক হলো হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক সর্ম্পকিত। হাক্কুল্লাহ সর্ম্পকিত যাবতীয় ফরজ ওয়াজিব পালন করা, সতীত্বের হিফাজত, সালাত, জাকাত, রোজা, হজ্ব, জাকাত ইত্যাদি আদায় করা। আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা। আর হাক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত বিষয়গুলো হলো, কারো বস্তুগত আমানত রক্ষা করা। সাথে সাথে মানুষের দোষত্রুটি গোপন করা বা অন্যের সম্মান রক্ষা হয় এই রকম বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আমানত রক্ষা করা। ইমাম কুরতুবী (র.) বলেন, দীনের যাবতীয় কর্তব্য আমানতের অর্ন্তভুক্ত । (তাফসিরে কুরতুবী, খণ্ড ১৪, পৃ-১৭৯)

প্রিয়নবী (সাঃ) এর অনুসরণীয় চরিত্রে আমানতঃ

প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে বাল্যকাল থেকেই আমানতদারিতার গুণ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। যার কারণে তৎকালীন আরবের লোকেরা তাকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধি দিয়েছিল। কেননা তারা তাদের মালামাল ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্য নবীজির কাছে রাখতেন। অতঃপর নবীজি তা যথাযথভাবে প্রাপকের কাছে সময়মতো বুঝিয়ে দিতেন।

হিজরতের কুচকুচে কালাে রাত। দারুন নদওয়া বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং পূর্ব-পরিকল্পনা মােতাবেক, যুবকরা ঘেরাও করেছে নবীজির ঘরের চারপাশ। এদিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিজ বিছানায় রেখে এলেন। এর কারণ হলাে। কাফিররা নবীজির প্রতি সীমাহীন শত্রুতা পােষণ করলেও পুরাে মক্কার মানুষেরা তাকে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মনে করত। তাদের দামি গয়না-গাটি, আসবাবপত্র নবীজির কাছে আমানত রাখত। সেই আমানতগুলাে নবীজি যথাযথভাবে মালিকদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বের হওয়ার সময় আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আশ্বস্ত করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সকাল অবধি নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকো, তােমার কোনাে ক্ষতি হবে না। নবীজি সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন।

অনূরূপভাবে তিনি জীবনব্যাপী আমানতের দায়িত্ব পালন করে বিদায় হজ্বের ভাষণে আরাফাতের ময়দানে লক্ষাধিক সাহাবাদেরকে সামনে রেখে বলেন, আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো, আমার উপর অর্পিত আমানত আমি পৌঁছে দিয়েছি। হাদিসে পাকে রয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন তোমার মাঝে চারটি জিনিস থাকবে, তখন দুনিয়ার সবকিছু হারিয়ে গেলেও তোমার কোনো সমস্যা থাকবে না। ১. আমানত রক্ষা করা, ২. সত্যকথা বলা, ৩. সুন্দর চরিত্র, ৪. হালাল উপায়ে রিজিক উপার্জন করা। (মুসনাদে আহমদ-৬৬৫২, মুসতাদরাকে হাকেম-৭৯৮৯) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমানতদারকে ইসলামের অন্যতম নিদর্শন সাব্যস্ত করেছেন। হজরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এরূপ উপদেশ খুব কমই দিয়েছেন যাতে এ কথাগুলো বলেন নি যে, যার আমানতদারিতা নেই তার ইমান নেই এবং যার অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দীন-ধর্ম নেই। (মুসনাদে আহমদ-১২৪০৬)

মূসা (আঃ)-এর জীবনে আমানতঃ

মূসা (আঃ)-এর আমানতদারিতার সাক্ষ্য দিয়ে শো‘আয়েব (আঃ)-এর দুই কন্যার একজন তাদের পিতাকে বলেছিল, আববা! এঁকে বাড়ীতে কর্মচারী হিসাবে রেখে দিন। কেননা ‘আপনার কর্ম সহায়ক হিসাবে সেই-ই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত’ (ক্বাছাছ ২৮/২৬)। পরে শো‘আয়েব (আঃ) মূসাকে তাঁর জামাই করে নেন (ক্বাছাছ ২৮/২৭)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন,أَفْرَسُ النَّاسِ ثَلاَثَةٌ : الْعَزِيزُ حِينَ قَالَ لِامْرَأَتِهِ أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتِّخِذَهُ وَلَدًا، وَالَّتِي قَالَتْ : يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ، وَأَبُو بَكْرٍ حِينَ تَفَرَّسَ فِي عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا- ‘দুনিয়াতে তিন ব্যক্তি ছিলেন সর্বাধিক বিচক্ষণ। (১) ‘আযীযে মিসর’ বা মিসরের রাজস্ব মন্ত্রী (যিনি শিশু ইউসুফের চেহারা দেখেই তাকে চিনেছিলেন এবং স্ত্রীকে বলেছিলেন,) ‘একে সম্মানজনকভাবে থাকার ব্যবস্থা কর। সম্ভবতঃ সে আমাদের কল্যাণে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব’ (ইউসুফ ১২/২১)। (২) শো‘আয়েব (আঃ)-এর ঐ কন্যা, যে মূসা সম্পর্কে স্বীয় পিতাকে বলেছিল, হে পিতা! আপনি এঁকে আপনার কর্মসহযোগী হিসাবে রেখে দিন। কেননা উত্তম সহযোগী সেই-ই, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত হয়’ (ক্বাছাছ ২৮/২৬)। (৩) হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ), যিনি ওমর (রাঃ)-কে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসাবে অছিয়ত করেছিলেন’।[ হাকেম ২/৩৭৬, হা/৩৩২০, হাকেম একে ‘ছহীহ’ বলেছেন এবং যাহাবী তা সমর্থন করেছেন; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৮৯।]

সাহাবাদের (রাঃ) জীবনে আমানতঃ

খায়বার যুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ইহুদিদের একটি দুর্গ ঘেরাও করেন। সেখানকার ইহুদি নেতার একজন রাখাল একপাল ছাগল নিয়ে নবীজির কাছে আসেন। রাখালটি ছিলেন ওই ইহুদি নেতার বেতনভুক্ত মজুর। তিনি এসে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার সামনে ইসলামকে উপস্থাপন করুন। নবীজি তার সামনে ইসলামকে তুলে ধরেন । তিনি সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হলেন হজরত আসলাম আল হাবশী (রা)। যিনি ছিলেন হাবশার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি বললেন, আমি এই ছাগলগুলোর মালিকের মজুর। আমার নিকট এগুলো তার আমানত। এখন এই ছাগলগুলো আমি কী করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এগুলোর মুখ কেল্লার দিকে ঘুরিয়ে এবং মুখে একটু আঘাত করে হাঁকিয়ে দাও, তারা মালিকের কাছে ফিরে যাবে। তিনি তাই করে ছাগলগুলোকে হাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, তোমরা তোমাদের মালিকের নিকট ফিরে যাও, আল্লাহ তোমাদের সাথে থাকবেন। ছাগলগুলো মালিকের কাছে পৌঁছে গেল। তিনি এমন সাহাবী ইমান গ্রহণের সাথে আমানতের গুরুত্ব অনুধাবণ করেছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে এক ওয়াক্ত সালাত আদায়ের সুযোগও পাননি। শহীদ হয়ে গেছেন। (উসদুল গাবা ১/১০৭)

ইসলামের ইতিহাসে আমানতঃ

তৎকালীন বিশ্বের পরাশক্তি রোম সম্রাটের সেনাপতি মুসলিম বাহিনীর নিকট বারবার পরাজিত হয়ে ১৩ হিজরীতে শামের আজনাদাইন যুদ্ধের এক পর্যায়ে তার এক দুঃসাহসী ও উনণত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আরব খৃষ্টান গুপ্তচরকে নিয়োগ দেন। গুপ্তচর মুসলিম সেনা শিবিরে কয়েকদিন অবস্থান শেষে ফিরে গিয়ে যে রিপোর্ট দেয়, তা ছিল নিম্নরূপ :هُمْ بِاللَّيْلِ رُهْبَانٌ وَبِالنَّهَارِ فُرْسَانٌ، وَلَوْ سَرَقَ ابْنُ مَلِكِهِمْ قَطَعُوْا يَدَهُ وَلَوْ زَنَى رَجَمُوْهُ- ‘তারা রাতের বেলায় ইবাদতগুযার ও দিনের বেলায় ঘোড় সওয়ার। আল্লাহর কসম! যদি তাদের শাসকপুত্র চুরি করে, তাহ’লে তারা তার হাত কেটে দেয়। আর যদি যেনা করে, তবে তাকে প্রস্তরাঘাতে মাথা ফাটিয়ে হত্যা করে’। একথা শুনে সেনাপতি ক্বায়কুলান বলে ওঠেন, وَللهِ لَئِنْ كُنْتَ صَادِقًا لَبَطْنُ الْاَرْضِ خَيْرٌ لَنَا مِنْ ظَهْرِهَا ‘আল্লাহর কসম! যদি তোমার কথা সত্য হয়, তাহ’লে ভূগর্ভ আমাদের জন্য উত্তম হবে ভূপৃষ্ঠের চাইতে’। অর্থাৎ আমাদের মরে যাওয়াই উত্তম হবে।

পরে ১৬ হিজরীতে শাম থেকে নিরাশ হয়ে রাজধানী কনস্টান্টিনোপলে ফিরে গিয়ে রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস তাঁর এক বিশ্বস্ত গুপ্তচরকে মুসলমানদের বিজয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তার কাছ থেকে একই ধরনের রিপোর্ট পেয়ে বলেন,لَئِنْ كُنْتَ صَدَقْتَنِيْ لَيَمْلِكُنَّ مَوْضِعَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ- ‘যদি তুমি আমাকে সত্য বলে থাক, তাহ’লে ওরা অবশ্যই আমার দু’পায়ের নীচের এই সিংহাসনটারও মালিক হয়ে যাবে’।[ ইবনু জারীর, তারীখুত ত্বাবারী ২/২১৫; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/৭, ৫৪ পৃ.।]

তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছিল এবং হযরত ওমর ও ওছমান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে রোমক ও পারসিক সাম্রাজ্য ইসলামী খেলাফতের অধীনস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে উক্ত বিজয় অব্যাহত থাকে। যা এশিয়া, ইউরোপ ও অফ্রিকা সহ পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ ভূ-ভাগে বিস্তৃত হয়। ১৯২৪ সালের ২৪শে মার্চ সর্বশেষ তুরষ্কের ওছমানীয় খেলাফত ইহূদী-নাছারা ও তাদের দোসর মুনাফিকদের চাতুরী ও কপটতার কারণে বিলুপ্ত হয়।

আমানতদারিতার গুরুত্ব যে কত বেশী, তা বুঝা যায় পরবর্তী খলীফা কাকে করা হবে সে বিষয়ে খলীফা আবুবকর ও ওমরের মৃত্যুকালীন দুশ্চিন্তা থেকে। আবুবকর (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর সময় পরবর্তী খলীফা হিসাবে নিকটতম ছাহাবীদের নিকট ওমর ফারূকের নাম প্রস্তাব করেন। তাতে তারা সবাই একবাক্যে সম্মত হন। তবে কেউ কেউ ওমরের কঠোরতার বিষয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি বলেন, খেলাফতের গুরুভার চেপে বসলে ঐ কঠোরতা কমে যাবে।[ ইবনুল আছীর, আল-কামেল ফিত তারীখ ২/২৬৬ পৃ.।] ওমর (রাঃ) মৃত্যুর আগে আততায়ীর হামলায় আহত হওয়ার পর যখম যন্ত্রণা ভুলে পরবর্তী খলীফা কাকে করা যায়, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকেন। এসময় উপস্থিত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাসের নিকট যোগ্যতম কয়েকজনের নাম নিয়ে আলোচনা করেন এবং প্রত্যেকের ভাল-মন্দ সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেন। শেষে কারু ব্যাপারে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পেরে তিনি স্ব স্ব জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত উম্মতের শ্রেষ্ঠ ছয় জনের নাম প্রস্তাব করে যান এবং তাঁর মৃত্যুর তিন দিনের মধ্যে তাদেরকে যেকোন এক জনের ব্যাপারে একমত হওয়ার আদেশ দেন। যদি দুই পক্ষে তিন তিন সমান হয়ে যায়, তাহ’লে বড় ছেলে আব্দুল্লাহ বিন ওমরকে এক পক্ষে সমর্থন দিয়ে খলীফা নিযুক্তির কথা বলে যান।[ আল-মাওয়ার্দী, আল-আহকামুস সুলত্বা-নিইয়াহ ১৩ পৃ.।] এতে বুঝা যায় যে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যোগ্য নেতা নির্বাচন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সেখানে যোগ্য নির্বাচকমন্ডলী থাকা তার চাইতে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নেতাই হবেন সর্বোচ্চ আমানতদার। তাঁর কাছেই থাকবে সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আমানত।

দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে আমানত রক্ষার গুরুত্বঃ

সামাজিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমানতের চর্চা থাকলে সেই সমাজ কল্যাণে ভরপুর থাকে এবং সর্বত্র শান্তি বিরাজ করে। সমাজের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ তাদের দায়িত্ব যথাথ পালনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা করতে চেষ্টা করে। এতে জনগণও উপকৃত হয়। আল্লাহ তায়ালা হজরত ইউছুফ (আ.) সর্ম্পকে বলেন,قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ  “ ইউসুফ বলল, আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত-৫৫) আল্লাহ তায়ালা বলেন,يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ “চোখের চুরি ও অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন।” (সুরা মুমিন, আয়াত-১৯)

আত্মসাতের পরিমাণ কম হউক বা বেশি হউক সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। খায়বারের যুদ্ধে একজন গোলাম হাঠৎ তীরের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কতই সৌভাগ্য তার! সে জান্নাতি হয়ে গেল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কখনো নয়। শপথ যার হাতে আমার প্রাণ। খায়বারে বণ্টন ব্যতীত সে যে কাপড় নিয়েছে, তা তার জন্য আগুন জালাতে থাকবে। (সহিহ বুখারি)

হজরত ইমরান বিন হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার যুগের লোকেরাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। অতঃপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা। রাবী বলেন, আমি বলতে পারছিনা নবীজি তার যুগের পর দুই যুগ নাকি তিন যুগের কথা উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, তোমাদের পর এমন লোকেরা আসবে যারা খেয়ানত করবে, আমানত রক্ষা করবে না। সাক্ষ্য দিতে না ডাকলেও তারা সাক্ষ্য দিবে, তারা মানত করবে কিন্তু তা পূর্ণ করবে না। তাদের মধ্যে মেদওয়ালাদের প্রকাশ ঘটবে। (সহিহ বুখারি-২৬৫১)

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব রক্ষায় আমানতদারিতাঃ

আল্লাহ তায়ালা বলেন, يَآ أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لاَ تَخُونُوا اللهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوآ أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ – ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খেয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে তোমাদের পরস্পরের আমানত সমূহে খেয়ানত করো না’ (আনফাল ৮/২৭)। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ খেয়ানতকারীদের ভালবাসেন না’ (আনফাল ৮/৫৮)। আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে বলেন, وَلاَ تَكُن لِّلْخَآئِنِينَ خَصِيمًا – …‘আর তুমি খেয়ানতকারীদের পক্ষে বাদী হয়ো না’ (নিসা ৪/১০৫)। অত্র আয়াত থেকে স্পষ্টরূপে বুঝা যায় যে, নেতা কখনো কোন অধঃস্তন কর্মচারী বা কর্মকর্তার খেয়ানতের পক্ষে বাদী হ’তে পারবেন না। আর সেকারণেই রাসূল (ছাঃ) কুরায়েশ বংশের সম্ভ্রান্ত মাখযূম গোত্রের জনৈকা মহিলা চুরি করলে তার পক্ষে সুপারিশের জওয়াবে উসামা বিন যায়েদকে বলেন, তুমি আমার নিকট আল্লাহর দন্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করছ? অতঃপর তিনি দাঁড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে বলেন, إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ، وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ، ‘তোমাদের পূর্বেকার জাতি ধ্বংস হয়েছে একারণে যে, যখন তাদের মধ্যে কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করত, তখন তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত, তখন তার উপরে দন্ডবিধি জারি করত’। وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا – ‘আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করত, তাহ’লে আমি তার হাত কেটে দিতাম’।[ বুখারী হা/৩৪৭৫; মুসলিম হা/১৬৮৮ (৮); মিশকাত হা/৩৬১০ ‘দন্ডবিধি সমূহ’ অধ্যায়।]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللهُ رَعِيَّةً، يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِّرَعِيَّتِهِ، إِلاَّ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ- ‘আল্লাহ যখন তার কোন বান্দাকে কিছু লোকের দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন, অতঃপর সে খেয়ানত কারী হিসাবে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন’।[ মুসলিম হা/১৪২; রাবী মা‘ক্বিল বিন ইয়াসার (রাঃ)।] এরূপ কঠোর বিধানের কারণেই কোনরূপ চুরি বা সরকারী সম্পদের আমানতের খেয়ানত করার ঘটনা ইসলামী খেলাফতের ইতিহাসে দুর্লভ। ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিজয়ের মূল কারণ ছিল মূলতঃ এই আমানতদারী এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার।

মুসলিম বাহিনী ওয়াদিল ক্বোরা উপস্থিত হ’লে ইহূদীরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। তাতে মিদ‘আম (مِدْعَم) নামক রাসূল (ছাঃ)-এর জনৈক গোলাম মৃত্যুবরণ করে। সাথীরা তাকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলে ওঠেন, الْجَنَّةُ ‘তার জন্য জান্নাত’। তখন রাসূল (ছাঃ) রাগতঃস্বরে বলেন, ‘কখনোই না। সেই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ, এই ব্যক্তি খায়বরের দিন গণীমত বণ্টনের পূর্বেই তা থেকে একটা চাদর নিয়েছিল। সে চাদর এখন তার উপর অবশ্যই আগুন হয়ে জ্বলবে’। একথা শুনে কেউ জুতার একটি ফিতা বা দু’টি ফিতা যা গোপনে নিয়েছিল, সব এনে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে জমা দিল। রাসূল (ছাঃ) বললেন, এ ফিতা ছিল আগুনের’।[ বুখারী হা/৪২৩৪; মুসলিম হা/১১৫; মিশকাত হা/৩৯৯৭, জিহাদ অধ্যায়-১৯, অনুচ্ছেদ-৭।]

জাবের (রাঃ) বলেন, জনৈক ব্যক্তি মারা গেলে মাত্র দুই দীনার ঋণ থাকায় রাসূল (ছাঃ) তাঁর জানাযা পড়াননি। তখন আবু ক্বাতাদাহ উক্ত ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিলেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বললেন, ঋণগ্রস্ত নির্ধারিত হ’ল এবং মাইয়েত দায়মুক্ত হ’ল? আবু ক্বাতাদাহ বলল, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার জানাযা পড়ালেন। একদিন পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ঐ দুই দীনারের অবস্থা কি? আবু ক্বাতাদাহ বলল, মাত্র গতকালই লোকটি মারা গেছে। পরের দিন রাসূল (ছাঃ) পুনরায় তার নিকটে এলেন। আবু ক্বাতাদাহ বলল, আমি তার দুই দীনার পরিশোধ করেছি। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, الآنَ بَرَدَتْ عَلَيْهِ جِلْدُهُ- ‘এখন ঐ মাইয়েতের চামড়া ঠান্ডা হ’ল’।[ আহমাদ হা/১৪৫৭৬, সনদ হাসান।] এতে বুঝা যায় যে, কেবল দায়িত্ব নিলেই মাইয়েতের আযাব দূর হবেনা, যতক্ষণ না তার ঋণ পরিশোধ করা হবে।[ শাওকানী, নায়লুল আওত্বার ৫/২৮৫।]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গণীমতের মালের দুই দিরহাম বা তার কম মূল্যের তুচ্ছ বস্তুর খেয়ানতকারী[ ছহীহ ইবনু হিববান হা/৪৮৫৩।] এবং আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়েননি বরং অন্যকে পড়তে বলেছেন।[ বুখারী হা/৫৭৭৮; মুসলিম হা/১০৯; মিশকাত হা/৩৪৫৩।] এক্ষণে আমানতের খেয়ানতকারী ব্যক্তির সাথে মুমিন সমাজের আচরণ কেমন হওয়া উচিৎ, তা সহজেই অনুমেয়।

عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ : أَدُّوا الْخِيَاطَ وَالْمَخِيطَ، وَإِيَّاكُمْ وَالْغُلُولَ فَإِنَّهُ عَارٌ عَلَى أَهْلِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ-

উবাদা বিন ছামেত (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, (হোনায়েন যুদ্ধের দিন) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘হে জনগণ! তোমাদের গণীমতের মালের সুঁই ও সুতা সহ সবই জমা দাও। গণীমতের মাল আত্মসাৎ করা হ’তে বেঁচে থাক। কেননা ক্বিয়ামতের দিন তা আত্মসাৎকারীর জন্য লজ্জা ও অপমানের কারণ হবে’।[ দারেমী হা/২৪৮৭; নাসাঈ হা/৩৬৮৮ হাসান; মিশকাত হা/৪০২৩।]

আমানত রক্ষা না করার পরিণামঃ

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষের চারিত্রিক গুণাবলির মধ্যে যে গুলো সবচেয়ে আগে অদৃশ্য হয়ে যাবে তা হলো আমানতদারিতা। আর শেষ পর্যন্ত যা রয়ে যাবে তা হলো নামাজ। তবে এমন অনেক নামাজি আছে, যারা কোনো কল্যাণই অর্জন করতে পারেন না। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলেপাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা খিয়ানত করোনা। কেননা খিয়ানত কতই না শাস্তিযোগ্য অপরাধ। (আবু দাউদ) কিয়মতের ময়দানে মানুষের সব আমলনামা পেশ করা হবে। পাপ-পুণ্যের হিসাব করা হবে। পৃথিবীতে যারা আমানতের খিয়ানত করেছিল তাদের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, কিয়ামতের দিন আমানতের খিয়ানতকারীকে হাজির করা হবে এবং বলা হবে তোমর কাছে গচ্ছিত আমার আমানত ফিরিয়ে দাও। সে বলবে হে আমার প্রতিপালক তা কীভাবে ফিরিয়ে দেব? পৃথিবীতো ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন তার গচ্ছিত আমানতগুলো যেভাবে রাখা হয়েছিল ঠিক সেই ভাবে জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে তাকে দেখানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে ওইখানে অবতরণ করে এগুলো উত্তোলন করে নিয়ে আস। সে তখন নেমে যাবে জিনিসগুলো ঘাড়ে করে নিয়ে আসতে চাইবে। জিনিসগুলো তার কাছে দুনিয়ার সব পাহাড়ের চাইতেও ভারী মনে হবে। সে মনে করবে এগুলো তুলে আনলে সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে। সে তখন জাহান্নামের শেষ প্রান্তে চলে আসবে তখই উক্ত জিনিসগুলো জাহান্নামের নিচে পড়ে যাবে। এভাবে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। (বায়হাকী)

কুরআনের আমানত :

আমানতদারিতার বিষয়ে সতর্ককারী শ্রেষ্ঠ ইলাহী গ্রন্থ হ’ল আল-কুরআন। যা মানুষকে বিশ্ব পরিচালনার সর্বোচ্চ আমানত সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ ও সর্বোত্তম উপায়ে পরিপালনের যথাযথ পথ প্রদর্শন করে। সেদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন,لَوْ أَنْزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللهِ، وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ – ‘যদি এই কুরআন আমরা কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম, তাহ’লে অবশ্যই তুমি তাকে দেখতে আল্লাহর ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ হ’তে। আর আমরা এইসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্য বর্ণনা করি যাতে তারা চিন্তা-গবেষণা করে’ (হাশর ৫৯/২১)। আর এ কারণেই জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ হিসাবে ‘আবুল হাকাম’ নামে প্রসিদ্ধ ‘আবু জাহেল’ ও তার সাথীরা কুরআনী আমানত বহনে অস্বীকার করেছিল। যে বিষয়ে আল্লাহ বলেন,قَدْ نَعْلَمُ إِنَّهُ لَيَحْزُنُكَ الَّذِي يَقُولُونَ فَإِنَّهُمْ لاَ يُكَذِّبُونَكَ وَلَكِنَّ الظَّالِمِينَ بِآيَاتِ اللهِ يَجْحَدُونَ – ‘আমরা জানি যে, তারা যেসব কথা বলে তা তোমাকে দুঃখ দেয়। কিন্তু বাস্তব কথা এই যে, ওরা তোমাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং এইসব যালেমরা আল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার করে’ (আন‘আম-মাক্কী ৬/৩৩)।

জগৎ সংসারে শান্তি ও সুখের আকাঙ্খী এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠাকামী মানুষকে অবশ্যই কুরআনী আমানত বহনে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহকে খেয়ানতের দায়ে আল্লাহর নিকট দায়ী হ’তে হবে।

আল্লাহ আমাদেরকে খেয়ানতের কঠিন পাপ থেকে রক্ষা করুন- আমীন!

 

 

 

 

Leave a Reply