পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি
মূল লেখক- ওস্তাদ উমর ফারুক
সম্পাদনা- ইসমাইল বিন ইবরাহীম
ভুমিকা
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। (মনে রাখবে) পরিশেষে আমার কাছেই ফিরতে হবে” (সুরা লোকমান : ১৪)। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে আপন হাতে নিপুন করে সৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীতে তাঁর ইবাদতের জন্য পাঠিয়েছেন। আর পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী মানুষ তার পিতা-মাতার জন্যই পৃথিবীর আলো দেখতে পায়। মাতা-পিতা সন্তানের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। মা তার দেহের বিন্দু বিন্দু রক্ত দিয়ে গর্ভস্থ সন্তানকে বড় করে তোলেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তিনি আপন স্তন্য পান করিয়ে শিশু সন্তানকে তিলে তিলে পরিপুষ্ঠ করে তোলেন। সন্তানকে শিক্ষিত করার জন্য মাতা-পিতা সব রকম চেষ্টা করেন। বস্তুত সন্তানের জন্ম, বৃদ্ধি, শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রতিষ্ঠা সবকিছুর জন্য সন্তান মাতা-পিতার কাছে ঋণী। পৃথিবীর সব ঋণ শোধ করা যায়। কিন্তু মাতা-পিতার ঋণ অপরিশোধযোগ্য। আজকে আমরা ইসলামের আলোকে মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
মাতা-পিতার গুরুত্ব ও অবদান
আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) ব্যতীত সকল মানুষকেই আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন পিতার ঔরষে এবং মাতার গর্ভের মাধ্যমে অসহায় শিশু রূপে। আল্লাহ তা‘আলা আল কুরআনে ঘোষণা করেছেন,
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لاَ تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالأَبْصَارَ وَالأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের (সৃষ্টি) করেছেন। তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদেরকে কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর দিয়েছেন, যাতে তোমরা অনুগ্রহ স্বীকার কর।’’ -নাহালঃ ৭৮
অতপর এ ছোট শিশুটি দুনিয়ার মানুষের আদর যত্ন, স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসা পেয়ে বড় হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অবদান মাতা-পিতার, সে জন্যই মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার জন্য আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেছেন।
কেন আমরা মাতা-পিতার সাথে সুন্দর আচরণ করব?
আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে সুন্দরতম সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ। অন্যান্য জন্তু বা প্রাণী জন্মের পর পরই নিজের চাহিদা নিজেই পুরণ করতে শিখে। কিন্তু সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ শুরু থেকেই থাকে অসহায়। সেই অসহায় শিশুটিকে যারা বুক দিয়ে আগলে রাখেন, বিভিন্ন বিপদ-আপদ ও প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন তারা হচ্ছেন পিতা-মাতা। তাইতো মাতা-পিতা ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে গড়ে উঠে নিবিড় সম্পর্ক। সৃষ্টিগত সেই সম্পর্ক আরও প্রাণবন্ত ও দায়িত্বপূর্ণ করে তুলতে মানবতার ধর্ম ইসলাম দিয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। কোন সন্তান যাতে মাতা-পিতার অনবদ্য অবদান ভুলে তাদের সাথে অনাকাঙ্খিত আচরণ না করে সে ব্যাপারে ইসলাম কঠোর হুশিয়ারি দিয়েছে ।
তাই সন্তানের জীবনে মাতা পিতার গুরুত্ব অপরিসীম এবং তাদের অবদান অনস্বীকার্য। মাতা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গর্ভধারণ করেন, লালন পালন করেন। রোগ শোকে সেবা শুশ্রƒষা করেন। নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান। নিজের আরাম আয়েশ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের কল্যাণে জীবনপাত করেন। পিতাও অক্লান্ত পরিশ্রমে লালন পালন করেন। ইসলাম শুধু তাদের কষ্টের স্বীকৃতিই দেয়নি বরং তাদেরকে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করেছে এবং সন্তানদেরকে পিতা মাতার অধিকার রক্ষার তাগিদ দিয়েছে।
আল-কুরআনের আলোকে মাতা-পিতার মর্যাদার গুরুত্ব
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَقَضَى رَبُّكَ أَلاَّ تَعْبُدُواْ إِلاَّ إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاهُمَا فَلاَ تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلاَ تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا * وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদেরকে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল। তাদের সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বল ঃ “হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’’ -সূরা বনী ইসরাঈলঃ ২৩-২৪
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَوَصَّيْنَا الإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَاَمِيْنَ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِر
“আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু’বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে।।’’ -সূরা লোকমানঃ ১৪
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنكُمْ وَأَنتُم مُّعْرِضُونَ
“যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও দীন-দরিদ্রের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী।’’ -সূরা বাকারাঃ ৮৩
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُم مِّنْ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
“আপনি বলুন: এস, আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে হারাম করেছেন। তা এই যে, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করো না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করো, স্বীয় সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের কারণে হত্যা করো না। আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই। নির্লজ্জতার কাছেও যেয়ো না, প্রকাশ্য হোক কিংবা অপ্রকাশ্য যাকে হত্যা করা আলাহ্ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তোমরা বুঝ।’’-সূরা আনয়ামঃ ১৫১
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
وَاعْبُدُواْ اللَّهَ وَلاَ تُشْرِكُواْ بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالاً فَخُورًا
“আর ইবাদত কর আলাহ্র, শরীক করো না তার সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয় আলাহ্ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে।’’-সূরা নিসাঃ ৩৬
وَالَّذِي قَالَ لِوَالِدَيْهِ أُفٍّ لَّكُمَا أَتَعِدَانِنِي أَنْ أُخْرَجَ وَقَدْ خَلَتْ الْقُرُونُ مِن قَبْلِي وَهُمَا يَسْتَغِيثَانِ اللَّهَ وَيْلَكَ آمِنْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَيَقُولُ مَا هَذَا إِلاَّ أَسَاطِيرُ الأَوَّلِينَ
“আর যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বলে, ধিক তোমাদেরকে, তোমরা কি আমাকে খবর দাও যে, আমি পুনরুত্থিত হব, অথচ আমার পূর্বে বহু লোক গত হয়ে গেছে? আর পিতা-মাতা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলে, দূর্ভোগ তোমার তুমি বিশ্বাস স্থাপন কর। নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। তখন সে বলে, এটা তো পূর্ববর্তীদের উপকথা বৈ নয়।’’ -সূরা আহকাফঃ ১৭
হাদিসের আলোকে পিতামাতার সাথে সুন্দর আচরণের গুরুত্বঃ
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুলাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম- হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আল্লাহ তায়ালার কাছে কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, ওয়াক্তমত সলাত আদায় করা। আমি আবার বললাম, এরপর কোনটি ? তিনি বললেন , পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি ? তিনি বললেন , আলাহর রাস্তায় জিহাদ করা।” (বুখারী, মুসলিম)
আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে একজন প্রশ্ন করলেন- হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সন্তানের উপর পিতামাতার কী হক বা দাবী রয়েছে? তিনি বললেন, তারা উভয়ই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।” (ইবনে মাজা, মিশকাত)
মাতা-পিতার সাথে সদাচারনের প্রতিদান বা ফলাফল
মাতা-পিতার খিদমত হলো জান্নাত প্রাপ্তির উপায়। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে,
عَنْ ابي هُريرة (رض) قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : رَغِمَ أَنْفُهُ رَغِمَ أَنْفُهُ رَغِمَ أَنْفُهُ قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا ثمَّ لم يدْخل الْجنَّة
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, প্রশ্ন করা হল কার নাক হে আল্লাহর রাসূল? তিনি উত্তরে বলেন, যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে তার মাতা-পিতার একজন বা উভয়কে পেল অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করল না।’ -মুসলিমঃ ২৫৫১
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে,
عَن أبي أُمامةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا حَقُّ الْوَالِدَيْنِ عَلَى وَلَدِهِمَا؟ قَالَ: هُمَا جَنَّتُكَ ونارُكَ ( رَوَاهُ ابنُ مَاجَه
“আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একজন লোক রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের কি হক বা কর্তব্য আছে ? তিনি বলেন, তারা হলেন তোমার জান্নাত বা তোমার জাহান্নাম। ইবন মাজাহঃ ৩৬৬২; মিশকাতঃ ৪৯৪১
এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَصْبَحَ مُطِيعًا لِلَّهِ فِي وَالِدَيْهِ أَصْبَحَ لَهُ بَابَانِ مَفْتُوحَانِ مِنَ الْجَنَّةِ” (رواه البيهقي في شعب الايمان
“ইবন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মাতা-পিতার অনুগত হল, পরকালে জান্নাতের দু’টি দরজা তার জন্য খোলা রাখা হবে। -বায়হাকীঃ ৭৫৩৮; মিশকাতঃ ৪৯৪৩
মাতা-পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: رَضِيَ الربِّ فِي رضى الْوَالِدِ وَسُخْطُ الرَّبِّ فِي سُخْطِ الْوَالِدِ ( رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ
আব্দুল্লাহ ইবন আমর (রাঃ) বর্ণনা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।’তিরমিযী; মিশকাতঃ ৪৯২৭
পিতা মাতার খেদমতের কারণে গুনাহ মাফ হয়ঃ
হাদীসে এসেছে, “একজন লোক এসে বললেন- ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি একটি জঘন্য গুনাহ করে ফেলেছি। আমার জন্য তাওবার কোন ব্যবস্থা আছে কি? রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মা জীবিত আছেন? তিনি বললেন নেই। রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমার কোন খালা আছেন? বললেন- হ্যাঁ। রাসূল (সাঃ) বললেন- তোমার খালার সাথে সুন্দর আচরণ বা খেদমত করো।” (তিরমিযি, মিশকাত)
মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত
এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَن معاويةَ بن جاهِمةُ أَنَّ جَاهِمَةَ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ وَقَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيرُكَ. فَقَالَ:هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: فَالْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ عِنْدَ رِجْلِهَا (رَوَاهُ أَحْمَدُ وَالنَّسَائِيُّ وَالْبَيْهَقِيّ )
“মুয়াবিয়া ইবন জাহিমাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। (একদা আমার পিতা) জাহিমাহ্ নবী ﷺ-এর খিদমতে এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি জিহাদে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছা করেছি। অতএব এ ব্যাপারে আমি আপনার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মা জীবিত আছেন কি? সে বলল হ্যাঁ আছেন। তিনি বললেন, যাও, মায়ের খিদমতে নিজেকে নিয়োগ কর। কেননা, জান্নাত তার পায়ের কাছে।” -আহমদ; নাসাঈ; বায়হাকী; মিশকাতঃ ৪৯৩৯
মাতা-পিতার জন্য অর্থ-সম্পদ ব্যয় করা
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنفِقُونَ قُلْ مَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالأَقْرَبِينَ وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا تَفْعَلُواْ مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ *
“তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর তা হবে মাতা-পিতার জন্যে, আত্মীয়-আপনজনের জন্যে, ইয়াতীম-অনাথদের জন্যে, অসহায়দের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। আর তোমরা যে কোন সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে। -সূরা বাকারাঃ ২১৫
আল্লাহর সাথে শিরক ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে মাতা-পিতার আদেশ মান্য করা
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَصَّيْنَا الإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِن جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلا تُطِعْهُمَا إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
“আমি মানুষকে মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জন্য প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন অতঃপর আমি তোমাদেরকে বলে দেব যা কিছু তোমরা করতে। -সূরা আনকাবুতঃ ৮
অন্যায় কাজে আনুগত্য নয়ঃ
আল্লাহ তায়ালা বলেন “যদি পিতামাতা তোমাকে আমার সাথে কাউকে শরীক বানাতে চাপ দিয়ে থাকেন- সে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই- তবে অবশ্যই তাদের আনুগত্য করবে না।”(সূরা- লুকমান আয়াত-১৫) আর রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না ।” (আহমাদ)
পিতা-মাতা মুশরিক হলেও ভালো ব্যবহার করতে হবে
এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنهُ قَالَتْ: قَدِمَتْ عَلَيَّ أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ قُرَيْشٍ فَقُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّي قَدِمَتْ عَلَيَّ وَهِيَ رَاغِبَةٌ أَفَأَصِلُهَا؟ قَالَ نعم صِليها (مُتَّفق عَلَيْهِ
আসমা বিনতে আবী বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা মুশরিকা অবস্থায় আমার কাছে আসলে আমি রাসূলুল্লাহﷺ কে জিজ্ঞেস করলাম আমি কী তার সাথে ভালো ব্যবহার করব? তিনি ﷺ বললেন হ্যাঁ, তুমি তার সাথে ভালো ব্যবহার কর। বুখারী-৫৫৫৩, ৫৫৫৩; মুসলিম- ১০০৩
সবচেয়ে বেশী ভাল ব্যবহার পাওয়ার উপযোগী হলেন মাতা-পিতা
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِي؟ قَالَ: أُمَّكَ.قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: أُمَّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ أُمَّكَ. قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: أَبُوكَ وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: أُمَّكَ ثُمَّ أُمَّكَ ثُمَّ أُمَّكَ ثُمَّ أَبَاكَ ثمَّ أدناك أدناك ( مُتَّفق عَلَيْهِ ,مشكوة
“আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কে সবচেয়ে বেশি ভাল ব্যবহার পাওয়ার হকদার? তিনি বললেন তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে ? তিনি বললেন তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তার পর কে ? তিনি বললেন তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তার পর কে ? তিনি বললেন তোমার বাবা। -বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ৪৯১১
খেদমত পেতে মায়ের অগ্রাধিকারঃ
নবীজির কাছে প্রশ্ন করা হল, “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমার সুন্দর আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? রাসূল (সাঃ) বললেন- তোমার মা। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন-অতঃপর কে? রাসূল (সাঃ) বললেন- তোমার মা। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন- অতঃপর কে? রাসূল (সাঃ) বললেন- তোমার মা। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন-অতঃপর কে? রাসূল (সাঃ) বললেন- তোমার পিতা। এরপর যে তোমার নিকটতম এরপর যে তোমার নিকটতম।” (বুখারী)
পিতা মাতার খেদমতের কারণে হায়াত ও রিযিক বৃদ্ধি পায়ঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “ যদি কোন ব্যক্তি নিজের হায়াত দারায এবং প্রশস্ত রুজি কামনা করে, তবে সে যেন নিজের পিতামাতার সাথে উত্তম আচরণ করে এবং তার আতœীয়তার বন্ধন অটুট রাখে”।
মাতা-পিতার সাথে দুর্ব্যবহারের পরিণাম
পিতামাতার অবাধ্যতার শাস্তিঃ
শিরকের পরে বড় গুনাহ হলো পিতামাতার নাফরমানী (অবাধ্যতা)। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে রাসূল তাদেরকে বলুন যে, এসো আমি তোমাদেরকে বলি যে, তোমাদের রব তোমাদের উপর কী কী জিনিস নিষিদ্ধ করেছেন; তা হলো- তোমরা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, মাতা-পিতার সাথে উত্তম ব্যবহার করবে এবং দারিদ্রের ভয়ে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না।” (সূরা আন’আম- ১৫১)।
দুনিয়ার জীবনে অকল্যাণ, অমঙ্গল ও ধ্বংস অনিবার্য
যারা তাদের মাতা-পিতার সাথে দুর্ব্যবহার করে, আল্লাহ তাদের কোন প্রকারের ইবাদত কবূল করেন না, অমঙ্গল, অকল্যাণ ও ধ্বংস তাদের অনিবার্য এমনকি এ দুনিয়াতেই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শাস্তির কিছু নমুনা দেখিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمْ: ” ثَلَاثَةٌ لَا يُقْبَلُ مِنْهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَرْفٌ، وَلَا عَدْلٌ: عَاقٌّ، وَمَنَّانٌ، وَمُكَذِّبٌ بِقَدْرٍ ” (المعجم الكبير للطبراني
“আল্লাহ তাআলা তিন প্রকার লোকের তওবা কবুল করবেন না এবং তাদের কাছ থেকে কোন কিছু (অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে অন্যায় থেকে মুক্তি) গ্রহণ করবেন না। (১) মাতা-পিতার অবাধ্য ব্যক্তি (২) দান করে খোঁটা দানকারী (৩) তাক্বদীরকে অস্বীকারকারী। -তাবারানী
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كلُّ الذنوبِ يغفرُ اللَّهُ مِنْهَا مَا شاءَ إِلَّا عُقُوقَ الْوَالِدَيْنِ فَإِنَّهُ يُعَجَّلُ لِصَاحِبِهِ فِي الحياةِ قبلَ المماتِ (بَيْهَقِيُّ فِي شعب الْإِيمَان
“আবূ বাকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহﷺ বলেছেন, প্রত্যেক পাপ (শিরক ছাড়া) আল্লাহ তায়ালা যতটুকু ইচ্ছা ক্ষমা (মার্জনা) করে থাকেন, কিন্তু মাতা-পিতার অবাধ্যতা ক্ষমা করেন না বরং আল্লাহ তায়ালা তার শাস্তি দুনিয়াতেই তার মৃত্যুর পূর্বে প্রদান করেন। বায়হাকী; মিশকাতঃ ৪৯৪৫
পিতা-মাতাকে গালি দেয়া কবিরা গুনাহ্
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مِنَ الْكَبَائِرِ شَتْمُ الرَّجُلِ وَالِدَيْهِ . قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَهَلْ يَشْتُمُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ؟ قَالَ: نَعَمْ يَسُبُّ أَبَا الرَّجُلِ فَيَسُبُّ أَبَاهُ ويسبُّ أمه فيسب أمه ( مُتَّفق عَلَيْهِ
“আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বর্ণনা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, মাতা-পিতাকে গালি দেয়া কবীরা গোনাহ। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! কেউ কি তার মাতা-পিতাকে গালি দেয়? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ দেয়। কেউ যখন অন্যের মাতা-পিতাকে গালি দেয়, তখন তা তার নিজের মাতা-পিতার জন্য হয়ে থাকে। বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ৪৯১৬
মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া কবিরা গুনাহ্
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেন,
عَن الْمُغِيرَةِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوقَ الْأُمَّهَاتِ وَوَأْدَ الْبَنَاتِ وَمَنَعَ وَهَاتِ. وَكَرِهَ لَكُمْ قِيلَ وَقَالَ وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ وَإِضَاعَةَ الْمَالِ”(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
“মুগিরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী করীম ﷺ বলেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মায়েদের নাফরমানী করা, হক্বদারের হক না দেয়া এবং কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেয়া। আর তোমাদের জন্য গল্প-গুজবে মত্ত হওয়া, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা ও মাল সম্পদ নষ্ট করাকে অপছন্দ করেছেন।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাতঃ ৪৯১৫
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الكَبَائِرِ قُلْنَا: بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ، قَالَ: ” الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ، وَكَانَ مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَقَالَ: أَلاَ وَقَوْلُ الزُّورِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ، أَلاَ وَقَوْلُ الزُّورِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ ” فَمَا زَالَ يَقُولُهَا (بخاري
“রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি কী তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে জানাব? আমরা বললাম, জী হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন আল্লাহসাথে শিরক করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, তিনি হেলান দেয়া হতে সোজা হয়ে বসলেন এবং বলতে থাকলেন, খবরদার মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষি দেয়া, মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষি দেয়া, এ কথাগুলো বলতেই থাকলেন। বুখারীঃ ৫৯৭৬
মাতা-পিতার সাথে খারাপ ব্যবহার জান্নাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায়ঃ
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবীদের বললেন, “সেই লোক জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যে পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, যে উপকার করে খোটা দেয় এবং মদখোর।” (দারামী, মিশকাত)
মাতা-পিতার মৃত্যুর পর করণীয়
এ প্রসঙ্গে একটি বর্ণনা রয়েছে,
وَعَن أبي أسيد السَّاعِدِيّ قَالَ: بَيْنَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سَلَمَةَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ بَقِي من برِّ أبويِّ شيءٌ أَبَرُّهُمَا بِهِ بَعْدَ مَوْتِهِمَا؟ قَالَ:نَعَمْ الصَّلَاةُ عَلَيْهِمَا وَالِاسْتِغْفَارُ لَهُمَا وَإِنْفَاذُ عَهْدِهِمَا مِنْ بَعْدِهِمَا وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا تُوصَلُ إِلَّا بِهِمَا وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا) رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ
“আবূ উসাইদ (রাঃ) বলেন, একদা আমরা রাসূলের কাছে বসে ছিলাম, এমন সময় একজন লোক জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহরাসূল! মাতা-পিতার মৃত্যুর পরও কি তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে ? তিনি উত্তরে বললেন, হ্যাঁ আছে। (চারটি কর্তব্য রয়েছে)
(১) তাদের জন্য দু’আ ও ইস্তিগফার করা।
(২) তাদের কৃত ওয়াদাগুলো পূরণ করা।
(৩) তাদের মৃত্যুর পূর্বে যাদের সাথে তোমরা সুসম্পর্ক রাখতে তাদের সাথে সেই সম্পর্ক বজায় রাখা।
(৪) তাদের বন্ধু-বান্ধবদেরকে সম্মান করা। -আবূ দাঊদ-৫১৪২; ইবন মাজাহ্-৩৬৬৪
মাতা-পিতার মান্নত পুরণ করা।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ: أَنَّ سَعْدَ بن عبَادَة رَضِي الله عَنْهُم اسْتَفْتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي نَذْرٍ كَانَ عَلَى أُمِّهِ فَتُوُفِّيَتْ قَبْلَ أَنْ تَقْضِيَهُ فَأَفْتَاهُ أَنْ يَقْضِيَهُ عَنْهَا(مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
সাদ ইবন উবাদাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে ফতোয়া চাইলেন তাঁর মৃত মায়ের মান্নত পূরণ করার ব্যাপারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন তোমার পক্ষ থেকে পূরণ করে দাও। -বুখারী-৬৬৮৯, মুসলিম-১৬৩৮
এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত হয়েছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ، جَاءَتْ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: إِنَّ أُمِّي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ فَلَمْ تَحُجَّ حَتَّى مَاتَتْ، أَفَأَحُجُّ عَنْهَا؟ قَالَ:نَعَمْ حُجِّي عَنْهَا، أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَةً؟ اقْضُوا اللَّهَ فَاللَّهُ أَحَقُّ بِالوَفَاءِ”(بخاري
“ইবন আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জুহায়না বংশের একজন মহিলা এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ﷺ আমার মা হজ্জ করার মান্নত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ্জ আদায় না করেই মারা গেয়েছেন, আমি কী তার পক্ষ থেকে হজ্জ করতে পারি? তিনি ﷺ বললেন, হ্যাঁ, তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করে দাও। তুমি কি মনে কর যদি তোমার আম্মার উপর ঋণ থাকত তাহলে কি তুমি তা আদায় করতে না? সুতরাং আল্লাহহক আদায় করে দাও। কেননা আল্লাহহকই সবচাইতে অধিক আদায়যোগ্য। বুখারী-১৮৫২,৭৩১৫
নবীগণ মাতা-পিতার সাথে কেমন আচরণ করতেন?
ক. আমাদের মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আঃ) আজীবন স্বীয় পিতার সাথে সদ্ধব্যহার করেছেন। (অথচ সে ছিল অমুসলিম)।
খ. ইউসুফ (আঃ) দীর্ঘ দিন পর মাতা-পিতার পরিবেশে চলে আসেন। (আঃ)
গ. ইসমাঈল (আঃ) পিতার নির্দেশ পালনে স্বীয় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুতি নিয়ে ছুরির নিচে সানন্দে শুয়ে যান। শুধু মাত্র পিতার নির্দেশের মর্যাদা রক্ষার্থে স্বীয় স্ত্রীকেও তিনি তালাক দিয়েছিলেন।
উপসংহার
পারিবারিকভাবে সকল ধর্মের মানুষ মাতা-পিতাকে সম্মান করে, শ্রদ্ধা করে ও তাদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলে। আর ইসলামী শরিয়তও মানুষকে এ নির্দেশই দেয়। সুতরাং পিতা-মাতার নিখাদ খিদমতের মধ্যেই রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের কামিয়াবি। অতএব আমাদেরকেও তাঁদের পদাংক অনুসরণ করে পিতা-মাতার প্রতি প্রেম ভালোবাসা ও হৃদয় নিংড়ানো মমত্ববোধ দিয়ে নিঃসার্থ খিদমত করে যেতে হবে। তাহলেই হবে আমাদের জীবনের সার্থকতা। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি পাব এবং হতে পারব জান্নাতের অগণিত নিয়ামতের হক্বদার হতে পারব। আল্লাহ আমাদেরকে পিতা-মাতার প্রতি দয়াদ্র ও অনুগত হওয়ার তাওফীক দিন। আমাদের উচিৎ এই দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে মাতা-পিতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা, “হে আমার রব, তাঁদের উপর এমনভাবে রহম করো, যেমন শিশুকালে তাঁরা আমাকে রহম ও স্নেহদ্বারা লালনপালন করেছিলেন।” (সূরা বানী ইসরাঈল- ২৪) -আমিন!!
