আয়াতুল কুরসী ফজীলত ও তাফসীর

আয়াতুল কুরসী ফজীলত ও তাফসীর

এ আয়াতের শ্রেষ্ঠত্ব

ইবনে কাসির তার তাফসীরে লিখেছেনঃ কুরআন শরীফের মধ্যে সবচেয়ে ফযীলতের আয়াত সম্পর্কে সহীহ হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতের মর্যাদা সব আয়াতের চেয়ে উচ্চে।

আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ধারাবাহিকভাবে উবাইদ ইবন খাশখাশ …… আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, আবু যর জুনদুব ইবন জানাদাহ বলেছেনঃ একদিন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলে তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে বসা দেখতে পাই আর আমিও গিয়ে তার (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে বসি …….. এরপর আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আপনার প্রতি সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কোন আয়াতটি নাযিল হয়েছে ?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আয়াতুল কুরসী।” ( “….” এর পর পূর্ণ হাদিসটির শেষ অংশ উল্লেখ করা হয়েছে)

উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ধারাবাহিকভাবে আবদুল্লাহ ইবন রিবাহ ….. আহমাদ বর্ণনা করেছেনঃ একদিন উবাই ইবন কাব’কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করেন – কুরআনের মধ্যে কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ? তিনি বলেন – আল্লাহ ও তার রাসুল’ই (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা বেশী জানেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন – আয়াতুল কুরসী।

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন – হে আবুল মানযার, তোমাকে এই উত্তম জ্ঞানের জন্য ধন্যবাদ। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার আত্মা, এটির একটি জিহবা ও দুটো ঠোঁট রয়েছে যা দিয়ে সে আরশের অধিকারীর পবিত্রতা বর্ণনা করে।

আবু সালীল রহিমাহুল্লাহ থেকে ধারাবাহিকভাবে উসমান ইবন ইতাব …… আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, আবু সালীল বলেছেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন এক সাহাবীর সাথে লোকজন কথা বলছিলো। কথা বলতে বলতে তিনি ঘরের ছাদের উপর উঠেন। তখন তিনি বলেন – রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার জিজ্ঞাসা করেন যে, বলতে পারো, কুরআন শরীফের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড় ? তখন জনৈক সাহাবী বললেন – اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ  (এই আয়াতটি সবচেয়ে বড়)

এরপর সেই লোকটি বলেন – আমি এই উত্তর দেওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কাঁধের উপর হাত রাখেন আর আমি সেটির শীতলতা বুক পর্যন্ত অনুভব করছিলাম। অথবা তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বুকে হাত রেখেছিলেন আর আমি সেটির শীতলতা কাঁধ পর্যন্ত অনুভব করছিলাম।

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন – হে আবু মানযার, তোমাকে এই উত্তম জ্ঞানের জন্য ধন্যবাদ।

উমার ইবন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ধারাবাহিকভাবে ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু …… ইবন মারদুবিয়া বর্ণনা করেছেনঃ উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার শহরতলীর কতগুলো লোককে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতে দেখলেন আর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন – তোমাদের মধ্যে কেউ বলতে পারো, কুরআন শরীফের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত আয়াত কোনটি ? তখন ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন – এটি আমার ভালো জানা আছে। কেননা, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে বলতে শুনেছি যে, “اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ” হলো কুরআনের সবচেয়ে সম্মানিত আয়াত। (তাফসীরে ইবন কাসির, ২য় খণ্ড)

 আয়াতের ফযীলত

আসমা বিনতে ইয়াযীদ ইবনে সাকান থেকে ধারাবাহিকভাবে শাহর ইবন হাওশাব …… আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, আসমা বিনতে ইয়াযীদ ইবন সাকান বলেছেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে বলতে শুনেছি – “اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ” এবং “الم ﴿١﴾ اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ” এই দুই আয়াতে ইসমে আযম রয়েছে।

আবু ইমামা থেকে ধারাবাহিকভাবে কাসিম ইবনে আবদুর রহমান ….. ইবন মারদুবিয়া বর্ণনা করেছেন যে, আনু ইমামা বলেছেন, “আল্লাহ’র ইসমে আযম দিয়ে দুয়া করলে তা আল্লাহ কবুল করেন। আর সেটি সূরা বাকারা, সূরা আলি ইমরান ও সূরা তো-হা’র মধ্যে রয়েছে।”

দামেস্কের খতীব ইবন হিশাম ইবন আম্মার বলেছেনঃ সূরা বাকারার মধ্যে ইসমে আযমের আয়াত হলো “اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ”, সূরা আলি ইমরানের মধ্যে আয়াতটি হলো “الم ﴿١﴾ اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ” এবং সূরা তো-হা’র মধ্যে আয়াতটি হলো “وَعَنَتِ الْوُجُوهُ لِلْحَيِّ الْقَيُّومِ”।

উবাই ইবন কাবের পিতা থেকে ধারাবাহিকভাবে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন কাব রহিমাহুল্লাহ ……. আবু ইয়ালা আল মোসেলী রহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেনঃ উবাই ইবন কাবের পিতা তাকে বলেন – আমার খেজুর ভর্তি একটি বস্তা ছিল আর প্রত্যেকদিন আমি সেটি পরিদর্শন করতাম। কিন্তু একদিন কিছুটা খালি দেখে রাত জেগে পাহারা দিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম যে, যুবক ধরণের কে একজন আসলো। আমি তাকে সালাম দিলাম, সে সালামের উত্তর দিলো। এরপর জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কি জীন না ইনসান ?” সে বললো – “আমি জীন।” আমি বললাম – “তোমার হাতটা বাড়াও তো”। সে বাড়ালে আমি তার হাতে হাত বুলাই। হাতটা কুকুরের হাতের গঠনের মতো এবং কুকুরের লোমও রয়েছে। আমি বললাম – “সকল জীন কি এই ধরণের ?” সে বললো – “সমগ্র জীনের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা বেশী শক্তিশালী।” এরপর আমি তাকে বললাম, “যে উদ্দেশ্যে তুমি এসেছো, সেটা তুমি কিভাবে সাহস পেলে ?” সে উত্তরে বললো, “আমি জানি যে, আপনি দানপ্রিয়। তাই ভাবলাম, সবাই যখন আপনার নিয়ামতের দ্বারা উপকৃত হচ্ছে, তাহলে আমি কেন বঞ্চিত হবো ?” অবশেষে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমাদের অনিষ্ট থেকে কোন জিনিস রক্ষা করতে পারে ?” সে বললো, “তা হলো – আয়াতুল কুরসী।”

সকালে উঠে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে রাতের ঘটনাটি বললে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, দুষ্ট তো ঠিক বলেছে।

সালমা ইবন ওয়াদান থেকে ধারাবাহিকভাবে আবদুল্লাহ ইবন হারিস ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, সালমা ইবন ওয়াদান বলেছেন যে, তাকে আনাস ইবনে মালিক বলেছেনঃ একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন এক সাহাবীকে জিজ্ঞাসা করলেন ……. এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কাছে কি আয়াতুল কুরসী নেই ?” সাহাবী বললেন, “জ্বী, আছে।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “এটিও কুরআনের এক-চতুর্থাংশ।” ( “….” এর পর পূর্ণ হাদিসটির শেষ অংশ উল্লেখ করা হয়েছে)

সহীহ বুখারীতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ধারাবাহিকভাবে মুহাম্মাদ ইবন সীরীন …… উসমান ইবন হাইসাম আবু আমর বর্ণনা করেছেন যে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে রমযানের যাকাতের মালামাল সংরক্ষণের দায়িত্বভার অর্পণ করেন। কিন্তু এক ব্যক্তি এসে তা থেকে খাদ্য তুলে নিতে থাকলে আমি তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলি। এরপর তাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে সে অনুনয় করে বললো, “আমি অত্যন্ত অভাবী, পরিবার-পরিজন অনাহারে রয়েছে। তাই খাবারের আমার এতো প্রয়োজন যে তা অবর্ণনীয়।” এরপর আমি তাকে ছেড়ে দেই। কিন্তু সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, “হে আবু হুরায়রা, রাতের বন্দীকে কি করলে ?” আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), সে আমার কাছে পরিবারের ভীষণ অভাবের অভিযোগ করলে দয়া-পরবশ হয়ে তাকে মুক্তি দেই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি শুনে বললেন, “সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। দেখবে, সে আবার আসবে।”

তাই আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বলেছেন যে, সে আসবে, তখন আসবেই। আমিও টহল দিতে থাকলাম। সত্যিই সে এসে খাদ্য নিতে থাকলে আমি তাকে পাকড়াও করলাম। এরপর বললাম, “তোমাকে এবার অবশ্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাবো।” সে কাকুতি মিনতি করে বললো, “আমার সংসার বড় অভাবের সংসার, আমি অত্যন্ত গরীব। আর আসবো না, আপনি আমাকে মুক্তি দিন।” তাই আমি করুণাবশত তাকে মুক্তি দান করি। সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন, “হে আবু হুরায়রা, বন্দীকে কি করলে ?” আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আমাকে তার অবর্ণনীয় অভাবের কথা বললে আমি দয়ার্দ্র হয়ে তাকে মুক্তি দান করি।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। দেখবে, সে আবার আসবে।”

এরপর তৃতীয়বার এসেও সে খাদ্য নিতে প্রবৃত্ত হলে এবারও তাকে বন্দী করে বললাম, “তোমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাবো। কেননা, তিনবার তোমাকে পাকড়াও করেছি, আর প্রত্যেকবার তুমি বলেছো – আর আসবো না। অথচ তুমি ওয়াদা ভেঙ্গে প্রত্যেকবারই এসেছো (তাই তোমাকে এবার আর ছাড়বো না)।” তখন সে বললো, “আমাকে ছেড়ে দিন। আপনাকে এমন কতগুলো বাক্য শিখাবো, যার দ্বারা আল্লাহ আপনার কল্যাণ করবেন।” আমি বললাম, “সেটা কি ?” সে বললো, “আপনি যখন শুতে যাবেন, তখন বিছানায় আয়াতুল কুরসী পড়বেন, অর্থাৎ – اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ  – এই আয়াতের শেষ পর্যন্ত। তাহলে আল্লাহ আপনার রক্ষক হবেন এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান আপনার নিকটবর্তী হতে পারবে না।” এরপর আমি তাকে মুক্তি দেই।

এরপর সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন, “গত রাতের বন্দীকে কি করলে ?” আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), সে আমাকে উপকারী কতগুলো বাক্য শিখিয়ে দিলে আমি তাকে মুক্তি দেই।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “কি শিখিয়েছে ?” আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “সে আমাকে বলেছে যে – যখন আপনি শুতে যাবেন, তখন আয়াতুল কুরসীর তখন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়বেন, তাহলে আপনি সে রাতে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহ’র হিফাযতের বহির্ভূত হবেন না, আর সকাল পর্যন্ত শয়তানও আপনার নিকটবর্তী হতে পারবে না, উপরন্তু সে রাতে যা কিছু হবে সবই কল্যাণকর হবে।” পরিশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সে মিথ্যাবাদী হলেও এটা সে সত্যই বলেছে। তবে হে আবু হুরায়রা, জানো কি, তুমি এই তিন রাত কার সাথে কথা বলেছিলে ?” আমি বললাম, “না।” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সে হলো শয়তান।”

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ধারাবাহিকভাবে আবু সালিহ ……. হাকাম বর্ণনা করেছেন যে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সূরা বাকারার মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে, যে আয়াতটি সমগ্র কুরআনের নেতা স্বরূপ। তা পড়ে ঘরে প্রবেশ করলে শয়তান বের হয়ে যায়। সেটি হলো আয়াতুল কুরসী।”

আবু ইমামা থেকে ধারাবাহিকভাবে মুহাম্মাদ ইবন যিয়াদ …… আবু বকর ইবন মারদুবিয়া বর্ণনা করেছেন যে, আবু ইমামা বলেছেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাযের পর আয়াতুল কুরসী পড়বে, তাকে মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু বেহেশতে যেতে বাঁধা দেয় না।”

হাসান ইবন বাশারের সূত্রে নাসাঈ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, দিনে ও রাতে দুইবার পড়লে। (তাফসীরে ইবন কাসীর, ২য় খণ্ড)

 

তাফসীর

এই পবিত্র আয়াতে দশটি বাক্য রয়েছে। দশটি বাক্য আলাদা আলাদা তাফসীর উপস্থাপন করা হচ্ছে।

 

১ম বাক্যঃ اللَّـهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ

অনুবাদঃ আল্লাহ – তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই।

“আল্লাহ” নাম সম্পর্কিত ব্যাখ্যাঃ

আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু’র বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ হলেন এমন সত্তা – সমগ্র সৃষ্টি যার ইবাদাত করে। অর্থাৎ, সারা বিশ্বের মাবুদ হলেন আল্লাহ। (তাফসীরে তাবারী, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শাফী লিখেছেনঃ “আল্লাহ” শব্দটি সৃষ্টিকর্তার নামসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মহত্তর ও তার যাবতীয় গুণের সম্মিলিত রূপ। কোন কোন আলিম একে ইসমে আযম বলেও অভিহিত করেছেন। এ নামটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য প্রযোজ্য নয়, এজন্যই এ শব্দটির দ্বিবচন বা বহুবচন হয় না। কেননা, আল্লাহ এক, তার কোন শরীক নেই।

মোটকথা, আল্লাহ এমন এক সত্তার নাম, যে সত্তা পালনকর্তার সমস্ত গুণের এক অসাধারণ প্রকাশবাচক। তিনি অদ্বিতীয় ও নজিরবিহীন। (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানীপথী লিখেছেনঃ “আল্লাহ” শব্দটি সেই অপরিহার্য সত্তার নাম, যিনি পূর্ণতার সমষ্টি এবং হীনতা থেকে পবিত্র। (তাফসীরে মাযহারী, ১ম খণ্ড)

শামসুল হক ফরিদপুরী লিখেছেনঃ “আল্লাহ” শব্দটি এতই খাস যে, এর চেয়ে খাস শব্দ জগতে আর নেই। আল্লাহ নিজেই তার ব্যক্তিবাচক নাম রেখেছেন “আল্লাহ”। তার অন্যান্য যতো নাম আছে, সেগুলো গুণবাচক নাম। …… কুরআন শরীফে ও হাদিস শরীফে আল্লাহ’র যে নাম নেই, সে নাম ধরে আল্লাহ’কে ডাকা ঠিক নয়। ….. “আল্লাহ” নামের বৈশিষ্ট্য এই যে, এ শব্দটি অন্য কোন ভাষায় অনুবাদ হতে পারে না। এ শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ নেই, বহুবচন নেই। আর ইংরেজিতে বলা হয় গড, কিন্তু তার স্ত্রীলিঙ্গও আছে, বহুবচনও আছে। বাংলায় ঈশ্বর শব্দেরও স্ত্রীলিঙ্গ আছে। ফারসীতে খোদা শব্দের খাস আল্লাহ অর্থেও ব্যবহার আছে, আবার অধিকারী, মালিক অর্থেও ব্যবহার আছে। অনুবাদ যখন হতে পারে না, তখন ব্যাখ্যার প্রয়োজন। ব্যাখ্যা এই – নিরাকার নিরঞ্জন, অগতির গতি, অনাথের নাথ, নিরুপায়ের উপায়, নিরাশ্রয়ের আশ্রয়, সকলের সকল অভাব মোচনকারী, সর্বশক্তিমান, দয়াময়, অনাদি-অনন্ত, চিরঞ্জীব, সর্বগুণাকর, সর্ব গুণের আধার, আত্মা-দেহ আর ইহকাল-পরকালের সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা, পালনকর্তা যিনি – তার মহামহিম পবিত্র নাম ব্যক্তিগত ও ব্যক্তিবাচক নাম “আল্লাহ”। (হাক্কানী তাফসীর, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ আলী আস-সাবূনী লিখেছেনঃ “আল্লাহ” সবচেয়ে মহান পবিত্র সত্তার নাম। এ নামটি আল্লাহ ছাড়া আর কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তার নামসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মহান ও অদ্বিতীয় নাম। সত্যের অস্তিত্বের এক সত্তার নাম, প্রভুত্বের যাবতীয় গুণাবলীর সম্মিলিত রূপ। প্রতিপালনের যাবতীয় গুণাবলীতে গুণান্বিত, বাস্তব অস্তিত্বের একমাত্র সত্তা, তিনিই সেই পবিত্র সত্তা যিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। (সাফওয়াতুত তাফাসীর, ১ম খণ্ড)

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ “আল্লাহ” শব্দটি মহাবিশ্বের একমাত্র মহান প্রতিপালক মহাপ্রভুর নাম। কেউ কেউ বলেন, সেটিই ইসমে আজম। কারণ, “আল্লাহ” শব্দের মধ্যে সকল গুণের সমাবেশ ঘটেছে। যেমন আল্লাহ বলেনঃ

“তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।

তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তি, তিনিই নিরাপত্তা-বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অতীব মহিমান্বিত; তারা যাকে শরীক স্থির করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।

তিনিই আল্লাহ – সৃজনকর্তা, উদ্ভাবন কর্তা, রুপদাতা, সকল উত্তম নাম তারই। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরাহ আল-হাশর, ৫৯ : ২২-২৪)

উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা উল্লিখিত অন্যান্য সকল গুণকে “আল্লাহ” এর সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেখিয়েছেন। অনুরূপভাবে অন্যত্র বলেছেনঃ

“আর আল্লাহ’র সুন্দর সুন্দর নাম রয়েছে, তোমরা সেসব নামে তাকে ডাকো ….” (সূরাহ আল-আরাফ, ৭ : ১৮০)

তিনি আরো বলেনঃ

“বলোঃ আল্লাহ বলে আহবান করো কিংবা রহমান বলে, যে নামেই আহবান করো না কেন, সব সুন্দর নাম তো তারই …..” (সূরাহ বানি ঈসরাঈল, ১৭ : ১১০)

……… “আল্লাহ” একটি অনন্য নাম। মহাবিশ্বে একক মহান প্রতিপালক প্রভু ভিন্ন অন্য কেউ উক্ত নামে অভিহিত নয়। এ কারণেই আরবী ভাষায় সেটির সম-ধাতুজ কোন সমাপিকা ক্রিয়া পরিদৃষ্ট হয় না। …..” (তাফসীরে ইবন কাসির, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদ্রিস কান্দলভী লিখেছেনঃ “আল্লাহ” সেই ওয়াজিবুল অজুদ বা অবশ্যম্ভাবী অস্তিমান সত্তার নাম, যিনি উত্তম গুণাবলীর আধার এবং সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটির আভাস ও ধারণা থেকে পুত-পবিত্র। এ কারণেই “আল্লাহ” শব্দটি সর্বদা বিশেষিত পদ বা মাওসুফ (الموصوف) রূপে ব্যবহৃত হয় এবং আসমাউল হুসনা বা আল্লাহ’র গুণবাচক নামগুলোকে বিশেষণ পদ বা সিফাত রূপে “আল্লাহ” নামের পরে উল্লেখ করা হয়। যেমন কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ

“তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই; তিনি অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।

তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তি, তিনিই নিরাপত্তা-বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল, তিনিই অতীব মহিমান্বিত; তারা যাকে শরীক স্থির করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র, মহান।

তিনিই আল্লাহ – সৃজনকর্তা, উদ্ভাবন কর্তা, রুপদাতা, সকল উত্তম নাম তারই। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সমস্তই তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরাহ আল-হাশর, ৫৯ : ২২-২৪)

“আল্লাহ” নামটি মহাপ্রভু ও স্রস্টার জন্যই নির্দিষ্ট। এটি সর্বদা সেই একক, লা-শারীক, পুত-পবিত্র সত্তার জন্য ব্যবহৃত হয়। যেভাবে তার সত্তা ও গুণে কোন শরীক নেই, তেমনিভাবে এ মহান নামেও তার কোন শরীক নেই। এ কারণেই সকল আউলিয়ায়ে কেরামের অভিমত হলো, “আল্লাহ” নামই ইসমে আজম। ….” (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ আবদুর রহীম লিখেছেনঃ “আল্লাহ” শব্দটি মূলতঃ “ইলাহ” শব্দ থেকে নির্গত হয়েছে। এটির প্রথমের “আলিফ” (হামজা) উহ্য করে দিয়ে সেখানে “আলিফ” ও “লাম” বসানো হয়েছে এবং একই স্থানের দুই “লাম” পরস্পর মিলিত হয়েছে। এভাবে “আল্লাহ” শব্দটি গঠিত হয়েছে।

আভিধানিক অর্থে “ইলাহ” বলা হয় এমন প্রত্যেক মাবুদকে, যার কোন না কোন প্রকারের ইবাদাত-বন্দেগী ও আনুগত্য আরাধনা করা হয়। কিন্তু এর উপর “আলিফ” ও “লাম” অক্ষর দুটো বসার ফলে “আল্লাহ” শব্দটি গঠিত হয়েছে বিধায় এর অর্থ সম্পূর্ণ নতুনভাবে গ্রহণ করেছে।

আল্লাহ হচ্ছেন একমাত্র সেই মহান সত্তা, যিনি নিজ ক্ষমতা ও প্রতিভার দ্বারা বিশ্বজগতকে সৃষ্টি করেছেন, লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন, এটির যাবতীয় প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণ করে সেটিকে ক্রমশঃ বিকাশ দান করছেন, সামনের দিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং এই সব কারণে নির্দিষ্টভাবে একমাত্র তিনিই  সকল প্রকার পূজা-উপাসনা ও আনুগত্য-ইবাদাত পাওয়ার উপযুক্ত ও নিরঙ্কুশভাবে এই সব কিছুরই অধিকারী।

“আল্লাহ” খোদা তাআলার নিজ মূল সত্তার নাম। এ নাম তিনি ছাড়া আর কারো জন্য ব্যবহৃত হতে পারে না। কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে – “যিনি আল্লাহ, তিনি ছাড়া কেউই ইলাহ নয়, আর কোন ইলাহ নেই।”

বস্তুতঃ ইলাহ হওয়ার যে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ভাবধারা, তা-ই এই শব্দটির মৌলিক অর্থ। এটি ছাড়া আল্লাহ’র আরো যতো নাম আছে, তা সবই এর অধীন, এবং তা সবই আল্লাহ’র গুণবাচক নাম। (সূরা ফাতিহার তাফসীর)

ফখরুদ্দীন আর-রাযী “আল্লাহ” নাম সম্পর্কিত বিস্তারিত আলোচনায় লিখেছেনঃ “আল্লাহ” শব্দটি নামবাচক বিশেষ্য …… খলীল বলেন, এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, “আল্লাহ” শব্দটি আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট। এমনিভাবে “الاله” শব্দটিও। যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্যও “الاله” এর ব্যবহার করতো, তারা এটিকে কোন কিছুর সাথে সম্বন্ধযুক্ত করেই ব্যবহার করতো। অথবা, এটিকে নাকিরা বা অনির্দিষ্টতাবাচক হিসেবে “ال” ছাড়া ব্যবহার করতো। যেমন, আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের উক্তি বর্ণনা করেন যে, তারা তাকে বলেছিলো –

اجْعَل لَّنَا إِلَـٰهًا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ ۚ قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ

অর্থঃ “…. আপনি আমাদের জন্য একটি ইলাহ বানিয়ে দিন, যেমন তাদের ইলাহ আছে; তিনি বললেনঃ তোমরা এক অজ্ঞ সম্প্রদায়।” (সূরাহ আল-আরাফ, ৭ : ১৩৮)

এরপর আর-রাযী লিখেছেনঃ উল্লেখ্য, “الله” শব্দটির এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা আল্লাহ তাআলার অন্য কোন নামের মধ্যে পাওয়া যায় না। আমরা নীচে সেদিকে ইশারা করছি।

একঃ আপনি যদি “الله” এর “আলিফ” লোপ করেন, তবে অবশিষ্ট থাকবে “لله”, আর তা-ও কেবল আল্লাহ তাআলার জন্যই প্রযোজ্য, যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ

وَلِلَّـهِ جُنُودُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

অর্থঃ “….. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সেনাদল তো আল্লাহ’র-ই …..” (সূরাহ আল-ফাতহ, ৪৮ : ৪)

আরো ইরশাদ হয়েছেঃ

وَلِلَّـهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

অর্থঃ “…. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর ধনভাণ্ডারসমূহ আল্লাহ’র-ই …..” (সূরাহ আল-মুনাফিকুন, ৬৩ : ৭)

“الله” থেকে প্রথম “ل” লোপ করলে বাকি থাকে “له” (তার জন্য)। এর দ্বারাও আল্লাহ তাআলাকেই বুঝায়। যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ

لَّهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

অর্থঃ “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কুঞ্জিসমূহ তো তারই ….” (সূরাহ আয-যুমার, ৩৯ : ৬৩)

আরো ইরশাদ হয়েছেঃ

لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ

অর্থঃ “….. সার্বভৌমত্ব তারই আর প্রশংসা তারই  …..” (সূরাহ আত-তাগাবুন, ৬৪ : ১)

দ্বিতীয় “ل” লোপ করলে অবশিষ্ট থাকে “هو”, এটিও আল্লাহ তাআলাকে নির্দেশ করে, যেমন ইরশাদ হয়েছেঃ

قُلْ هُوَ اللَّـهُ أَحَدٌ

অর্থঃ “বলোঃ তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।” (সূরাহ আল-ইখলাস, ১১২ : ১)

আরো ইরশাদ হয়েছেঃ

هُوَ الْحَيُّ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ

অর্থঃ “তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই ….” (সূরাহ আল-মুমিন, ৪০ : ৬৫)

“هو” এর “و” হরফটি অতিরিক্ত। প্রমাণ এই যে, দ্বিবচন ও বহুবচনে এটি লোপ পেয়ে যায়। বস্তুত দ্বিবচনে বলা হয় “هما” আর বহুবচনে বলা হয় “هم”। দেখা যাচ্ছে উভয় ক্ষেত্রেই “و” হরফটি অনুপস্থিত। আর “الله” শব্দটির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আল্লাহ তাআলার অন্য কোন নামে এই বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না।

আবার এ বৈশিষ্ট্য যেমন শাব্দিকভাবে পাওয়া যায়, তেমনি অর্থগতভাবেও পাওয়া যায়। কেননা, আপনি যখন আল্লাহ তাআলাকে “আর-রহমান” বলে ডাকেন, তখন তাকে কেবল “রহমত” গুণেই বিশেষিত করে থাকেন, কাহর বা প্রচণ্ডতা গুণে নয়। যখন “আল-আলিম” (العليم) নামে ডাকেন, তখন তাকে ইলম বা জ্ঞানের গুণে বিশেষিত করে থাকেন, কুদরত বা শক্তি গুণে নয়।

পক্ষান্তরে যখন “আল্লাহ” বলে ডাকেন, তখন তাকে তার সমস্ত গুণের সাথেই ডেকে থাকেন। কেননা, ইলাহ যতক্ষণ না সংশ্লিষ্ট সমস্ত গুণে গুণমণ্ডিত হোন, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ইলাহ হতে পারেন না।

কাজেই প্রমাণিত হয় যে, উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যটি কেবল “আল্লাহ” শব্দের মধ্যেই বিদ্যমান আছে, অন্য কোন নামে নয়।

দুইঃ কালেমায়ে শাহাদাত অর্থাৎ যে বাক্য দ্বারা কাফির তার কুফর থেকে ইসলামে চলে আসে, তাতে কেবল এই নামটিই ব্যবহৃত হয়। কোন কাফির যদি “اشهد ان لا اله الا الرحمن” বলে, অথবা “الا الرحيم” বা “الا الملك” কিংবা “الا القدوس” বলে, তবে সে কুফর থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামে প্রবেশ করতে পারে না। পক্ষান্তরে সে যদি বলে “اشهد ان لا اله الا الله”, তবে এর দ্বারা সে কুফর থেকে বের হয়ে ইসলামে চলে আসে। এটিও “আল্লাহ” শব্দটির এক মহান বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলাই সরল সঠিক পথের দিশারী। (তাফসীরে কাবীর, ১ম খণ্ড)

আমীন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ “اله” শব্দের প্রথমে আলিফ-লাম যুক্ত করে “الله” শব্দ গঠিত হয়েছে। সৃষ্টির শুরু থেকে এ নাম কেবলমাত্র আসমান যমীনসহ সর্ব জগতের সৃষ্টিকর্তা মহান সত্তার জন্যই নির্দিষ্ট। তিনি ছাড়া অন্য কোন বস্তু কিংবা ব্যক্তির নামকরণ এ শব্দ দ্বারা করা হয়নি। কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বে জাহেলী আরবদের মধ্যেও এ অর্থই প্রচলিত ছিলো। মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের উপাস্য দেব-দেবীর কাউকে তারা আল্লাহ’র সমকক্ষরূপে বিশ্বাস কিংবা তার মর্যাদায় স্থান দিতো না। তারা স্বীকার করতো নভোমণ্ডল-ভূমণ্ডলসহ সমগ্র সৃষ্টিজগতের মালিক ও খালিক একমাত্র আল্লাহ। চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করে এদেরকে তিনিই সেবায় নিয়োজিত করেছেন। মেঘের কোল থেকে বৃষ্টি বর্ষণ এবং সৃষ্টিকুলের রুজি-রোজগার, পানাহারসহ প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ তারই দায়িত্বে এবং তিনি এ সবের একক যিম্মাদার। অন্যান্য দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা ও আরাধনা-উপাসনা ছিলো নিছক তাদের মিথ্যা আকিদার ফলশ্রুতি। তারা মনে করতো, এরা মহান আল্লাহ’র নৈকট্যশীল। আল্লাহ’র দরবারে এরাই তাদের পক্ষে সুপারিশের আরযী দিবে। পবিত্র কুরআনে তাদের এহেন মিথ্যা আকিদার বিবরণ বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। নীচে সংখিপ্তাকারে মাত্র ২/৩ টি আয়াতের উদ্ধৃতি দেওয়া হলো –

“…. আমরা তো এদের উপাসনা শুধু এজন্যই করে থাকি যে, ওরা আমাদেরকে আল্লাহ’র ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে পৌঁছে দিবে …..” (সূরাহ আয-যুমার. ৩৯ : ৩)

“আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন – নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল কে সৃষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে সেবায় নিয়োজিত কে করেছে ? তখন তারা অবশ্যই বলবে – ‘আল্লাহ’। তাহলে তারা কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ? আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন আর যার জন্য ইচ্ছা কমিয়ে দেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে সম্যক অবগত। আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন – কে আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করে, এরপর সে পানি দ্বারা মৃত হওয়ার পর যমীনকে সঞ্জিবীত করে ? তাহলে অবশ্যই তারা বলবে – ‘আল্লাহ’।” (সূরাহ আল-আনকাবুত, ২৯ : ৬১-৬৩)

একইভাবে সকল শক্তির যোগ্যতা, জীবন-মরণ, বিশ্ব পরিচালনা-ব্যবস্থাপনা, হ্রাস-বৃদ্ধি ইত্যাদির মূলকেন্দ্র এবং আসল উৎসরূপে আল্লাহ’কে স্বীকার করে নিতেও তাদের কোন আপত্তি ছিল না। যেমন আল-কুরআনের ভাষায়ঃ

“আপনি জিজ্ঞাসা করুন, তোমাদেরকে আসমান-যমীন থেকে কে রুযী দান করেন, অথবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক ? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভিতর থেকে, অনুরূপ কে-ই বা মৃতকে জীবিতের ভিতর থেকে বের করেন ? আর কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাই বা কার হাতে ? তখন তারা বলে উঠবে, ‘আল্লাহ’। তাহলে আপনি বলুন – এরপরও কি তোমরা তাকে ভয় করো না ?” (সূরাহ ইউনুস, ১০ : ৩১) (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

 

“ইলাহ” শব্দের ব্যাখ্যাঃ

“আল্লাহ” নাম সম্পর্কিত আলোচনায় “ইলাহ” সম্পর্কিত কিছু আলোচনা চলে এসেছে, এতে “ইলাহ” এর সহজ ব্যাখ্যাও সাথে সাথে চলে এসেছে। একটু পর পূর্ণ প্রথম অংশের ব্যাখ্যায় আরো পরিষ্কারভাবে বুঝা যাবে। আর পূর্বে “ইলাহ” সম্পর্কিত ছোট্ট একটি আলোচনা –

আরবদের কাছে “ইলাহ” কোন একক সত্তার নাম ছিলো না, বরং তারা যে সমস্ত দেব-দেবীর পূজা-অর্চনা করতো, এদের প্রত্যেকের জন্য এই শব্দ প্রয়োগ করতো। আল-কুরআনের কোথাও “আল-ইলাহ” শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। শুধু “ইলাহ” আর “আল্লাহ” শব্দের ব্যবহার হয়েছে। বিভিন্ন আয়াতে “ইলাহ” শব্দ দিয়ে ঐ সমস্ত উপাস্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, মানুষ যাদের পূজা-অর্চনা, উপাসনা ও আনুগত্য প্রকাশ করে থাকে। বহু আয়াতে আল-কুরআন দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছে যে, “ইলাহ” আখ্যায়িত হওয়ার একমাত্র অধিকার আল্লাহ’র-ই জন্য সংরক্ষিত। তিনি এক, অদ্বিতীয় ও সমস্ত ইবাদাতের হকদার, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আল-কুরআনের এই ঘোষণাটি শুধু আরব অঞ্চলের অবিশ্বাসীদের জন্য সীমিত নয়, এটি সমগ্র দুনিয়াবাসীর প্রতি, যেখানে প্রতিমা পূজার বিশ্বাস ব্যাপকতা লাভ করেছিলো আর যেখানে আল্লাহ’র প্রকৃত সত্তা, তার গুণাবলী ও অবস্থান সম্পর্কে মানব অন্তর বহুবিধ পথভ্রষ্টতার মধ্যে নিমজ্জিত ছিলো। (আল- কুরআনুল কারীমের সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ, ১ম খণ্ড; “ইলাহ” সম্পর্কিত আলোচনার একটি অংশ সংক্ষেপিতভাবে এখানে তুলে ধরা হলো)

 

“আল্লাহ – তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই” – এর ব্যাখ্যাঃ

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ অর্থাৎ তিনি সৃষ্ট জীবসমূহের একক ইলাহ বা উপাস্য। (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

“তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই” – এর ব্যাখ্যায় ইবনে জারীর আত-তাবারী লিখেছেনঃ এ কালেমায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদাত করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা, আল্লাহ তো চিরঞ্জীবী, চিরস্থায়ী। তাছাড়া, তিনি অন্যান্য গুণেরও অধিকারী, যা এ আয়াতে তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ এমন এক সত্তা, শুধু যার জন্যই সৃষ্টির ইবাদাত নির্ধারিত। তিনি চিরঞ্জীবী ও চিরস্থায়ী। আল্লাহ ছাড়া তোমরা কারো ইবাদাত করো না। কেননা, তিনি এমন চিরঞ্জীবী চিরস্থায়ী, যাকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। এ আয়াতে তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেওয়া আহকাম ও নিদর্শনাদির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে আর তারা রাসুলগণের আবির্ভাবের পর আল্লাহ’র নিদর্শনাদির মধ্যে মতভেদ করেছে। তাদেরকে আল্লাহ অবহিত করেছেন যে, তিনি রাসুলগণের মধ্যে কাউকে আবার কারো থেকে অধিক মর্যাদা দিয়েছেন। বান্দাগণ মতভেদ করার পর একে অন্যের সাথে বিবাদ করেছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ করেছে, তাদের মধ্যে কেউ ঈমান নিয়েছে, কেউ আবার কুফরী করেছে। কাজেই আল্লাহ’র জন্যই সমস্ত প্রশংসা, যিনি তার প্রতি বিশ্বাস করার জন্য আমাদের শক্তি দান করেছেন এবং তাকে স্বীকার করার জন্য তাওফিক দিয়েছেন। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি লিখেছেনঃ জাহিলী ধর্মগুলোও তো আল্লাহ’র নিছক অস্তিত্ব স্বীকার করে। অবশ্য তারা এই বড় ইলাহ ছাড়াও অনেক অধীনস্থ ইলাহ আর দেবতায়ও বিশ্বাস করে। এটা কেবল ইসলামেরই শিক্ষা যে, এক ইলাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ’র অস্তিত্ব নেই। ইসলাম এটা স্বীকার করে না যে, আল্লাহ বড় ইলাহ, এছাড়া আরো অনেক ইলাহ, অনেক ছোট ছোট ইলাহ’রও অস্তিত্ব আছে। ….. (তাফসীরে মাজেদি, ১ম খণ্ড)

 

২য় বাক্যঃ الْحَيُّ الْقَيُّومُ

অনুবাদঃ (তিনি) চিরঞ্জীব, স্বপ্রতিষ্ঠ সংরক্ষণকারী

“الحي” নামের ব্যাখ্যাঃ

রাগীব ইস্পাহানী এ নাম প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ যার উপর মৃত্যু নেই, এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপর প্রযোজ্য নয়। (আল-মুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন)

আবু জাফর আত-তাবারী লিখেছেনঃ এখানে “الحي” কথাটির অর্থ – যিনি চিরঞ্জীবী, যার অস্তিত্বের শুরুও নেই, শেষও নেই। তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু লয়প্রাপ্ত হয়ে যাবে। সৃষ্টি মাত্রেরই জীবন আছে, কিন্তু তাদের জীবনের শুরু ও শেষ নির্ধারিত। সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তারা বিলীন হয়ে যাবে। প্রতিটি সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল হলে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড, সংক্ষেপিত)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানীপথী লিখেছেনঃ তিনি এমন সত্তা, যার জন্য জানা-শোনা, দেখা, সক্ষম হওয়া, ইচ্ছা করা ইত্যাদির সম্বন্ধ যথার্থ রূপে সাব্যস্ত এবং যা কিছু তার জন্য যথার্থ রূপে সাব্যস্ত, তা তার জন্য ওয়াজিব অর্থাৎ অনাদি-অনন্ত রূপে সাব্যস্ত, যাতে কখনো বিচ্যুতি আসেনি, আসবে না। অর্থাৎ, তিনি যেমন অনাদি-অনন্ত, তার গুণেরও শুরু ও শেষ নেই। যেহেতু قوة ও فعل অর্থাৎ কোন কিছু করার যোগ্যতা আর কোন কিছু তাৎক্ষণিক সম্পাদনা তার অনিত্য সত্তার গুণ। মোট কথা, “হায়াত” আল্লাহ’র এমন গুণ, যা সব পূর্ণাঙ্গতা গুণের সূত্র। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ তিনি স্থায়ীভাবে জীবিত আর অনাদি-অনন্ত। জীবনের গুণ বিশেষণটি তার সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মৃত্যু বা জীবনের অবসান তার উপর অতীতেও আপতিত হয় নি, ভবিষ্যতেও হবে না।

তবে কি এমন জাতিও আছে, যে নিজেদের মাবুদের এই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন গুণটির ব্যাপারেও সন্দেহ-সংশয় পোষণ করেছে ? এক নয়, অনেক জাতিই এ সন্দেহ পোষণ করেছে। অর্থগতভাবে এ গুণটি অস্বীকারও করেছে। রোম সাগর তীরে এমন অনেক জাতি ছিলো, যারা বিশ্বাস করতো যে, তাদের খোদা প্রতি বছর অমুক তারিখে মৃত্যুবরণ করে, আবার পরদিন নতুন করে অস্তিত্ব লাভ করে। তদনুযায়ী প্রতিবছর ঐ তারিখে খোদা বা بعل এর পুতুলী বানিয়ে দাহ করা হতো আর পরদিন ভোরে তার জন্মের খুশীতে আনন্দ উৎসব করা হতো। হিন্দু ধর্মে অবতারের মৃত্যু আর আবার জন্ম নেওয়া এ বিশ্বাসেরই দৃষ্টান্ত। আর স্বয়ং খৃষ্টানদের আকিদা এছাড়া আর কি ছিলো যে, খোদা আগে মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আগমন করেন আর এরপর ক্রুশে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুরা যেহেতু শুরু থেকেই এক অনাদি অনন্ত শাশ্বত অবিনশ্বর খোদার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ও পরিচিত থাকে, বড় হয়ে তাদের ধারণা কল্পনায়ও একথা আসে না যে, তাদের খোদা কখনো কোন অবস্থায় কোন অর্থে আর কোন বিচার বিবেচনায়ই লয়-ক্ষয় ও লীন হতে পারেন। কিন্তু অবশেষে আজো কি কোটি কোটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আল্লাহ’র এ বিলীন হওয়াকেই স্বীকার করে নিচ্ছে না ? (তাফসীরে মাজেদি, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ আল্লাহ’র সিফাতসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম হলো “হায়াত” বা জীবন। অভিধানে “الحي” বলা ঐ সেই জীবিত বস্তুকে – যা বোধসম্পন্ন, যে শ্রবণ করে, দেখে, আর যে শক্তিমান। তাই “হায়াত” সিফাতটি সকল উত্তম সিফাতের উৎস। (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

“القيوم” নামের ব্যাখ্যাঃ

ইবনে জারীর আত-তাবারী লিখেছেনঃ সৃষ্টির তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে সত্তা অনাদি ও অনন্তকাল ব্যাপী বিরাজমান, আপন সত্তার জন্য যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন অথচ যিনি সর্বসত্তার ধারক, তাকেই القيوم  বলা হয়। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ “সমগ্র সৃষ্টি জীব তার মুখাপেক্ষী, আর তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। আর তার হুকুম ছাড়া সব কিছুই অস্তিত্বহীন।” (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

মাহমুদ আল-আলূসী এ শব্দের ব্যাখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করে এরপর রাগিব আল-ইস্পাহানী’র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেনঃ আল-কাইয়্যুম তিনি, যিনি স্বীয় শক্তিতেই বিদ্যমান। তিনি সব কিছুর রক্ষাকারী, সব কিছুর অস্তিত্ব প্রদানকারী। (তাফসীরে রুহুল মাআনী, ৩য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ “القيوم” শব্দটি “কিয়াম” শব্দ থেকে উৎপন্ন, এটি বুৎপত্তিগত আধিক্যের অর্থে ব্যবহৃত। এর অর্থ হচ্ছ এই যে, তিনি নিজে বিদ্যমান থেকে অন্যকে বিদ্যমান রাখেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন। “কাইয়্যুম” আল্লাহ’র এমন এক বিশেষ গুণ, যাতে কোন সৃষ্টি অংশীদার হতে পারে না। তার সত্তা স্থায়িত্তের জন্য কারো মুখাপেক্ষী নয়। কেননা, যে নিজের স্থায়িত্ব ও অস্তিত্বের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী, সে অন্যের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কি করে করবে ? সে জন্যই কোন মানুষকে “কাইয়্যুম” বলা জায়েজ নয়। যারা “আবদুল কাইয়্যুম” নাম বিকৃত করে শুধু “কাইয়্যুম” বলে, তারা গুনাহগার হবে। (মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আশেকে ইলাহি বুলন্দশহরি লিখেছেনঃ “قائم” নিজে প্রতিষ্ঠিত, আর “قيوم” যে অন্যকে প্রতিষ্ঠিত রাখে। সমগ্র বস্তুজগত আল্লাহ’র সৃষ্টি। আল্লাহ এ সব কিছুর অস্তিত্ব দান করেছেন। তারই ইচ্ছা ও ইঙ্গিতে এ সব কিছু বিদ্যমান রয়েছে। তার ইচ্ছায় ও শক্তিতে বিশ্বজগতের সকল অবস্থা পরিবর্তিত হয়। তিনি যাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে রাখেন।

বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে যে, রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে যখন তাহাজ্জুদের নামাযের জন্য জাগ্রত হতেন, তখন আল্লাহ’র দরবারে যে সব আরজি পেশ করতেন, তার মধ্যে এও অন্তর্ভুক্ত থাকতো –

“হে আল্লাহ, আপনার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। আপনি আসমান, জমিন ও তার মাঝে যা কিছু আছে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক (কাইয়্যুম)।” (তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী লিখেছেনঃ সুতরাং আল্লাহ’র এ সিফাতী নামের দাবী হলো – তিনি ছাড়া সবকিছু তাদের অস্তিত্বের জন্য যেরূপ তার মুখাপেক্ষী, তদ্রূপ তাদের স্থিতির জন্যও তারা তারই মুখাপেক্ষী, যেমন মূল বস্তুর সাথে তার ছায়ার সম্পর্ক। বরং সবই এর চাইতে আল্লাহ’র অধিক মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তো মহোত্তম প্রকৃতির অধিকারী। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

আমীন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ “قيوم” শব্দের অর্থ হচ্ছে সেই সত্তা, যিনি স্বয়ং নিজ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত এবং অন্যদের প্রতিষ্ঠা ও স্থায়িত্বের মাধ্যম ও উসিলা। (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ খৃষ্টানরা যেমন আল্লাহ’র জীবন গুণের ক্ষেত্রে মারাত্মক হোঁচট খেয়েছে, তেমনি তার قيوميت  গুণের ক্ষেত্রেও নানা বিস্ময়কর গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছে। তাদের বিশ্বাস এই যে, পুত্র যেমন পিতার অংশগ্রহণ ছাড়া খোদা হতে পারে না, তেমনি পুত্রের অংশগ্রহণ ছাড়াও পিতাকে পিতা বলা যায় না। যেন যেভাবে মাসীহ আল্লাহ’র মুখাপেক্ষী, তেমনি খোদাও তার খোদায়ীত্ব প্রমাণ করার জন্য মাসীহ এর মুখাপেক্ষী। قيوميت  এর গুণ প্রমাণ করে, কুরআন খৃষ্টানদের এ আকিদার উপর আঘাত হেনেছে। قيوم  তিনি, যিনি যে কেবল নিজেই স্থির আছেন তা নয়, বরং তিনি অন্যদের স্থির থাকার কার্যকারণও, আর তিনি সকলকে ধারণ করে রেখেছেন। সকলেই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কারোরই মুখাপেক্ষী নন। (তাফসীরে মাজেদি, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ “الحي” দ্বারা আল্লাহ যে “ওয়াজিবুল অজুদ” বা অবশ্যম্ভাবী সত্তা, তা বর্ণনা করা হয়েছে। আর “القيوم” শব্দ দ্বারা তিনি যে “ওয়াহিবুল অজুদ” বা অস্তিত্বদাতা, তা বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি নিজে ওয়াজিবুল অজুদ – যার অস্তিত্ব অপরিহার্য এবং অন্যদেরকে অস্তিত্ব ও হায়াত দানকারী। সৃষ্টিজীবের মাঝে যা কিছু অস্তিত্বশীল, তা সেই ওয়াজিবুল অজুদের দান ও হেবা। “হায়াত” সিফাতের উল্লেখ দ্বারা “অজুদ” বা নিজ অস্তিত্বের কথা এবং “কাইয়ুমিয়্যাত” সিফাতের উল্লেখ দ্বারা “ইজাদ” বা অন্যদেরকে অস্তিত্ব দানের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

 

৩য় বাক্যঃ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ

অনুবাদঃ তাকে ধরে না তন্দ্রা, আর না নিদ্রা।

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ অর্থাৎ, কোন অনিষ্টই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তিনি স্বীয় সৃষ্ট জীব থেকে কখনো উদাসীন নন, প্রত্যেকের প্রতি তার সজাগ দৃষ্টি রয়েছে। সুতরাং, তিনি মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক নন। যে যেই অবস্থায় আছে, সবই তার দৃষ্টির গোচরে, তাই কোন কিছুই তার দৃষ্টির আড়ালে নেই। তার দৃষ্টি থেকে কারো গোপন থাকার শক্তি নেই। কেননা, তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, আর নিদ্রাও না।

“لَا تَأْخُذُه” এর শাব্দিক অর্থ হলো, তাকে কাবু করতে পারে না। অর্থাৎ তিনি ক্লান্তিহীন ও সর্বদা সজাগ।

“سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ” এজন্য বলা হয়েছে যে, তিনি তন্দ্রা ও নিদ্রার চাইতে অধিক শক্তিশালী।

আবু মুসা থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে চারটি কথা বললেন, তা এই –

নিশ্চয়ই আল্লাহ নিদ্রা যান না, আর তার জন্য নিদ্রা শোভনীয়ও না। কেননা, তিনি দাঁড়িপাল্লা সমুন্নত করে রাখেন। আর তার কাছে রাতের আমল দিনের পূর্বে আর দিনের আমল রাতের পূর্বে পেশ করা হয়। তার ও সৃষ্টি জগতের মাখখানে নূর বা আগুনের পর্দা রয়েছে। যদি তা অপসারিত হয়, তা হলে তার দৃষ্টি গোচরের সবকিছুই পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে। (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড, সংক্ষেপিত)

আবু জাফর আত-তাবারী লিখেছেনঃ আল্লাহ তাআলাকে কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি ও আপদ-বিপদ স্পর্শ করে না। পক্ষান্তরে, তন্দ্রা ও নিদ্রা হচ্ছে শরীরের দুটো অবস্থার নাম, যা ধীশক্তিসম্পন্ন লোকের ধীশক্তি ঢেকে ফেলে, অবচেতন করে দেয়, আর এ দুটো অবস্থা যাকে স্পর্শ করে তার মধ্যে পূর্বাবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ও পরিবর্তিত অবস্থার জন্ম দেয়। এখন আমাদের ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতটির অর্থ হচ্ছে –

“আল্লাহ” এমন এক সত্তার নাম, যিনি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নেই। যিনি জীবিত, তার কোন মৃত্যু নেই, তিনি ছাড়া অন্য সকলের যিনি রক্ষণাবেক্ষণ করেন, রিযিক দান করেন আর এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন হওয়া ও যাবতীয় কাজ-কারবার সম্পাদন করার সকলকে তাওফিক দান করেন।

তাকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। কোন বস্তু অন্যের মধ্যে যেরূপ পরিবর্তন সাধন করে, তার মধ্যে এরূপ পরিবর্তন সাধন করে না। রাত-দিন, যুগ-যুগান্তর ও বিভিন্ন পরিবর্তনশীল অবস্থাদির পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য বস্তুতে যেরূপ অহরহ পরিবর্তন সাধিত হতে থাকে, তার মধ্যে এরূপ পরিবর্তন সাধিত হয় না। বরং তিনি পরিবর্তনহীন একই অবস্থায় সর্বকালে বিরাজমান এবং তিনি সমগ্র মাখলুকের রক্ষণাবেক্ষণে সদা-সর্বদা সচেতন ও সুযত্নবান। কাজেই, যদি তাকে নিদ্রা স্পর্শ করতো, তাহলে তিনি প্রভাবিত হয়ে পড়তেন, কেননা নিদ্রা নিদ্রায় মগ্ন ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যদি তিনি তন্দ্রাভিভূত হয়ে পড়তেন, তাহলে আসমান-যমিন ও উভয়ের মধ্যে যা কিছু বিদ্যমান, তা ধ্বংস হয়ে যেতো। কেননা, এসবের রক্ষণাবেক্ষণ তারই তদবীর ও কুদরতের মাধ্যমে সুসম্পন্ন হয়ে থাকে। অথচ নিদ্রা রক্ষণাবেক্ষণকারীকে তার রক্ষণাবেক্ষণ কর্ম পরিচালনা থেকে বিরত রাখে। অনুরূপভাবে তন্দ্রাও তন্দ্রাচ্ছন্ন ব্যক্তিকে তার কর্তব্য কাজ যথাযথ আঞ্জাম দিতে দেয় না। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ “সীন” এর যের দ্বারা উচ্চারণ করলে এর অর্থ হয় তন্দ্রা বা নিদ্রার প্রাথমিক প্রভাব। “نَوْمٌ” পূর্ণ নিদ্রাকে বলা হয়। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলা তন্দ্রা ও নিদ্রা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। পূর্ববর্তী বাক্যে “কাইয়্যুম” শব্দে মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আসমান ও যমিনের যাবতীয় বস্তুর নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। সমস্ত সৃষ্টি তার আশ্রয়েই বিদ্যমান। এতে করে হয়তো ধারণা হতে পারে যে, যে সত্তা এতো বড় কার্য পরিচালনা করছেন, তার কোন সময় ক্লান্তি আসতে পারে আর কিছু সময় বিশ্রাম ও নিদ্রার জন্য থাকা দরকার। দ্বিতীয় বাক্য দ্বারা সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে জানানো হয়েছে যে, আল্লাহ’কে নিজের বা অন্য কোন সৃষ্টির সাথে তুলনা করবে না, নিজের মতো মনে করবে না। তিনি সমকক্ষতা ও সকল তুলনার ঊর্ধ্বে। তার পরিপূর্ণ ক্ষমতার পক্ষে এসব কাজ করা কঠিন নয়। আবার তার ক্লান্তিরও কোন কারণ নেই। আর তার সত্তা যাবতীয় ক্লান্তি, তন্দ্রা ও নিদ্রার প্রভাব থেকে মুক্ত ও পবিত্র। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আমিন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ “سنة” শব্দের অর্থ হচ্ছে তন্দ্রা, আর “نوم” শব্দের অর্থ নিদ্রা। এর কোনটিই আল্লাহ’র স্পর্শ করে না বলায় বুঝা গেলো নিদ্রার প্রথম ও শেষ উভয় অবস্থা থেকে তিনি মুক্ত। যার অর্থ হচ্ছে, শৈথিল্য ও উদাসীনতা বা অবসাদগ্রস্ততার যাবতীয় প্রভাব থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পবিত্র। (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

আশেকে ইলাহি বুলন্দশহরি লিখেছেনঃ “سنة” বলা হয় হালকা ঘুমকে, যার তরজমা করা হয়েছে তন্দ্রা। “نوم” বলে এমন পূর্ণ নিদ্রাকে, যার ফলে হুঁশ থাকে না। আল্লাহ তাআলা তন্দ্রা ও নিদ্রা উভয়টি থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। ক্লান্তি দূরীকরণার্থে ও বিশ্রামের জন্য সৃষ্টিজীবের নিদ্রার প্রয়োজন হয়। আল্লাহ জাল্লা শানুহু’র কোনো ধরণের ক্লান্তি আসি না এবং আসতেও পারে না। অধিকন্তু নিদ্রা ও তন্দ্রার মধ্যে প্রভাব গ্রহণ ও অবস্থার পরিবর্তন হয়। আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রভাব গ্রহণ ও অবস্থার পরিবর্তন থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। কাজেই তার নিদ্রা আসে না এবং তা সম্ভবও না। মাখলুকের অবস্থা এই যে, কাজ করতে করতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, নিদ্রা তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। শয়ন করতে না চাইলেও সে শয়ন করতে বাধ্য হয়। আল্লাহ তাআলা শয়ন করেন না, নিদ্রাও তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

“لَا تَأْخُذُه” শব্দের মধ্যে বলা হয়েছে, নিদ্রা আল্লাহ’র উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। যখন হালকা নিদ্রা বা তন্দ্রা তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে না, তখন গভীর নিদ্রা তো প্রভাব ফেলার প্রশ্নই আসে না। নিদ্রা মাখলুকের একটি বিশেষ গুণ, যা খালিকে কায়েনাতের শানে আয়েব ও ত্রুটি। এজন্যই হাদিস শরীফে (মুসলিম শরীফে) বর্ণিত হয়েছে, “আল্লাহ নিদ্রা যান না, আর নিদ্রা তার জন্য শোভনীয়ও না।” (তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী লিখেছেনঃ “السنة” হলো নিদ্রা পূর্ববর্তী অবসাদ। অতিশয়তার ধারায় নিদ্রার পরে তন্দ্রার কথা বলার নিয়ম হলেও বাস্তব অস্তিত্বের ধারায় তন্দ্রা আগে হওয়ার প্রতি লক্ষ্য রেখে ধারা পাল্টে দেওয়া হয়েছে।

“النوم” – নিদ্রা হলো প্রাণীর একটি অবস্থা, যা ঊর্ধ্বগামী বাস্পের আর্দ্রতার কারণে, মস্তিস্কের শিরা-উপশিরাসমূহ শিথিল হয়ে যাওয়ার ফলে প্রাণীর উপর আপতিত হয় এবং বাহ্য অনুভূতি কেন্দ্রগুলোকে (পঞ্চ-ইন্দ্রিয়কে) সম্পূর্ণরূপে অনুভূতিশূন্য করে দেয়। এ বাক্যটি নেতিবাচক বিশেষণরূপে উল্লিখিত হয়েছে তুলনা ও উপমার ধারণা বিদূরিত করার লক্ষ্যে। সুতরাং এটি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী – এর দৃঢ়তাজ্ঞাপক। কেননা, নিদ্রা বা তন্দ্রা যাকে কাবু করতে পারে, তার জীবনীশক্তি রহিত হয়ে যায়। কারণ নিদ্রা হলো মৃত্যুর ভাই। আর সে অন্য কিছুর সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, তত্ত্বাবধান, স্থিতিবিধান করতে অপারগ হয়। এটি পূর্ববর্তী বাক্যের তাকীদ হওয়ার কারণে এ বাক্যের শুরুতে সংযোজক “ওয়াও” (و) ব্যবহৃত হয়নি। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করে না আর নিদ্রাও না। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা যে পরিবর্তন, ক্ষণস্থায়িত্ব ও সৃষ্টিজীবের গুণ-বৈশিষ্ট্য থেকে পবিত্র ও মুক্ত তা বর্ণনা করা হয়েছে। এ বাক্যটি পূর্বোক্ত “الْحَيُّ الْقَيُّومُ” এর তাকীদ। কারণ তন্দ্রা ও নিদ্রার কারণে হায়াত বা জীবন ত্রুটিপূর্ণ হয়। কেননা, নিদ্রা মৃত্যুর সমগোত্রীয়। আর আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর নাম-গন্ধ থেকেও পবিত্র ও মুক্ত। তাছাড়া যার হায়াত বা জীবন ত্রুটিপূর্ণ হবে তার “কাইয়ুমিয়্যাত” তথা হেফাযত ও রক্ষণাবেক্ষণও ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল হবে। কাজেই “لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ” এর মর্ম হলো, তিনি এমন ধারণকর্তা ও ব্যবস্থাপক যে, এক মুহূর্তও ব্যবস্থাপনা থেকে গাফিল হোন না। তিনি নিজ ব্যবস্থাপনা ও ধারণ কাজে ভুল, বিস্মৃতি, গাফলত ও আলস্য থেকে পবিত্র ও মুক্ত। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ (যেমন মুশরিক জাতি ধারণা করে নিয়েছে) জাহিলী ধর্মমতের দেবতারা নিদ্রায় কাতর হয়, নেশায় ঘুমায় আর এ অবচেতন অবস্থায় তাদের দ্বারা নানা ভুল-ভ্রান্তিও হয়ে যায়। খৃষ্টান আর ইহুদীদেরও আকিদা এই যে, আল্লাহ তাআলা ছয় দিনে আসমান-যমিন পয়দা করে সপ্তম দিন তার বিশ্রাম গ্রহণের প্রয়োজন হয়। ইসলামের খোদা চিরন্তন, সদা সতর্ক, সবকিছু সম্পর্কে খবর রাখেন, অবচেতনতা, অলসতা আর অবসাদের অনেক ঊর্ধ্বে তিনি। এসব কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না, পারে না আচ্ছন্ন করতেও। (তাফসীরে মাজেদী, ১ম খণ্ড) 

 

৪র্থ বাক্যঃ لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ

অনুবাদঃ আকাশসমূহে যা রয়েছে আর পৃথিবীতে যা রয়েছে – সব তারই সত্বাধীন।

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ অর্থাৎ এর মর্যাদা হলো যে, সমগ্র সৃষ্টি তার দাসত্বে নিয়োজিত, সবই তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত, সবই তার আয়ত্তাধীন এবং সব কিছুর উপর তার একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। যথা আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন –

“আকাশসমূহ ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে, সে দয়াময়ের নিকট বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে না। অবশ্যই তিনি তাদের সংখ্যা নির্ণয় করেছেন আর তাদেরকে পূর্ণরূপে গণনা করেছেন। আর তাদের প্রত্যেকেই কিয়ামতের দিন তার কাছে একা আসবে।” (সূরাহ মারইয়াম, ১৯ : ৯৩-৯৫)

আবু জাফর আত-তাবারী লিখেছেনঃ এ আয়াতাংশে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, সমস্ত কিছুর মালিকই তিনি, তার কোন শরীক বা অংশীদার নেই। তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। অন্য সকল ভ্রান্ত মাবুদ ও উপাস্য সৃষ্টিকর্তা নয়।

“لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ” কালেমা দ্বারা এ অর্থ নেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করা উচিত বা সঙ্গত নয়। কেননা, মালিকানা সম্পত্তি মালিকের হাতেরই পুতুল বিশেষ। মালিকের অনুমতি ছাড়া মামলুক ব্যক্তি বিশেষ অন্যের সেবা করতে পারে না।

এজন্যই আল্লাহ ইরশাদ করেন যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে তার সমস্তই আমার মালিকানা সম্পদ ও আমার সৃষ্টি। সুতরাং আমার মাখলুকের কারোরই অন্যের উপাসনা করার অধিকার নেই। আমিই তার মালিক। কেননা, কোন গোলামের জন্য সঙ্গত নয় যে, সে তার মালিক ছাড়া অন্যের ইবাদাত বা সেবা করবে। সুতরাং সে তার মালিক ও প্রভু ছাড়া অন্যের আনুগত্য স্বীকার করে না। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ এ বাক্যের প্রারম্ভে ব্যবহৃত “লাম” অক্ষর মালিকানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, আকাশ ও যমিনে যা কিছু রয়েছে, সেসবই আল্লাহ’র মালিকানাধীন। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তির মালিক। যেভাবে ইচ্ছা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ “له” অগ্রে উল্লেখ করায় অর্থের জোর সৃষ্টি হয়েছে আর এতে সীমাবদ্ধতার তাৎপর্য পরিস্ফুট হয়েছে। অর্থাৎ, গোটা বিশ্ব চরাচরের মালিকানা কেবলমাত্র তারই। এক্ষেত্রে কেউ তার শরীক নেই। তার মালিকানা ক্ষেত্রে মাখলুক তথা সৃষ্টিলোকের কোন অংশ কোন বিভাগই মুক্ত নয়। মুশরিক জাতিগুলো নিজেদের দেবতাকে সৃষ্টিলোকের মালিক স্বীকার করলেও তা তো নিছক ল্যাংড়া-লুলা অপূর্ণ ধরণের। ইসলাম এসে এ বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছে, স্রস্টার সাথে সৃষ্টির সত্যিকার ও সঠিক সম্পর্ক হচ্ছে পূর্ণ মালিকানার সম্পর্ক। “له” এর “লাম” অব্যয়টি সর্বসম্মতভাবে মালিকানা অর্থে (بحر – نهر) (তাফসীরে মাজেদী, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী লিখেছেনঃ এটি তার চিরস্থায়ী হওয়ার জন্য দৃঢ়তা জ্ঞাপক এবং ইলাহ হওয়ার ব্যাপারে তার একত্বের প্রমাণ। “আসমান-যমিনে যা কিছু আছে” দ্বারা উদ্দেশ্য যা কিছু এই দুইয়ের মধ্যে বিদ্যমান, চাই তা তাদের সত্তার অন্তর্ভুক্ত হোক, বা বাইরে হোক, কিন্তু তা তাদের মাঝে অবস্থিত। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ এ বাক্য দ্বারা “মালিকানা” সিফাত সাব্যস্ত করা হয়েছে। তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মালিক। কারণ প্রকৃত মালিক সে-ই, যে অস্তিত্ব দান করে। অতএব, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে অস্তিত্ব দান করেছেন এবং যিনি উভয়ের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছেন ও উভয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করছেন, তিনিই এ দুয়ের প্রকৃত মালিক। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আশেকে ইলাহি বুলন্দশহরী লিখেছেনঃ সমস্ত মাখলুক তার বান্দা ও তার মালিকানার অধীন। সবকিছু তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনিই স্বাধীন স্রস্টা। তিনি যেভাবে চান নিজ মাখলুক পরিচালনা করতে পারেন। (তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান, ১ম খণ্ড)

 

৫ম বাক্যঃ مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ

অনুবাদঃ এমন কে আছে, যে তার অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করবে ?

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন –

مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِندَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ

অর্থাৎ, এমন কে আছে, যে তার অনুমতি ছাড়া তার সামনে কারো সুপারিশ করতে পারে ?

যেমন আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন –

“আকাশসমূহে বহু ফেরেশতা রয়েছে, কিন্তু তাদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না; তবে আল্লাহ যদি ইচ্ছা করে সন্তুষ্ট হয়ে কাকেও অনুমতি দান করেন, তবে তা অন্য কথা।” (সূরাহ আন নাজম, ৫৩ : ২৬)

অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন –

“….. তারা কারো জন্য সুপারিশ করে না, কিন্তু একমাত্র তার জন্য সুপারিশ করে যার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট রয়েছেন …..” (সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১ : ২৮)

এর দ্বারা তার শ্রেষ্ঠত্ব, মহত্ত্ব ও উচ্চতম মর্যাদার কথা প্রকাশিত হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে, তার অনুমতি ছাড়া কারো জন্য সুপারিশ করার সাহস কার আছে ?

যেমন শাফাআতের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন – আমি আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে থাকবো। আল্লাহ তার ইচ্ছা মোতাবেক আমাকে ডাকবেন আর বলবেন, মাথা তোলো আর যা বলতে হয় তা বলো, তোমার আবেদন শোনা হবে, তুমি সুপারিশ করলে তা গৃহীত হবে। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, সুপারিশের জন্য আমাকে সংখ্যা নির্ধারিত করে দেওয়া হবে, অবশেষে তাদেরকে আমি বেহেশতে নিয়ে যাবো। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ২য় খণ্ড)

আবু জাফর আত-তাবারী লিখেছেনঃ এর মাধ্যমে (আল্লাহ) প্রশ্ন রাখছেন যে, কে তার মালিকের কাছে অন্য সকলের জন্য সুপারিশ করতে পারে যদি মালিক তাদেরকে শাস্তি দিতে চায়। হ্যা, যদি সে তাদেরকে দায়মুক্ত করেন আর তাকে তাদের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দেন, তাহলে সে তা পারে। আল্লাহ’র এ ঘোষণা দেওয়ার কারণ হলো যে, মুশরিকরা বলেছিলো, আমরা এসব মূর্তির অর্চনা শুধুমাত্র এজন্য সম্পাদন করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহ’র পাকের নৈকট্য লাভে সক্রিয় সাহায্য-সহায়তা করবে। প্রতিউত্তরে আল্লাহ তাদেরকে বলেন, আকাশ ও পৃথিবীতে এবং উভয়ের মধ্যে যা কিছু বর্তমান রয়েছে সব কিছুর মালিকানা স্বত্ব আমারই। কাজেই আমার ব্যতীত অন্যের ইবাদাত করা সঙ্গত নয়। সুতরাং তোমরা মূর্তিপূজা করো না, যাদেরকে তোমরা ধারণা করছো যে, তারা তোমাদেরকে আমার নৈকট্য লাভে সাহায্য-সহায়তা করবে। তারা আমার কাছে তোমাদের কোন উপকারে আসবে না এবং তারা তোমাদের কোন অভাবও মিটাতে পারবে না। তবে যদি কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে সে সুপারিশ করতে পারবে। তারা হচ্ছেন আমার পয়গাম্বর, ওলী ও বাধ্যগত বান্দাগণ। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ এর অর্থ হচ্ছে – এমন কে আছে, যে তার সামনে কারো সুপারিশ করতে পারে তার অনুমতি ব্যতীত ?

এতে কয়েকটি মাসআলা বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রথম হচ্ছে এই যে, যখন আল্লাহ তাআলা যাবতীয় সৃষ্টবস্তুর মালিক এবং কোন বস্তু তার চাইতে বড় নয়, তাই কেউ তার কোন কাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকারী নয়। তিনি যা কিছু করেন, তাতে কারো আপত্তি করার অধিকার নেই।

তবে এমন হতে পারতো যে, কেউ কারো জন্য সুপারিশ করে। তাই এ বিষয়টিও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এ ক্ষমতাও কারো নেই। তবে আল্লাহ’র কিছু খাস বান্দা আছেন, যারা তার অনুমতি সাপেক্ষে তা করতে পারবেন, অন্যথায় নয়।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হাশরের ময়দানে সর্বপ্রথম আমি সমস্ত উম্মতের জন্য সুপারিশ করবো।

একে “মাকামে মাহমুদ” বলা হয়, যা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য খাস, অন্যের জন্য নয়। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ “مَن ذَا الَّذِي” – এমন কে আছে ? (এটি) অস্বীকৃতি জ্ঞাপক জিজ্ঞাসা, অর্থাৎ, এমন কেউই নেই।

“يَشْفَعُ عِندَهُ” – শাফাআত বা সুপারিশ সম্পর্কে টীকা এইমাত্র উল্লিখিত হয়েছে। মাসীহ – এর মহান শাফায়াত মাসীহীদের এক বিশেষ আকিদা। খৃষ্টানদের মতে মাসীহের কেবল স্বতন্ত্র শাফাআতই প্রমাণিত নয়, বরং তার এ সন্তানের মাধ্যমে তিনি এ বিশ্বলোকই সৃষ্টি করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)। খৃষ্টানদের সম্বোধনকালে কুরআন মাজীদ তাদের কাফফারা, শাফায়াত ইত্যাদি বিশেষ ও কেন্দ্রীয় আকিদার উপর আঘাত হেনে থাকে।

“بِإِذْنِهِ” – তার অনুমতিক্রমে। এটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করাও অতীব প্রয়োজন ছিলো। খৃষ্টানদের মতে পরিত্রাণ নির্ভর করে শাফাআতের উপর, ঠিক এর বিপরীতে কোন মুশরিক জাতি খোদাকে কর্মফল বিধানের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে নিয়েছে যে, তার জন্য ক্ষমা ও সুপারিশের কোন অবকাশই অবশিষ্ট রাখেনি। ইসলাম মধ্যমপন্থার রাজপথ অবলম্বন করে বলেছে যে, মুক্তি কখনো কারো সুপারিশের উপর নির্ভর করে না। অবশ্য আল্লাহ সুপারিশের অবকাশ রেখেছেন এবং তার অনুমতিক্রমে মকবুল বান্দাগণকে অপরের জন্য সুপারিশ করার সুযোগ দিবেন (মূলতঃ যা এক ধরণের দোয়া’ই) আর তাদের দোয়া কবুল করবেন। আর আল্লাহ’র মাকবুল বান্দাগণের সবচেয়ে বড় সর্দার হচ্ছেন আমাদের রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। (তাফসীরে মাজেদী, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী লিখেছেনঃ এটি তার উঁচু মর্যাদা বর্ণনা। অর্থাৎ, এমন কেউ নেই, যে তার সমকক্ষ হতে পারে বা তার ধারেকাছে যেতে পারে। কার এমন শক্তি যে, তিনি যা ইচ্ছা করেন, সুপারিশের জোরে তা খন্ডাতে পারে ? সরাসরি তার মোকাবিলা করা তো দূরের কথা। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ এ বাক্য দ্বারা তার সর্বময় কর্তৃত্ব, প্রতাপ ও বড়ত্ব বর্ণনা করা উদ্দেশ্য যে, কার সাধ্য তার সমীপে তার অনুমতি ছাড়া মুখ খুলে ? (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী লিখেছেনঃ এখানে বলা হয়েছে যে, কারো এতোটুকু ক্ষমতা ও যোগ্যতা নেই, যার ফলে আল্লাহ’র দরবারে সে সুপারিশ করতে সক্ষম হবে। তবে তিনি তার অপার অনুগ্রহে যাকে সুপারিশ করার আর যার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দিবেন, একমাত্র তিনিই সুপারিশ করতে পারবেন।

কিয়ামতের দিন মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ হবে। সেদিন সব মানুষ সুপারিশের জন্য বিভিন্ন নবীগণের কাছে উপস্থিত হবে। যখন সমস্ত নবী অপারগতা প্রকাশ করবেন, তখন সবাই ফখরুল আউওয়ালিন ওয়াল আখিরিন সায়্যিদিনা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হয়ে আবেদন করবে – আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “তখন আমি রওয়ানা হয়ে যাবো। আরশের নীচে এসে আমার প্রভুর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়বো। তখন আল্লাহ তাআলা তার ঐসব প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য আমার সামনে উদ্ভাসিত করে দিবেন, যেগুলো আমার পূর্বে কারো জন্য উদ্ভাসিত করে দেওয়া হয়নি। তারপর আমার রবের হুকুম হবে – হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), মাথা উঠাও, আমার কাছে প্রার্থনা করো, তোমার প্রার্থনা পুরা করা হবে; সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।” (এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুপারিশ করবেন, যার বিস্তারিত বিবরণ বুখারী ও মুসলিম শরীফে উল্লেখ আছে)

আল্লাহ ইরশাদ করেন –

“সেদিন সুপারিশ উপকার দিবে না, কিন্তু ঐ ব্যক্তির জন্য ছাড়া – যাকে আল্লাহ তাআলা সুপারিশের অনুমতি প্রদান করবেন আর যার কথা পছন্দ করবেন।” (সূরাহ তো-হা, ২০ : ১০৯)

ফেরেশতাদের ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে –

“আল্লাহ তাদের আগেপিছের সমস্ত অবস্থা জানেন, তারা কেবল ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারবে, যার উপর আল্লাহ সন্তুষ্ট, তারা সবাই আল্লাহ’র ভয়ে প্রকম্পিত থাকবে।” (সূরাহ আল-আম্বিয়া, ২১ : ২৮)

“আকাশসমূহে বহু ফেরেশতা রয়েছে, কিন্তু তাদের সুপারিশ কোন কাজে আসবে না; তবে আল্লাহ যদি ইচ্ছা করে সন্তুষ্ট হয়ে কাকেও অনুমতি দান করেন, তবে তা অন্য কথা।” (সূরাহ আন নাজম, ৫৩ : ২৬) (তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান, ১ম খণ্ড) 

 

৬ষ্ঠ বাক্যঃ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ

অনুবাদঃ তাদের সামনে যা রয়েছে আর তাদের পিছনে যা রয়েছে তিনি তা অবগত আছেন।

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যকভাবে পরিজ্ঞাত। যেমন কুরআনে উল্লেখ হয়েছে –

“(জিবরীল বললোঃ) আমি আপনার পালনকর্তার আদেশ ব্যতীত অবতরণ করি না, যা আমাদের সামনে আছে, যা আমাদের পশ্চাতে আছে এবং যা এ দুই-এর মধ্যস্থলে আছে, সবই তার, এবং আপনার পালনকর্তা বিস্মৃত হওয়ার নন।” (সূরাহ মারইয়াম, ১৯ : ৬৪) (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

আবু জাফর আত-তাবারী লিখেছেনঃ এ আয়াতাংশের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, যা কিছু সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে বা হবে – সবকিছুর সম্বন্ধেই তিনি অবগত, তার কাছে কোন কিছুই গোপন নেই।

আত-তাবারী আরো লিখেছেন – আমার এ বক্তব্য তাফসীরকারগণ সমর্থন করেছেন। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা অগ্র-পশ্চাৎ যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনা সম্পর্কে অবগত। অগ্র-পশ্চাৎ বলতে এ অর্থও হতে পারে যে, তাদের জন্মের পূর্বে ও জন্মের পরের যাবতীয় অবস্থা ও ঘটনা আল্লাহ’র জানা রয়েছে। আর এ অর্থও হতে পারে যে, অগ্র বলতে সে অবস্থা বুঝানো হয়েছে, যা মানুষের জন্য প্রকাশ্য, আর পশ্চাৎ বলতে বুঝানো হয়েছে যা অদৃশ্য। তাতে অর্থ হবে এই যে, কোন কোন বিষয় মানুষের জ্ঞানের আওতায় রয়েছে, কিন্তু কোন কোন বিষয়ে তাদের জ্ঞান নেই। কিছু তাদের সামনে প্রকাশ্য আর কিছু গোপন। কিন্তু আল্লাহ’র ক্ষেত্রে সবই প্রকাশ্য। তার জ্ঞান সে সমস্ত বিষয়ের উপরই পরিব্যাপ্ত। সুতরাং এ দুটোতে কোন বিরোধ নেই। আয়াতের ব্যাপকতায় উভয় দিকই বুঝানো হয়। (তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আমিন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ’র জ্ঞান লোকদের সামনের ও পিছনের, তাদের অতীত ও ভবিষ্যৎ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে। (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ অর্থাৎ উপস্থিত অনুপস্থিত, অনুভূত ও বুদ্ধিগত, জানা অজানা সবকিছুর পুরোপুরি জ্ঞান তার রয়েছে। এখানে কেবল দুটি দিকের উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্য সকল দিক। এ ধরণের রূপক ব্যবহার আরবী ভাষায় ব্যাপক।

خَلْفَهُمْ – أَيْدِيهِمْ – এ هُمْ সর্বনাম দ্বারা “مَن ذَا” এর উদ্দিষ্টই উদ্দেশ্য। আম্বিয়া ও ফেরেশতারা যার অন্তর্ভুক্ত, অথবা এর দ্বারা “فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ” ই উদ্দেশ্য। পুরুষ বাচক সর্বনাম এজন্য ব্যবহার করা হয়েছে যে, এতে আসমান-যমিনের জ্ঞানবানরাই লক্ষ্য।

উপরে (তাফসীরে মাজেদীর এই আয়াতাংশ সংক্রান্ত তাফসীরের পূর্বে) আল্লাহ’র গুনাবলী প্রসঙ্গে “قيوميت” ও “مالكيت” গুণের উল্লেখ করা হয়েছে। এখন এখানে আর একটি তত্ত্ব প্রমাণ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলার জ্ঞান বিশেষণটিও পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। চেষ্টা-সাধনা আর সুপারিশ-তদবীরের একটা ধারা তো দুনিয়ায় এমনও হয়ে থাকে যে, যে বিচারক-মালিকের সামনে মামলা পেশ করা হয়, তার জ্ঞান সর্বব্যাপী ও পূর্ণাঙ্গ নয়। এ কারণে বাইরের উপরকরণ দ্বারা তার জ্ঞানে সংযোজন করা প্রয়োজন, প্রয়োজন তার জ্ঞানকে সর্বব্যাপক ও পরিপূর্ণ করা। আল্লাহ’র জ্ঞান প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছুতেই ব্যাপ্ত হয়ে আছে। এখানে একথা উল্লেখ করে যেন বলে দেওয়া হয়েছে যে, তার জ্ঞানে কারো সংযোজন করার, তার সামনে কারো গুণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার দ্বারা তাকে কোন অজ্ঞাত বিষয়ে অবহিত করা অর্থহীন। আর এমনিভাবে খৃষ্টানদের সুপারিশ সংক্রান্ত বিশ্বাসের উপর আর একটি আঘাত হানা হয়েছে। (তাফসীরে মাজেদী, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী লিখেছেনঃ অর্থাৎ যা তাদের পূর্বে ছিলো আর যা তাদের পরে আসবে, অথবা যা তারা বুঝতে পারে আর যা বুঝতে পারে না, অথবা যা তারা গ্রহণ করে আর যা বর্জন করে। কেননা, তারা যা বর্জন করলো তা যেন তারা পিঠের পিছন দিকে ফেলে দিলো। هُمْ সর্বনাম দ্বারা “আসমান-যমিনে যা কিছু” আছে উদ্দেশ্য। এতে বিবেকবানদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বিবেকহীনদের উপর। কিংবা সর্বনাম দ্বারা পূর্বোক্ত “ذا” (ইসমুল ইশারা) দ্বারা যাদের বুঝানো হয়েছে – অর্থাৎ নবীগণ ও ফেরেশতাগণ। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ এ বাক্যে তার সর্বব্যাপী জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে যে, তার জ্ঞান সৃষ্টিজীবের সকল অবস্থাকে বেষ্টন করে আছে। (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী লিখেছেনঃ অর্থাৎ, তাদের পার্থিব ও পারলৌকিক সকল বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে ওয়াকিফহাল। কোনো কোনো মুফাসসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, আমলকারীদের ভালো-মন্দ সমস্ত আমল আল্লাহ’র সামনে। তিনি এগুলো সম্পর্কেও জানেন, তারা যা পূর্বে করেছে সেগুলো সম্পর্কেও জানেন। মোটকথা, তার জ্ঞান সমগ্র মাখলুক এবং মাখলুকের সার্বিক অবস্থা, আমল ও কার্যসমূহকে পরিপূর্ণভাবে পরিবেষ্টিত করে রেখেছে। (তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম লিখেছেনঃ এ আয়াতের মর্ম হলো এ কথা প্রকাশ করা যে, মানুষের জন্মের পূর্বে ও পরে দুনিয়া ও আখিরাতে যা কিছু ঘটেছে আর যা কিছু ঘটবে এবং মানুষের কাছে যা প্রকাশিত বা গোপন – এই সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন সম্পূর্ণ অবগত। ভূত বা ভবিষ্যৎ কোন কিছুই আল্লাহ পাকের কাছে গোপন নেই।

কারো মনে এ প্রশ্ন উত্থিত হতে পারে যে, পৃথিবীর অগণিত মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে সঠিক বিবরণ সংরক্ষণ করা, প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের যাবতীয় কার্যাবলীর হিসাব রক্ষা করা, প্রত্যেকের কার্যক্রমের ভালো-মন্দ নির্ণয় করা, তাদের পুরস্কার ও তিরস্কার নির্দিষ্ট করা আদৌ সহজ নয়, বরং কঠিনতর এমনকি অসম্ভব। আলোচ্য আয়াত দ্বারা মানব মনের এমনি সন্দেহের নিরসন করা হয়েছে যে, আল্লাহ পাকের জ্ঞানের কোন সীমা নেই। তার জ্ঞান, তার ক্ষমতা ও আধিপত্য সমগ্র সৃষ্টিজগতকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে, মানুষের কাছে যা অসম্ভব মনে হয়, আল্লাহ পাকের দরবারে তা কোন সমস্যাই নয়, কেননা তার জ্ঞান, তার কুদরত হেকমত অনন্ত অসীম, সবই তার কর্তৃত্বাধীন। (তাফসীরে নুরুল কুরআন, ৩য় খণ্ড)

 

৭ম বাক্যঃ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ  

অনুবাদঃ আর যা তিনি ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তার ইলমের কিছুই তারা (সৃষ্টিকুল) আয়ত্ব করতে পারে না।

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ অর্থাৎ, কেউই তার জ্ঞানের একটি অংশবিশেষকেও পরিবেস্টিত করতে পারে না। তবে আল্লাহ যাকে জানাবার ইচ্ছে করেন, সে-ই কেবল কিছু জানতে পারে।

এর অর্থ এটিও হতে পারে যে, আল্লাহ তার জাতিসত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে কাকেও জ্ঞান দান করেন না, তবে যাকে জানাবার ইচ্ছা করেন তাকে জানান। যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেন –

“….. আর তারা তাকে নিজ জ্ঞানের পরিধিতে বেষ্টন করতে পারে না।” (সূরাহ তো-হা, ২০ : ১১০) (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

আবু জাফর আত-তাবারী লিখেছেনঃ তিনি এমন জ্ঞানী যার কাছে কোন কিছুই গোপন নেই এবং প্রত্যেক জিনিসকেই স্বীয় জ্ঞান দ্বারা আয়ত্তাধীন রেখেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কেউ এরূপ গুণের অধিকারী নন এবং তিনি ছাড়া অন্য কেউ তিনি যা ইচ্ছা করেন তার চেয়ে অধিক কোন কিছুর জ্ঞান রাখেন না। অন্য কথায়, তিনি যে জ্ঞান সম্বন্ধে কাউকে অবগত করাবার ইচ্ছা করেন, সে তা-ই জানে, এর চেয়ে অধিক জানে না। এটি এজন্য যে, যদি কোন ব্যক্তি যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত না হয়, তাহলে তার সত্তার ইবাদাত করা সঙ্গত হতে পারে না। আর যারা কিছুই বুঝে না, যেমন মূর্তি ও দেবদেবী, তাদের ইবাদাত কিভাবে সঙ্গত হতে পারে ? এজন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন যে, তোমরা এমন সত্তার জন্য ইবাদাত নির্ধারণ করো, যিনি যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন, তার কাছে ছোট-বড় কোন কিছুই গোপন থাকে না। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ অর্থাৎ, মানুষ ও সমগ্র সৃষ্টির জ্ঞান আল্লাহ’র জ্ঞানের কোন একটি অংশবিশেষকেও পরিবেস্টিত করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে যে পরিমাণ জ্ঞান দান করেন, শুধু ততটুকুই সে পেতে পারে। এতে বলা হয়েছে যে, সমগ্র সৃষ্টির অণু-পরমাণুর ব্যাপক জ্ঞান আল্লাহ’র জ্ঞানের আওতাভুক্ত – এটি তার বৈশিষ্ট্য। মানুষ অথবা অন্য কোন সৃষ্টি এতে অংশীদার নয়। (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ কে পরিবেষ্টন করতে পারে না ? সেই সৃষ্টিকূল পীর-পয়গম্বর ফেরেশতা সকলেই যার অন্তর্ভুক্ত। “من علمه” তে “علم” অর্থ “আল্লাহ’র জ্ঞান”। আল্লাহ’র জ্ঞানের কোন একটি বিষয়ের তত্ত্ব-রহস্য উদঘাটন করা সবচেয়ে বড় আলিম ও আরিফের পক্ষেও সম্ভব নয়। সসীম আর অসীমের জ্ঞানের কি তুলনা চলে !

“إِلَّا بِمَا شَاءَ” – (স্বীয় প্রজ্ঞা ও উপযোগিতা অনুযায়ী)। এখানে এ তত্ত্ব বিবৃত হয়েছে যে, বান্দা যতো বড় আলিম আরিফ’ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার জ্ঞান তো সীমাবদ্ধই এবং আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা-অভিপ্রায়ের অধীন। (তাফসীরে মাজেদি, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ সানাউল্লাহ পানিপথী লিখেছেনঃ “তারা তার জ্ঞানের কোন কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না” – অর্থাৎ, তার জ্ঞাত বিষয়সমূহ। সবকিছুই আল্লাহ’র জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও “তার জ্ঞান” বলে তাদের আয়ত্ত না করতে পারাকে সীমিতরূপে উল্লেখ করার কারণ এ কথা বুঝানো যে, এখানে আয়ত্ত করা দ্বারা জ্ঞানমূলক আয়ত্ত উদ্দেশ্য। আয়ত্ত করতে পারে না বলা হয়েছে, “তারা কোন কিছু জানে না” বলা হয়নি। এর দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, বস্তুর মূলতত্ত্ব সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ পরিব্যাপ্ত জ্ঞান আল্লাহ’র জন্যই খাস, অন্য কারো মাঝে কদাচিৎ কোন কিছুর তত্ত্ব জ্ঞান পাওয়া যায় না। অথবা তার জ্ঞান দ্বারা তার জন্য বিশিষ্ট জ্ঞান অর্থাৎ “ইলমুল গাইব” – অদৃশ্য বস্তুর জ্ঞান বুঝানো হয়েছে। কেননা, তারা অদৃশ্য জ্ঞানের কোন কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না।

“যা তিনি ইচ্ছা করেন তা ছাড়া” – অর্থাৎ, যতটুকু তিনি বেষ্টন করার ইচ্ছা করেন এবং তা অতি নগণ্য পরিমাণ। আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন –

“…… তোমাদের অতি অল্প পরিমাণ জ্ঞান দেওয়া হয়েছে।” (সূরাহ বানি ঈসরাঈল, ১৭ : ৮৫)

“وَلَا يُحِيطُونَ” – এর “و” টি “يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ” এর কর্তার (আল্লাহ’র) অবস্থা জ্ঞাপক বিশেষণ। কিংবা এটি সংযোজক বর্ণ। সংযোজন করার কারণ এই যে, বাক্যদ্বয়ের সমষ্টি দ্বারা বুঝা যায় যে, সৃষ্টিকুলের অবস্থাদি বেস্টনকারী তার পূর্ণাঙ্গ সত্তাগত জ্ঞান এবং এক্ষেত্রে তিনি একক ও অদ্বিতীয়। (তাফসীরে মাযহারী, ২য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দলভী লিখেছেনঃ এ বাক্যে বলা হয়েছে, যেভাবে সৃষ্টিজীবের অস্তিত্ব আল্লাহ’র দান, তেমনিভাবে সৃষ্টিজীবের জ্ঞানও তার দান। বান্দা কেবল ততটুকুই জানতে পারে যতটুকু তিনি চান। বান্দার জ্ঞান তার ইচ্ছার অধীন। বান্দার জ্ঞান অতি সামান্য ও সীমিত এবং অজ্ঞতা সীমাহীন ও অসীম। (মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী লিখেছেনঃ মাখলুক যতটুকু ইলমের অধিকারী হয়েছে, তা আল্লাহ’র পক্ষ থেকেই প্রাপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে কারো নিজস্ব ইলম নেই। কারো ইলম আল্লাহ’র সমগ্র জ্ঞানের পরিধি পরিবেষ্টন করতে সক্ষম নয়। (তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান, ১ম খণ্ড)

 

৮ম বাক্যঃ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ

অনুবাদঃ তার কুরসী আকাশমণ্ডল ও পৃথিবী পরিব্যাপ্ত।

ইবনে জারীর আত-তাবারী লিখেছেনঃ এ আয়াতাংশের মাধ্যমে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, আল্লাহ’র “কুরসী” আকাশ ও পৃথিবীময় সুবিস্তৃত। তবে বিশ্লেষণকারীরা এ আয়াতে উল্লিখিত “কুরসী” এর অর্থ নিয়ে মতবিরোধ করেছেন। (তাফসীরে তাবারী, ৫ম খণ্ড)

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এর (কুরসীর) পরিমাপ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জানা নেই।” (তাফসীরে ইবনে কাসির, ১ম খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ অর্থাৎ, তার কুরসী এতো বড়, যার মধ্যে সাত আকাশ ও যমিন পরিবেস্টিত রয়েছে।

আল্লাহ উঠা-বসা আর স্থান-কাল থেকে মুক্ত। এ ধরণের আয়াতকে মানুষের কার্যকলাপ ও আচার-আচরনের সাথে তুলনা করা উচিত নয়। এর অবস্থা পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করা মানবজ্ঞানের ঊর্ধ্বে। তবে হাদিসের বর্ণনা দ্বারা এতোটুকু বোঝা যায় যে, আরশ ও কুরসী এতো বড় যে, তা সমগ্র আকাশ ও যমিনকে পরিবেস্টিত করে রেখেছে।

ইবনে কাসির আবু যর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু’র উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কুরসী কি এবং কেমন ?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যার ইখতিয়ারে আমার প্রাণ, তার কসম – কুরসীর সাথে সাত আকাশ ও সাত যমিনের তুলনা একটি বিরাট ময়দানে ফেলে দেওয়া একটি আংটির মতো।”

অন্য এক বর্ণনাতে আছে যে, আরশের তুলনায় কুরসীও অনুরূপ। (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আমীন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ তার ব্যাপক-বিস্তৃত রাজত্বের দূরবর্তী কোন প্রান্তও এমন নয়, যেখানে তিনি তার কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে সফল হচ্ছেন না এবং তিনি সেখানে নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য উপাস্যদেরকে নিজের ক্ষমতার অংশীদার বানাতে বাধ্য। (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

 

৯ম আয়াতঃ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا

অনুবাদঃ আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাকে ক্লান্ত করে না।

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ অর্থাৎ, আসমান ও যমিন এবং এর অভ্যন্তরের প্রতিটি সৃষ্টিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা তার জন্য কোন কষ্টকর ব্যাপার নয়, বরং এটি তার জন্য খুবই সহজ। আর সমগ্র সৃষ্টি তার কাছে অতি নগণ্য ও তুচ্ছ এবং সকলেই তার নিকট মুখাপেক্ষী ও দরিদ্র। তিনি ঐশ্বর্যশালী ও অতি প্রশংসিত। তিনি যা ইচ্ছা তাই করেন। তাকে হুকুম দেওয়ার কেউ নেই। নেই তার কাজের কোন হিসাব গ্রহণকারী। তিনিই সকল বস্তুর উপর একচ্ছত্র ক্ষমতাবান ও সকলের হিসাব আদায়কারী, সকল জিনিসের একমাত্র মালিকানা তার। তিনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই, নেই কোন প্রতিপালক। (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী লিখেছেনঃ মুশরিক জাতিগুলো ধারণা করে নিয়েছে যে, এতো বিশাল-বিস্তীর্ণ ও বিজন প্রান্তর, যার কোন সীমা-পরিসীমা নেই, তার দেখাশুনা আল্লাহ একা কি করে করবেন ? এ কারণে (নাউযুবিল্লাহ) তিনি কখনো ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন, আর এসব সামাল দেওয়ার জন্য তার অংশীদার ও সহায়কেরও প্রয়োজন হতে পারে। আল্লাহ’র অবসন্ন হওয়া ও বিশ্রাম নেওয়া সম্পর্কে স্বয়ং ইহুদী-খৃষ্টানদের বিশ্বাস এ দিকেই ইঙ্গিত করে। (তাফসীরে মাজেদী, ১ম খণ্ড)

আমীন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ আল্লাহ তাআলা এ দুনিয়ার বাদশাহদের মতো নন, যারা নিজেদের রাজত্ব সামাল দেওয়ার জন্য বহুসংখ্যক সহকারী ও সাহায্যকারীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। তাদের ছাড়া রাজ্যের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। বরং তিনি অসীম জ্ঞান, অশেষ ক্ষমতা ও সীমাহীন শক্তি প্রয়োগের অধিকারী। সুতরাং যেভাবে আমরা আমাদের বাড়ির প্রাঙ্গনকে দেখাশোনা করি, তার চেয়েও লাখো গুণ সহজতরভাবে তিনি তার আসমান ও যমিনব্যাপী রাজত্বের শৃঙ্খলা রক্ষা করেন এবং এটা তার জন্য বিন্দুমাত্র দুঃসাধ্য ব্যাপার নয় যে, কারো পক্ষ থেকে সহযোগিতার প্রয়োজন পড়তে পারে। (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

 

১০ম বাক্যঃ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ

অনুবাদঃ আর তিনিই সর্বোচ্চ মর্যাদাবান, সর্বোচ্চ মাহাত্ম্যের অধিকারী।

ইবনে কাসির লিখেছেনঃ (এর অর্থ,) তিনি সমুন্নত মহীয়ান। (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

মুহাম্মাদ শফী লিখেছেনঃ তিনি অতি উচ্চ ও অতি মহান। পূর্ববর্তী নয়টি বাক্যে আল্লাহ’র সত্তা ও গুণের পূর্ণতা বর্ণনা করা হয়েছে। তা দেখার ও বুঝার পর প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলতে বাধ্য হবে যে, সকল শান-শওকত বড়ত্ব ও মহত্ত্ব এবং শক্তির একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। এ দশটি বাক্যে আল্লাহ’র যাত ও সিফাতের পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

আমীন আহসান ইসলাহী লিখেছেনঃ অর্থাৎ, তার সত্তা বিশালতম ও শ্রেষ্ঠতম। তার জ্ঞান, তার ক্ষমতা ও তার ব্যাপকতাকে নিজেদের সীমিত পাল্লায় পরিমাপ করো না, এখান থেকেই তো তার সম্পর্কে বিভ্রান্তি বা পথচ্যুতির সৃষ্টি হয় আর শিরকের বিভিন্ন পথ উন্মুক্ত হয়। তার গুণাবলী সম্পর্কে তিনি স্বয়ং যা কিছু বলেন তার উপর ঈমান আনো। ধারণা ও অনুমান এবং সাদৃশ্য ও উপমার খেয়ালীপনা থেকে দূরে থাকো। (তাদাব্বুরে কুরআন, ১ম খণ্ড)

ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের তাফসীর শেষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেনঃ

উল্লেখ্য, আলোচ্য আয়াতটি এবং এ ধরণের যতো আয়াত ও হাদিস রয়েছে, এ সম্বন্ধে পূর্ববর্তী বিজ্ঞ আলিমগণের অভিমত হলো, এ বিষয়গুলোর প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা না করে ও প্রলম্বিত আলোচনায় প্রবৃত্ত না হয়ে তা যেভাবে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন, সেভাবে তার প্রতি ঈমান রাখা এবং কোন বস্তুর সাথে তার পরিমাপ ও তুলনা না করাই ঈমানদারের কাজ। তাহলে কোন সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার আশংকা থাকে না। (তাফসীরে ইবনে কাসির, ২য় খণ্ড)

আহকাম  শিক্ষাঃ

(১) তাওহীদের বিষয় বর্ণিত হয়েছে।

(২) আল্লাহ তাআলার একাধিক গুণাবলীর কথা বর্ণিত হয়েছে।

(৩) আল্লাহ তাআলা সবকিছুর মালিক।

(৪) আল্লাহ তাআলার অনুমতি ছাড়া কেউ তার কাছে কোন সুপারিশ করতে পারবে না।

(৫) আল্লাহ তাআলা ভূত-ভবিষ্যৎ ও প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছু সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন।

(৬) কুরসী ও তার ব্যাপকতার কথা বর্ণিত হয়েছে।

(৭) আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণ তাকে ক্লান্ত করে না – এর দ্বারা তার মহা শক্তিমত্তার কথা বর্ণিত হয়েছে। (বুরহানুল কুরআন, ১ম খণ্ড)

Leave a Reply