কুরবানীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, তাৎপর্য, আহকাম ও ফজিলত

কুরবানীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, তাৎপর্য,

আহকাম ও ফজিলত

পেশকালামঃ

পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের তথ্য অনুসারে পবিত্র ঈদুল আজহার সাথে জড়িয়ে রয়েছে নিগূঢ় ইতিহাস যার সূচনা হয়েছিল হযরত আদম আঃ পুত্র হাবিল ও কাবিলের প্রতিযোগিতা মূলক কুরবানি করার মাধ্যমে।

একজন সফল হলেন আত্মিক পবিত্রতা উপর ভর করে আর অন্যজন পথহারা হলো লোভ ও প্রতিহিংসার ছায়াতলে। তখন থেকে কোরবানির ধারা শুরু হয়েছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন বলছে-

‘ওদেরকে আদমের দুই পুত্রের (হাবীল ও ক্বাবীল) ঘটনা ঠিকঠিকভাবে শোনাও; যখন তারা (আল্লাহর উদ্দেশ্যে) একটি করে কোরবানি করেছিল। তাদের একজনের কোরবানি কবুল হল, অন্যজনের হল না। তখন দ্বিতীয়জন (প্রথমজনকে) বলল, ‘আমি তোমাকে খুন করে ফেলব।’ প্রথমজন বলল, ‘আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের কোরবানি কবুল করেন।’ ( আল মায়িদাহ:২৭)।

এরই ধারাবাহিকতায় হযরত ইব্রাহিম আঃ পর্যন্ত পৌঁছে। অনন্তর তিনি মহা পরীক্ষার সম্মুখীন হোন। স্বীয় পুত্র ইসমাইল আঃ কে উৎসর্গ করার দৃঢ় মনোবল ও মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার ঈর্ষণীয় ঈমান নিয়ে আত্মোৎসর্গের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে যান। তার আত্মত্যাগে মহান প্রতিপালক এতোই সন্তুষ্ট হয়ে পড়েন যে, পরবর্তী মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর এই কোরবানির বিধান অত্যাবশ্যক করে দেন

ঈদুল আযহা এর পরিচয়ঃ

ঈদ (عيد) একটি আরবি শব্দ। শব্দটি খুশি, উৎসব এবং আনন্দ প্রকাশক অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শব্দটি আরবি হলেও বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি এবং হিন্দিসহ প্রায় সব ভাষাতেই শব্দ ও অর্থের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।

“আযহা শব্দের অর্ধ-দ্বিপ্রহর অর্থাৎ সকাল ও দুপুরের মধ্যবর্তী সময়। গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মূল্যায়ণ বিবেচনায় কুরআন ও হাদীসে আরবীতে এ দিনটির আরোও কিছু নাম ও পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন ঈদুল আযহা বা অর্ধ-দুপুরের আনন্দ। ইয়াওমুন নাহার বা রক্ত প্রবাহের দিন। ইয়াওমুয যাবাহ বা পশু যবেহের দিন। ইয়াওমুন নুসুক বা কুরবানীর দিন।

কুরবানী শব্দের অর্থ ও তার প্রচলন

কুরবানী قربانى শব্দটি আরবী “কুরবান” قربان যা ‘ক্বারব’ قرب শব্দ থেকে একটু পরিবর্তন হয়ে এসেছে। এর অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য, আত্মোৎসর্গ, পশু যবেহ করা, রক্ত প্রবাহিত করা ইত্যাদি। যেহেতু কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন ও তার ইবাদতের জন্য পশু জবেহ করা হয়, তাই একে কুরবানী বলা হয়। শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট কতিপয় গৃহপালিত হালাল প্রাণীকে জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের জন্য উৎসর্গ করাকে কুরবানী বলে। ইসলামি শরিয়তে এটি ইবাদত হিসেবে সিদ্ধ। উলে−খ্য যে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে যে পশু জবেহ করা হয় তা তিন ধরনের। যেমন (১) হাদী (২) কুরবানী (৩) আক্বীক্বাহ্।

ঈদের উৎপত্তি বা সুচনা

আনাস ইবন মালেক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا فَقَالَ: مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ؟ قَالُوا: كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” قَدْ أَبْدَلَكُمُ اللَّهُ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ “)رَوَاهُ أَبُو دَاوُد)

“রাসূলুল−াহ্ ﷺ যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করলেন তখন তাদের অর্থাৎ মদীনাবাসীদের দু’টি দিন নির্ধারিত ছিল, যে দিনগুলোতে তারা খেলাধুলা ও আনন্দ ফুর্তি করত। রাসূলুল−াহ্ ﷺ এ দু’টি দিবস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, দিবস দুটি কি? মদীনাবাসিরা উত্তরে বলেন, আমরা জাহিলি যুগে এ দু’ দিবসে খেলাধুলা (উৎসব) করতাম। তখন রাসূলুল−াহ্ ﷺ বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের এ দিনদ্বয়ের পরিবর্তে উহার চেয়েও উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। আর তা হল ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্র।’’ -আবূ দাঊদ; মিশকাত ঃ ১৪৩৯

ইসলাম পূর্বযুগের উৎসব ও আমাদের ঈদ উৎসব

শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়, বরং এ পৃথিবীর সকল ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষের জন্য রয়েছে তাদের প্রত্যেকেরই আনন্দ উৎসবের বছরের বিভিন্ন দিন নির্ধারিত। হাদীসে রয়েছে,

إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا وَهَذَا عِيدُنَا (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

“প্রত্যেকটি জাতিরই একটা আনন্দের দিন রয়েছে আর ইহা হল আমাদের (ঈদের) আনন্দের দিন।’’ -বুখারী, মুসলিম; মিশকাত ঃ ১৪৩২

কুরবানীর মর্মকথা। মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কুরবানী হলো আদম (আঃ)-এর দু’ সন্তান হাবিল ও কাবিলের কুরবানী। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন,

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِن أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الآخَرِ﴿المائدة: ٢٧﴾

“আপনি তাদেরকে আদমের দু’ পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বাস্তব অবস্থা পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই (পিতার নির্দেশে) কিছু কুরবানী নিবেদন করেছিল, তখন তাদের একজনের কুরবানী গৃহীত হয়েছিল এবং অপরজনের কুরবানী গৃহীত হয়নি।’’ -সূরা মায়িদা ঃ২৭

সেকালে কুরবানী গৃহিত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীকে ভস্মিভূত করে দিত। যে কুরবানী অগ্নি ভস্মিভূত করতো না, তাকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হতো।

উলে­খ্য যে, কুরবানীদাতা ‘হাবিল’ যিনি মনের ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে আল­াহ্র নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্যে একটি অতি সুন্দর দুম্বা কুরবানী পেশ করেন। ফলে তার কুরবানী কবুল হয়। পক্ষান্তরে ‘কাবিল’ তিনি অমনোযোগী অবস্থায় কিছু খাদ্য-শস্য কুরবানী হিসেবে পেশ করলেন। ফলে তার কুরবানী কবুল হয়নি। সুতরাং প্রমাণিত হলো কুরবানী মনের ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়া কবুল হয় না।

যুগে যুগে প্রত্যেক উম্মতের ওপর কুরবানীর হুকুম

কুরবানীর ইতিহাস ততটাই প্রাচীন যতটা প্রাচীন মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস। মানুষের জন্যে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যত শরী’য়ত নাযিল হয়েছে প্রত্যেক শরীয়তের সকল নবীর উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান বা হুকুম ছিলো। এব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ﴿الحج: ٣٤﴾

“আর আমি প্রত্যেক উ¤মতের জন্য কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’’ -সূরা হজ্জ ঃ৩৪

অর্থাৎ প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ। তবে অন্যান্য শরী’য়ত যেমনি বিভিন্ন ছিল, তেমনি কুরবানীর নিয়ম-পদ্ধতি এবং খুঁটিনাটি  বিষয়সমূহও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।

কুরবানী সম্পর্কে কুরআন মাজীদের সূরা ছ¦ফ্ফাতের ১০২-১১১ আয়াত পর্যন্ত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর মধ্যে যে ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে তা-ই হলো প্রকৃত ইতিহাস।

উম্মাতে মুহাম্মদী -এর ওপর কুরবানীর হুকুম

আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলকে কাওসার দান করেছেন। এর শুকরিয়া আদায়ে তিনি তাকে এ দিনে কুরবানি ও সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’’ – ইবন রজব (রঃ) পৃ ঃ ৪৮২-৪৮৩

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ-فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ﴿الكوثر: ١- ٢﴾

“নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’’ -সূরা কাউসার ঃ ১-২

আমরা জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে যে কুরবানী করে থাকি তা আমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর মাধ্যমে প্রবর্তীত হয়েছে। অর্থাৎ এটি ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত। হাদীস শরীফে রয়েছে,

عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ: قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ؟ قَالَ: سُنَّةُ أبيكم إِبْرَاهِيم عَلَيْهِ السَّلَام قَالُوا: فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ . قَالُوا: فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَة (رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَه)

“(একদিন) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবীগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল­াহ্র রাসূল! এ কোরবানী কী? জবাবে হুজুর ﷺ বললেন ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত (ঐতিহ্য)। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের জন্য কী (সওয়াব) রয়েছে? তিনি বলেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে পুন্য হবে (এদের পশম তো অনেক বেশি)? তিনি বলেন, পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকী রয়েছে।’’ -ইবন মাজাহ ঃ ৩২৪৭; আহমদ ঃ ১৮৭৯৭; মিশকাত ঃ ১৪৭৬

তবে মনে রাখতে হবে, সকল দৈহিক ইবাদত এবং আর্থিক ত্যাগ সম্বলিত ইবাদতের উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য। তাঁর সাথে অন্য কারো সন্তুষ্টি লক্ষ্য নয়। কুরবানী ও জীবন দানের প্রেরণা ও চেতনা সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্য নবী ﷺ-কে নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ*لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ ﴿الأنعام: ١٦٢- ١٦٣﴾

“আপনি বলুন: আমার সালাত, আমার কোরবানী এবং আমার জীবন ও আমার মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহই জন্যে। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি হলাম সবার আগে মুসলমান তথা আনুগত্যশীল।’’ -সূরা আন’য়াম ঃ ১৬২-১৬৩

কুরবানী একটি বিরাট স্মরণীয় বস্তু

আজ কাল দুনিয়ার সর্বত্র মুসলমানগণ যে কুরবানী করে এবং তার ফলে বিরাট উৎসর্গের যে দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় তা প্রকৃত পক্ষে ইসমাঈল (আঃ)-এর ফিদিয়া (উৎসর্গ)। পবিত্র কুরআনে মহান কুরবানীর ঘটনা পেশ করে তাকে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান বলে অখ্যায়িত করা হয়েছে। কুরবানী প্রকৃত পক্ষে এমন এক সংকল্প, দৃঢ় বিশ্বাস, আত্নসমর্পন ও জীবন দেয়ার বাস্তব বহিঃ প্রকাশ যে, মানুষের কাছে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর এবং তার পথেই তা উৎসর্গ হওয়া উচিৎ এটাই বুঝায়। এটা এ সত্যেরও নিদর্শন যে, আল্লাহর ইংগিত হলেই বান্দা তার রক্ত দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। ইব্রাহীম (আঃ) মূলত তা-ই প্রমাণ করলেন। বস্তুত এ শপথ, আত্নসমর্পন ও জীবন বিলিয়ে দেয়ার নাম হলো ঈমান, ইসলাম ও ইহসান।

কুরবানী আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃ প্রকাশ

আল্লাহর নামে পশু যবেহ করা প্রকৃত পক্ষে এ কথারই ঘোষণা যে, আল্লাহ এসব নিয়ামত দান করেছেন এবং যিনি এসব আমদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছেন তিনি এ সবের প্রকৃত মালিক। কুরবানী সেই আসল মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং একথারও বাস্তব বহিঃপ্রকাশ। যে মমিন অন্তর থেকে আল্লাহ মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি বিশ্বাস রেখে পশুর গলায় ছুরি চালায়। সে উপরোক্ত সত্যের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ঘোষণা করে এবং মুখে “বিসমিল্লাহি আল্লাহ আকবার” বলে এ সত্যের স্বীকৃতি প্রকাশ করে।

কুরবানীর দর্শন ও প্রাণশক্তি

জাহিলীযুগের লোকেরা পশু কুরবানী করার পর তার গোশত বায়তুল­াহ্র সম্মুখে এনে রেখে দিতো। তার রক্ত বায়তুল­াহ্র দেয়ালে লেপে দিতো। আর তারা মনে করতো তাদের কুরবানী তাদের ‘ইলাহ’র কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কুরআন নাযিল হওয়ার পর তাদের এ দর্শনকে বলা হলো এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। সঠিক দর্শন হলো কুরবানীর সময় মানুষের মনে যে আবেগ-অনুভূতি সঞ্চারিত হয় তা যেন একমাত্র আল­াহ্র জন্যে এবং তাঁর পথেই উৎসর্গ করার লক্ষ্যে হয়। তাই আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ﴿الحج: ٣٧﴾

“ওসব (কুরবানীর) পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে কিছুই পৌঁছে না; বরঞ্চ তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাক্বওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল­াহ্র মাহত্ম্য ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং হে নবী নিষ্ঠার সাথে যারা নেক কাজ করে আপনি তাদের জান্নাতের সু-সংবাদ শুনিয়ে দিন’’।’’ -সূরা হাজ্জ ঃ ৩৭

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ لَا ينظر إِلَى صوركُمْ وَلَا أموالِكم وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ (رَوَاهُ مُسْلِمٌ : ٢٥٦٤)

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারার দিকে এবং তোমাদের সম্পদের দিকে দেখেন না বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল (অর্থাৎ নিয়তের বিশুদ্ধতা ও আমলের উৎকর্ষতা)।’’ -মুসলিম ঃ ২৫৬৪; মিশকাত ঃ ৫৩১৪

কুরবানীর দিনের ফজীলত

এ দিনের একটি নাম হল ইয়াওমুল হজ্জিল আকবর বা শ্রেষ্ঠ হজ্জের দিন। যে দিনে হাজীগণ তাদের পশু জবেহ করে হজ্জকে পূর্ণ করেন। হাদীসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَقَفَ يَوْمَ النَّحْرِ بَيْنَ الْجَمَرَاتِ فِي الْحَجَّةِ الَّتِي حَجَّ، فَقَالَ: أَيُّ يَوْمٍ هَذَا؟ قَالُوا: يَوْمُ النَّحْرِ، قَالَ: هَذَا يَوْمُ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ (أَبُو دَاوُدَ)

ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল­াহ্ ﷺ বিদায় হজ্জের সময় নহরের দিন তিনি কংকর নিক্ষেপের স্থানে অবস্থান করেন। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন এটা কোন দিন? সাহাবাগণ উত্তর দিলেন, এটা ইয়াওমু-ন্নাহার বা কুরবানীর দিন। রাসূলে করীম ﷺ বললেন, এটা হল ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবর বা শ্রেষ্ঠ হজের দিন।’’ -আবূ দাঊদ ঃ ১৯৪৫

কুরবানীর দিনটি হল বছরের শ্রেষ্ঠ দিন

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ قُرْطٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ أَعْظَمَ الْأَيَّامِ عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ، ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ (رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ : ١٧٦٥)

“আব্দুল্লাহ্ ইবন কুরত (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলে করীম ﷺ বলেছেন, “আল্লাহর নিকট দিবস সমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হল কুরবানীর (নাহরের) দিন, তারপর পরবর্তী দিন (কুরবানীর দ্বিতীয় দিন)।’’ -আবূ দাঊদ ঃ ১৭৬৫; মিশকাত ঃ ২৬৪৩

কুরবানীর দিনটি হল ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন

কেননা এ দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনে সালাত ও কুরবানী একত্র হয়। যা ঈদুল ফিতরের সালাত ও সদকাতুল ফিতরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।’’-লাতায়েফুল মা’আরিফ, ইবন রজব (রঃ), পৃ-৪৮২-৪৮৩

কুরবানীর ফজীলত

কুরবানীই হচ্ছে কুরবানীর দিন সমূহের সর্বোত্তম আমল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ، إِنَّهُ لَيَأْتِي يَوْمَ القِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلاَفِهَا، وَأَنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الأَرْضِ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا ( رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه ,مشكوة : ١٤٧٠)

“কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করা (যবাহ করা) অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় মানুষের কোন আমল নেই। নিশ্চয় কিয়ামতের দিন (কুরবানী দাতার পাল­ায়) কুরবানীর পশু, ইহার শিং, ইহার পশম এবং ইহার খুর সব সহ উপস্থিত হবে। এর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌছে যায় সুতরাং স্বাচ্ছন্দ্য হৃদয়ে তোমরা তা করবে।’’ -ইবন মাজাহ; তিরমিযী; মিশকাত ঃ ১৪৭০

পশুর রক্ত যমিন স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে কবূল হয়ে যায়

রাসূলে করীম ﷺ বলেছেন,

وَإِنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الأَرْضِ فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا( رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه ,مشكوة : ١٤٧٠)‏

“কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলার কাছে বিশেষ সম্মানিত স্থানে পৌঁছে যায় (কবূল হয়ে যায়)। সুতরাং তোমরা প্রফুল­চিত্তে কুরবানী কর।’’ -তিরমিযী; ইবন মাজাহ; মিশকাত ঃ ১৪৭০

প্রথম রক্তবিন্দুর সাথেই বান্দার গুনাহ ক্ষমা হয়ে যায়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِفَاطِمَةَ عَلَيْهَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ: قَوْمِي إِلَى أُضْحِيَّتِكَ فَاشْهَدِيهَا فَإِنَّ لَكِ بِأَوَّلِ قَطْرَةٍ تَقْطُرُ مِنْ دَمِهَا يُغْفَرُ لَكِ مَا سَلَفَ مِنْ ذُنُوبُكَ قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا لَنَا أَهْلَ الْبَيْتِ خَاصَّةً أَوْ لَنَا وَلِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً؟ قَالَ: بَلْ لَنَا وَلِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً (المستدرك علي الصحيحين للحاكم : ٧٥٢٥)

“হে ফাতেমা! তুমি তোমার কুরবানীর পশুর দিকে যাও এবং (পশুর কুরবানীকার্য) প্রত্যক্ষ কর। কেননা পশু থেকে নির্গত প্রথম রক্ত বিন্দুর অসিলাতেই তোমার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। ফাতেমা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন; ইয়া রাসূলাল­াহ! এ প্রতিদান কি শুধু আমাদের (নবীর পরিবারের) জন্যই নির্ধারিত নাকি আমাদের ও সমস্ত মুসলানদের জন্যই নির্ধারিত? তিনি বললেন: না বরং আমাদের ও সমস্ত মুসলমানের জন্যই নির্ধারিত।’’ – মুস্তাদরাকে হাকিম ঃ ৭৫২৫; বাযযার

পশুর প্রতিটি লোমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ: قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الْأَضَاحِيُّ؟ قَالَ: سُنَّةُ أبيكم إِبْرَاهِيم عَلَيْهِ السَّلَام قَالُوا: فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ حَسَنَةٌ . قَالُوا: فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: بِكُلِّ شَعْرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَة (رَوَاهُ أَحْمد وَابْن مَاجَه)

“(একদিন) রাসূলুল­াহ্ ﷺ-এর সাহাবীগণ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল­াহ্র রাসূল! এ কোরবানী কী? জবাবে হুজুর ﷺ বললেন ইহা তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত (ঐতিহ্য)। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের জন্য কী (সওয়াব) রয়েছে? তিনি বলেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে পুন্য হবে (এদের পশম তো অনেক বেশি)? তিনি বলেন, পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি কওে নেকী রয়েছে।’’ -ইবন মাজাহ ঃ ৩২৪৭; আহমদ ঃ ১৮৭৯৭; মিশকাত ঃ ১৪৭৬

 

কুরবানীর শর্তাবলি

ক। এমন পশু দ্বারা কুরবানী দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো হল উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এ গুলোকে কুরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আনআম’।’’ -সূরা হজ্জ ঃ ৩৪; মুসলিম-১৯৬৩

খ। শরী’য়তের দৃষ্টিতে কুরবানীর পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরী।

গ। কুরবানীর পশু যাবতীয় দোষ ত্র“টি মুক্ত হতে হবে।’’ -তিরমিযী-১৫৪৬; নাসাঈ-৪৩৭১

ঘ। যে পশুটি কুরবানী করা হবে তার উপর কুরবানী দাতার পূর্ণ মালিকানা সত্ত¡ থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দ্বারা কুরবানী আদায় হবে না।

ঙ। কুরবানীর পশু কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট করা।

 

ঈদুল আযহার উদ্দেশ্য

ক। ওয়াজিব আদায় করা।

খ। পশুর অকাতরে আনুগত্য প্রকাশের শুকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্য থাকা।

গ। আল্লাহ বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি জন্তু-জানোয়ারেরও সৃষ্টিকর্তা। কুরবানীর মাধ্যমে এর সাক্ষ্য প্রদান।

ঘ। আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য প্রদান করা হয় পশুকে আল্লাহর নামে কুরবানীর মাধ্যমে।

ঙ। মুসলমানরা আল্লাহর নামে হালাল পশু যবেহ করে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য প্রদান করে।

চ। হাজীগণ মিনায় কুরবানী করেন। তাদের সাথে সাধারণ মানুষ একত্বতা প্রকাশ করে হাজীদের সাথে সাদৃশ্য রাখে।

ছ। কুরবানী দাতা নবী ইবরাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত এবং মুহাম্মদ ﷺ-এর তরীকা পালন ও আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।

জ। কুরবানী হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের, খোদাভীরুতা প্রকাশের এবং আল্লাহর ভয় প্রদর্শনের মাধ্যম।

ঝ। হিন্দু ধর্মে স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে তার সাথে পুড়িয়ে দিত, মূর্তির তুষ্টির জন্য নারী ও শিশুদের বলিদান করত। এ সব অন্ধ বিশ্বাসকে দূর করার জন্য এবং মানবতার কল্যাণের জন্য হালাল পশু কুরবানী করা হয়।

সর্বোপরি এলাকার দরিদ্র, নিঃস্ব ও অনাহারীদের গোশত খাওয়ানো পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অভাবীদের আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা হয়।

নবী ইব্রাহীম (আঃ)-কর্র্তৃক পুত্র ইসমাইলকে কুরবানীর বিবরণ এবং উভয়ের স্মৃতি রক্ষা

হজ্জ্ব ও ঈদুল আজহার কুরবানী মূলত নবী ইবরাহীম (আঃ)-এর কুরবানীর অনুসরণ। আজ থেকে প্রায় ৪ হাজার বৎসর পূর্বে, খৃস্টপূর্ব ২০০০ সালের দিকে ইরাকের “উর” নামক স্থানে ইবরাহীম (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজের সকলের বিরোধিতা ও প্রতিরোধের মুখে তিনি তাওহীদের প্রচারে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে তিনি ইরাক থেকে ফিলিস্তিনে হিজরত করেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। ৮৬ বৎসর বয়সে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাঈল (আঃ) জন্মগ্রহণ করেন। বৃদ্ধ বয়সের এ প্রিয় সন্তানকে কুরবানী করতে আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, (আঃ)

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ * فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلامٍ حَلِيمٍ * فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ * فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ * وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ * قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ * إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلاء الْمُبِينُ * وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ * وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الآخِرِينَ * سَلَامٌ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ * كَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ *إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ ﴿الصافات : ١٠٠ – ١١١)

“(অতঃপর সে আল্লাহ তায়ালার দরবারে দু‘আ করলেন) হে আমার মালিক! আমাকে তুমি একজন নেক সন্তান দান করো। এরপর আমি তাকে একজন সহনশীল (ধৈর্যশীল) পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। সে যখন তার (পিতার) সাথে চলাফেরা (দৌড়াদৌড়ি) করার মতো বয়সে উপনীত হলো, তখন সে (ইবরাহীম) তাকে (ছেলেকে) বললো, হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি, আমি (যেন) তোমাকে যবাই করছি, (বলো এ ব্যাপারে) এখন তোমার অভিমত কি? (স্বপ্নের কথা শুনে) সে বললো, হে আমার (স্নেহপরায়ণ) পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি (অবিলম্বে) তা পালন করুন। ইনশাআল­াহ্ (আল্লাহ চাহে তো) আপনি আমাকে (এ সময়েও) সবরকারী (ধৈর্যশীলদের) মাঝে পাবেন। অতঃপর যখন তারা (পিতা-পুত্র) দু’জনই (আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার সামনে) আত্মসমর্পণ করলো এবং সে তাকে (যবাই করার উদ্দেশ্যে) কাত করে শুইয়ে দিলো, তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি (আমার দেখানো) স্বপ্ন সত্য প্রমাণ করেছো, (আমি তোমাদের উভয়কেই মর্যাদাবান করবো, মূলত) আমি এভাবেই সৎকর্মশীল মানুষদের প্রতিদান (পুরস্কার) দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিলো (তাদের উভয়য়ের জন্যে) একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা মাত্র! (এ কারণেই) আমি তার (ছেলের) পরিবর্তে (আমার নিজের পক্ষ থেকে) দিলাম যবেহ্ করার জন্যে এক মহান জন্তু। অনাগত মানুষদের জন্যে এ বিধান চালু রেখে) তার স্মরণ আমি অব্যাহত রেখে দিলাম। ইবরাহীমের প্রতি সালাম (শান্তি) বর্ষিত হোক। এমনিভাবে আমি (আমার) নেক বান্দাদের প্রতিদান (পুরস্কার) দিয়ে থাকি! অবশ্যই সে ছিলো আমার মোমেন (বিশ্বাসী) বান্দাদের একজন।’’ -সূরা আস-সাফফাত ঃ ১০০-১১১

 

ঈদুল আযহা, কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ঈদুল আযহার ধর্মীয় গুরুত্ব

ধর্মীয় দিক থেকে ঈদুল আযহার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যেমন

ক। ইব্রাহীম (আঃ) এর ন্যায় আবেগ, অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা ও ঐকান্তিকতার সাথে পশু কুরবানী করা।

খ। আল্লাহর পথে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার দৃপ্ত শপথ গ্রহণের দিন হলো ঈদুল আযহার দিন।

গ। পশুর গলায় ছুরি চালানোর মাধ্যমে প্রবৃত্তির গলায় ছুরি চালিয়ে নিষ্কলুষ মানুষে পরিণত হওয়ার দিন।

ঘ। আল্লাহ প্রেমে পাগলপারা হয়ে পাপাচারের কালিমা মুক্ত হওয়ার দিন।

ঙ। হাজীগণের মিনায় পশু কুরবানী করার সাথে ইসলামী ঐতিহ্যের সাদৃশ্য রক্ষা করা।

চ। মহানবী ﷺ এর সুন্নাত পালন করা ও ধর্মের প্রতি আনুগত্যশীল হওয়ার সাক্ষ্য দেয়ার দিন।

ছ। পার্থিব জগতের কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পাথেয় সংগ্রহের দিন।

 

ঈদুল আযহার সামাজিক গুরুত্ব

ঈদুল আযহার ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে অনেক সামাজিক গুরুত্ব। যেমন ঃ-

ক। ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করে অনৈসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে সমাজকে রক্ষা করা।

খ। সামাজিক সাম্য ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।

গ। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে সম্প্রীতির সমাজ গঠন করা।

ঘ। গর্ব-অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে জনসেবা ও জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করার শপথ গ্রহণ করার দিন।

ঙ। মুসলিম ভ্রাতৃত্ব কায়েম ও সম্প্রসারণের দিন।

চ। আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করার দিন।

ছ। দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার প্রত্যয় গ্রহণের দিন।

 

ঈদের দিনে আমাদের করণীয়

ঈদগাহে আসা এবং যাওয়ার সময় তাকবীর ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করা

ঈদের দিনের সুন্নাত আমলগুলোর মধ্যে একটি হল ঈদুল ফিতরে নিম্নস্বরে ও ঈদুল আযহাতে উচ্চস্বরে তাকবীর ধ্বনী দিতে দিতে ঈদগাহে গমন করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রزَيِّنُوا أَعْيَادَكُمْ بِالتَّكْبِيرِগ্ধ (المعجم الاوسط للطبرانى : ৪৩৭৩)

“তোমরা তোমাদের ঈদকে তাকবীর ধ্বনি দ্বারা মুখরিত কর।’’ -তাবারাণী ঃ ৪৩৭৩

তাকবীরটি হলো

اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ واللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وللَّه الْحمد (دار القطني : ১৭৩৭)

“আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই এবং আল্লাহই সবচেয়ে বড়, আল্লাহই সবচেয়ে বড় আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহই জন্যই।’’-দারে কুতনি ঃ ১৭৩৭

ঈদগাহে আসা এবং যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করা আল্লাহ

হাদীসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ يَوْمَ الْعِيدِ فِي طَرِيقٍ، ثُمَّ رَجَعَ فِي طَرِيقٍ آخَرَ (أبو دادؤد : ১১৫৬)

“রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের সালাত পড়ার জন্য এক রাস্তা দিয়ে যেতেন এবং অন্য রাস্তা দিয়ে প্রত্যাবর্তন করতেন।’’ – আবূ দাঊদ ঃ ১১৫৬

ঈদের সালাত আদায় করা

সামর্থ্য অনুযায়ী শরীয়ত সম্মতভাবে উত্তম, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পোশাক পরিধান এবং সুগন্ধি ব্যবহার করা

হাদীস শরীফে রয়েছে,

্রأَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْعِيدَيْنِ أَنْ نَلْبَسَ أَجْوَدَ مَا نَجِدُ، وَأَنْ نَتَطَيَّبَ بِأَجْوَدَ مَا نَجِدُ، (المستدرك للحاكم : ৭৫৬০)

“হাসান আসসিবতু (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে আমরা যেন দু’ ঈদের দিনে সাধ্যমত উত্তম পোশাক পরিধান করি এবং সহজ প্রাপ্য সুগন্ধি ব্যবহার করি।’’ -হাকিম ঃ ৭৫৬০

কুরবানীর পশু জবেহ করা ও তার গোশত আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা

পরিবারের জন্য উত্তম খাবারের সুব্যবস্থা করা

খাবারের মধ্যেও একটি আনন্দ রয়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের দিনে সাওম রাখা হারাম ঘোষণা করেছেন, যেন সাওম মানুষের খানা-পিনায় বিন্দু মাত্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে।

সকল কাজের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন ও সন্তুষ্টি অন্বেষণের চেষ্টা করা

আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন তথা তাঁর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই কুরবানী দিতে হবে। যদি গোস্ত খাওয়া বা লোক লজ্জা সামাল দেয়ার জন্য কুরবানী দেয়া হয় তাহলে সেই কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবূল হবে না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ ۗ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ ﴿الحج: ٣٧﴾

“ওসব (কুরবানীর) পশুর রক্ত-মাংস আল্লাহর কাছে কিছুই পৌঁছে না; বরঞ্চ তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাক্বওয়াই তাঁর কাছে পৌঁছে। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল­াহ্র মহত্ত¡ ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং হে নবী নিষ্ঠার সাথে যারা নেক কাজ করে আপনি তাদের জান্নাতের সু-সংবাদ শুনিয়ে দিন’’।’’ -সূরা হাজ্জ ঃ ৩৭

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রإِنَّ اللَّهَ لَا ينظر إِلَى صوركُمْ وَلَا أموالِكم وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْগ্ধ (رَوَاهُ مُسْلِمٌ)

“আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের চেহারার দিকে এবং তোমাদের সম্পদের দিকে দেখেন না বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও আমল (অর্থাৎ নিয়তের বিশুদ্ধতা ও আমলের উৎকর্ষতা)।’’ -মুসলিম; মিশকাত ঃ ৫৩১৪

এ দিনটিকে শুধু খেলা-ধুলা, অশীল বিনোদন ও পাপাচারের দিনে পরিণত না করা

আমরা মুসলিম জাতি। আমাদের আকীদা-বিশ্বাস,সভ্যতা-সংস্কৃতি ও আদর্শের ভিত্তি হচ্ছে তাওহীদে বিশ্বাস। আমাদের আদর্শ সর্ব প্রকার বাজে হাসি-তামাসা, নিরর্থক জৌলুস, বেহুদা কর্মকান্ড ও অশ্লীল-ফাহেশা আচার-অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ন মুক্ত রাখা। যেমন আলকুরানের বাণী,

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ ﴿المؤمنون: ٣﴾

“আর তারা অনর্থ কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে”।’’ -সূরা মু’মিনুন ঃ ৩

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ عَلِيِّ بْنِ الْحُسَيْنِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِগ্ধ ( رَوَاهُ مَالك وَأحمد ,مشكوة- ৪৮৩৯)

“ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক কর্ম-কান্ড পরিহার করা”। -মুয়াত্তা; আহমদ; মিশকাত ঃ ৪৮৩৯

কুরবানীর পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি ইত্যাদির বিধান

কুরবানীর গোশ্তকে তিন ভাগ করে এক ভাগ ফকীর-মিসকীনদের মাঝে বিতরণ, একভাগ পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের বা বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে বিতরণ এবং একভাগ নিজ পরিবারবর্গের জন্য রাখা মুস্তাহাব বলে উলামায়েকিরাম উলে−খ করেছেন। কুরবানীর গোশ্ত যে তিন ভাগ করতে হয় নিচের আয়াতটিতে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে আলিমগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন,

فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ ۚ ﴿الحج: ٣٦﴾

“অতঃপর যখন সেগুলো কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু প্রার্থনা করে না তাকে এবং যে প্রার্থনা করে তাকে।’’ -সূরা হজ্জ ঃ ৩৬

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ ﴿الحج: ٢٨﴾

“অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দু ঃস্থ-অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ -সূরা হজ্জ ঃ ২৮

আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ্রأَمَرَهُ أَنْ يَقْسِمَ بُدْنَهُ كُلَّهَا، لُحُومَهَا وَجُلُودَهَا وَجِلَالَهَا، لِلْمَسَاكِينِগ্ধ (ابن ماجه : ৩১৫৭)

“রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে (আলীকে) তার কুরবানীর উটের গোশ্ত, চামড়া ও খুর সবকিছু দরিদ্রের মধ্যে বিতরণ করার নির্দেশ দেন।’’ -ইবন মাজাহ্ ঃ ৩১৫৭

কুরবানীর গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। ‘কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না’ বলে যে হাদিস রয়েছে তার হুকুম রহিত হয়ে গেছে। তাই যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন,

عَنْ جَابِرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ نَهَى عَنْ أَكْلِ لُحُومِ الضَّحَايَا بَعْدَ ثَلَاثٍ، ثُمَّ قَالَ بَعْدُ: ্রكُلُوا، وَتَزَوَّدُوا، وَادَّخِرُواগ্ধ (مسلم : ١٩٧٢)

“নবী ﷺ তিন দিনের পর কুরবানীর গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ﷺ বলেছেন, তোমরা তা (তিন দিনের পরেও) খেতে পারো এবং জমা করে রাখতে পারো।’’ -মুসলিম ঃ ১৯৭২

কুরবানী বা আক্বিক্বা করার সময় নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে কুরবানীর বা আক্বিক্বার গোশ্ত দ্বারা বিবাহ অনুষ্ঠানে আগত মেহমানদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা যাবে।’’ -আপনাদের প্রশ্নের জবাব-প্রশ্ন নং-১১২৯

সামর্থ্যবানগণ জিলহজ্জ মাসে যে কুরবানী দেন সে গোস্ত অমুসলিমদেরকে খেতে দেয়াতে দোষের কিছু নেই। তবে মান্নত ও ওসিয়তের কুরবানীর গোস্ত তাদেরকে দেয়া যাবে না।’’ -ফাতওয়া ও মাসায়েল, খ. ৬, পৃ. ৩৭১; মাসায়েলে ঈদাইন আওর কুরবানী-পৃ. ১৮৪

মিসকীনদের অংশ সমাজ নামক কেন্দ্রীয় একটি স্থানে জমা করে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করার ব্যবস্থা খুবই উত্তম বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু সমাজে যারা গোশ্ত জমা দিয়েছেন, তারা আবার সমাজ কর্তৃক বিতরণকৃত গোস্তের অংশ ফেরত নেয়ার যে নিয়ম কোন কোন এলাকায় প্রচলন আছে তা মোটেও বৈধ নয়। বরং তা গরীবদের মধ্যে বন্টন করে দিতে হবে।” -বুখারী ঃ ২৬২৭, বুখারী ঃ ২৬৬১,

জবাইকারী বা অন্য কাউকে কুরবানীর বিনিময় হিসেবে পশুর মাথা দিয়ে দেয়া বৈধ নয়, যদি হাদিয়া হিসেবে দেয়া হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই।

কসাইকে গোস্ত বানানোর বিনিময়ে পৃথকভাবে পারিশ্রমিক না দিয়ে কুরবানীর কিছু গোস্ত দেয়া মোটেও জায়েয নেই। তবে দান বা উপহার হিসেবে কসাইকে কিছু দিলে তা না-জায়েজ হবে না।

কুরবানীর গোস্ত বিক্রয় বা বিনিময় করা বৈধ নয়। দ্রঃ বুখারী ঃ ১৭১৬ ও মুসলিম ঃ ১৩১৭

কুরবানীর চামড়া তিন উপায়ে ব্যবহার করা যাবে

(১) কুরবানী দাতা নিজে ব্যবহার করতে পারবেন,

(২) অথবা কাউকে হাদিয়া দিতে পারবেন,

(৩) কিংবা বিক্রি করতে পারেন। তবে যদি বিক্রি করেন তাহলে তার সম্পূর্ণ অর্থ মিসকীনদের দিয়ে দিতে হবে।’’ -ফাতওয়া ও মাসায়েল, খ. ৬, পৃ. ৩৬৭

বন্ধুত্বের খাতিরে স্বল্পমূল্যে চামড়া বিক্রয় করা যাবে না চামড়ার টাকা অমুসলিমদেরকে দেয়া যাবে না।’’ -সমকালিন জিজ্ঞাসার জবাব-৮, প্রশ্ন নং-১৮০

 

কুরবানীর প্রাণী জবাই করার নিয়মাবলি

কুরবানী ঈদের সালাতের পরেই করা

জিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিন হল কুরবানী করার সময়, এ কয়দিনের যে কোন সময়ে পশু জবাই করলে কুরবানী সহীহ হবে। ঈদের সালাতের পর কুরবানীর পশু জবাই করা আবশ্যক, ঈদের সালাতের পূর্বে জবাই করলে তা কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে না।

عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ: خَطَبَنَا النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ النَّحْرِ فَقَالَ: ্রإِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ نُصَلِّيَ فَإِنَّمَا هُوَ شَاةُ لَحْمٍ عَجَّلَهُ لِأَهْلِهِ لَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِي شَيْءٍগ্ধ (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة : ١٤٣٥)

“রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরবানীর ঈদে আমাদের মাঝে খুতবা দিলেন। খুতবাতে তিনি বললেন, আজকের দিনের বিশেষ কাজের মধ্যে প্রথম কাজ হল আমরা প্রথমে ঈদের সালাত পড়ব। অতঃপর (বাড়িতে) ফিরে গিয়ে কুরবানী করব। যে ব্যক্তি এভাবেই করল সে আমাদের সুন্নত মোতাবিক আমল করল। আমাদের সালাত পড়ার পূর্বে যারা কুরবানী করল (তার কুরবানী আদায় হবে না) সে যেন নিজের পরিবারের লোকদের গোশত খাবারের জন্য বকরী জবেহ করল। কুরবানীর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।’’ -বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ১৪৩৫

কুরবানী করার সময় দুআ পড়া

কুরবানীর পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে بسم الله و الله اكبر বলাটাই জরুরী। নিম্মলিখিত দু’আ পাঠ জরুরী নয়, তবে মুখস্ত থাকলে পড়া ভাল।

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ صَلاَتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَاىَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ اللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَأُمَّتِهِ بِاسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ ‏ثُمَّ ذَبَحَ ( رَوَاهُ أَحْمَدُ وَأَبُو دَاوُدَ وَابْنُ مَاجَهْ وَالدَّارِمِيُّ ,مشكوة : ١٤٦١)

‘‘আমি আমার চেহারা তাঁর দিকে ফিরাচ্ছি, যিনি এককভাবে যমীন ও আসমান সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার হায়াত এবং আমার মউত আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের জন্য, যাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি এরূপ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি মুসলিমদের শামিল। ইয়া আল্লাহ! এটি তোমারই পক্ষে এবং তোমারই জন্যে-মুহাম্মদ ও তাঁর উম্মতের তরফ হতে। বিসমিল­াহ আল্লাহ আকবর। অুঃপর তিনি সে দু¤¦াকে যবাহ করেন। করেন।’’ -আহমদ; আবূ দাঊদ; ইবন মাজাহ; দারেমী; মিশকাত ঃ ১৪৬১

 

নিজ হাতে কুরবানী করা

নিজের কুরবানী নিজেই জবাই করা উত্তম, আমাদের নবী ﷺ নিজ হাতে কুরবানী বা জবাই করেছেন। হাদীসে আছে,

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: شَهِدْتُ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْأَضْحَى بِالْمُصَلَّى، فَلَمَّا قَضَى خُطْبَتَهُ نَزَلَ مِنْ مِنْبَرِهِ وأُتِيَ بِكَبْشٍ فَذَبَحَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِيَدِهِ، وَقَالَ: ্রبِسْمِ اللَّهِ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، هَذَا عَنِّي، وَعَمَّنْ لَمْ يُضَحِّ مِنْ أُمَّتِيগ্ধ (رَوَاهُ َأَبُو دَاوُدَ)

“জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি এক ঈদুল আযহার দিন নবীজির সাথে ঈদের মাঠে উপস্থিত ছিলাম, যখন তিনি খুৎবাহ শেষ করে মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন তখন তাঁর নিকট তরু-তাজা (কাল চোখ ও শিং বিশিষ্ট) একটি ছাগল আনা হল তিনি ছাগলটিকে নিজ হাতে জবাই করলেন এবং বললেন: بسم الله و الله اكبر “ইহা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতদের যারা কুরবানী করে নাই তাদের পক্ষ থেকে।’’ -আবূ দাঊদ ঃ ২৮১০

নিজে জবাই করতে না পারলে অন্তত পশুর সামনে কুরবানীদাতা ও সংশিষ্ট সবাই উপস্থিত থাকা

আবূ সাঈদ খুদরী  থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ফাতিমা -কে লক্ষ্য করে বললেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِفَاطِمَةَ عَلَيْهَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ: ্রقَوْمِي إِلَى أُضْحِيَّتِكَ فَاشْهَدِيهَا فَإِنَّ لَكِ بِأَوَّلِ قَطْرَةٍ تَقْطُرُ مِنْ دَمِهَا يُغْفَرُ لَكِ مَا سَلَفَ مِنْ ذُنُوبُكَগ্ধ قَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا لَنَا أَهْلَ الْبَيْتِ خَاصَّةً أَوْ لَنَا وَلِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةً؟ قَالَ: ্রبَلْ لَنَا وَلِلْمُسْلِمِينَ عَامَّةًগ্ধ (المستدرك علي الصحيحين للحاكم : ٧٥٢٥)

“হে ফাতেমা! তুমি তোমার কুরবানীর পশুর দিকে যাও এবং (পশুর কুরবানীকার্য) প্রত্যক্ষ কর। কেননা পশু থেকে নির্গত প্রথম রক্ত বিন্দুর অসিলাতেই তোমার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়। ফাতেমা  জিজ্ঞেস করলেন; ইয়া রাসূলাল­াহ! এ প্রতিদান কি শুধু আমাদের (নবীর পরিবারের) জন্যই নির্ধারিত নাকি আমাদের ও সমস্ত মুসলানদের জন্যই নির্ধারিত? তিনি বললেন: না বরং আমাদের ও সমস্ত মুসলমানের জন্যই নির্ধারিত।’’- মুস্তাদরাকে হাকিম ঃ ৭৫২৫; বাযযার

 

কুরবানী বা পশু জবেহ করার সময় যে সকল  বিষয় লক্ষণীয়

পশুকে কষ্ট না দেয়া

যা কুরবানী বা জবেহ করা হবে তার সাথে সুন্দর আচরণ করা এবং তাকে আরাম দেওয়া।

জবাই করাতে প্রাণীর কষ্ট তো হবেই, এর বাহিরে অতিরিক্ত কোন কষ্ট যেন না হয় সে ব্যপারে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রإِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ فَإِذَا قَتَلْتُمْ فَأَحْسِنُوا الْقِتْلَةَ وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذَّبْحَ وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)

“আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক জিনিসের বেলায়ই ইহসানকে ফরয বা অবশ্য করণীয় করে দিয়েছেন। তোমরা যখন কোন প্রাণীকে হত্যা করবে, উত্তমভাবে হত্যা করবে। যখন কোন প্রাণীকে যবেহ করবে, উত্তমভাবে যবেহ করবে। আর তোমাদের প্রত্যেকেই যেন তার ছুরিটাকে শানিত করে নেয় এবং প্রাণীকে জান বের হওয়া পর্যন্ত (আরাম) প্রশান্তি দেয়।’’-মুসলিম; মিশকাত ঃ ৪০৭৩

যদি উট কুরবানী বা জবেহ করতে হয় তবে তা নহর করবে।’’-সূরা হজ্জ ঃ ৩৬, তাফসীর ইবন কাসীর

 

আইয়্যামুততাশরীক ও তার করণীয়

আইয়্যামুততাশরীক বলা হয় কুরবানীর পরবর্তী তিন (জিলহজ্জ মাসের ১১, ১২ ও ১৩) দিনকে।

 

আইয়্যামুত-তাশরীকের ফজীলত

এ দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগি, আল­াহ্ রাব্বুল আলামিনের জিকির ও তার শুকরিয়া আদায়ের দিন

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَّعْدُودَاتٍ ﴿البقرة: ٢٠٣﴾

“তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল­াহ্কে স্মরণ করবে।’’ -সূরা বাক্বারা ঃ ২০৩

ইমাম বুখারী (রহঃ) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট দিনগুলো বলতে আইয়্যামুততাশরীককে বুঝানো হয়েছে।” -ফতহুল বারী,

আইয়্যামুততাশরীকের দিনগুলো ঈদের দিন হিসেবে গণ্য

হাদিসে এসেছে, “সাহাবী উকবাহ ইবন আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, যে রাসূলে করীম ﷺ বলেছেন,

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রيَوْمُ عَرَفَةَ، وَيَوْمُ النَّحْرِ، وَأَيَّامُ التَّشْرِيقِ عِيدُنَا أَهْلَ الْإِسْلَامِ، وَهِيَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍগ্ধ (ابو داؤد)

“আরাফা দিবস, কুরবানীর দিন ও মিনার (কুরবানী পরবর্তী তিন দিন) দিন সমূহ আমাদের ইসলাম অনুসারীদের ঈদের দিন। সেগুলো পানাহারের দিন।” -আবূ দাঊদ ঃ ২৪১৯; তিরমিযী

এ দিনসমূহ জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের সাথে লাগানো। যে দশক খুবই ফজীলতপূর্ণ। তাই এ কারণেও এর যথেষ্ট মর্যাদা রয়েছে। এ দিনগুলোতে হজ্জের কতিপয় আমল সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এ কারণেও এ দিনগুলো ফজিলতের অধিকারী।

আইয়্যামুততাশরীকে আমাদের করণীয়

এ দিনসমূহ যেমনি ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আযকারের দিন, তেমনি আনন্দ-উল­াস করার দিন। রাসূলুল­াহ্ ﷺ বলেছেন,

عَنْ نُبَيْشَةَ الْهُذَلِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রأَيَّامُ التَّشْرِيقِ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرِ اللَّهِগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)

“আইয়্যামুততাশরীক হলো খাওয়া-দাওয়া ও আল­াহ্র জিকিরের দিন।”-মুসলিম; মিশকাত ঃ ২০৫০

সুতরাং এ দিনগুলোতে আমাদের উচিত আল­াহ্ রাব্বুল আলামিনের দেয়া নি‘য়ামত নিয়ে আমোদ-উল­াস করার মাধ্যমে তার শুকরিয়া ও জিকির আদায় করা।

 

কুরবানী ব্যতীত এ মাসের আরও কিছু আমল

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিন অধিক হারে ইবাদত-বন্দেগী করা

এ স¤পর্কেÑ হাদীসে উলে­খ রয়েছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ্রمَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشَرَةِগ্ধ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ؟ قَالَ: ্রوَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍগ্ধ )رَوَاهُ البُخَارِيّ ,مشكوة : ١٤٦٠)

“জিলহজ্জের এই প্রথম দশ দিনগুলো ব্যতীত এমন কোন দিন নেই যে দিনের সৎ কর্ম (ইবাদত) আল্লাহ তা‘আলার নিকট অধিক পছন্দনীয়। সাহাবাগণ আরয করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি নয়? তিনি বললেন: জিহাদও না, তবে যে ব্যক্তি জান ও মাল নিয়ে যুদ্ধে বের হয়ে আর কোনটা নিয়েই সে ফিরে আসে নাই (শহীদ হয়ে গেছে, তার মর্যাদা বেশি)।’’ -বুখারী ঃ ৯৬৯; মিশকাত ঃ ১৪৬০

তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ খুব গুরুত্ব সহকারে এ দশ দিনের সদ্ব্যবহার করতেন। উম্মুল মুমিনীন আয়িশা  বলেছেন,

عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا ليله وَأَيْقَظَ أَهله (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ ,مشكوة : ٢٠٩٠)

“যখন জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন আগমন করত তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ লুঙ্গি খুব ভাল করে বেঁধে নিতেন ও রাত্রি জেগে ইবাদত করতেন এবং তার পরিবারবর্গকে জাগিয়ে দিতেন।’’ – বুখারী; মুসলিম; মিশকাত ঃ ২০৯০

আরাফাতের দিনের ফজীলত

জিলহজ্জের ৯ তারিখ আরাফাতের দিনের সাওমের ফজীলত সম্পর্কে হাদীসে উলে­খ রয়েছে,

্রصِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُগ্ধ )رَوَاهُ مُسلم)

“রাসূলুল্লাহ ﷺ  বলেছেন, আমি আল্লাহ পাকের দরবারে আরাফাত দিবসের রোজা সম্পর্কে আশা রাখি যে ইহার বিনিময়ে তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন।’’ -মুসলিম ঃ ২৬৩৬; মিশকাত ঃ ২০৪৪

ঈদের রাতের ফজীলত

১০ ই জিলহজ্জ তারিখ ঈদের রাতের ফজীলত সম্পর্কে হাদীসে রয়েছে,

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ্রمَنْ قَامَ لَيْلَتَيِ الْعِيدَيْنِ مُحْتَسِبًا لِلَّهِ لَمْ يَمُتْ قَلْبُهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُগ্ধ (ابن ماجه : ١٧٨٢)

“রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সওয়াবের নিয়তে দু’ ঈদের রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করবে তার অন্তর সেদিন মরবে না যেদিন সমস্ত— অন্তর মরে যাবে।’’ -ইবন মাজাহ ঃ ১৭৮২

গোঁফ, চুল, অবাঞ্চিত লোম, নখ ইত্যাদি কর্তন না করা

জিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর থেকে ঈদের দিন কুরবানীর পশু জবাই পর্যন্ত গোঁফ, চুল, অবাঞ্চিত লোম, নখ ইত্যাদি কর্তন না করা। চাই সে কুরবানী দিক আর না দিক, এটা সবার জন্য মুস্তাহাব। এ স¤পর্কে হাদীসে আছে,

্রمَنْ رَأَى هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ وَأَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَأْخُذْ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ أَظْفَارِهِগ্ধ (رَوَاهُ مُسلم)

“যে ব্যক্তি কুরবানী করার ইচ্ছা করেছে সে জিলহজ্জের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর পশু জবাই পর্যন্ত তার চুল ও নখ যেন কর্তন না করে।’’ -মুসলিম; তিরমিযী; মিশকাত ঃ ১৪৫৯

তাকবীরে তাশরীক

জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ ফজরের সালাত থেকে ১৩ তারিখ আসরের সালাত পর্যন্ত (২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর একবার নিæের তাকবীরটি বলা ওয়াজিব। জামাতে হউক বা একা, নারী হউক বা পূরুষ, মুকিম হউক চাই মুসাফির প্রত্যেকের জন্যই ইহা ওয়াজিব, তবে নারীরা নিæ আওয়াজে এবং পুরুষরা উঁচু আওয়াজে বলবেন। এ তাকবীরটি একবারই ওয়াজিব একের অধিক বলা খেলাফে সুন্নত।’’ -মাসায়েলে ঈদাইন ও কুরবানী-পৃ. ৫৫

তাকবীরটি নিম্মরূপ

اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ واللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وللَّه الْحمد

উপসংহার

ঈদুল আযহা মুসলিম জাতির ধর্মীয় উৎসবের দিন, আল­ার জন্য প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করে আল্লাহর নৈকট্যলাভের দিন, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার দিন, আর্তমানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করার দৃপ্তশপথের দিন, পাপাচার পরিত্যাগ করে ইব্রাহীম (আঃ)-এর ন্যায় একনিষ্ঠ ধর্মভীরু হওয়ার প্রত্যয় গ্রহণের দিন। সুতরাং আসুন আমরা সকলে দেশ, জাতি ও ধর্মের কল্যাণে নিজেদেরকে উৎসর্গ করি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।’’ -আমীন!!

 

Leave a Reply